বিশ্বাস

রাজনীতিতে অনেক বেশি তুখোড় হওয়ায় দেশের একটি জেলায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের জেলা ছাত্রনেতা হিসেবে খুব অল্প বয়সে প্রায় শীর্ষে পৌঁছে গেল তন্ময়। সেই সাথে শহরে নিঃস্বার্থ সমাজ সেবায়ও তার ডাক সবার আগে। তার সৎ এবং নির্ভীক জীবন যাপন তার শহরের সবার কাছে তাকে এক কথায় গ্রহণযোগ্য করে তুলল। সে কোথাও কোন কাজে ক্ষমতা খাটাতে গেলে স্থানীয় প্রশাসন তাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করত। তন্ময়ের এই জনপ্রিয়তা যখন তার শহরে তাকে প্রায় নায়ক বানিয়ে ফেলল তখন একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশে প্রায় অন্ধকার এক জায়গায় পেছন থেকে কেউ একজন তার ঘাড়ে লোহার রড দিয়ে সজোরে আঘাত করল। সে আর্তনাদ করে বসে পড়ল। তন্ময়কে বাঁচাতে গিয়ে অজ্ঞাত শত্রুর রডের আঘাতে মারাত্নক ভাবে আহত হল তন্ময়ের দুই বন্ধু। তন্ময় বেঁচে গেলেও তার সাথের দু’জন বন্ধুই হাসপাতালে নেয়ার পর মারা গেল। তন্ময় তাদের মৃত্যুশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদল। সারা শহর তছনছ করে যখন তার বন্ধুদের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করল তখন অনেকটা নির্বাক হয়ে গেল সে। সে দেখল, যারা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তারা তার দলেরই লোক এবং তার সবচেয়ে ভাল বন্ধুরা।মানুষের উপর সব বিশ্বাস তার হঠাৎ হারিয়ে গেল।

তন্ময় অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে দিয়ে নিজ শহর ছেড়ে দূরের এক শহরে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেল। বেশ কিছুদিন মানুষের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখল। রাজনীতি, ন্যায়-অন্যায়, বিচার-অবিচার সবকিছু এড়িয়ে চলতে লাগল। মানসিকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার ভালভাবে পড়াশুনা শুরু করল। এর কয়েক বছর পর বিসিএস দিয়ে পুলিশ অফিসার পদে নিয়োগ পেল। এক পর্যায়ে নিজ শহরে নিয়োগ নিতে বাধ্য হল। পুলিশ অফিসার হিসেবেও সে নির্ভীক। কোন রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, আমলাদের ভয়ে সে ভাল কাজ থেকে বিরত হয় না।

তন্ময়ের বাবা মা তার মেধাবী, সৎ, সাহসী ছেলের জীবনসঙ্গী হিসেবে একটি যোগ্য মেয়ে খুঁজতে লাগল। তন্ময়ের বন্ধুবান্ধবরা অনেক মেয়ের সন্ধান আনল। তন্ময় এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে না বলে সবাইকে জানিয়ে দিল।
একদিন সন্ধ্যায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তন্ময় দাওয়াত পেল। অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি সময়ে লালপেড়ে গরদের শাড়ী পরা সুন্দর একটি মেয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইল। তন্ময়ের বেশ ভাল লাগল। সে তার পাশে বসা এক বন্ধুকে বলেই দিল যে, সে এই মেয়েটিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চায়।

দু’একদিনের মধ্যে তন্ময়ের বন্ধুরা তার পছন্দ করা মেয়েটির খোঁজ খবর নিয়ে তার অফিসে আসল। তারা একেকজন একেক রকম নেতিবাচক কথা বলতে শুরু করল। কেউ বলল, মেয়েটার বয়স ত্রিশ বত্রিশ হবে, প্রায় তন্ময়ের সমবয়সী। কেউ বলল, মেয়েটা অতিরিক্ত সাহসী। আগে বাম ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। আবার কেউ বলল মেয়েটার আগে বিয়ে হয়েছিল। নিজে ডিভোর্স দিয়ে চলে এসেছে। বাবা মা নেই, একা একা থাকে, টিচার ইত্যাদি।

তন্ময় সবার কথা খুব মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল, ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট এ কাস্টমারি ডল ওনলি। আই ওয়ান্ট অ্যান উম্যান হু ক্যান মেক অ্যান অ্যাটমসফিয়ার টু টেক ব্রেথ।” তন্ময়ের এই কথা শুনে তার বন্ধুরা বিয়ে করার সময় বেশী উদারতা দেখালে পরে পস্তাতে হবে এই কথা বলে এক করে তার অফিস থেকে মন খারাপ করে বেরিয়ে গেল। তন্ময়ের বিয়ে হয়ে গেল তার পছন্দ করা এবং তার বন্ধুদের অপছন্দ করা মেয়ে জেনিফারের সাথে।

