বাকস্বাধীনতা ও ভাতস্বাধীনতা দুটোই চাই

পৃথিবী প্রতিদিন নতুন নতুন সংকটের মুখে পড়ছে। এই সংকট শুধু যে ব্যবহারিক জীবনেই সীমাবদ্ধ তা নয়, মানুষের চিন্তা বা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতকেও এলোমেলো করে দিচ্ছে। যেমন বাকস্বাধীনতার সংকট। বাক স্বাধীনতার সংকট পৃথিবীর প্রধান সমস্যা হয়তো নয়, কিন্তুু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকট। কে জানে এই বাকস্বাধীনতা না থাকার দরুণ আমরা পৃথিবীর কত সমস্যা সম্পর্কে অজ্ঞাত থেকে যাচ্ছি। আমরা জানতে পারছিনা বলে যে সমস্যাটা নেই তা তো নয়। সমস্যাটা থেকেই যাচ্ছে এবং সেটা নিয়ে আলোচনা না হওয়ার কারণে সেই সমস্যা সমাধানেরও কোন উদ্যোগ কেউ নিচ্ছে না। ফলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হচ্ছে গোপনে । এবং একসময় প্রচণ্ড শক্তিতে সেই সমস্যা আমাদের সামনে বিরাট সংকট নিয়ে হাজির হবে।

তাই ভবিষ্যতের কঠিন সংকট থেকে বাঁচার জন্যেই বর্তমানেই সেই সংকটের বীজ নিয়ে কথা বলতে হবে। এটা বাকস্বাধীনতার প্রয়োগের একটা বাস্তবিক উপযোগিতা।ফ্রিডম অব প্রেস এবং ফ্রিডম অব অপিনিয়ন থাকলে কী হয় আর না থাকলে কী হয় সেটা অমর্ত্য সেনের দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণায় দেখতে পাওয়া যায়।

এই প্র্যাগমেটিক দিক ছাড়াও বাকস্বাধীনতার সাথে যুক্ত আছে আদর্শিক বিষয় : লিবার্টি। রাষ্ট্র গঠনের পর যেহেতু আর নাগরিকের পক্ষে state of nature বা নৈরাজ্যকর অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়, তাই কিছু যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে নাগরিক রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যেই সর্বোচ্চ স্বাধীন জীবনযাপন করার অধিকার লাভ করে। নাগরিকেরাই রাষ্ট্র গঠন করে। তাই সার্বভৌমত্বের মালিক আসলে রাষ্ট্র নয়, নাগরিক। সুতরাং নাগরিক নিজেদের জন্য যথেষ্ট স্বাধীনতা সংরক্ষণ করে।

কিন্তুু রাষ্ট্র তার শোষণ যন্ত্র অর্থাৎ রাজনৈতিক সংগঠন, পুলিশ, সেনাবাহিনী আর প্রশাসন দিয়ে নাগরিকদের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব খর্ব করে নিজে অপ্রতিরোধ্য শক্তিশালী হয়ে উঠতে চায়। এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক প্রেরণার বিরোধী। কোনভাবেই নাগরিকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নাগরিকের স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার রাখেনা রাষ্ট্র। অথচ অনধিকারচর্চাতেই রাষ্ট্রের যত আগ্রহ।

দুটো বিষয়ে এতোক্ষনে দেখাতে চেয়েছি। প্রথমত, কথা বলা এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে সমস্যা ঘণীভূত হয়ে সংকটে রূপান্তরিত হয় এবং দ্বিতীয়ত,মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা রাষ্ট্রের একক আয়ত্বের বিষয় নয়;জনগনের স্বাধীনতা খর্ব করার এবসোলিউট কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের নেই। তৃতীয় একটা বিষয় এখন উত্থাপন করি। একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জনকল্যাণ এবং বাকস্বাধীনতা। বিষয়টা খুবই জটিল ও ভজঘট। এই জটিলতার জট ছাড়ানো এবং ভজঘটের ঘট উল্টানোর মতো জ্ঞান আমার নেই। সরল বুদ্ধিতে শুধু বলতে পারি যে জনকল্যানের সাথে বাকস্বাধীনতার কোন মৌল বিরোধ নেই।

অনেককেই দেখছি কিউবার ব্যাপারে বেশ কথা বলছেন। কেউ কেউ কিউবার সমাজতান্ত্রিক(সমাজতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে আসলে কী জিনিস সে বিষয়ে আমার জানোশোনা নেই। লোকে বলছে যে কিউবা সমাজতান্ত্রিক তাই আমিও বললাম) শাসন ব্যবস্থার প্রশ্রংসা করে বাকস্বাধীনতার অনুপস্থিতকে ছোট করে দেখছেন বা দেখছেনই না। বাকীরা বাকস্বাধীনতার অনুপস্থিতিকেই বড় করে দেখে কিউবা সরকার জনগনের জন্য যেসব সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অর্থাৎ খাদ্য,শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিচ্ছে সেটাকে একেবারেই হিসাবে আনছেন না। প্রত্যেকেই একটার বিনিময়ে আরেকটা পেতে চেয়েছে যেন:কেউ সামাজিক সুবিধার বিনিময়ে বাক স্বাধীনতা চাচ্ছে, কেউ বাক স্বাধীনতার বিনিময়ে সামাজিক সুবিধা চাচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে একটার বিনিময়ে আরেকটা কেন? কেন দুটোই একসাথে নয়? দুটো চাওয়া তো পরস্পরবিরোধী নয়। আমি যদি স্বাধীন মতামত প্রকাশ করি তাহলে কী ধানের উৎপাদন কমে যাবে? ডাক্তারেরা ভুল চিকিৎসা দেবে? দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে? না, সেসব কিছুই হবে না। তাহলে কেন আমরা একইসাথে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা এবং মুক্তভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবোনা?

আমরা দুটোই চাই একইসাথে। যে শাসক আমাদেরকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভাসিয়ে দেয় কিন্ত্তু কথা বলার স্বাধীনতা দেয়না আমরা তার সমালোচনা করবো। আবার যে শাসক কথা বলতে দেয় কিন্তুু দেশের উন্নয়ন করতে পারেনা সে অযোগ্য শাসক। আমরা তারও সমালোচনা করবো। রাষ্ট্রের দায়িত্বই তো জনগনের চাওয়াকে পাওয়াতে রূপ দেওয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 − = 77