রোহিঙ্গা, আইলানের লাশ ও মানবতা

এখন কয়েকটা শব্দ রোহিঙ্গা, মগ, আরাকান, শরনার্থী ইত্যাদি খুব আলোচিত হচ্ছে! এই ইস্যু আবার সামনে চলে আসায় অনেকই এই বিষয়ের দলিল দস্তাবেজ হাজির করছেন। রহিঙ্গা বসতি ও অভিবাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি, বর্তমান বাস্তবতা, কার কতটা দায়, এসব নিয়ে অনেক বিশ্লেষণমূলক লেখা পড়ছি। লেখা ও বিশ্লেষণগুলো নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে একটা বিস্তৃত বিতর্ক শুরু হয়েছে। এটা একটা ভাল দিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মনে করি। এর মাধ্যমে আগ্রহীরা ধর্মসহ এই বিষয়ের নানা বিভ্রান্তি, আঞ্চলিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের কারন-সমীকরণগুলো বুঝতে পারছে, বুঝতে চেষ্টা করছে।

কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একটি সামাজিক ও মানবিক পরিচয় আছে! মানুষ যখন ভয়ঙ্কর বন্যায় বিপর্যস্ত হয়, তখন তাদের একটিই পরিচয় তাঁরা “দূর্গত”! কেউ যখন মানুষ খুন করে তখন তাঁর একটাই পরিচয় সে খুনী! ধর্মের নামে, বর্ণের নামে করলেও তাঁর একটিই পরিচয় সে খুনী! মুসলিম খুনী, হিন্দু খুনী হয়ে যায় না। এবং আইনের ধারাগুলোও স্বীকৃত হয় অপরাধের স্তর, গভীরতা ও ব্যপকতা দিয়ে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়!

একজন মানুষ যখন পানিতে পড়ে, তখন মানুষ হিসেবে আমাদের প্রথম কাজ, হাত বাড়িয়ে দেয়া..! তাঁকে জিজ্ঞেস করা না, পানিতে পরেছ কিভাবে..? তোমার ধর্ম কি..? তোমার দেশ কোথায়..? মানুষের দাবী অনেক বড়! তাঁর বিশেষত্ব এখানেই! সে অতিক্রম করতে পারে অনেক কিছু..! সেই আহ্বানের সাড়াই মানবতা.., তার পূরণই মনুষ্যত্ব..!

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, মাদকদ্রব্য সে আলোচনা ও বিশ্লেষণ জরুরী! তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারন-সমীকরনও এর সাথে যুক্ত করতে হবে। এর প্রতিরোধ ও নির্মূলে, বিভিন্ন পর্যায়ে-স্তরে সম্মিলিত কূটনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক উদ্যোগ-প্রচেষ্টা না নিলে এই বিপদ মোকাবেলা করার ভাবনা হবে খন্ডিত..!

সীমানা ও প্রাচীর যদি সব সমস্যার সমাধান হতো তাহলে সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদের বারুদে দেশে-দেশে আগুন জ্বলতো না..! সীমানা রাষ্ট্রের একটি ধারনা, সরকারই তার চরিত্র নির্ধারণ করে! শাসক যদি তাঁর দৃষ্টিভোঙ্গী ও নীতিতে সৎ থাকে তাহলে বড় কোন সমস্যার সমাধান কঠিন হয় না। তারপর সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তি জ্ঞান থাকার পরও ফ্রান্স-আমেরিকার মত দেশ তাদের জীবনকে নিরাপদ ও স্বস্তিকর করতে পারেনি..?

রোহিঙ্গাদের ঘিরে যে বিপদ ও আতঙ্ক, তাদের আশ্রয় না দিলে কি সেই আতঙ্কের কারন শেষ হয়ে যাবে..? কিছুটা কমলেও, বাতিল হয়ে যায় না! এমন উদাহরণ দেশে-বিদেশে আমাদের সামনে অনেক! মারাত্মক ঝুঁকি ও বিপদ থাকা সত্ত্বেও জার্মান-কানাডা ইরাক-সিরিয়া-মধ্যপ্রাচ্যে থেকে আসা লক্ষ লক্ষ শরনার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং দিচ্ছে..। এই দেশগুলো তাদের সুযোগ দিয়েছে স্থায়ীভাবে বসবাসের! নিরীহ রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেটা করতে পারে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় সুনির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে, অস্থায়ী ভাবে।

সিরিয়া থেকে মানব শিশু আইলানের লাশ মহাসাগর ভেসে এলে পশ্চিমের মানবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পূবের লোকজন..! কিন্তু এমন ঘটনা যখন বঙ্গপসাগরের পারে ঘটবে তখন বদীপের মানবতার বড়াই কোথায় গিয়ে দাড়াবে, ভাবতে পারেন..? কেবলি ভূপেনের গানের কথা মনে হয়, …বলো কী তোমার ক্ষতি, জীবনের অথৈ নদী.. পার হয় তোমাকে ধরে দূর্বল মানুষ যদি..!

ড. মঞ্জুরে খোদা, লেখক-গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, টরেন্টো, কানাডা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 + = 85