‘ছাত্রলীগ’ এখন সম্পূর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

পাকিস্তানে তখন রাজনৈতিক দল বলতে ছিল ‘মুসলিম-লীগ’। এটি ঠিক রাজনৈতিক দল নয়—তবে রাজনৈতিক দলের মোড়কে একটি আপাদমস্তক দালালসংগঠন। এদের সহযাত্রী হিসাবে আরও ছিল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান, নেজামে ইসলাম পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইত্যাদি। আর সব দালাল একজোট হয়ে আল্লাহ-রাসুলের গুণকীর্তন বাদ দিয়ে বিশ্বের অভিশপ্তরাষ্ট্র ‘পাকিস্তান-বন্দনা’য় ব্যস্ত ছিল। সেই সময় ‘পূর্বপাকিস্তানে’র তকমা চাপানো বাংলাদেশে বাঙালির পক্ষে শক্তিশালী কোনো রাজনেতিক দল ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টিগুলো তখনকার দিনে পাকিস্তানের বিশ্বস্ত-দালালসংগঠন ‘মুসলিম-লীগে’র সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিলো না। এসময় বাঙালির একটি নিজস্ব ও শক্তিশালীসংগঠনের প্রয়োজন অনুভূত হয়।।

সেই সময় বাঙালির প্রতিনিধিত্বকারী-সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছাত্রলীগ’। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুআরি পাকিস্তানআমলে ‘ছাত্রলীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে অতিঅল্পসময়ের মধ্যে গণমানুষের হৃদয়ের সংগঠনে পরিণত হয়। ছাত্রলীগপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর এর বছরখানেক পরেই প্রতিষ্ঠালাভ করে ‘আওয়ামীলীগ’।

১৯৪৮ সালে, আমাদের বঙ্গবন্ধু অনেক আশায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ছাত্রলীগ। কিন্তু সেই আশা-ভরসা আজ সম্পূর্ণরূপে ভূলুণ্ঠিত হতে চলেছে। এখন ‘বাংলাদেশছাত্রলীগ’ শুধুই একটি নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড মাত্র। ছাত্রলীগের সেই ঐতিহ্য আজ কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে।

ছাত্রলীগে এখন ছাত্র আছে কতজন? লোভে ও লাভের আশায় এখন অনেকে রাতারাতি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী হয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার সরকারি চাকরিলাভের আশায় পিতৃপুরুষের রাজাকারিসংগঠন ছেড়ে একদৌড়ে-একলাফে ছাত্রলীগে নাম লেখাচ্ছে। অনেকের কাছে এখন ছাত্রলীগ একটি ব্যবসায়ীসংগঠন মাত্র। আর তাই, সবাই লাভের আশায় নিজেদের বহুদিনের ঘরবাড়ি ছেড়ে সাময়িক আনন্দে ও কৃত্রিম-হাসিমুখে ছাত্রলীগে ঢুকে যাচ্ছে। আর সেই ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ এখন ঢাকা-শহরের ‘লোকাল-মিনিবাসে’র মতো। এখানে এখন যে-কেউ উঠতে পারে, ঢুকতে পারে। তাই, ছাত্রলীগের উঁচুস্তরের অনেক নেতাকে ম্যানেজ করে এখন জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররাও এখানে নির্বিবাদে ঢুকে পড়েছে।
ঢাকা-শহরের ‘মিরপুর-গুলিস্তান-রুটের মিনিবাসের হেলপার, কন্ডাক্টর ও ড্রাইভার কাউকে ভিতরে ঢুকতে একবারও নিষেধ করে না। বরং ভিতরে যাত্রী যতোই থাক না কেন, ওরা বারবার তারস্বরে চিৎকার ও চেঁচামেচি জুড়ে দেয়: আসেন! আসেন! সিট খালি! সিট খালি!

ছাত্রলীগে এখন কোনো কাণ্ডারী নাই। কে ধরবে এর হাল? বারো-জায়গার বারোরকমের টাউটগুলো আজ শুধু লোভের আগুনে পুড়ে আর লাভের হিসাব কষতে-কষতে আধাপাগল হয়ে ঢাকা-শহরের লোকাল-মিনিবাসের সাধারণ যাত্রীদের মতো ‘ছাত্রলীগে’ ঢুকে পড়ছে। এদের বেশির ভাগই এখন বঙ্গবন্ধুকে চেনে না, জানে না, আর তাঁর জীবনাদর্শ ও জীবনদর্শন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এইরকম একটি শ্রেণী দীর্ঘদিন যাবৎ ছাত্রলীগের ‘লোগো’-ব্যবহার করে শুধু নিজের আখের গোছানোর কাজে ব্যস্ত। আর সে শুধু নিজের আখের গোছাচ্ছে না—একইসঙ্গে সে তার নিজের সর্বরকমের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদেরও সোল্লাসে আখের গোছানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।

ছাত্রলীগে ঢুকলে এখন নানারকম ফায়দা লোটা যায় ভেবে একটি শ্রেণী হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে একরাতে ছাত্রলীগে ঢুকে নেতা-কর্মী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করছে না। এদের সম্মিলিত আক্রমণে ছাত্রলীগ এখন একটি সম্পূর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আজ ছাত্রলীগের নামভাঙ্গিয়ে অনেকের রমরমা-ব্যবসাবাণিজ্য গড়ে তোলা সহজ হচ্ছে। কারও-কারও বাপ-দাদা ছিল চিরস্থায়ী রাজাকার। আজ তাদেরই ছেলেমেয়ে একলাফে ছাত্রলীগে ঢুকে এলাকার ‘মাতবর’ হয়ে গেছে। আর কে পায় তাকে? সে এখন ছাত্রলীগের নেতা!

ছাত্রলীগের নামে দিন-দিন ব্যবসাবাণিজ্য জমে উঠছে। আর তাই, অনেকের মুখ থেকে দুধের গন্ধ যেতে-না-যেতেই সে এখন ঢাকা-শহরে গাড়ি-বাড়ির মালিক! হাতে দামি-দামি মোবাইল! আর চারপাশে কত চামচা! আরও কত গামছা! এইসব মাকালফল ছাত্রলীগের নামে আজকাল নিজের স্বার্থ-লোটা ছাড়া আর-কিছুই করছে না। আর এরা ছাত্রলীগে ঢুকেছে শুধু ব্যবসা করার জন্য। কারণ, আজ সরকারি-লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ ব্যবসার জন্য একেবারে নিরাপদ।

কলেজে-কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আর মেডিক্যাল কলেজগুলোতে সকল আগাছা চাকরির আশায় ঢুকে যাচ্ছে ছাত্রলীগে। এদের এখন বই পড়তে হয় না। এদের এখন লাইব্রেরি-ওয়ার্ক করতে হয় না। অতিসহজে আজকাল ‘অনার্স-মাস্টার-ডিগ্রী’ জুটে যাচ্ছে। আর এরচেয়ে বড় ডিগ্রী হলো ছাত্রলীগের একটি বড়-পদ বা মাঝারি-পদ। আর এই পদের সার্টিফিকেট একবার পেয়ে গেলে তার জীবন ধন্য হয়ে যাবে। সে জীবনেও পার্টির জন্য বা দেশের জন্য কিছু না করেও বড়কিছু হয়ে যেতে পারবে। আর তার সম্পদের পাহাড় দেখে যেকোনো হার্টের রোগী যেকোনো মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

একবার শুধু একবার ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ছাত্রলীগের নেতা হতে পারলে তার জন্য টেন্ডারবাজি করা, টেন্ডারের জন্য নিজসংগঠনের নেতা-কর্মী হত্যা করা, যেকোনো কাজে কমিশন খাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে চিরদিন ফাও খাওয়া একেবারে জায়েজ হয়ে যাবে।

কিছুসংখ্যক ‘নেতা-কর্মী’-নামধারী অতিলোভী লোকের কারণে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ আজ শুধুই একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আজ এখানে যে-কেউ ঢুকে তার ইচ্ছেমতো ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু সংগঠন আর দেশ কী পাচ্ছে? এর জবাব সুধীবৃন্দ ভেবেচিন্তে দিবেন। অথচ, এই ছাত্রলীগ তার ঐতিহ্য-অনুযায়ী দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়ালে বাংলাদেশে আজ ‘জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদে’র এতো উত্থান ঘটতো না।
জয়-বাংলা।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০১/১২/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =