নাস্তিকদের পাহারা না দিয়ে মুখোশধারী আস্তিকদের পাহারা দিলে মানবতা বাঁচে

যারা আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর, সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেনা তাদেরকেই নাস্তিক নামে সমাজের ধর্ম বিশ্বাসী লোকেরা আখ্যায়িত করে থাকে। অথচ হাজার হাজার লোক আছে যারা বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যায় বিশ্বাস রাখে। ধর্মগুলো সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টিকর্তার কার্যাবলী সম্পর্কে যে সব বর্ণনা দিয়েছে তার প্রতি এখন সত্যিকার অর্থে অনেকেরই বিশ্বাস নেই। এর মধ্যে যারা কমুনিষ্ট পার্টিগুলোর সাথে জড়িত আছে তারাসহ পুঁজিবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী এরকমও অনেক অনেক লোক বর্তমানে সবদেশে, সব সমাজে আছে যাদের ধর্ম বিশ্বাস নেই। এদেরকে বলা হয় নাস্তিক। কারন এরা সৃষ্টিকর্তা বলে অলৌকিক, অস্বাভাবিক, অসীম ক্ষমতাবান কোন সত্তায় বিশ্বাস রাখে না। এটা তাদের অপরাধ নয়। এটা তাদের চিন্তার স্বাধীনতা। সাধারণ মানুষরা নাস্তিকদের গালাগালি করে এবং তাদেরকে সমাজের শত্রু মনে করে। এমনকি সাধারণ মানুষ বামপন্থী রাজনীতিকে গ্রহণ না করার ক্ষেত্রে এই কারণটাও দেখানো হয় যে, বামপন্থীরা ধর্মে বিশ্বাস রাখেনা বা অলৌকিক কোন কর্মকান্ডে বিশ্বাস করেনা এবং তারা ভাগ্যে বিশ্বাস করেনা।

যদিও সমাজের সাধারন মানুষ সহ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিতে রাজী নয়। কিন্তু’ তাদের মনে রাখা উচিত যে নিরানব্বই ভাগ নাস্তিকরা কাউকে খুন করতে যায় না, কাউকে ধর্ষণ করতে য়ায় না, কারও জানমালের ক্ষতি করতে চায়না। বরং সমগ্র বিশ্বকে মানবিক করে তোলার জন্য লেখালেখি করে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, আলোচনা করে, সর্বত্র ন্যায্য আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তাদের একটাই অপরাধ। আর তা হল- যাকে দেখা যায় না, যার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না, যার কার্যাবলীতে যৌক্তিকতা কম সেরকম এক অলৌকিক সৃষ্টিকর্তাকে তারা গ্রহণ করতে চায় না। যে সৃষ্টিকর্তাকে সব ধর্ম বিভিন্নরূপে সাজিয়েছে এবং মেনে চলতে সবাইকে বাধ্য করতে চাচ্ছে তাকে নাস্তিকরা মানেনা।

অপরদিকে আস্তিকদের অবস্থাটা দেখা যাক। যে পাকিস্তানীরা বাঙ্গালীদের উপর বর্বর অত্যাচার চালিয়েছিল তারা সবাই আস্তিক ছিল। বঙ্গবন্ধুসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যারা যারা খুন হয়েছে তারা সবাই আস্তিকদের হাতেই খুন হয়েছে। সে সব খুনীদের সমাজে কেউ কখনও নাস্তিক বলেনি। কারন তারা মানুষের সামনে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকেছে, অন্তরে কখনও ডাকেনি। তাই সমাজ তাদেরকে চিনতেও পারেনি। বর্তমান সরকারের আমলে কিছু যুদ্ধাপরাধীদেরকে যুদ্ধের সময় ধর্ষণ, খুন ও অমানবিক কার্যক্রম চালানোর জন্য ফাঁসি দেয়া হয়েছে-যারা ফাঁসিতে ঝোলার আগে পর্যন্ত নিজেদেরকে পরম আস্তিক বলে প্রচার চালিয়েছে এবং আল্লাহকে ডেকেই গেছে। অথচ তারা সারাজীবন মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে এবং শয়তানের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখেছে।

অতীত কাল থেকে আজ পর্যন্ত কখনও মুসলিমরা হিন্দুকে মেরেছে, কখনও হিন্দুরা মুসলিমকে মেরেছে, কখনও বৌদ্ধ ধর্মের লোকদেরকে খ্রীস্টানরা রক্তাক্ত করেছে, কখনও খ্রীস্টান ধর্মের লোকদেরকে অপর কোন ধর্মের লোকজন রক্তাক্ত করেছে। আর এসব যারা করেছে তারা সবাই মসজিদ, মন্দিরে যাওয়া আসা করে, অর্থাৎ তারা আস্তিক।

