সুফিবাদের ভন্ডামি-২:

ভারতীয় উপমহাদেশে সূফী সম্প্রদায় এসে নিজ নিজ মতের প্রচার চালায়। আসুন দেখি প্রচারের প্রকারভেদ|

চিসতী শাখা :- ভারতবর্ষে এই শাখা সর্ব প্রথম আসে আনুমানিক ১১৯০ খ্রিস্টাব্দে খ্বাজা মইনুদ্দিন চিশতী –র হাত ধরে । এই শাখার সবচেয়ে বিখ্যাত দুইজন সূফী হলেন তিনি নিজে এবং নিজামুদ্দিন আউলিয়া । খ্বাজা মইনুদ্দিন চিশতি হিন্দু ধর্ম কে গভীর ঘৃণা করত । আজমীর এসে সে অনেকগুলি দেব মন্দির দেখতে পায় । এবং সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ওগুলি ধ্বংস করার অঙ্গীকার করে। তার রীতিমত সেনাদল ছিল । প্রতিদিন একটি বিখ্যাত মন্দিরের সামনে হিন্দুদের পুবিত্র মনে করা গরু জবাই করত ও এবং তার কাবাব বানিয়ে খেত । এটি করত শুধুমাত্র হিন্দুদের প্রতি গভীর ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য । হিন্দুদের কাছে অতি পবিত্র দুটি হ্রদ আনাসাগর ও পান্সেলা শুকিয়ে দিয়েছিল চক্রান্ত করে । দয়ালু হিন্দু রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান এতবার মোহম্মদ ঘরি কে ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন , তার বিরুদ্ধে ঘরী র বিশ্বাসঘাতী যুদ্ধে সে ঘরী-র সাথে হাত মিলিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। পৃথ্বীরাজ চৌহান পরাজিত হলে সে তার জেহাদী উদ্দিপনায় এই বিজয়ের গৌরব নিজের কাঁধে নিয়ে বলে , “আমরা পৃথ্বীরাজ কে জীবন্ত আটক করে ইসলামের বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছিলাম” । নিজামুদ্দিন আউলিয়াও মইনুদ্দিনের পথেই হেঁটেছিল। সে হিন্দুদের বিরুদ্ধে একাধিক সুলতানের অভিজানে অংশ গ্রহন করেছিল । নিয়মিত হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিশদ্গার করেছে । সুলতান আলাউদ্দিনের জিহাদে তার সঙ্গ দেওয়ার জন্য প্রাপ্য গনিমতের প্রচুর উপহার সে গ্রহন করত এবং গর্ব ভরে দেখাত সকল কে । বাংলার সিলেটের রাজা গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে জেহাদে অংশ গ্রহন করার জন্য বাংলার শ্রেষ্ঠ সূফী শাহজালাল কে ৩৬০ জন ভক্তসেনা সহ প্রেরন করে । তারা পিছন থেকে হানাদারী কারমন চালিয়ে গৌরগোবিন্দ কে পরাজিত করে ।সঙ্গে সঙ্গে চলে কয়েক হাজার হিন্দু নাগরিক হত্যা ও বাকিদের তলোয়ারের ডগায় ধর্মান্তরন । নিজামুদ্দিনের শীশ্য আমির খসরু সর্বদায় তার কবিতায় হিন্দুদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করত । খিজির খাঁ চিতর বিজয়ের পর যে তিরিশ হাজার হিন্দুর শিরচ্ছেদ করেছিলেন ,তার জন্য সে আল্লাহ্‌ কে ধন্যবাদ দিয়েছিল । মালিক কাফুর যখন দক্ষিন ভারতের কেতি মন্দির ধ্বংস করে সেখানকার ব্রাহ্মণদের নৃসংশ ভাবে হত্যা করেছিল, তখন তার পরিপ্রেক্ষিতে সে লিখেছিল , “মোহম্মদের ধর্মের বিজয়ের জন্য আল্লাহ্‌ কে ধন্যবাদ । কোনও সন্দেহ নেই , যে পাথর কে গাওয়ার রা পুজা করে , তা তাদের কোনও কাজে আসে নি , তারা পরপারে গেল শুধু পূজার অরথহীনতার সাক্ষ্য বহন করে”। এরকম অনেক নৃশংসতার সে আনন্দের সাথে কাব্যিক বর্ণনা দিয়েছে , অনুশোচনার নাম গন্ধ কখনই তার কাব্যে প্রকাশ হয়নি ।

সুহরাওয়ার্দী :- এই শাখা এসেছিল একাদশ শতকের মধ্যভাগে । তবে এই শাখার সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ইসলামী পণ্ডিত শেখ মোবারক গজ্‌নবি । সে অমুস্লিমদের প্রতি প্রচন্দ ঘ্রীনা প্রকাশ করত । সে বলত “হিন্দু ও বৌদ্ধদের নাস্তিকতা ও মূর্তিপূজা উচ্ছেদ না করলে আল্লাহ্‌ ও নবীর বিরুদ্ধাচার করা হবে । ওদের সংখ্যাধিক্যের কারনে যদি সম্পূর্ণ বিলোপ না ও করা যায় , তাহলে তাদের প্রতিনিয়ত অসম্মান ও অমর্যাদা করতে হবে । এরা আল্লাহ্‌ ও নবীর নিকৃষ্টতম শত্রু”।

এই শাখার এক সূফী দিল্লীর শেখ রুকন্‌-উদ্‌-দিন তুলনামুলক ভাবে অনেক উদার ছিল । উগ্র মুসলিম শাসক ফিরজ শাহ তুঘলক তার আত্মিজবনী তে বলেছে যে , “রুকন্‌-উদ –দিন নিজেকে আল্লাহ-র প্রতিনিধি মেহদী বলে ঘোষণা করেছিল (সুন্নি মতবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে ), তাই সে তাকে বন্দী করে” । পরে জনগন তাকে ও তার ভক্তদের হত্যা করে এই শাসকের উস্কানিতে তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ও তার হাড় গুলোকে খণ্ড খণ্ড করে দেয়। এ থেকেই বোঝা যায় শাসকদের সহায়তা ছাড়া ভারতে সূফী দের মত প্রচারের কোনও অধিকারই ছিল না ।

এরপর দিল্লীতে এই শাখায় সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী নামক এক সূফীর আবির্ভাব ঘটে , সে মকদুম্‌-ই-জাহানিয়া নামে বিখ্যাত ছিল ।হিন্দুদের তো তিনি চরম ঘৃনা করতই , এমনকি মুসলমানদের মধ্যে জমে ওঠা হিন্দু সংস্কারগুলির (যেমন সব-এ বরাত , যা দীপাবলির অনুকরন ছাড়া বাস্তবে আর কিছুই নয়) বিরুদ্ধে সে প্রচার চালাত। সে ফিরোজ শাহ তুঘলকের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে হিন্দুদের ধরমান্তরিত করত । গুজরাতে বহু সম্ভ্রান্ত হিন্দু কে বাধ্য করেছিলেন ইসলাম গ্রহন করতে । তার পুত্র ও পৌত্র একই কাজ করে গেছে বংশ পরম্পরায় ।


ফেরদৌসীয়া
:- এই শাখার উদ্ভব হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে । এদের মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ সংস্কৃতির তীব্র প্রভাব ছিল । এই শাখার সবচেয়ে বিশিষ্ট সূফী ছিল শেখ শরাফুদ্দিন আহমেদ বিন ইয়াহিয়া মনাইরী । সে প্রথম জীবনে অরন্যে কঠিন সাধনায় রত ছিল। তার পত্রাবলী থেকে জানা যায় সে শিক্ষক ও আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন । কিন্তু তিনি গোঁড়া মুসলিমদের নজরে পরেন । শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলক গোঁড়া মুসলিমদের দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে থাকে ও তার একাধিক বন্ধু ও সমগোত্রীয় সুফিকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেন । শেখ শরাফুদ্দিন তার পত্রে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল , সে শহরে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে , তা কিভাবে আল্লাহ্‌র হাতে ধ্বংস না হয়ে টিকে থাকতে পারে ! তিনিও নিহত হতেন , কিন্তু মখদুম -ই- জাহানিয়া এর হস্তক্ষেপের ফলে তিনি বেঁচে যান । এরপর সারা জীবন তিনি চুপ থাকেন ।

নক্সবন্দী শাখা :- এই শাখার প্রতিষ্ঠাতা ছিল খ্বাজা আহমেদ আতা ইয়েসবী । ১১০০ খ্রীস্তাব্দের আশে পাশেই সে এই শাখার প্রতিষ্ঠা করে। এরাও হিন্দু –বৌদ্ধ মতাদর্শের দ্বারা চুরান্ত ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল । এই শাখার একাধিক বিখ্যাত সূফী ছিল যারা আদ্যাত্মিক শিক্ষক হিসাবে আদর্শ ছিল । কিন্তু তা সত্ত্বেও এই জোট জনপ্রিয় হয় নি । কারণটা বুঝতে পেরেছিল সূফী আশ্রাফ জাহাঙ্গীর সামনানী । সে বুঝেছিল এই শাখা শরিয়ত না মানার জন্যই জনপ্রিয় হচ্ছে না । রাজানুগ্রহ পাচ্ছে না ।ফলে সে নরম শরিয়তি পন্থা গ্রহণ করেছিল । তাতেও কাজ দেয়নি । প্রায় ২০০ বছর পর খ্বাজা বাকী বিল্লাহ সমস্ত ‘ঘৃন্য’ পৌত্তলিক আচার আচরণকে বর্জন করেছিল ।এর পর স্বাভাবিক ভাবেই রাজানুগ্রহ এবং জনপ্রিয়তা আসে ।

যেসব সূফী ঘরানা ভারতে তাদের মত প্রচার করেছিলেন তারা প্রত্যেকেই হিন্দু- বৌদ্ধ দের ঘৃণার চখে দেখত । তাদের ধরমান্তরিত হতে বাধ্য করত ,কখনো লোভ কখনো ভয় দেখিয়ে। এবং এই একই ফরমুলাতে তারা রাজানুগ্রহ ও জনপ্রিয়তা লাভ করত । এবং যেসব সূফীরা তা না করত , তাদের তা করাতে বাধ্য করা হত । নয়ত তাদের বিলুপ্তি ঘটতো

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “সুফিবাদের ভন্ডামি-২:

  1. রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান সহ
    রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান সহ সমসাময়িক রাজা-সম্রাটদের ইতিহাস আমরা ভালো করেই জানি। মুসলিমরা ভারতকে গড়েছে বৈ ধ্বংস করেনি। যদি মুসলিম সুফি বা সাধকদের উদ্দেশ্য হিন্দুদের ধ্বংস করাই হতো, তাহলে সম্পুর্ন ভারতবর্ষ থেকে হিন্দু বা সনাতন ধর্মালবম্বী শব্দটিই বহু আগে বিলুপ্ত হয়ে যেত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

45 − = 35