আমরা

ইউরোপীয় আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদের হামলায় গোটা মুসলিম বিশ্ব কুপোকাত হয়ে পড়ে। মানচিত্র থেকে অনেকগুলো দেশকে মুছে ফেলা হয়। অন্যেরা হারায় তাদের আজাদী। অবশিষ্ট যেসব রাষ্ট্রকে বেঁচে থাকতে ও নামমাত্র স্বাধীন থাকতে দেওয়া হয় তারা পাশ্চাত্য জগতের এতোটাই পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে এসে যায় যে, তারা তাদের নিজেদের অবাধ কর্তৃত্বে তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো পর্যন্ত রক্ষা করতে পারলো না।

মুসলিম বিশ্বের পরাজয়ের বহু কারণ রয়েছে। মুসলিম স্বাধীনতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কয়েকটি জ্বলন্ত কয়লা খন্ড তখনো নিভে নিভে জুলছে । কোন কোন দল পাশ্চাত্য প্রভুত্বের জোয়ার ঠেকাবার জন্য চূড়ান্ত প্ৰয়াস চালায়।

কিন্তু বন্যার পানি বেষ্টিত কয়লা খন্ডের মতো তারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। অবশ্য তারা স্বল্পক্ষণের জন্য হলেও আলো জ্বালিয়েছিল- যার আলো এখনো আমাদের চেতনার গভীরতম প্রদেশগুলোতে আলো ছড়ায় । তারা যদি বাধা না দিতেন মুসলিম অন্তর থেকে স্বাধীনতার শিখা চিরদিনের জন্য নিভে যেতো।

আল্লাহতায়ালা এইসব স্বাধীনতা যোদ্ধার কবরগুলোকে জ্যোতির্ময় করে তুলুন, যাদের অন্তর-বেদনা পরবর্তী সকল মুসলমানদের জন্য দিয়েছে। আভ্যন্তরীণ শক্তির উৎস । মুসলমানদের স্বাধীনতা ও শক্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার ফলে মুসলমানদের জীবনে যে ট্র্যাজোড়ী নেমে আসে- তা-ই তাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে নিৰ্মল করার জন্য যথেষ্ট- যদি না। এইসব যোদ্ধা অস্বীকার করতেন যে- গোলামী কখনো মুসলমানদের নিয়তি হতে পারে না।

তাঁরা দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন যে, দাসত্ব মুসলমানদের জন্য হতে পারে না- তাই তাদের দুর্দশার আধার রাত্ৰি নিশ্চয়ই উজ্জ্বল প্ৰভাতের উদয়ে নিঃশেষ হবে। যদি অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং গভীরতর প্রতীয়মান হয়, তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ আলোর অভু্যদ্বয় ব্যর্থ হতে পারে না । তারা জানতো না যে, তাদের সংগ্রামের মাধ্যমে আলো আসবে কি-না। তারা জানতো না- তাদের যে বিপুল পরিমাণ রক্ত ক্ষরিত হয়েছে, তাই স্বাধীনতার প্রভাতজ্যোতিকে সূচিত করবে কি-না এবং তাদের জখমগুলোকে চূড়ান্ত বিজয়ের মলম দ্বারা পুরস্কৃত করা হবে কিনা। জাগতিক হিসাবী লোকরা, যারা সংশয়বাদী, তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, তারা যে ছোটখাটো সাময়িক বাধা দিয়েছে, ইউরোপের অগ্রগতির মহাপুীবনকে ঠেকানোর জন্য তা টিকবে না । এইসব হিসাবী লোকের টিটকিরিকে এই অসীম সাহসী যোদ্ধারা কোন গুরুত্বই দেয়নি। সম্ভবত তারা জানতো যে, প্রভাতী আলোর আবির্ভাবের পূর্বে লক্ষ-কোটি তারকা অস্ত যায়। সম্ভবত এই কারণেই তারা এই অসম পবিত্র যুদ্ধে কখনো ঢিলে দেয়নি।

