শীতনিদ্রা ও ধর্মীয়-জাতিগত সিলেকটিভ মানবতাবাদ!

মিয়ানমারের নির্যাতিত অসহায় রোহিঙ্গাদের (পড়ুন রোহিঙ্গা মুসলমান!) নিয়ে আমাদের দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে কলামিস্ট, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাঁরা বেশ সরব। তাঁদের প্রতিবাদ, আর্তনাদ-হাহাকারে ফেসবুক-ব্লগ, অনলাইন পোর্টাল, নিউজ পেপার বেশ ভারি হয়ে উঠছে। মানবতা-দরদ উথলে উঠেছে। মিয়ানমারের জনগণ, রাষ্ট্র ও শান্তির মুখোশধারী অংসাং সুকি হয়ে সমস্ত বিশ্ব চরাচর তথা জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গগনবিদারী গণ-আর্তনাদ করে প্রতিবাদী লেখালেখি চলছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিভাবে এই নির্যাতিত মুজরিম রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশয় দিতে পারে সেই বিষয় নিয়ে পরামর্শমূলক বিস্তর লেখালেখি চলছে। বেশ। বুদ্ধিজীবীদের দায় আছে, থাকতে হয়। বেশ।

ক.
মিয়ানমারের নির্যাতিত অসহায় রোহিঙ্গাদের (পড়ুন রোহিঙ্গা মুসলমান!) নিয়ে আমাদের দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে কলামিস্ট, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাঁরা বেশ সরব। তাঁদের প্রতিবাদ, আর্তনাদ-হাহাকারে ফেসবুক-ব্লগ, অনলাইন পোর্টাল, নিউজ পেপার বেশ ভারি হয়ে উঠছে। মানবতা-দরদ উথলে উঠেছে। মিয়ানমারের জনগণ, রাষ্ট্র ও শান্তির মুখোশধারী অংসাং সুকি হয়ে সমস্ত বিশ্ব চরাচর তথা জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গগনবিদারী গণ-আর্তনাদ করে প্রতিবাদী লেখালেখি চলছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিভাবে এই নির্যাতিত মুজরিম রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশয় দিতে পারে সেই বিষয় নিয়ে পরামর্শমূলক বিস্তর লেখালেখি চলছে। বেশ। বুদ্ধিজীবীদের দায় আছে, থাকতে হয়। বেশ।

খ.
এ হেন সংকটপূর্ণ সময়ে মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, আশ্রয় দেওয়া কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মানবিক আচরণ করা কতো জরুরি তা বিবেকবান মাত্রেই জানেন, মানেন ও বুঝেন। মানুষের জন্যই তো রাষ্ট্র, আইন-কানুন নাকি? মানুষ হয়ে মানুষের জন্যই যদি রাষ্ট্র তথা ভূ-খন্ড মানুষের কল্যাণে, আপদে-বিপদে কাজে লাগানো না গেলো তবে মিছে কেনো এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা? মিছে এই জগৎ। মিছে এই সয়াল-সংসার। মিছে এ মানবতা! রাষ্ট্র হোক সুষম বন্টনের। রাষ্ট্র হোক মানবিক। মানুষের মানবের। তবেই না রাষ্ট্র কল্যাণকামী। তা বেশ বেশ।

গ.
দলীয় দুর্নীতি, শেয়ার বাজার ধ্বংস, কেন্দ্রীয় ব্যাংক লুটপাট, ধারাবাহিক ধর্ষণ-খুন-গুম-জখম, ধারাবাহিক লেখক-প্রকাশক, ব্লগার, ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা-নির্যাতন, গণহারে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন, অত্যাচার-নির্যাতন করে দেশছাড়া করা, হাড় জিরজিরে জীবন্মৃত আদিবাসীদেরকে দেশছাড়া করার উদ্দেশ্যে নজিরবিহীন হামলা মামলা, হত্যা, গণ-গ্রেফতার করা, ঘৃণ্য ও বর্বরোচিতভাবে ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে ভিটেমাটিহারা করা সহ অকারণ রাজনৈতিক হয়রানি করা এতোসব ভয়াবহ ঘটনা ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। মাসকাবারি, বছরওয়ারি চিত্র দেখলে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির থেকে কম নির্মম নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে নির্মমতা ও ভয়াবহতার বিচারে পুরো বাংলাদেশের চিত্রটা নির্মমতাকে পুঁজি করে দাঁড়িয়ে আছে!

