বুমেরাং

এক.
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার এই সময়টাকে সবচেয়ে কষ্টকর সময় বলে মনে হয় রফিক সাহেবের। এই ৫২বছর বয়সে টানা তিন ঘন্টা বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্য সত্যিই কষ্টের। অথচ অফিস থেকে বাসায় যেতে বাসে করে বড়জোর ত্রিশ মিনিট লাগার কথা। আসার সময় সিট নিয়ে কোন ঝামেলা হয়না। কিন্তু বাসায় ফেরার পথে প্রায় দিনেই দাঁড়িয়ে ফিরতে হয়। এভাবে দাঁড়িয়ে আসা আগে অসহ্য মনেহলেও কয়েক বছর থেকে একেই উপভোগ্য করে নিয়েছেন তিনি। মাঝে মাঝেই অবাক হয়ে ভাবেন, এত্ত চমতকার একটা আইডিয়া তার মাথায় আরো আগে আসলো না কেনো?
আজ বাসে উঠেই কিঞ্চিত মেজাজ খারাপ রফিক সাহেবের। সবসময়ই সামনের দরজার কাছাকাছি দাড়াতে পছন্দ করেন তিনি। অথচ সবাই মিলে ঠেলতে ঠেলতে তাকে কি করে যেন বাসের পেছনের অংশে নিয়ে এসেছে। কারণ ছাড়াই তার বড় মেয়ে যূথিকার কথা মনে পরল। যূথিকা অনার্স ২য় বর্ষে পরছে। মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দর হয়েছে, আরো তিন-চার বছর আগে থেকেই বিভিন্ন যায়গা থেকে বিয়ের সন্মন্ধ আসছে। প্রায় দুই বছর থেকেতো ওর বড় খালার ননদ আঠার মত লেগে আছে ছেলের বউ বানানোর জন্য। ছেলে নিউইয়র্ক থাকে, ভালো একটা চাকরি করে নাকি।তার অবশ্য বিদেশে ভালো চাকরির কথা বিশ্বাস হয়না। এইসব বিলাতী আমেরিকান বাঙ্গালিদের কথা বিশ্বাস করতে নেই। হয়তো দেখা যাবে ছেলে কোনো এক হোটেলে থালা-বাসন মাজে বা একটু বেশি হলে কোনো সুপার শপের সেলস ম্যান অথবা ট্যাক্সি ড্রাইভার! মেয়ে কি তার ফেলনা নাকি যে তিনি এই ড্রাইভার জামাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মেয়েকে বিদেশে পাঠাবেন? হঠাত করে বাসের ব্রেক কষলে প্রছন্ড ঝাঁকুনিতে তার সম্বিত ফিরে এলো। বাসের ড্রাইভারকে কঠিন কোন গালি দিতে ইচ্ছা করলো। কড়া চোখে ড্রাইভারের দিকে তাকাতেই মেয়েটার দিকে চোখ পরলো। বয়সতো দেখে মনে হচ্ছে সতেরো-আঠারোর বেশি হবে না। কিন্তু এই মেয়ে এমন অসস্তি নিয়ে এতো ভীড়ের মাঝে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেনো? বারবার আসে-পাশের সব ছেলে-ছোকড়াগুলোর থেকে গা বাঁচানোর চেষ্টা করছে? তার ছোট মেয়ে জেরিন এর কথা মনে পরলো, সেও তো এই মেয়ের বয়সী! মেয়েটার কাছাকাছি দাড়ানোর তাগিদ অনুভব করলেন তিনি। ভীড় ঠেলে সামনের দিকে এগুতে লাগলেন। মেয়েটার কাছাকাছি পৌছে গেছেন প্রায় এমন সময় শুনতে পেলেন এক ছেলে কন্ঠ বলছে, “আপু, আপনি এখানে বসুন, প্লিজ়” শুনেই রাগে তার গা জ্বলে গেলো! এই উঠতি বয়সী কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে গুলোকে দেখলেই এমন হয় তার। এই বদের হাড্ডিগুলো মেয়েদের দাঁড়ানো দেখলে সিট ছেড়ে দেয়। কই, তিনি যে ওদের বাবার বয়সী, তাকে তো একদিনও কেউ বসতে বলেনা! মেয়েদের কেন সিট ছেড়ে দিস, বুঝিনা মনে করেছিস? মনেমনে বললেন তিনি। দাড়ায়ে থাকলেতো বুক দেখতে সুবিধে হয় তোদের।
অবশেষে ভীড় ঠেলে মেয়েটার কাছে পৌছুতে পারলেন। সাদামাটা কাপড় পরনে, আর আচরণেই বোঝা যায়, মফস্বল থেকে নতুন আসছে। কোলে ঝোলার মতো ব্যাগ থেকে উঁকি দেয়া বইপত্র দেখে বুঝলেন ইন্টারমিডিয়েটে পরে মেয়েটা। বেয়াদব ছেলেটা তার সামনেই দাঁড়ানো। কালো একটা টি-শার্ট পরে আছে সেইটাতে আবার ওর মতই লম্বা চুলওয়ালা মাথায় লালটুপি পরা আরেক বেয়াদবের ছবি আঁকা। নিচে বড় করে লিখা “CHE GUEVARA” । এত্তবড় ধাড়ি ছেলে হাফপ্যান্ট না কি পরছে হাঁটুর নিচেই সেইটা শেষ!
আবার মেয়েটার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেয়ার তাগিদ অনুভব করলেন তিনি। সিটের মধ্যে বসেও মাথা নিচু করে আছে সে। একটু এগিয়ে দাড়ালেন, নাহ, হচ্ছে না। আরো একটু এগিয়ে সিট ঘেষে দাড়ালেন। হ্যাঁ, এইবার হয়েছে! মেয়েটার শরীরে তার বিশেষ অঙ্গটা স্পর্শ করাতে পেরেছেন! ধীরে ধীরে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরছে অনুভূতি। হঠাত্ মেয়েটি চমকিয়ে তার দিকে তাকালো। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন তিনি। জানেন, এইসব মফস্বলের মেয়েরা তাকানো পর্যন্তই থাকে। কিছুই বলতে পারবেনা।
নাহ… এই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসে করে ফেরা খুব একটা খারাপ না।

দুই.
সালমা অনেক অসস্তি নিয়ে ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। এমন না যে ভীড়ওয়ালা বাসে আজই প্রথম উঠলো। এক সপ্তাহে তাকে বেশ কয়েকবার উঠতে হয়েছে। তবে প্রতিবারেই সঙ্গে বাবা ছিলো, সম্পুর্ণ একা আজ প্রথম উঠলো। এইচ.এস.সি. পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় ইঞ্জিয়ারিং এ ভর্তির জন্য কোচিং করতে এসেছে সে। বড়ফুপুর বাসা থেকেই ক্লাশ করে। ভর্তির সময় ও প্রথম ক্লাশের দিনে বাবা সঙ্গে এসেছিলো, তাই কিছুই মনে হয়নি। আজ একটু ভয় ভয়ও করছে, ঠিকমত বাসায় যেতে পারবে তো? ভীড়ের মাঝে দরজার সামনে থেকে কিভাবে যে এতো ভেতরে চলে এলো, বলতেও পারবে না! এদিক ওদিক তাকাতেই পাশে থেকে এক ছেলে বলে উঠল, “আপু, আপনি এখানে বসুন, প্লিজ” একটু ইতস্তত করে বসে পরলো। ব্যগের ভেতরে দেখছে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে কি না। গতদিন ক্যলকুলেটরটা ভুল করে কোচিং এ ফেলে এসেছিলো, ভাগ্যিস মিতি মেয়েটা তার কাছে রেখে দিয়েছে। হঠাত বাহুতে শক্ত কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করে চমকিয়ে উঠল। তাকিয়ে দেখে বাবার থেকেও বয়সে বড় হবে, এমন একটা লোক তার বাম হাতে কুতসিত ভাবে লোকটার ‘ইয়ে’ ঘষছে! ঘৃণায় তার গা রি রি করে উঠলো। লোকটা আবার শয়তানের মত করে হাসছে!
স্তব্ধ হয়ে বসে আছে সালমা। কি বলবে বা করবে, বুঝতে পারছেনা। বাবার কথা মুনে পরছে, প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে তার। ব্যাগের ভেতর রাখা হাতে হঠাত তীব্র ব্যাথা অনুভব করতেই বুঝতে পারলো তার এখন কি করা উচিত। ওইতো সামনের গোলচত্ত্বরটা দেখা যাচ্ছে, ওখানে নেমে তারপর রিক্সা করে বাসা। এখনই উঠে বাসের দরজার কাছে দাড়াতে হবে। ব্যাগের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে হাত বের করল। লম্বা দম নিয়ে উঠে দাড়ানোর সময় ডান হাতে ধরা কাঁটা-কম্পাসটা শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার যায়গা বরাবর বসিয়ে দিয়ে দ্রুত ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেলো সে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২৪ thoughts on “বুমেরাং

  1. সাংঘাতিক হইসে। কিন্তু চে
    সাংঘাতিক হইসে। কিন্তু চে গুয়েভারার গেঞ্জি আর থ্রি কোয়ার্টার পড়লেই বেয়াদপ না। আমি নিজেই পড়ে ঘুমাতে এসেছি। 😀

    1. বেয়াদপ যে না, তা আমি জানি
      বেয়াদপ যে না, তা আমি জানি :মুগ্ধৈছি:
      আপনি পারলে রফিক সাহেবদের বুঝান :শয়তান: :শয়তান:

  2. সাহসী তো নয় একেবারে ডেঞ্জারাস
    সাহসী তো নয় একেবারে ডেঞ্জারাস সাহসী মেয়ে।অবশ্য বাংলায় নারী অধিকার রক্ষায় এমব চরিত্র গল্পের থেকে বাস্তবে চলে আসুক।
    বাসের বুড়ো আর হেফাজতি বুড়ো যারাই নারীর স্বাধীনতার অন্তরায় তারাই এই ৫২% নারীর দেশে তলিয়ে যাবেই।

    1. http://www.facebook.com/jenny
      http://www.facebook.com/jenny.islam.9/posts/373432002767127
      কাল হেফাজতিদের সমর্থন করিনা বলাতেই এত্ত কথা প্রকাশ্য শুনেছি… ইনবক্স এর গালির কথা বলতে আমিই লজ্জা পাচ্ছি… ক্যামনে মানুষ এভাবে গালি দিতে পারে???

    1. আপনার ইমোটিকন দেখে লজ্জা
      আপনার ইমোটিকন দেখে লজ্জা পেলাম… :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই:

    1. আমাদের নওগাঁ তে এক মেয়ে কে
      আমাদের নওগাঁ তে এক মেয়ে কে রেপ করতে এসেছিল এক যুবলীগ পাতি নেতা… মেয়েটা বঁটি দিয়া লোকটারে এর আর লোক দাবী করার যোগ্য রাখেনাই :salute:

  3. একজন মেয়েই ভালো জানে কতো ঘটনা
    একজন মেয়েই ভালো জানে কতো ঘটনা দুর্ঘটনা ‘র মধ্য দিয়ে তাকে পথ চলতে হয় । আমরা ছেলেরা এর খুব কম -ই অনুভব করতে পারি । ভালো লেগেছে ।

    1. কিছুটা হলেও তো অনুভব করতে
      কিছুটা হলেও তো অনুভব করতে পারেন, এমন যদি সবাই পারতো তাহলেও এই হ্যারেজমেইন্ট কিছুটা হলেও কমত……
      ভালো লাগার জন্য ধন্যবাদ :খুশি:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 + = 42