স্ত্রীর সরল সহজ কথাবার্তা, আচরণ, নিষ্পাপ চাহনি তন্ময়কে সবসময় ঘরের দিকে টেনে রাখল। যত কাজই থাক সন্ধ্যাটা স্ত্রীর সাথে কাটানোটাই তার স্বভাবে পরিণত হল। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের একসাথে বই পড়া, সমসাময়িক রাজনীতি ,সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি বেশ ভাল মতই চলতে লাগল।এমনকি তন্ময়ের অফিসিয়াল সমস্যাগুলোর ব্যাপারেও তন্ময়কে পরামর্শ দিতে অনেক দক্ষতার পরিচয় দিল জেনিফার। তন্ময় তার স্ত্রী’র দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত আর ভাবত সে যেমন মেয়েকে তার জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে চেয়েছিল ঠিক তেমন মেয়েকেই পেয়েছে। কোন ঔদ্ধত্য নেই, ভালবাসতেও জানে। আর যখন মনের খেয়ালে গান গেয়ে ওঠে তখন তন্ময়ের মনে হয় যেন তার স্ত্রী’র উচিত ছিল রবীন্দ্রনাথের মত বড় কোন মানুষের জীবনসঙ্গী হওয়া ।তার আরও মনে হয়-বন্ধুদের ভাঙ্গানিতে পড়লে তার জীবনটাই মাটি হয়ে যেত।

তবে বন্ধুরা যে বলেছিল জেনিফারের সাহস বেশী তন্ময়ের কাছেও তাই মনে হল। তন্ময়ের কোয়ার্টারটা একটু নিরিবিলি জায়গায়। অনেক রাতে তন্ময় যখন গভীর ঘুমে থাকে তখন জেনিফার ছাদে একা একা হাঁটে। একা একা কিছু যেন বলে। তন্ময় এরকম কয়েকবার দেখেছে। তবে এর বাইরে আর কোন অস্বাভাবিক আচরণ জেনিফারের মধ্যে নেই। তাই তন্ময় এই বিষয়টিকে স্বাভাবিক চোখে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। সে স্ত্রী’র কাছে তার এরকম অদ্ভুত আচরণের কারণ জানতে চেয়েছে কয়েকবার, কিন্তু তেমন কোন যথাযথ উত্তর পাওয়া যায়নি। জেনিফার তার অতীতের কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে যেন অস্বস্তিবোধ না করে সেজন্য তন্ময় স্ত্রী’র কাছে অনেক বেশী বন্ধুপরায়ণ হয়ে থাকতে চেষ্টা করল।

তন্ময়ের সাথে জেনিফারের বিবাহের বছর খানেক পর তন্ময়ের ওপর একটি বিশেষ মামলা তদন্তের ভার পড়ল। মামলাটি সুজন নামক একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষক অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে করে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ছবি তুলে এবং তাদেরকে হুমকি ধমকি দিয়ে নানা রকম কুকর্ম করতে বাধ্য করে। কোন এক সাহসী মেয়ে উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কিন্তু ঐ শিক্ষক পলাতক। তার পরিবারের উপর অনেক চাপ সৃষ্টি করেও শিক্ষককে খুঁজে বের করা যাচ্ছে না। তন্ময় অনেক খোঁজ নিয়ে জানল যে, কোন এক মাজারে সুজনকে মাঝে মাঝে গাঁজা টানতে দেখা যায়। অবশেষে তন্ময় ছদ্মবেশে সেখান থেকেই আসামীকে গ্রেপ্তার করল। সুজনকে গ্রেপ্তারের সময় হঠাৎ তন্ময়ের মুখের নকল দাঁড়ি খুলে পড়ল। তাই দেখে নেশায় ডুবু ডুবু সুজন হো হো করে হেসে উঠল। মুখ চোখ বিকৃত করে আর কিছুটা অবাক হয়ে বলল, জেনিফারের হাজব্যান্ড ! যাহ্! শালা।
.
তন্ময় এই শয়তানের মুখে জেনিফারের নাম শুনে আশ্চর্যান্বিত হল। ঘৃণার চোখে সুজনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। মনে মনে ভাবতে থাকল, এই কালো কুৎসিত কুকুরটার মুখে তার নিষ্পাপ স্ত্রীর নামটা কি করে এল?
তন্ময় খোঁজ নিয়ে জানল যার সাথে জেনিফারের প্রায় আটবছর আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে সে সুজন নয়। তবে লোকটা অ্যারেস্ট হওয়ার সময় জেনিফারকে নিয়ে ওভাবে তাচ্ছিল্য করে কথা বলছিল কেন- এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে পুলিশ কাস্টডিতে সুজনকে যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে পৌঁছে গেল তন্ময়। যে মেয়েটা সুজনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে তার সাথে সুজনের তোলা কয়েকটি ছবি পকেট থেকে বের করে সুজনের সামনে ছুঁড়ে ফেলে জিজ্ঞাসা করল, চিনিস?
সুজন লাল টকটকে চোখে কটমট করে তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এগুলোত সাধারণ অপরাধ। এগুলো এখন সবাই করে। একটু লুকিয়ে লুকিয়ে করে। আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে করতাম। হঠাৎ প্রকাশ পেল কিভাবে বুঝতে পারছিনা। জেনিফার প্রকাশ করল নাকি? এই কথা বলে সুজন প্রচন্ড হিংসুটে দৃষ্টিতে তন্ময়ের দিকে তাকাতেই তন্ময় তাকে সজোরে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিল।

সুজনের মুখ থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল। প্রচন্ড আক্রোশে উঠে দাঁড়িয়ে সে তন্ময়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস্‌ফিস্ করে বলল, “জেনিফার হ্যাজ এ রাউন্ড রেড মার্ক অন হার লেফট ব্রেস্ট অ্যান্ড সি’জ ভেরী সেক্সী, অ্যাম আই রাইট-মি. অনেস্ট অফিসার? .

তন্ময়ের চোখমুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থতমত খেয়ে গেল। তাই দেখে আসামী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। এবার শরীরের সব শক্তি একত্র করে সুজনের বুকে লাথি মারল তন্ময়। সুজন ঢুলতে ঢুলতে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল, আর উঠতে পারলনা।

তন্ময় পুলিশ কাস্টডি থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে দূরে একটা নদীর পারে গিয়ে বসল। এক ধ্যানে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। বারবার তার কানের কাছে একটা কুৎসিত জানোয়ারের বলা কতগুলো নোংরা কথা বাজতে লাগল- “জেনিফার হ্যাজ এ রাউন্ড রেড মার্ক অন হার লেফট ব্রেস্ট অ্যান্ড সি’জ ভেরী সেক্সী, অ্যাম আই রাইট-মি. অনেস্ট অফিসার? ”

সন্ধ্যা হয়ে এল। তন্ময়ের আজ নদীর কাছেই বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। বিয়ের পর স্ত্রীকে ছাড়া এটি তার প্রথম সন্ধ্যা। জেনিফারের জীবনে কি হয়েছিল আর কি হয়নি কিছুই মেলাতে পারলনা তন্ময়। সে স্ত্রীকে কখনও অতীত নিয়ে প্রশ্ন করেনি, কোনদিন করতেও চায়না। তার স্ত্রীকে সুজনের মত একটা জঘন্য লোক স্পর্শ করেছে এটা ভাবতে তার ঘৃণাবোধ হল। আপন মনে সে বলল, না- এ কিছুতেই হতে পারেনা। জেনিফার স্বচ্ছ, পবিত্র, নিষ্পাপ। ঐরকম একটা লোককে ভালবাসার মত ভুল কিছুতেই সে করতে পারেনা। যদি তেমন হয়েও থাকে তবু ঐ নরকের কীটটাকে সে তার শরীর স্পর্শ করার সাহস কখনও দেয়নি। ওই কুকুরটা নিশ্চয়ই ওকে জোর করে কলুষিত করে থাকতে পারে। তন্ময়ের মনে পড়ল রাতের অন্ধকারে জেনিফারের একা একা ছাদে হাঁটার কথা। আবার মাঝে মাঝে তন্ময় যখন স্ত্রীকে খুব কাছে টেনে নিত তখন জেনিফার কি যেন একটা বলতে গিয়ে মুখ মলিন করে ফেলত। তন্ময় বেশ কয়েকবার জেনিফারকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে যে, “জেনি-যেদিন থেকে তুমি আমার জীবনে এসেছ আমি সেদিন থেকেই তোমাকে বিচার করব, তোমার অতীত নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই। কখনও মন খারাপ করে থেকনা। আমার কষ্ট হয়।” একথা শুনে জেনিফার একটু যেন খুশি হত।
রাত হয়ে এল একসময়। জেনিফার কল দিল। অস্থির হয়ে জানতে চাইল, “কোথায় তুমি? তন্ময় খুব আদরমাখা স্বরে স্ত্রীকে বলল, “একটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আজ ফিরতে একটু রাত হবে। তুমি খেয়ে নিও।”

পরদিন সকালে স্থানীয় পত্রিকার হেডলাইন পড়ে সীমাহীন একটা শান্তি বোধ করল জেনিফার। হেডলাইনে আছে, “পুলিশ কাস্টডিতে পুলিশের নির্মম নির্যাতনে স্কুল শিক্ষক সুজন হাওলাদারের মৃত্যু।”

এরপর তন্ময় আর কখনও তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে গভীর রাতে ছাদে মন খারাপ করে একা একা হাঁটতে দেখেনি। গভীর রাতে কেবল স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকাই তার অভ্যেস হয়ে গেল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 3 =