ঘ.
ধর্মীয় বিচারে, ভেদবুদ্ধির বিচারে, চিন্তা-চেতনার বিচারে, ভিন্নমতের বিচারে, সংখ্যার বিচারে, দল-গোষ্ঠিগত বিচারে, ঐক্য ও দলগত বিচারে যদি আপনাদের নিজেদের নিরাপত্তা সুশীলতাকে জারি রেখে ও বুদ্ধিবৃত্তিকে শীত-নিদ্রায় রেখে নিজেদের দেশের ভেতরে ঘটে যাওয়া ধারাবাহী এইসব ভয়াবহ নির্মমতাকে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে মৌন সম্মতি দিয়ে পরিপুষ্টি দান করে থাকেন, তবে আজ, এই সময়ে ভিনরাষ্ট্র মিয়ানমারের নির্যাতিত অসহায় রোহিঙ্গাদের (স্যরি, আবারও পড়ুন মুসলিমদের!) জন্য গগনবিদারী হাহাকার-আর্তনাদের মোড়কে গরম ও ভারি প্যাকেটজাত মানবতাবাদ কি তবে নির্দিষ্ট জাত-ধর্মের তরে? এই প্রশ্ন তোলা কি তবে অন্যায়, নাকি অপরাধ, ধৃষ্টতাজ্ঞান হিসেবে গণ্য করবেন আপনারা?

ঙ.
দেশের নিকট অতীত ও বর্তমান চলমান নৃশংসতা বিচারে মিয়ানমারের চলমান গণ-নির্যাতন, হত্যা, দেশত্যাগকে নির্মোহভাবে দেখলে তা সমগ্র মানবজাতির জন্য সত্যি লজ্জার। তেমনি স্বাধীন ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক এই ব-দ্বীপের ভেতর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনাগুলো নির্মমতা ও লজ্জাকে ফেরি করে, সমগ্র বিশ্বের মানবজাতিকেই শোকাভিত করে। পার্থক্য, এইসবকে আপনারা বিচ্ছিন্ন মনে করেন, সাময়িক উত্তেজনা মনে করেন। বিরোধী দলীয় কর্মকাণ্ড মনে করে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। কেউ কেউ একে সংখ্যাগুরুর দেশে এইরকম একটু আধটু সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়-ই বলে বৈধতা দিয়ে চা খেতে খেতে, ফেসবুকে কিংবা রাতের টকশো শেষ করে বাসায় ফিরে পেটপুরে খেয়ে ঘুমাতে যান।

চ.

ঘুম থেকে উঠে খবরে প্রকাশিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনকে মানবতার লংঘন শীর্ষক কলাম, বক্তৃতা-বিবৃতি রেডি করেন, প্রকাশ করেন ও টকশোতে বক্তব্য রাখেন। প্রতিবাদ জারি রাখেন। মানববন্ধন করেন। দিনশেষে ইতিহাসের আলোয় মুজরিম রোহিঙ্গাই প্রতিপাদ্য হয়ে উঠে চাপা পড়ে দেশের মুজরিম নির্যাতিত সংখ্যালঘু হত্যা-নির্যাতন। শোক আর চোখের জলে ক্রমশ আড়াল হয় দেশীয় ঘটনা। বিরান হয় মানবতা। রাষ্ট্রের অমোঘ নিদানের বলি হয়ে গুলি খেয়ে মরে পরে থাকে শ্যামল-মঙ্গলরা, চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি, দেশ ছেড়ে পালায় সুধাংশু-শ্যামল- মঙ্গলরা। দেশান্তরি হয়ে শরণার্থীর জীবন বেছে নেয়। সেই জায়গায় শরণার্থী বেশে স্থান পায় রোহিঙ্গারা! শীতের ঘুম কাতরতায় জড়িয়ে যায় সমস্তকিছু। চোখ খোলা মাছের মতো নিদ্রায়মাণ হয় সমস্ত চরাচর, সমস্ত মানবিকতা!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2