রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিন: যাহা বায়ান্ন তাহাই তিপান্ন

/ALTERNATES/w540/03_Myanmar_Unrest_221116_0001.jpg” width=”512″ />

আমি জাতীয়তাবাদী নই, ধর্ম বিশ্বাসীও নই, তাহলে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাংলাদেশে আশ্রয় দানের বিষয়ে আমার অবস্থান কি হবে? তার আগে বলে নেই যারা রোহিঙ্গাদের জন্য বর্ডার খুলে দিতে বলছেন তাদের একমাত্র অবস্থান মানবতার পক্ষে। তবে এখানে ইসলামপন্থিদের কথা বলা হচ্ছে না। নাস্তিক-প্রগতিশীল-সেক্যুলারদের কথাই বলছি। এদের একটা পক্ষ সরাসরি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার যুক্তি আশংকা ও বাস্তবতা দেখিয়েছে যা অগাহ্য করাও কঠিন। বর্ডার খুলে দেয়ার পক্ষে যারা তারা রোহিঙ্গাদের জিহাদী মনোভাব, সন্ত্রাস ও ড্রাগ ব্যবসার কথা উল্লেখ করেও তাদের আশ্রয় দিতে বলেছেন কারণ এসব অভিযোগ থাকার পরও বিপদগ্রস্তের আশ্রয় পাবার অধিকার শতভাগ। তাছাড়া নৌকায় করে তাড়া খেয়ে আসা অবোধ শিশু ও নারীদের কি দোষ? এই মানবিক প্রশ্ন এড়ানোও কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? আবারও বলছি আলোচনাটা নাস্তিক-সেক্যুলার-প্রগতিশীল-মুক্তমনাদের অবস্থাগত দিক থেকে। এখানে ইসলামপন্থি একচোখা মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের কোন স্থান নেই।

এ যাবত পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুতে যতটুকু লিখেছি তাতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় বিষয়ের চেয়ে আমার কাছে গুরুত্ব পেয়েছে রোহিঙ্গা নির্যাতনের রব তুলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতনা সৃষ্টির প্রতি। রোহিঙ্গা ইস্যু আমার কাছে সাময়িক এবং প্রায় সমাধানহীন। তর্কের খাতিরে সমস্ত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে দিলে তাদের বার্মার নির্যাতন থেকে রেহাই মিলবে। কিন্তু সারা বিশ্বে মুসলিমদের প্রতি যে ভীতি ও অবিশ্বাস বেড়ে চলেছে তার এক ইঞ্চি কমবে কি? আগের একটা লেখায় বলেছিলাম ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান যা কুরআন নির্দেশিত সেখান থেকে সাধারণ মুসলিমরা বের হতে না পারলে সারা পৃথিবীতে মুসলিমদের শরণার্থী হওয়ার ঢল কেউ থামাতে পারবে না। এবং এইসব মুসলিম শরণার্থীরা নদী সাঁতরিয়েও কোথাও আশ্রয় পাবে না। নেংটি ইঁদুরকে কেউ ঘরে আশ্রয় দিতে চায় না কারণ সে আশ্রয়দাতার ঘরের বাঁধনই কেটে ছাফা করে দেয়। আজকে রোহিঙ্গাদের প্রতি একমাত্র মানবিক অবস্থান ছাড়া তাদের পক্ষে হয়ে দুটো ভাল কথা কি আমাদের বলার উপায় আছে? ইরাকী-সিরিয়ান মুসলিমদের ইউরোপের বর্ডারে প্লেকার্ড লিখে স্বাগত জানিয়েছিল যারা তারাই ছয় মাস যেতেই মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে উঠেছে। জোর দাবী উঠেছে তাদের ইউরোপ থেকে খেদিয়ে দিতে। আমার পয়েন্টটা এই জায়গায় আটকে আছে এবং বর্তমান রোহিঙ্গা সমস্যার সাময়িক জোড়াতালির চাইতে মুসলমানদের আগামী ভবিষ্যতের দিকে বেশি মনযোগী আমি। বেশির ভাগ মুসলিমই জিহাদী জঙ্গি নয়- এটি কি আমাদের বায়ুবীয় একটি থিউরী নয়? নিজেদের বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা আমাদের কি বলে?

