ওলাবিবি

** ওলাবিবি
পড়ছিলাম গোপেন্দ্রকৃষঞ্চ বসুর বাংলার লৌকিক দেবতা। এখানে বাংলাদেশ ও কলকাতায় বাঙ্গালি হিন্দু ও মুসলিম সমাজে কিছুদিন আগেও প্রচলিত ছিল এমোন সব লৌকিক আচার অনুষ্ঠান। এরা —মাকাল ঠাকুর, পাচু ঠাকুর, বড় খা গাজী, বাসলি, বড়াম, ওলাইচন্ডি, সাত বোন, পীর গোরাচাঁদ,সত্য পীর————— ইত্যাদি।

ওলাবিবির নাম পড়লাম আবার অনেকদিনবাদে, ওলাউঠা শব্দটা প্রথম পড়েছিলাম হাজার বছর উপন্যাসে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হাজার বছর ধরে-তে লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে ওলাবিবির আগমন বর্ণনা করেছেন। পরে জেনেছিলাম কলেরা রোগকে আগের মানুষ জন ওলাবিবি নামে ডাকত। এই ওলাবিবির প্রাদুর্ভাবে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। আর অন্ধকারচ্ছন্ন মানুষগুলি ভয়ে প্রতিবছর ওলাবিবির পুজাআর্চনা করত। এই ওলাবিবি সম্পর্কে একটু খানি জেনে নিই।

>>ওলাইচণ্ডী
“ওলাইচণ্ডী’, ‘ওলাবিবি” বা ‘বিবিমা’ প্রভৃতি বিভিন্ন নামে এই লৌকিক দেবীকে অভিহিত করা হয়। এর পূর্ণ নাম “ওলাউঠা-চণ্ডী” বা ‘ওলাউঠবিবি” । ইনি ওলাউঠা রোগের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিশ্বাসে এর ভক্তেরা একে পূজা করেন। ওই রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে এর কৃপা প্রার্থনা করা হয়।

“ওলাউঠা”-চলতি দুটি গ্রাম্য শব্দের সমষ্টি—“ওলা’ এবং “উঠ”। “ওলা’ মানে নামা বা দাস্ত হওয়া আর ‘উঠার” অর্থ হল উঠে যাওয়া বা বমি হওয়া। যে রোগে দাস্ত ও বমি দুই-ই হয় তাকে ওলাউঠা রোগ বলে, শুদ্ধ ভাষায়—বিসূচিকা। ইংরেজিতে কলেরা। এর ‘ওলাবিবি” নামের প্রচলন বেশি।

ওলাইচণ্ডী বা ওলাবিবির মূর্তি দু-রকমের হয়। সর্বত্রই অতি সুশ্ৰী। হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে এর আকৃতি একেবারে লক্ষ্মী সরস্বতীর মত—রং ঘন-হলদে, টানা টানা দুটি চােখ (কোন কোন স্থলে তিনটি), নাক, কান, ঠোঁট বেশ সুন্দর, দুটি হাত প্রসারিত (মুদ্রার স্থিরতা নেই), কখন দণ্ডায়মান, কখনও বা শিশু-সন্তান কোলে করে আসেন উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। সারা দেহে নানারকম গয়না—বাজু, গোট, মাকড়ি, চুড়ি, নাথ, হার, চিক ইত্যাদি। মাথায় মুকুটও পরেন দু-এক স্থানে, অন্যত্র ইনি এলোকেশী। বাহন বা প্রহরণ কিছু নেই। সাধারণত নীল শাড়ি পরেন।

মুসলমান প্রধান অঞ্চলে এর আকৃতি বা পোশাক-পরিচ্ছদ একটু ভিন্ন রকমের।—মূর্তি খানদানী ঘরের মুসলমান কিশোরীর মত। পিরান, পাজামা, টুপি, ওড়না, গায়ে নানারকম নাগরা-জুতো, মোজাও পরেন কোন ক্ষেত্রে। এক হাতে আসাদণ্ড দেখা যায়।

বহু পল্লীতে এর একক বা স্বাধীন থান আছে। বহু থানে ইনি এর ভগ্নীদের সঙ্গে থাকেন। ওলাইচণ্ডী বা ওলাবিবিরা সাধারণত সাত (কোন কোন স্থানে নয়) জন ভগ্নী। ভগ্নীদের নাম যথাক্রমে : ওলাবিবি, ঝোলাবিবি, আজিগৈবিবি, চাদবিবি, বাহাড়বিবি, ঝোঁটুনেবিবি ও আসনবিবি। যে থানে ইনি ছয় ভগ্নীসহ থাকেন তাকে ‘সাতবিবির থান” বলা হয়। এর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্যে মধ্যযুগে রচিত কাব্যগুলির নাম ‘সাতবিবির গান’। **কোন কোন গবেষক মন্তব্য করেছেন,—এই সাতবিবি সম্ভবত শাস্ত্রীয় সপ্তমাতৃকা (ব্রাহ্মী, ইন্দ্ৰাণী, বৈষ্ণবী প্রভৃতি), কোন এক কালে পল্পী সমাজে গিয়ে সাতবিবি হয়েছেন। কিন্তু তাদের মন্তব্যের সমর্থনযোগ্য কোন প্রমাণ তারা দেন নি। আকৃতিতে কিছু মিল থাকলেও শাস্ত্রীয় দেবীদের পূজাচারের সঙ্গে আলোচ্য দেবীদের অর্চনা পদ্ধতির বিশেয মিল দেখা যায় না।

এই দেবীর পূজাচারের মধ্যে সর্বত্রই মুসলমান প্রভাব কম বা বেশি দেখা যায়। অধিকাংশই এর একক থানে পৌরহিত্য করেন মুসলমান ফকীররা তবে যেখানে হীন অন্য শাস্ত্রীয় দেবতাদের সঙ্গে থাকেন সেখানে হিন্দু পুরোহিত দ্বারা পূজিত হন।

উক্ত সপ্তমাতৃকার সঙ্গে আলোচ্য দেবীদের সম্পর্ক স্পষ্ট না দেখা গেলেও বীরভূম ও বাঁকুড়া জেলার পল্লী অঞ্চলে পূজিত ‘সাতবউনী’ বা ‘সাত বনদেবী ভগ্নীদের’, ‘রঙ্গিনী’, ‘চমকিনী’, ‘সনকিনী’ প্রভৃতি এবং জঙ্গলমহালের বিভিন্ন স্থানে পূজিত জয়মালা দেবী সাত ভগ্নীর (বাসিলি, চণ্ডী, বিলাসিনী প্রভৃতির) বা সাতটি বনদেবীর আকৃতি ও পূজাচারের সঙ্গে এই সাতবিবির মিল দেখা যায়। সে কারণে কোন বিশিষ্ট গবেষক তার গ্রন্থে বলেছেন,-“সম্ভবত এই দেবীরাই কোন এক কালে “সাতবিবি” হয়ে গেছেন।”

* শ্রদ্ধেয় শ্ৰীবিনয় ঘোষ বলেন, “এই বনদেবীরা দক্ষিণ বঙ্গে আসিয়া মুসলমান আমলে “সাতবিবি” হইয়াছেন।”

সাত ভগ্নীর মধ্যে ওলাইচণ্ডী বা ওলাবিবিই প্রধান। ভক্তেরা তার উদ্দেশ্যে পূজা করেন, নৈবেদ্য দেন, অপর ভগ্নীরা ওই পূজার ভাগ পান। তবে যে সব থানে এই দেবী এর ঝোলাবিবি নামের ভগ্নীসহ থাকেন, সেখানে ওই ভগ্নীটিরও মর্যাদা কম নয়। ওলাবিবিকে কলেরা এবং ঝোলাবিবিকে হাম-বসন্তের অধিষ্ঠাত্রী বিশ্বাসে লোকে দুজনকে পূজা করেন।

সম্ভবত এই দেবীর পূজার উৎপত্তি কেন্দ্র চব্বিশ পরগণা জেলা, বিস্তারণ ক্ষেত্র বেশ ব্যাপক-হাওড়া, নদীয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান প্রভৃতি জেলায়ও একে পূজিত হতে দেখা যায়। লৌকিক দেবকুলের মধ্যে ওলাইচণ্ডীর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেখানে এককালে পল্লী ছিল সেখানে শহর গড়ে উঠেছে, লোকের রুচির পরিবর্তন ঘটেছে, শাস্ত্রীয় দেবতাদের প্রভাবে অবৈদিক, অস্মার্ত, অব্ৰহ্মাণ্য বহু লৌকিক দেবতা উচ্চকোটি বা নগর সমাজে হীনপ্ৰভ, এমন কি লোপ পেয়েছেন। কিন্তু এই দেবী পল্লী অঞ্চল থেকে আরম্ভ করে। বহু উন্নত জনপদে এমন কি কলকাতার মত শহরেরও স্থান বিশেষে আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। শুধু তাই নয়—ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজের দ্বারা আফ্ৰিকৃত না হয়ে বা মিশ্রিত নাম-রূপ ধারণ করে উন্নত স্তরে অনুপ্রবেশ করতে চেষ্টা করেন নি। আজও সর্বত্রই এইভাবে স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা বজায় রেখেছেন। এবং কারও ব্যক্তিগত বা মন্দিরদেবী হননি। অপর লৌকিক দেবতার মতই এর পূজাস্থান গাছের তলায়— ঝোপ-ঝাড়ে জলাশয়ের তীরে এবং এর পূজাতে লৌকিক চণ্ডীর মন্ত্র বা আচার ব্যবহৃত হয়।

*জানা যায়—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে যখন কলিকাতার ওই অঞ্চল ব্যাঘ্র ও বন্য শূকর প্রভৃতি জন্তুতে পূর্ণ গভীর অরণ্যে আবৃত ছিল এবং বেলগাছিয়ার ওই অঞ্চল দিয়া বিদ্যাধরী-নদী বা উহার কোনো শাখা প্রবাহিত ছিল সেই কালে মিস্টার ডানকিং নামক জনৈক ইংরেজ (সম্ভবত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদস্থ কর্মচারী বা কুঠীয়াল) এই দেবীর প্রতি ভক্তিবশত এই স্থানে ওলাইচণ্ডী দেবীর একটি মন্দির নির্মাণ করাইয়া দেন—বর্তমান মন্দিরটি উহার নব সংস্করণ ।

কলকাতার সীমানার মধ্যে বলা যেতে পারে—বেলগাছিয়াতে ও টালিগঞ্জের বাবুরাম ঘোষ স্ট্রিটে এবং হাওড়া শহরের কাসুন্দিয়া পল্লীতে এর স্বাধীনতা মন্দির বা থান আছে। এমন কি কলকাতা ও হাওড়ায় এর নামে দুটি রাস্তা আছে। (ওলাইচণ্ডী লেন ও ওলাইবিবি লেন)। ধর্মতলা স্ট্রিটের দু’পাশের (উত্তর ও দক্ষিণের) দুই বড় রাস্তায়—সুরেন্দ্র ব্যানার্জিস্ট্রিটের শীতলা মন্দিরে ও বাঞ্ছারাম আক্রুর লেনের বঁাকারায় (ধর্মঠাকুর) মন্দিরে এই দেবী অপর শাস্ত্রীয় দেবতার সঙ্গে থাকেন। শহরে কলেরা রোগের আধিক্য দেখা গেলে একে প্রাধান্য দেওয়া হয় ও বিশেষভাবে পৃথক পূজার ব্যবস্থা হয়।

নদীয়া জেলায় এই দেবীর এক অধিষ্ঠান পল্লী এর নামে খ্যাত। মেদিনীপুর গড়বেতা রাজকোটের দুর্গে ওলাইচণ্ডী অন্য দেবতাদের সঙ্গে পূজিত হন। বীরভূম জেলার বোলপুর গ্রামের প্রান্তে নীলকুঠির পাশে ওলাইচণ্ডী অপর লৌকিক দেবতাদের সঙ্গে একটি থানে আছেন। চব্বিশ পরগণা জেলার জয়নগরের রক্তাখা পল্লীর (এখানে ইনি বিবিমী নামে খ্যাত) এই দেবী বিশেষ প্ৰসিদ্ধ।

হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে ‘বারের-দিনে’ অর্থাৎ শনি-মঙ্গলবারে এর পূজায় নিরামিয নৈবেদ্য দেওয়া হয়। এর পৌরোহিত্যে যে কোন বর্ণ ও সম্প্রদায়ের এমন কি নারীরাও অধিকার আছে। মুসলমান ফকীররা যে সব থানের কর্তা সেখানে একে ওলাইচণ্ডী বলা হয় না-ওলাবিবি বা বিবিমা নামেই ইনি খ্যাত হন। হাড়ি বা ডোম জাতীয়রা এর যে থানে পৌরোহিত্য করেন সেখানে পূজার নানা রকম পশুপক্ষী বলি হয়। নদীয়া জেলার একটি থানে এর পূজায় ডোম-জাতিকে অগ্ৰাধিকার দেওয়া হয়।

তিন রকমভাবে এর পূজা হয়—“বারের পূজা’ হয় শনি-মঙ্গলবারে, এতে বিশেষ ঘটা হয় না। কারো মানত বা প্রতিশ্রুতি থাকলে কোন এক বারে এর পূজা দেবীর কৃপাপ্রাপ্ত ভক্তের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজায় কিছু আড়ম্বর দেখা যায়। ছাগ বলিও হয়। এর বিশেয বা ‘পল্লীগত পূজা’ হয় দেশে কলেরা রোগ ভয়াবহ বা মহামারী রূপে দেখা গেলো। ওই অঞ্চলের সব পল্লীর লোক ওই সময় কোন এক দিনে (শনি বা মঙ্গলবারে) সমষ্টিগতভাবে ও গ্রাম্য মোড়লের নায়কত্বে বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গে এর পূজা হাজোত দেন। এই পূজায় কয়েকটি অবশ্য-পালনীয় প্রথা বা লোকায়ত বিধান আছে। তার মধ্যে মাঙন” করা ও ছলন’ দেওয়া। অঞ্চলের মোড়ল বা প্ৰধান ব্যক্তি গলায় বন্দিরমালা (একটি খড়ের হার) পরে বা দাঁতে একটি তৃণ ধারণ করে পল্লীর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এই পূজার জন্যে অর্থ, চাল, ফল-মূল ইত্যাদি সংগ্রহ করেন, এটাই মাঙন” প্রথা। কোন কোন পল্লীর লোক এই পূজার ওলাবিবির ক্ষুদ্রাকৃতি মূর্তি গড়ে দেবীর থানে রেখে দেন। ওইরূপ ক্ষুদ্র মূর্তিকে “ছলন” বা ‘সলন” বলা হয়। ভক্তদের কেউ কেউ কলেরা রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে বা অন্য কোন বাসনায় সিদ্ধ হবার ইচ্ছায় দেবীর থানের জানলায় বা থানের সংলগ্ন কোন গাছের ডালের দড়ি-সহযোগে একটা চিল বুলিয়ে রাখে, একে “টিল-বাঁধা” মানত বলে। এই পূজায় পল্পী গায়নরা এই দেবীর মাহাত্ম্য গান (কোন কোন ক্ষেত্র হরিনামও) করে থাকেন। কলেরা রোগের অধিষ্ঠাত্রী বিশ্বাসে একটি বিশেষ দেবীর পূজা অন্য প্রদেশে আছে। উড়িষ্যাতে ‘যোগিনী বা রণকিনী, দক্ষিণ-ভারতে ‘মারাম্মা আনকাম্মা’ প্রভৃতি কলেরা-নিয়ন্ত্রকদেবী বিশ্বাসে পূজিত হন। মহীশূরে সাতটি বনদেবীর পূজা হয় কলেরা (বা অন্য রোগে) মহামারীরূপে প্রাদুর্ভূত হলে। এদের ও ওলাইচণ্ডীর পূজাচারে বেশ মিলও দেখা যায়।

ওলাইচণ্ডী বা ওলাবিবির পূজাচারের মধ্যে কয়েকটি প্রথা লক্ষ্য করলে মনে হয়, প্রাচীন মাঙন” করার রীতিটি সম্ভবত কোন আদিম যুগের Food-gathering or Food Collecting কালের নিদর্শন এবং গ্রাম্য মোড়ল বা গোষ্ঠীপতির নায়কত্বে সমষ্টিগত পূজার রীতি Community worship হয়ত আৰ্য-পূর্ব যুগের একটি পূজাচার কেনমতে—দ্বীপাবদ্ধ, বিচ্ছিন্ন ও রক্ষণশীল পল্লীসমাজে আজও থেকে গেছে।

*সূত্রঃ গোপেন্দ্রকৃষঞ্চ বসুর বাংলার লৌকিক দেবতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 27 = 31