আমাদের উপমহাদেশে ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো এ ধরনের সংগ্ৰামীদের বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপে ভূষিত । টিপু সুলতান জীবনব্যাপী পরনির্ভরশীলতা ও বিলাসিতার পরিবর্তে শহীদের মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন। এই অঞ্চলের ইতিহাসের এমন কোন সিরিয়াস অনুসন্ধানকারী নাই- যিনি সৈয়দ আহমদ শহীদ ও তার দুঃসাহসী সঙ্গীদের কৃতিত্বের সঙ্গে পরিচিত নন। ১৮৫৭ সনের রক্তরঞ্জিত ইতিহাস এখনো অনুপ্রাণিত করে আমাদের লেখকদেরকে। যদিও দেশের মানুষ মাওলানা আহমদ উল্লা শাহ, আজমতউল্লাহ খান, খান বাহাদুর খান এবং বীর্যবতী রানী হযরত মহলকে ভুলে যেতে পারে, তবু ইতিহাস কখনো তাদের ভুলতে পারবে না, আরো অগণিত মানুষ ভুলতে পারে না যারা তাদের লক্ষ্যের বিষয় সম্পর্কে আশা নেই জেনেও সংগ্রামে প্ৰাণ দিয়েছে। উপমহাদেশে এমন কেউ নেই যে ১৮৫৭ সনে বিদেশী প্ৰভুত্বকে নিৰ্মল করার জন্য যে মহাসংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল তার সঙ্গে পরিচিত নন । এমনকি আমার জীবনকালে উত্তর আফ্রিকার সেনুসিদের বিরুদ্ধে ইটালিয়ানদের বর্বর কার্যকলাপের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলোতে প্ৰায়ই উল্লেখ দেখেছি। আরব নেতাদেরকে প্লেন বোঝাই করে নিয়ে গিয়ে ভূমিতে প্লেন ভূপাতিত করে তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে বিক্ষিপ্ত পানির ঝর্ণা এবং কূপগুলো কংক্রিট দিয়ে ভর্তি করে ফেলা হয়, যাতে সেখানে কোন মানুষ বসবাস করতে না পারে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে প্ৰবেশ আরবদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়- যাতে করে ইতালীয় উপনিবেশবাদীরা সেখানে বসতি স্থাপন করতে পারে; কোন আরব যদি সেই বাউন্ডারি অতিক্রমের সাহস করতো তাকে দেখামাত্ৰই গুলি করে হত্যা করা হতো। তবুও সংগ্রাম চলতে থাকে। অবশেষে অগণিত শহীদের রক্তে নিষিক্ত স্বাধীনতার চারাটি হয়ে উঠে একটি বিশাল মহীরুহে- যা এখন সমৃদ্ধিশালী দেশ লিবিয়া। ঔপনিবেশিক প্রভুত্বের অন্ধকারে মরক্কোর পর্বতসঙ্কুল রীফ অঞ্চলে মহান বিপ্লবী যোদ্ধা আব্দুল করিম স্পেনিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, একটি সংক্ষিপ্ত অথচ উজ্জ্বল মুহুর্তে।

আতাতুর্ক যদিও ইসলামের নামে যুদ্ধ করেননি, তবুও তিনি পরাজিত এবং যুদ্ধক্লান্ত তুকীদের সমবেত করে তাদের দেশ থেকে গ্ৰীকদের বিতাড়িত করেন এবং মিত্ৰ শক্তির ষড়যন্ত্রকে চুরমার করে দেন ।

এমনকি এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনের মুক্তিযোদ্ধারা— সন্দেহ নেই। এদের কেউ কেউ বিভ্ৰান্ত এবং আত্মঘাতী নীতি অনুসরণ করছেন- তবুও বীর ফিলিস্তিনীরা জিওনিজম ও পাশ্চাত্য মিত্ৰশক্তির বিরুদ্ধে দুঃসাহসিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

