সুযোগ-সুবিধা পেলে হিজড়ারাও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে


পুরুষও নয় আবার নারীও নয়, এধরনের এক শ্রেণীর মানুষদের আমরা প্রায়ই রাস্তাঘাটে কিংবা দোকানপাটে বিভিন্ন রকম অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে টাকা তুলতে দেখি। আমরা যারা সভ্যসমাজের মানুষ, তারা সমাজের এই অবহেলিত শ্রেণীটিকে ‘হিজড়া’ বলে আখ্যায়িত করে থাকি। মহান আল্লাহ্‌ তায়ালার ইচ্ছাতেই এরা সমাজের অন্যান্য আট-দশজন স্বাভাবিক মানুষের পরিবর্তে হিজড়ায় রূপান্তরিত হয়। ঠিক যেমনটি ঘটে থাকে একজন প্রতিবন্ধীর ক্ষেত্রে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, প্রতিবন্ধীদের জন্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে এবং তাদেরকে সমাজের মূলস্রোতের অন্তর্ভূক্ত করতে নানারকম সরকারী-বেসরকারী আন্দোলন ও পদক্ষেপ আমাদের দৃষ্টিগোচর হলেও হিজড়াদের কল্যাণে এরকম কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না আমাদের দেশে।

সভ্যসমাজ থেকে একপ্রকার নির্বাসিত এই অবহেলিত শ্রেণীটি তাই ছোটবেলা থেকেই বিকৃত ও হতাশাগ্রস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে উঠে। বাঁচার তাগিদে জড়িয়ে পড়ে নানারকম সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। অথচ ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এসব হিজড়া শ্রেণীর মানুষগুলোর সামাজিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারলে তারাও আমাদের সমাজ ও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

একজন মানুষ কেন হিজড়া হয়ে জন্মায় এর বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যাটা একটু জেনে নেয়া যাক। আমরা জানি যে, এক্স এক্স (XX) প্যাটার্ন ডিম্বানুর সমন্বয়ে কন্যা শিশু আর এক্স ওয়াই (XY) প্যাটার্ন থেকে সৃষ্ট হয় ছেলে শিশু। ভ্রুনের পূর্ণতার স্তরগুলোতে ক্রোমোজোম প্যাটার্নের প্রভাবে ছেলে শিশুর মধ্যে অণ্ডকোষ আর কন্যা শিশুর মধ্য ডিম্বকোষ জন্ম নেয়। অণ্ডকোষ থেকে নিসৃত হয় পুরুষ হরমোন এন্ড্রোজেন এবং ডিম্ব কোষ থেকে নিসৃত হয় এস্ট্রোজেন। ভ্রুনের বিকাশকালে নিষিক্তকরণ ও বিভাজনের ফলে বেশকিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হয় যেমন ‘এক্স এক্স ওয়াই’ (XXY) অথবা ‘এক্স ওয়াই ওয়াই’ (XYY)। আর এর ফলেই বিভিন্ন গঠনের মানব শিশুর জন্ম হয় যাদেরকে আমরা হিজড়া বলে থাকি।

হিজড়াদের শারীরিক গঠন কেমন তা নিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা রকমের জল্পনা-কল্পনা। মূলত, হিজড়ারা অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মতোই একটি শারীরিক গঠনজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। অন্য প্রতিবন্ধীদের সাথে তাদের পার্থক্য কেবল প্রতিবন্ধকতার স্থানটিতে।
শারীরিক গঠনের দিক থেকে হিজড়ারা মূলত তিন প্রকার:-

১. নারীদের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও নারী জননাঙ্গ থাকে না।
২. পুরুষের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও পুরুষ জননাঙ্গ থাকে না।
৩. উভয় বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান থাকে।

অধিকাংশ হিজড়ারাই নিজেদেরকে নারী হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। আবার বৈশিষ্ট্যগতভাবে হিজড়ারা দু’ধরনের: নারী অথবা পুরুষ। নারী হিজড়ার মধ্যে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকলেও স্ত্রীজননাঙ্গ না থাকায় তার শারীরিক গঠন অস্বাভাবিক। পুরুষ হিজড়াদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তবে নারী বা পুরুষ যাই হোক, অধিকাংশ হিজড়ারাই নিজেদেরকে নারী হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে বলে জানা যায়।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীজুড়েই হিজড়ারা ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের দেশেও হিজড়াদের সংখ্যা কম নয়। একটি বেসরকারী পরিসংখ্যান মতে, দেশে এখন লক্ষাধিক হিজড়া রয়েছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ এই হিজড়াদের সামাজিক মর্যাদার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। আমাদের দেশে হিজড়ারা একজন মানুষ হিসেবে মর্যাদাতো দূরের কথা, কুকুর-বিড়ালের অধিকারও পায় না। হিজড়া হয়ে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট পরিবারটি ওই শিশুটিকে আর তাদের সঙ্গে রাখতে চায় না। নানা লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়ে শিশুটি অবশেষে পূর্ণবয়স্ক হতে না হতেই যোগ দেয় ছিন্নমূল হিজড়াদের দলে। এরপরই তার জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যাতনা। আমাদের সমাজে এটাই হিজড়াদের স্বাভাবিক পরিণতি।

আমাদের বাঙালি সমাজ তাদেরকে কর্মসংস্থানের সুযোগ কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত নয় বলে হিজড়াদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে যায় মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে ভিক্ষা করা। এভাবে অন্যের অনুকম্পার ওপর বেঁচে থাকার এক অভিশপ্ত সংগ্রামে যুক্ত হয়ে পড়ে এরা। স্বাভাবিক শ্রমজীবীদের মতো উপার্জনের কাজে এদেরকে জড়িত হতে দেখা যায় না। নিজস্ব পদ্ধতিতে হাটে বাজারে তোলা উঠানোর পাশাপাশি বিনামূল্যে ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করেই এরা জীবিকা নির্বাহ করে। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অঙ্গভঙ্গি করে মনোরঞ্জনকারী হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে তারা নাচগানে অংশ নিয়ে থাকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বিকৃত যৌনপেশাসহ নানারকম অপরাধের সাথেও জড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সমাজের এই শ্রেণীটিকে আমরা আর কতদিন অবজ্ঞা-অবহেলায় ফেলে রাখব? আমাদের দেশে অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সামাজিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নানারকম উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তার যৎসামান্যও নেয়া হয়নি এই হিজড়াদের ক্ষেত্রে। অথচ মানুষ হিসেবে হিজড়ারাও মানবাধিকারের যোগ্য। জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষনার আওতায় প্রত্যেক মানুষই কিছু মৌলিক অধিকারের দাবিদার। যেমন- দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার, ভোটাধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, কাজের অধিকার, মানসম্মত জীবন-যাপনের অধিকার, আইনের আশ্রয় ও নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার এবং বিবাহ ও পরিবার গঠনের অধিকার। এসব অধিকার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধের জন্যে রয়েছে অনেক আন্তর্জাতিক সনদ ও চুক্তি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, হিজড়াদের জীবনে এসব অধিকারের যৎসামান্য প্রভাবও কখনো আমাদের দেশে পড়তে দেখা যায় না। একারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে, মানবাধিকার বঞ্চিত এই হিজড়ারা কি তাহলে ‘মানুষ’ নয়? সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার কি তাদের নেই?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে স্বীকৃত মানুষ হিসেবে বসবাস করার অধিকার পেলে হিজড়ারাও স্বাভাবিক মানুষের মতো সামাজিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। হিজড়াদের রয়েছে মেধা, পরিশ্রমের ক্ষমতা, যার সদ্ব্যবহার করে তারাও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই শ্রেণীটিকে সমাজের মূলস্রোতের অন্তর্ভূক্ত করা খুব সহজ কাজ নয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তার সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে হিজড়াদের কল্যাণে কাজ করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে সরকারের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হল-

১) পরিণত বয়সে পৌঁছার আগেই চিকিৎসার মাধ্যমে হিজড়া শিশুকে স্বাভাবিক কোনো সেক্সে পরিণত করা সম্ভব। এমনকি পরিণত বয়সে পৌঁছার পরও হিজড়া থেকে স্বাভাবিক মানুষে পরিণত হবার রেকর্ড রয়েছে। ভারতের ‘অমলা’ নামের একজন নারী এভাবে চিকিৎসার মাধ্যমে পরিণত বয়সে হিজড়া থেকে পূর্ণ নারিত্ব অর্জন করেছিলেন। সুতরাং, হিজড়া শিশুদের জন্মের পরপরই সরকারি উদ্যোগে তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।

২) বিভিন্ন সামাজিক অধিকার যেমন পরিবারে সম্মানের সঙ্গে বসবাসের অধিকার, চাকুরির অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার ইত্যাদি মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় হিজড়ারা। অথচ এসব অধিকার রক্ষা ও বলবৎ করার দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রের। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযাযী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আওতাধীন কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু হিজড়াদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি এখন পর্যন্ত। অতিসত্বর হিজড়াদের জন্যে এই অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করা দরকার।

৩) ভোটার তালিকায় হিজড়াদের অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। ভারতে শবনম মৌসি নামের একজন হিজড়া লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সুতরাং, সুযোগ পেলে তারা যে সমাজে অবদান রাখতে পারবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় হিজড়াদেরকে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে তাদের লিঙ্গ নির্ধারণে সমস্যার তৈরি হয়েছে। হিজড়ারা যেহেতু নারীও নয় পুরুষও নয়, একারণেই তাদের লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণে এ জটিলতা। এই সমস্যার সমাধানকল্পে তাদেরকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে।

১১ নভেম্বর, ২০১৩ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানলাম যে, বাংলাদেশ প্রথমবারের মত আওয়ামী লীগ সরকার সংখ্যালঘু হিজড়া শ্রেণীর মানুষদের এতদিনকার ঝুলে থাকা দাবিটি পূরণ করেছে অবশেষে। হিজড়াদের লিঙ্গ-পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়, যদিও এটা করা উচিত ছিল অনেক আগেই।

৪) উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয় হিজড়াদের। অথচ এটি তাদের প্রাপ্য। অন্যান্য ধর্মের পারিবারিক আইনে হিজড়াদের সম্পর্কে কোনো কথা না থাকলেও ইসলামি আইনে তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে হিজড়াদের অংশ স্বীকার করেছে ইসলাম। যেসব হিজড়ার মাঝে পুরুষালি স্বভাবের প্রাধান্য থাকে তাদেরকে পুরুষ আর যাদের মাঝে নারী স্বভাবের প্রাধান্য তাদেরকে নারী হিসেবে বিবেচনা করে সম্পত্তি বণ্টনের বিধান দিয়েছে ইসলাম। আর যেসব হিজড়ার মাঝে নারী-পুরুষ উভয় বৈশিষ্ট্যই সমভাবে বিদ্যমান, তাদেরকে নারী হিসেবে সম্পত্তি প্রদানের বিধান দিয়েছে ইসলাম। হিজড়াদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি প্রদানের ব্যাপারে সরকার এই নীতি অনুসরণ করে আইন প্রণয়ন করতে পারে।

৫) যে অধিকারটির ব্যাপারে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিতে পারে সেটি হলো হিজড়াদের বিবাহের অধিকার। হিজড়াদের বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা নেই বলে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের সাথে তাদের বিবাহ স্বীকৃত নয়। আমাদের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৭ নং ধারার আওতায় হিজড়াদের যৌনতাকে ‘সডোমি’ অর্থাৎ অস্বাভাবিক ও অনৈতিক হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়েছে এবং এটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল, অন্যান্য স্বাভাবিক মানুষের মতোই এদেরও রয়েছে যৌন চাহিদা। তাদের এই চাহিদার স্বীকৃতি না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্নরকম বিকৃতি যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে হিজড়ারা।

অন্যদিকে, এই সমস্যার সমাধানে ভারতের দিল্লি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গত ০২ জুলাই ২০০৯ সমকামিতাকে বৈধ ঘোষণা করে এক রায় ঘোষণা করেছে। ফলে হিজড়াদের নিজেদের মাঝে যৌন সম্পর্কের বৈধতা এসেছে এই রায়ের আওতায়। আমাদের দেশের অনেক মানবাধিকারকর্মী এই রায়কে বাংলাদেশের হিজড়াদের জন্যে একটা উল্লেখযোগ্য নমুনা হিসেবে পেশ করছেন। কিন্তু, মূল্যবাধসম্পন্ন এই দেশে ঢালাওভাবে সমকামিতাকে বৈধ করা ঠিক হবে না।

কিন্তু হিজড়াদের যৌনতার স্বীকৃতি কিভাবে আসবে? এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে এই যে, হিজড়াদের নিজেদের মাঝে বিবাহের স্বীকৃতি প্রদান করা। গঠনগত দিক থেকে যেহেতু কিছু হিজড়ার মাঝে পুরুষালি স্বভাব আর কারো মাঝে নারী স্বভাব বেশি বিদ্যমান, সুতরাং এই দুইধরনের হিজড়াদের মাঝে বিবাহের বৈধতা দেয়া যেতে পারে।

হিজড়াদেরকে সমাজের মূলস্রোতের অন্তর্ভূক্ত করবার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে আমাদের দেশে। সাম্প্রতিক সময়ে হিজড়াদের জীবন নিয়ে বেশ কিছু ডকুমেন্টারি এবং ফিল্ম নির্মিত হয়েছে। মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেটি করতে হলে হিজড়াদের যাবতীয় অধিকারের সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারিত করে রাখতে হবে সরকারের। হিজড়াদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য রুমী বলেন, সহানুভূতি নয়, চাই নিজের অধিকার। সমাজের আলাদা কোন অংশ না হয়ে সমাজের অংশ হয়েই বাঁচতে চাই। হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য ও নেত্রী অনন্যা বণিক বলেন, আমাদের প্রতি বৈষম্য সকল স্তরে। যেটা নিজের পরিবার থেকে শুরু হয়। কিন্তু আমাদের নিজেরও মেধা বা যোগ্যতা রয়েছে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমরা এ মেধা বা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে চাই।

হিজড়া সম্প্রদায়ের অপর সদস্য রিমা বলেন, সমাজের অন্যান্য মানুষের যেমন ৫টি মৌলিক অধিকার রয়েছে তেমনি আমরাও চাই ৫টি অধিকার নিশ্চিত করা হোক।

রাজনীতি বিভাগের প্রফেসর নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, সমাজের বুনন চিত্র আলাদা আলাদা। মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এ সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি।

হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে– “এর ফলে সরকারি নথিপত্র ও পাসপোর্টে তাদের লিঙ্গ-পরিচয় ‘হিজড়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হবে।“
আরও বলা হয়েছে, “এই সিদ্ধান্তের ফলে তথ্যসংগ্রহের সময় ব্যক্তির লিঙ্গ-পরিচয় হিসেবে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি ‘হিজড়া’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ থাকবে। পাসপোর্টেও তাদের লিঙ্গ-পরিচয় হবে ‘হিজড়া’। নথিপত্রে ইংরেজিতেও ‘হিজড়া’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন।’’

এই ব্যাপারগুলো বছরের পর বছর ধরে চলে আসছিল। রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা এই জটিলতাগুলোর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু সেগুলো নিরসনের কোনো বন্দোবস্ত করেননি। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছিল, এই জটিলতার কারণ হচ্ছে আমাদের জেন্ডার -অসচেতনতা এবং পাশাপাশি, ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ ছাড়া আর কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য না হওয়া বা ‘স্বাভাবিক’ মনে না করার প্রবণতা।

পশ্চিমা বিশ্বের বহু জায়গায় ইতোমধ্যেই কেবল নারী ও পুরুষ– এই দ্বি-লিঙ্গভিত্তিক সমাজ ঘুচিয়ে দিয়ে বহুলিঙ্গভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে। শেরিল চেজ, এরিক শেনিগার, জিম সিনক্লায়ারের মতো ইন্টার-সেক্স সেলিব্রিটিরা সেখানে নিজ পরিচয়ই বাস করেন। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন চাকুরীতে তাদের জন্য আলাদা কৌটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের মেধা ও দক্ষতার পরিচয়ও রাখছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শবনম মৌসি নামের এক হিজড়া মানুষ নিজের মেধা ও যোগ্যতার বলে নির্বাচিত সংসদ প্রতিনিধি হতে পেরেছেন।

বাংলাদেশেই বা হিজড়ারা তৃতীয় লিঙ্গ বলে বিবেচিত হবেন না কেন, যুগের দাবির প্রেক্ষাপটে এ অতি স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল। বাংলাদেশ সরকার সে প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। ধন্যবাদ এবং সাধুবাদ অবশ্যই সরকারের প্রাপ্য।

পরিশেষে, হিজড়াদের শুরু থেকেই তাদের স্কুলগামী করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য নিঃশর্ত কোটার ব্যবস্থা করা এবং চাকুরির ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হিজরারাও তাদের মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। তারাও হয়ে উঠতে পারে সমাজ ও দেশের সম্পদ, বোঝা নয়।

গবেষণা এবং সম্পাদনায়ঃ খোরশেদ আলম, লেখক, ব্লগার ও গবেষক
ই-মেইলঃ [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “সুযোগ-সুবিধা পেলে হিজড়ারাও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে

    1. ঠিক বলেছেন। ধন্যবাদ। তারা
      ঠিক বলেছেন। ধন্যবাদ। তারা আমাদেরই কেউ। আমাদের সমাজেরই অংশ। সুযোগ-সুবিধা পেলে তারা সমাজের বোঝা নয়, দেশের সম্পদ হবে।

    1. তাদের অধিকার সম্পর্কে সমাজকে
      তাদের অধিকার সম্পর্কে সমাজকে সচেতন হতে হবে। তারা আমাদেরই কেউ না কেউ। আমাদের মতোই মানুষ। ভিনগ্রহ থেকে উঠে আসা কোন প্রাণী নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 + = 28