আইউব খান ও আওয়ামী শাসনকাল

আজকাল আমাদের দেশে কিছু ব্যক্তি বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র। এদের কথা শুনে মনে হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র যেন পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রকে বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত, তারা সবাই প্রায় হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী হলে এটা কখনোই হতে পারত না।

অনেক দিন পর কিছু লিখলাম

বিষয়: ভেসে উঠছে আইউব খান।
অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনটি কথা বলেছেন। প্রথমত, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র কতটা উৎকর্ষ লাভ করল, সে বিতর্কে না গিয়েও এর বিকাশের প্রতিই নজর দেয়া জরুরি। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রে আলোচনা ছাড়া কিছু সম্ভব নয়। এটি তাঁর কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নয়, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্কে এত দিনকার সুচিন্তিত অভিমত পুনর্ব্যক্ত হয়েছে মাত্র। তাই বলে কেবল প্রগতি বা উন্নয়ন দেখিয়ে মানবিক প্রগতিকে দুর্বল করা গ্রহণযোগ্য হবে না। আগে গণতন্ত্র, না উন্নয়ন – এই তর্ক থেকে অমর্ত্য দর্শনের দূরত্ব যোজন যোজন।

অর্থনীতির সঙ্গে দরকার মানবিক প্রগতিও।
সুশাসন ছাড়া যেমন গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষা করা যায় না, তেমনি গণতন্ত্র না থাকলে সুশাসনও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যতিরেকেও রাষ্ট্রনায়কগণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ শাসন এবং উন্নয়ন করতে পারেন। তবে সে উন্নয়ন সুষম, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই হয় না। বৃহৎ দেশ চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু উন্নয়নে দেশটি বহু গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বের বহু উন্নত দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, কিন্তু উন্নয়নে অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে থাকলেও তাদের উন্নয়ন জবাবদিহিমূলক ও টেকসই। আসলে গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক, একটি ছাড়া অন্যটি পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে না। অনেক রাষ্ট্রনায়ক মতামত দেন যে, উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকলে একটি দেশে জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে না, ভয়ভীতিতে তাদের চিন্তা, চেতনা মাটি চাপা দিয়ে রাখতে হয়, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারে না, তাই রাষ্ট্রনায়ক, আমলা, ব্যবসায়ীরা যথেচ্ছ দুর্নীতি করতে পারেন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, যে দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম আছে, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। দুর্ভিক্ষ বিত্তশালীদের ব্যক্তিস্বার্থে সৃষ্টি করা হয়, তেমনি দুর্নীতিও ব্যক্তি লালসার কার্যকারণ। তাঁর মতে, উন্নয়ন মানেই মুক্তি, সে অর্থে গণতন্ত্র মানেই উন্নয়ন, অর্থনীতির দু’টি দিক। একটি হচ্ছে দ্রব্য উৎপাদন। দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষকে ব্যবহার করতে হয় প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু এর একটি দিক হচ্ছে দ্রব্য ভোগের নিয়ম, যা প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে সামাজিক নিয়মের ওপর। প্রাকৃতিক নিয়ম মানুষ বদলাতে পারে না; কিন্তু সামাজিক নিয়ম পারে। এই সামাজিক নিয়ম রচনার ক্ষেত্রে আসে গণতন্ত্রের ধারণা। গণতান্ত্রিক উপায়ে গঠিত সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইন করে নির্দিষ্ট করতে পারে উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কে কতটা পরিমাণে উৎপাদিত দ্রব্য ভোগ করতে পারবে। এভাবেই রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সম্ভব হয়েছে অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ।

আজকাল আমাদের দেশে কিছু ব্যক্তি বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র। এদের কথা শুনে মনে হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র যেন পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রকে বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত, তারা সবাই প্রায় হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী হলে এটা কখনোই হতে পারত না।

গণতন্ত্র সূর্যের মত সর্বব্যাপী। রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে সুশাসন, সুবিচার, উন্নয়ন, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবই থাকে ও বিকশিত হয়। তবে উন্নয়নের জন্য যখন গণতন্ত্রকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয় তখন বিশেষ কিছু মতলব প্রকাশ পায়। গণতন্ত্রতো উন্নয়নের অন্তরায় নয়। তাহলে ’গণতন্ত্র না উন্নয়ন’ এরূপ চিন্তার মতলবটা কি? গণতন্ত্র না থাকলেও উন্নয়ন হতে পারে। গাদ্দাফির লিবিয়াসহ পৃথিবীর কিছু দেশে তেমনটি হয়েছে। তাই বলে কি ’স্বৈরশাসন জিন্দাবাদ’ বলতে হবে? উন্নয়ন একটি দৈহিক ব্যাপার।

গণতন্ত্র না উন্নয়ন? : প্রশ্নটি নতুন নয়। এই প্রশ্নটি বা এই ইস্যুটি ওঠার পর মনে পড়ছে পাকিস্তান আমলের কথা। তখন ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। ১০ বছর তিনি রাজত্ব করেছেন এবং করেছেন দোর্দ– প্রতাপে। আইয়ুব খানের স্লোগান ছিল Development rather than Democracyঅর্থাৎ গণতন্ত্রের চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সম্ভবত এই নীতিতে আইয়ুব খান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি গণতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলেছিলেন। তিনি চালু করেছিলেন এক আজব গণতন্ত্র। সেটির নাম ছিল মৌলিক গণতন্ত্র।

আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র : আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন চালু করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন জনগণের ভোটে। তবে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন না। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে অর্থাৎ সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ। সেগুলোর চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার। এই ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য সরাসরি ভোট দিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট বানাবেন। এই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা হবেন মৌলিক গণতন্ত্রের স্তম্ভ। এভাবে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা ব্যবস্থাকে বলা হবে মৌলিক গণতন্ত্র। সোজা কথায় আইয়ুব খানের জামানায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রের পরিধিকে মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত করা হয়েছিল। জনগণকে দেয়া হয়েছিল সীমিত গণতন্ত্র। সেজন্যই আইয়ুব খানের থিওরি ছিল ‘গণতন্ত্রের চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়ন’।

অনেক আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ১৯৭০ এর নির্বাচন। গণতন্ত্রের লড়াই অতপর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে জন্ম লাভ করেছে এক নতুন রাষ্ট্র। নাম বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের ৪৫ বছর পর আবার শোনা যাচ্ছে আইয়ুব খানের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। আ’লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ, যারা সরকারের কর্মচারী , তাদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে আইয়ুব খানের থিওরির প্রতিধ্বনি, “এখন দরকার বেশি উন্নয়ন, কম গণতন্ত্র”। এই কথা একাধিক মন্ত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। আ’লীগের একজন মন্ত্রী বা একজন সদস্যও এই কথার প্রতিবাদ করেননি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও সেই উক্তিকে প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকার করেননি। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, আ’লীগের বর্তমান সরকার আইয়ুব খানের সেই পথেই হাঁটছে। এখন থেকে আইয়ুব খানের সেই সব কথা বলে তারা জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছেন।

গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন বেশি প্রয়োজন, আইয়ুব সরকারের এই তত্ত্বের মুখর সমালোচক ছিল সেইদিন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সেদিন আইয়ুব খানের এই অর্থনৈতিক দর্শনের কঠোর প্রতিবাদ করেছিলো। সেদিন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ নয়, পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের অর্থাৎ সারা পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং বিরোধীদলীয় পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে অযুত কণ্ঠে জনগণ বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা করেছিলেন, গণতন্ত্রের বিনিময়ে উন্নয়ন নয়। কম গণতন্ত্র বেশি গণতন্ত্র, কম উন্নয়ন বেশি উন্নয়ন, এসব কথা তারা শুনতে রাজি নন। গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটোই তারা এক সঙ্গে দেখতে চান। এখানে কম বেশির কোনো প্রশ্ন নেই।

আজ যখন সরকার নিজ অপশক্তির বলের কারনে টানা ১০ বছর ক্ষমতায় জাওয়ার লোভে মক্ত তখন দেখা যাচ্ছে সেই আইউবি শাসন।

দেখা যাচ্ছে সেই সাধারন মানুষের মাথায় কঠাল ভাংার লক্ষন। শুরু করেছে অপ উন্নয়ন। গুরু ভাইকে খুসি করতে ধ্বংস করছে সুন্দরবন। আরম্ভ করে দিয়েছে শিক্ষক,ছাত্র হত্যা। এইতো ফুলবাড়িতে নির্মম ভাবে গুলি করে হত্যা করেছে দুই শিক্ষক।

পরিশেষে বলব
৫২,৬২,৬৯,৭১,ভোলেনি ছাত্র সমাজ। ভুল করবেন না এই ভেবে যে একুশ শতকের ছাত্ররা ভুলে গেছে ৯ মাসের সংগ্রামী ইতিহাস।
ধন্যবাদ
টিটপ হালদার

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 63