এসব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় মুসলিম জাতিপুঞ্জ তাদের হৃদয়ে জেহাদের সেন্টিমেন্ট নিরবচ্ছিন্নভাবে পোষণ করেছে। কখনো তারা এই অনুভূতিকে মৃত্যুবরণ করতে দেয়নি। ঈমাম শামিলের জেহাদও একই কাহিনীর অংশ। পৃথিবীতে আমাদের এই অংশে মুসলিম জগত পরিচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে ঈমাম। শামিলের নাম এই উপমহাদেশের লোকরা এতো সামান্যই জানে যে, অনেকে তার নাম পর্যন্ত শুনেননি। এই ঘাটতি এখন সুন্দরভাবে পূরণ করেছেন ক্যাপ্টেন মোঃ হামিদ- এই পুস্তকের গ্রন্থকার । রাশিয়ানরা মুসলিম এলাকার বিশাল বিশাল অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল, এখনো তারা এগুলো দখল করে আছে। সকল রকমের সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যবাদ সবচেয়ে বেশি স্থায়ী প্ৰমাণিত হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে এটি টিকে থাকে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উপর, যা ঈমানের অবক্ষয়ের উপর মরণ কামড় দিয়ে বসে । বৈদেশিক শাসন তাকে মদদ যোগায় ।

এভাবে মহামতি আনোয়ার পাশার চমৎকার এবং নিবেদিত নেতৃত্বে তুকীস্থানে মুসলিম সংগ্রাম পরিণামে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং বহু যুদ্ধের বীর অনেক বেশি বৃহত্তর যুদ্ধক্ষেত্রে যিনি জয়ী হয়েছিলেন, তিনি শহীদ হন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি বিপথচালিত অংশের বিশ্বাসঘাতকতায়; এই অংশটি তাদের নিজ জনগোষ্ঠীকে গোলামে পরিণত করতে সাহায্য করে । রাশিয়ার রুশ প্রভুত্বের অধীন মুসলিম অঞ্চলগুলোর সাথে আমাদের ধমীয় এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল গভীর এবং অন্তরঙ্গ। পাকিস্তানের সংস্কৃতি আজকের দিনেও মধ্য এশিয়ার প্রভাব বহন করছে। সাহিত্য এবং কবিতার মাধ্যমে ককেশিয়া এবং আরো দূরবতী অঞ্চলের নগরীগুলোর নাম আমাদের কাছে পরিচিত । অবশ্য অল্প কয়েকটি নগরীর নাম বদল করে নতুন নাম দিয়েছে বিদেশী প্রভুরা, যাতে মুসলিম ইতিহাসের সঙ্গে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসব দেশ সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতার মূলে রয়েছে বিদেশীদের গোলামীকালে মুসলিম জগতের ইতিহাস।

শুরুতে বলা যায়, দুটি বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগ্রেট বৃটেন এবং রাশিয়ার জার। আমাদেরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সকল সম্পর্কের এবং যোগাযোগের বন্ধন সম্পূর্ণ কেটে ফেলে। এখন ককেশিয়া এবং মধ্য এশিয়া চলে গেছে রুশ শাসনের লৌহ যবনিকার অন্তরালে । আমাদের সম্পর্ক ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করে দেওয়া হয় এবং সে সম্পর্ক আর পুনরুদ্ধার করতে দেওয়া হয়নি । এই জন্যই আমরা মুসলিম দেশসমূহে রাশিয়ান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানি না।

আমরা এ সম্পর্কেও বেশি কিছু জানি না যে এসব দেশে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার আজ্ঞাবাহী গভৰ্ণমেন্টগুলোর দ্বারা পরিচালিত বিধ্বংসী প্রোগ্রামের মোকাবেলায় তাদের ঈমান রক্ষা করার জন্য মুসলমানরা গোপনে কী প্ৰয়াস চালিয়ে যাচ্ছে । এই কাহিনীর একটি যোগসূত্র আমরা পাচ্ছি জারের সরকারের বিরুদ্ধে ঈমাম। শামিলের সংগ্রামে । ঈমামকে দমন করার জন্য জারের এই অভিযান উন্মুক্ত ময়দানে একতরফা লড়াই ছিল না । শেষ পর্যন্ত এই সংগ্রাম ব্যর্থ হয় । কারণ এই সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন মুষ্টিমেয় সঙ্গতিবিহীন।

সূত্র— ককেশাসের মহানায়ক ইমাম শামিল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − 63 =