মুসলমানরা জঙ্গিবাদ বিরোধী এটা একটা শুভংকরের ফাঁকি! বুঝিয়ে বলছি- আমরা যাদেরকে জঙ্গি বলছি তাদের নামকরণ করেছে অমুসলিম বিশ্ব। সারা পৃথিবীতে যেখানেই মুসলমানরা জিহাদ করতে যায় সেটাকেই অমুসলিম গণমাধ্যম ‘মুসলিম জঙ্গি’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে। যারা ইসলামের সঙ্গে একমত না, জিহাদের সঙ্গে একমত না তারা তো সেটাকে সন্ত্রাস বলবেই। আবার মুসলিমরা জিহাদকে তাদের ধর্মযুদ্ধ বলে বিশ্বাস করে, এটাকে সন্ত্রাসের সঙ্গে এক করে দেখে না, কাজেই তারা সন্ত্রাসী এটা মানতে নারাজ, এ কারণেই তারা বলে ইসলামে জিহাদের কথা বলা আছে, কিন্তু সন্ত্রাসের কোন স্থান নেই!

এক সময় হিন্দু ধর্মমতে বিধবাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলা হত, এটাকে তারা সাধারণ আগুনে পুড়িয়ে হত্যার সঙ্গে এক করে দেখত না। কাউকে আগুনে পুড়িয়ে মারা ঘোরতর অধর্ম একজন ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুর কাছে কিন্তু ধর্মীয় বিধানে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবাকে স্বামীর চিতায় সহমরণে যাওয়াকে কোন অপরাধই মনে হয় না। এখানেই ধর্মের নৈতিকতার লেভেল ও ধার্মীকের নৈতিকতার প্রশ্নহীন আনুগত্যটা অনুভব করা যায়। একারণেই ইসলামে অমুসলিমদের কাছ থেকে তাদের দেশ ছিনিয়ে নিয়ে সেখানে মুসলমানদের শাসন কায়েম করাকে মুসলিমরা সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তুলনীয় মনে করে না।। ইসলামে একদম স্পষ্ট করে বলা আছে কাফেরদের দেশ (দারুল হার্ব) মুসলিমরা দখল করে আল্লাহ শাসন কায়েম করবে। এর জন্য কোন রকম কারণ বা উছিলার প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে কাফেররা যদি আহলে কিতাবী হয়ে থাকে (যেমন ইহুদী-খ্রিস্টান) তাহলে তাদের জিজিয়া কর দিয়ে নতমস্তকে মুসলিমদের বশ্যতা স্বীকার করে বেঁচে থাকার সুযোগ আছে। কিন্তু যারা আহলে কিতাবীদের কাতারে পরে না অর্থ্যাৎ যাদের কিতাবকে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না (যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, ইয়াজিদি ইত্যাদি) তাদের জিজিয়া কর দিয়েও রেহাই পাবার কোন সুযোগ নেই। তাদের জন্য একটাই পথ খোলা, হয় ইসলাম গ্রহণ করো, না হয় ইসলামের তলোয়ারের নিচে কল্লা ফেলো। হিটলার, মুসলিনিদের কার্যক্রম মানবতা বিরোধী হলেও একই কাজ করা ইসলামে বৈধ এবং তাকে মানবতা বিরোধী বলা ‘ইসলাম ব্যাসার’! হাজার হাজার মুসলমান তাদের সহজাত নৈতিকতায় যে কোন স্বৈরশাসনকে সমর্থন করেন না কিন্তু ইসলামের ধর্মযুদ্ধকে এদের সঙ্গে মিলাতে সম্মত হন না। আমেরিকা ইরাক যুদ্ধে লুন্ঠন চালিয়েছিল, আমাদের মুক্তিযু্দ্ধে পাকিস্তান ও এদেশীয় দালাল দল লুটপাট চালিয়েছিল, বাড়িঘরে আগুন, নারীদের উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছিল। সেসবকে সব মুসলমানই ঘৃণা করে কিন্তু ইসলামের গণিমতকে অন্যায় বলে মনে করে না। গণিমতের মালের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের যুদ্ধাপরাধীদের কার্যক্রমের সঙ্গে তফাতটা কি? গণিমত তো যুদ্ধলব্ধ মালকে বুঝানো হয়। ইসলাম মতে মুসলিমরা যে সব দেশে আক্রমন চালিয়ে দখল করতে সক্ষম হবে সেখানকার কাফেরদের সমস্ত ধনসম্পত্তি মুসলিমদের হয়ে যাবে। এই সম্পত্তির মধ্যে নারী হচ্ছে অন্যতম। ইসলাম সেইসব গণিমত হওয়া নারীদের অবাধে সেক্স করা মুসলিম পুরুষদের জন্য হালাল করে দিয়েছে। একজন মুসলিম কতখানি সাংঘর্ষিক দেখুন, সে এহেন কাজ যখন মার্কিন সৈন্যরা, ন্যাৎসিরা, পাকিস্তানীরা করে তখন নোংরা কুৎসিত বলে জানে কিন্তু গণিমতকে অন্যায় বলে স্বীকার করে না। …সম্প্রতি একটা জরিপে ১০ ভাগ ছাত্রছাত্রী জিহাদকে সমর্থন করে বলে প্রকাশ পেয়েছে। জরিপটি আমার কাছে অসম্পূর্ণ বলেই মনে হয়েছে। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এমন কোন বিশ্বাসী মুসলিম পাওয়া যাবে না যারা অবিশ্বাস করে সারা দুনিয়া ইসলামের পদনত হবে একদিন। মুসলিমদের ধর্মীয় অন্তিম বিশ্বাস হলো, কিয়ামতের আগে পৃথিবী আল্লাহ বিধান কুরআনের শাসনের অধিনে আসবে। সে অর্থে কোন মুসলিম গণতন্ত্র, সেক্যুলারিজম, অসাম্প্রদায়িকতাতেই বিশ্বাস রাখতে সক্ষম হবার কথা নয়। কার্যত সেটাই আমরা দেখি। বাংলাদেশের আবেগের বশে করে ফেলা ৭২ সালের সংবিধানকে যে ‘হাসজারু’ আমরা করেছি তার মূলে ইসলামী বিশ্বাসকে মুল্য দেয়া। জরিপ দল যদি প্রশ্ন রাখত, আপনি কি বিশ্বাস করেন একদিন ইসলামের অধীনে সমস্ত পৃথিবী এসে যাবে- তাহলে অবশ্যই বিশ্বাসী সব মুসলিমের উত্তর হবে হ্যাঁ। কিন্তু জিহাদ শব্দে এখনো তাদের কারুর কারুর অস্বস্তি থাকতে পারে। খেলাটা শব্দের মারপ্যাচ, ননজিহাদীরাও ইসলাম কায়েম চায়- কিন্তু জিহাদের নামে ‘জঙ্গিবাদকে’ তারা সমর্থন করে না!

এবার রোহিঙ্গাদের কথা ছাড়ুন, এই অবস্থায় কালকে যদি আপনাদের শরণার্থী হতে হয় কেউ কি আপনাদের আশ্রয় দিতে চাইবে মুসলিম পরিচয়ে? ৭১ সালের বর্ডার খুলে ২ কোটি শরণার্থী নিয়েছিল ভারত, পরিবর্তিত বাংলাদেশী মুসলিমদের এখন কি ভারতীয় বাঙালী হিন্দুরা আর বিশ্বাস করবে? ‘নাস্তিকরা মুসলিম বিদ্বেষী’ –এরকম অভিযোগ শুনলেই বহু নাস্তিক বিব্রত হোন। অথচ একটা সম্প্রদায়ের আত্মসমালোচনা ছাড়া কি তাদের পরিবর্তনের কোন সুযোগ আছে? নেই। এমনকি সমস্ত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে জিহাদ শুরু করে দিবে- তাই তাদের আশ্রয় দেয়া চলবে না- এই আশংকার বিপরীতে জরিপের ১০ ভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠির জিহাদের পক্ষে মতামতটা কি? আগামীদিনে সারা বিশ্বে শরণার্থী বলতে কেবল মুসলিমদেরকেই বুঝাবে এবং তাদেরকে কেউ আশ্রয় দিতে চাইরে না নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার কারণে। তখন কিন্তু মানবতার যুক্তি দিলে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদ বিশ্বজুড়ে জেগে উঠবে। যা এখনি ইউরোপে জাগতে শুরু করেছে। রোহিঙ্গাদের বর্ডার খুলে দেন সমস্যা নাই। তবে নিজেদের রোহিঙ্গাদের মতই কেউ আশ্রয় দিতে চাইবে না- সেটা নিয়েই মনে হয় বেশি ভাবা উচিত। সিরিয়াস…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =