সাম্প্রতিককালে হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর হামলার নেপথ্য-কারণ

সাম্প্রতিককালে হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর নগ্ন-হামলার ঘটনা অযাচিতভাবে বেড়ে গেছে। আর কিছু হলেই একদল মানুষ-নামের আর মুসলমান-নামের নরপশু হিন্দুসম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘জিহাদী-জোশে’ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর এরা মনে করে থাকে: এভাবে হামলা চালালেই বুঝি বাংলাদেশটা তাদের দখলে চলে আসবে। আর তারা ‘পাকিস্তানী-স্টাইলে’ ধর্মের নামে শয়তানীরাজত্ব শুরু করতে পারবে। এইরকম একটি শয়তানীখায়েশ এই দেশের একশ্রেণীর মানুষের মনে সবসময় ছিল। আর তা এখনও পুরাপুরি রয়েছে। আর এই খবিসগুলো আজও মানুষ হয়নি। এদের সংখ্যা যেন দিন-দিন আরও বাড়ছে। মুসলমান না হয়ে ‘মুসলমান-নামে’র একশ্রেণীর হিংস্র-জীব ইসলামধর্মকে পুঁজি করে আজ নিজেদের স্বার্থের রাজনীতি শুরু করেছে। আর সবসময় ইসলামধর্ম এদের একমাত্র পুঁজি। এরা কিন্তু ইসলামধর্ম ভালোবাসে না। কিন্তু হিন্দুসম্প্রদায়ের জায়গাজমি আর তাদের ঘরবাড়ি দখল করার সময় ইসলামধর্মের দোহাই দিয়ে থাকে। আজ এরাই দেশ, ধর্ম আর জাতিকে কলুষিত করছে।

সাম্প্রতিককালে হিন্দুদের উপর যতগুলো আর যতবার হামলা হয়েছে তাকে রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কেন? আর কাদের স্বার্থে এসব করা হচ্ছে? আর এসবের উদ্দেশ্যই বা কী? এর কারণ, এর পিছনে রয়েছে এদেশেরই একদল ভণ্ড, অমানুষ, আর মুসলমান-নামধারী কায়েমী-স্বার্থবাদীদের বিরাট বৈষয়িক ভাবনাচিন্তা। আর এদের কারণেই বারবার এদেশে হিন্দুদের উপর বিশেষ করে সংখ্যালঘুসম্প্রদায়ের উপর একের-পর-এক জঘন্য হামলা পরিচালিত হচ্ছে। আর এসবের কোনো বিচারও হচ্ছে না।

হিন্দুসম্প্রদায় তথা সংখ্যালঘুসম্প্রদায়ের উপর হামলার কতকগুলো কারণ রয়েছে। নিচে এর কয়েকটি তুলে ধরা হলো:

১. এদেশে এখনও এককোটির উপর হিন্দু-ভোটার রয়েছে। এটি দেশের একটি চিহ্নিত মৌলবাদীগোষ্ঠীর মাথাব্যথার কারণ। এদের কোনোভাবে তাড়িয়ে দিতে পারলেই তাদের আফগানী, তালেবানী আর পাকিস্তানী ইসলামীশাসন কায়েম করা সহজ হয়ে যাবে। এরা সেই ১৯৪৭ সাল থেকে হিন্দুসম্প্রদায়ের পিছনে এভাবে লেগে আছে। আর পাকিস্তানের দালাল মুসলিমলীগারদের উত্তরসূরীরা আজও হিন্দুনিধনে ব্যস্ত। এদের কাছে ধর্ম মানে: হিন্দুসম্প্রদায় তথা দেশের সংখ্যালঘুসম্প্রদায়কে যেকোনোপ্রকার নির্যাতন ও হত্যা করা। এই অপআদর্শ তারা আজও হৃদয়ধামে বহাল রেখেছে।

২. এই দেশে নামধারী-মুসলমানদের একটি বিরাট অংশ লুটেরাদের বংশধর। ১৯৪৬ সালের রায়ট থেকে তাদের লুটতরাজ শুরু। এরপর ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের সময় থেকে তাদের লুটপাটের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এসময় দেশের হিন্দুসম্প্রদায়ের লোকেরা জীবন বাঁচাতে তাদের সবকিছু ফেলে ভারতে পালাতে থাকে। আর সেই সুযোগে এরা, মানে মুসলমান-নামধারীরা একেকজন গজনীর কুখ্যাত দস্যুসম্রাট সুলতান মাহমুদের উত্তরসূরী হয়ে হিন্দুসম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, জায়গাজমি, দালানকোঠা, পুকুর, বসতবাড়ি, ধানীক্ষেত, জোতজমি ইত্যাদি রাতারাতি গ্রাস করতে থাকে। অথচ, এদের অনেকেই ছিল রাস্তার ভিক্ষুকের চেয়েও নিম্নস্তরের। আর তারাই এখন বড়-বড় বাড়ি আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক! এসবই তাদের হিন্দুসম্প্রদায়ের নিকট থেকে লুটপাটকৃত ফসল। এদেরই উত্তরাধিকারীরা বর্তমানে নতুন নামে আর নতুন চেহারায় হিন্দুসম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, জায়গাজমি, দালানকোঠা, পুকুর, বসতবাড়ি, ধানীক্ষেত, জোতজমি ইত্যাদি আবার গ্রাস করার জন্য উন্মত্ত হয়ে ‘কাবাঘরের উপর’ নিজেরা শিবমূর্তিস্থাপন করে একজন হিন্দুর উপর দোষ চাপিয়ে, সাম্প্রদায়িক-দাঙ্গা বাধিয়ে নিজেদের স্বার্থহাসিলের পথ খুঁজে পেতে চায়। আর এই দস্যুশ্রেণীটি দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ঘাপটি মেরে রয়েছে। এই স্বার্থপর-নরপশুগুলো এখন দেশের ভিতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম-ব্যবহার করে হিন্দুউচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের জায়গাজমি দখল করতে চায়।

৩. জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামীলীগ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তাদের গৌরব ও অগ্রযাত্রা অক্ষুণ্ন রেখেছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক আওয়ামীলীগের ভিতরেও অনেক সাম্প্রদায়িক-পশুশক্তি ঢুকে পড়েছে। আর এরাই এখন রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে দেশের হিন্দুসম্প্রদায় তথা সংখ্যালঘুসম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে সবকিছু গ্রাস করতে চায়। তাই, এরা রাজনৈতিক কোন্দলের নাটকসৃষ্টি করে হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর নগ্নহামলা চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এই পশুশক্তিই নিজেদের স্বার্থগত-কারণে সাম্প্রতিককালে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্নস্থানে হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর নগ্নহামলা চালিয়েছে। আর তাদের উদ্দেশ্য আগের মতোই একটি: যেকোনোভাবে হিন্দুসম্প্রদায়কে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের এদেশ থেকে বিতাড়ন করে তাদের ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সম্পদ লুটে নেওয়া। এরা যে, গজনীর কুখ্যাত দস্যু সুলতান মাহমুদের রক্তের উত্তরাধিকারী!

৪. দেশের হিন্দুসম্প্রদায়ের ঘরবাড়িসহ তাদের জায়গাজমি দখল ও লুটপাট করে তা বংশানুক্রমে ভোগদখল করার জন্য এদেশের মুসলমান-নামধারী একটি শ্রেণী সবসময় তৎপর। আর এদের কোনো আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত কোনো পার্থক্য নাই। হিন্দুর সম্পত্তি ও তাদের সর্বপ্রকার সহায়-সম্বল লুণ্ঠন করার জন্য সব দলের নেতা-কর্মী-নামধারী একশ্রেণীর জানোয়ার আজ এক ও এককাট্টা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-নাসিরনগরসহ সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্নস্থানে হামলার গতিপ্রকৃতি আমাদের আজ তা-ই বলে দেয়। এই হামলাকারী-পশুশক্তি আজ দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ঘাপটিমেরে রয়েছে। আর এই পশুশক্তি হিন্দুসম্প্রদায়কে এদেশ থেকে উচ্ছেদ করে তাদের সাজানো বাড়িঘর, জায়গাজমি, পুকুর ইত্যাদি হস্তগত করতে চায়।

৫. হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর হামলার মানে হলো: তাদের ভয়ভীতি ও হুমকিধমকি দিয়ে এদেশ থেকে তাদের বের করে দিতে পারলেই তাদের সবকিছু এই শ্রেণীটি তাদের পূর্বপুরুষদের মতো অনায়াসে রাতারাতি দখল করে তা পুরুষানুক্রমে ভোগদখল করতে পারবে।

৬. হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর যেকোনো সময় আর যেকোনো হামলার মূল কারণ হলো: তাদের জায়গাজমি দেশের মুসলমান-নামধারী একটি শ্রেণী দখল করতে চায়। আর এজন্য হিন্দুদের উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। তারা বারবার সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে।

যারা দস্যু বা দস্যুসম্প্রদায়ের উত্তরাধিকারী হতে চায় তারা কখনও ভালো হবে না। এদের কাছে ধর্মের বাণী অনর্থক আর অকেজো। তাই, এদের পিটিয়ে সোজা করবে রাষ্ট্র। আর এটি রাষ্ট্রের প্রধান কাজ, দায়িত্ব, আর ধর্মও বটে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: রাষ্ট্র এভাবে চুপচাপ আর কত বসে থাকবে?

[বি.দ্র. যে প্রকৃত ধার্মিক বা মুসলমান সে কখনও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না।]

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২৪/১১/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সাম্প্রতিককালে হিন্দুসম্প্রদায়ের উপর হামলার নেপথ্য-কারণ

  1. প্রকৃত মুসলমান একটাও খুঁজে
    প্রকৃত মুসলমান একটাও খুঁজে পাবেন কোথাও? বাড়াবাড়ি ছাড়া মুসলমানিত্ব থাকে নাকি? একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    1. প্রকৃত-মুসলমানের সংখ্যা খুব
      প্রকৃত-মুসলমানের সংখ্যা খুব কম। আর এরা থাকেন নীরবে-নিভৃতে।
      আর যারা নামধারী-মুসলমান তথা ভণ্ডশয়তান তাদের আস্ফালন বেশি। এদের জন্যই পৃথিবীতে আজ এতো অশান্তি।
      আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − 64 =