নাস্তিকরা কখনও এমন কাজ করেনা। তারা ধর্ম বিশ্বাসের পার্থক্যের জন্য কোন মানুষের হাত ছেড়ে দেয়না। তাদের কাছে মনুষ্যত্ব অনেক বড়। তারা সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার জন্য বা তার ভয়ে অথবা স্বর্গে বা বেহেশতে যাওয়ার জন্য ভালকাজ করতে প্রবৃত্ত হয়না- বরং তারা ভাল কাজ করে মানুষ হিসেবে নিজের মানবিক মুক্তির জন্য এবং অন্যের মানবিক মুক্তির জন্য।

বাংলাদেশের কোন এক হিন্দু ছেলে কাবা ঘরের উপর শিবকে বসানোয় তাদেরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। আবার বার্মায় কোন এক সাধারণ কারণে মুসলিমদের দলে দলে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কুকুরের মত। এ সবই আস্তিকরাই করছে। গৌতম বুদ্ধ বা হযরত মুহাম্মদ (স) এরা কেউ এরকম অমানবিক কাজ করতে না বললেও মুখোশধারী আস্তিকরা তা করছে।

বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, রাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আবার ভারত সরকারও হুমকি দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচার হলে তারা ভারতের মুসলিমদের উপর অত্যাচার চালাবে। কি চমৎকার এই আস্তিকদের রাজনীতি। মানুষ আর বানবিক বোধ তাদের রাজনীতির কাছে মূল্যহীন। যেখানে শাসকরাই এভাবে সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে বন্ধ করার কথা বলছে সেখানে সাধারন জনগনের কথা আর কি বলা যায়। বিশ্বের ক্ষমতাবানরা যদি সত্যি সত্যিই মানুষকে ভালবাসতে পারত তবে কোন দেশেই বেছে বেছে নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট ধর্মের লোকদের উপর অত্যাচার হত না। আমরা সাধারন জনগণ হাজার চিৎকার করেও সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ করতে পারব না যতক্ষণ না বিশ্বের ক্ষমতাবানরা আস্তিকতার মুখোশটা ছুঁড়ে না ফেলবেন। কেননা শেষ পর্যন্ত তারাই রাষ্ট্র, সমাজের নীতি, নৈতিকতাগুলো নির্ধারণ করে। আবার আমরা সাধারণ জনগণ সচেতন না হলে সবধরণের অধ:পতনগুলোও বন্ধ হবেনা কোনদিন।

ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সব ধর্মের লোকদের, বন্ধুদের গভীর স্নেহ ভালবাসা নিয়ে বড় হয়েছি, আজও একসাথে সব ধর্মের লোকের সাথে কর্মজীবনে ব্যস্ত থাকি। স্কুলে সুখ দু:খ ভাগাভাগী করে চলি, টিফিন বাটিতে অল্প অল্প খাবার নিয়ে যাই সবাই- যা সবাই ভাগাভাগী করে খেয়ে মজা পাই। আমাদের মধ্যে ধর্ম ভীরুও আছে, কম্যুনিষ্ট, নাস্তিকও আছে। কিন্তু কেউ কাউকে কোনভাবে বিরক্ত করে না। যার যার নিজ দ্বায়িত্ব পালন করে বাড়িতে ফিরি এবং মাঝে মাঝে পরস্পরের সাথে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করি, দেশের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করি। আমরা যে যে ধর্মেরই হইনা কেন আমরা কখনও ভুলে যাইনা যে, আমরা মানুষ। কিন্তু এই পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে, সমাজে সব ধর্মাবলম্বীরা এক সাথে শান্তিতে বাস করতে পারছে না কেন? কারন মুখোশধারী আস্তিকরাই বেশী শয়তান। সেই গুলিকে আগে সবার প্রতিহত করা উচিত। সমাজের জন্য নাস্তিকরা ভয়াবহ নয়, মুখোশধারী আস্তিকরাই ভয়াবহ।

যারা শিশু, নারী-পুরুষ সবাইকে নানারকমভাবে অত্যাচার করে চলেছে তারা আস্তিক, তনুকে যারা ধর্ষণ করে হত্যা করল তারা আস্তিক, হলি আর্টিসানে যারা বর্বরতা চালালো তারা আস্তিক–কেউ উগ্র আস্তিক আর কেউ মুখোশধারী আস্তিক। পিতা নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করতে চায় বা করে তারাও আস্তিক, সুযোগ পেলেই যারা মানুষের সর্বোচ্চ ক্ষতি করতে যায় তারাও আস্তিক। তবে এরা সব মুখোশধারী আস্তিক। এরা ভাল মানুষদের সাথে মিলে মন্দিরে যায়, মসজিদে যায়, কিন্তু একটু সুযোগ পেলে আস্তিকতার মুখোশ খুলে জানোয়ারে পরিণত হয়। সৃষ্টিকর্তা সব দেখছে- এই কথাটা তারা প্রচার করে শুধুমাত্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য। যখন তাদের খারাপ কাজ করতে ইচ্ছে হয় তখন এই কথাটা তাদের আদৌ মনে থাকেনা যে, সৃষ্টিকর্তা সব দেখছে। সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী থাকলে আর্মি, পুলিশও কম লাগত। কারণ সৃষ্টিকর্তা দেখছে- এই ভয়ে মানুষ অপরাধ কম করত, মানুষকে ভালবাসত। এই বিশ্বের বেশির ভাগ লোক হচ্ছে মুখোশধারী আস্তিক। আর তাই সমাজ, সভ্যতা অসভ্য বর্বরতার স্তরেই থেকে যাচ্ছে।

প্রত্যেক ধর্মই হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি, হিংসা, বিদ্বেষে লিপ্ত থাকতে নিষেধ করেছে। তবে প্রত্যেক ধর্মই নিজেদের ধর্মের বানীকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করে থাকে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গীটাই সকলকে নিজ ধর্মের মানুষ ব্যতীত অন্যান্য ধর্মের মানুষদেরকে ছোট করে দেখতে শিখায়, হিংসা করতে শিখায়। আর সাধারণ মানুষের এই ধরনের নিচু মানসিকতার সুযোগ নেয় বিশ্বের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা। কোথাও মুসলিমদের হত্যা হরা হচ্ছে, কোথাও হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রীস্টানদের। যেখানে যাদের ক্ষমতা বেশী তারা অপর ধর্মাবলম্বীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মুসলিমরা বলে মুসলিমদের রক্ষা করা হোক, হিন্দুরা বলে হিন্দুদের রক্ষা করা হোক, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানরাও নিজেদের বাঁচানোর জন্য চিৎকার করছে। কিন্তু’ মানবতাবাদী, মার্ক্সবাদী কিংবা শিক্ষিত নাস্তিকরা মানুষকে, মানবজাতিকে, মানবতাকে রক্ষার জন্য চিৎকার করছে। তারা জগতের সব মানুষকে রক্ষার জন্য চিৎকার করছে। তারা আস্তিকতার মুখোশ পরে জানোয়ারদের সমাজ কায়েমের জন্য ব্যস্ত নয়। তাই কোন কেউ যৌক্তিক, বিজ্ঞান সম্মত বা অসাম্প্র্রদায়িক হলে তাকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে তার পেছনে লেগে সময় নষ্ট না করে সমাজে যারা মসজিদে যায়, মন্দিরে যায়, গীর্জা, প্যাগোড়ায় যায় আবার মানবজাতির সব সুসভ্য অর্জনকে বিনাশ করতেও ব্যস্ত থাকে তাদেরকে বিনাশ করুন সবাই। তাতেই মানবতা বাঁচবে। বাঁচবে আস্তিক, নাস্তিক, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, ধনী, গরীব সবাই- সর্বোপরি সব ধরণের মানুষ বাঁচবে যাদের ব্যথা-বেদনা, বুদ্ধি, জ্ঞান, বোধশক্তি, রক্ত সবই এক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “নাস্তিকদের পাহারা না দিয়ে মুখোশধারী আস্তিকদের পাহারা দিলে মানবতা বাঁচে

  1. “সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী
    “সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী থাকলে আর্মি, পুলিশও কম লাগত। কারণ সৃষ্টিকর্তা দেখছে- এই ভয়ে মানুষ অপরাধ কম করত, মানুষকে ভালবাসত। এই বিশ্বের বেশির ভাগ লোক হচ্ছে মুখোশধারী আস্তিক। আর তাই সমাজ, সভ্যতা অসভ্য বর্বরতার স্তরেই থেকে যাচ্ছে।”

  2. সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী
    সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী থাকলে আর্মি, পুলিশও কম লাগত। কারণ সৃষ্টিকর্তা দেখছে- এই ভয়ে মানুষ অপরাধ কম করত, মানুষকে ভালবাসত। এই বিশ্বের বেশির ভাগ লোক হচ্ছে মুখোশধারী আস্তিক। আর তাই সমাজ, সভ্যতা অসভ্য বর্বরতার স্তরেই থেকে যাচ্ছে।

  3. সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী
    সমাজে সত্যিকার আস্তিক বেশী থাকলে আর্মি, পুলিশও কম লাগত। কারণ সৃষ্টিকর্তা দেখছে- এই ভয়ে মানুষ অপরাধ কম করত, মানুষকে ভালবাসত। এই বিশ্বের বেশির ভাগ লোক হচ্ছে মুখোশধারী আস্তিক। আর তাই সমাজ, সভ্যতা অসভ্য বর্বরতার স্তরেই থেকে যাচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − 17 =