অপরাজনীতিবিদগন এবং সাধের স্বাধীন বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক হাওয়া বইছে! সকালের প্রথম খবর আমি এটাই পড়ি। সুশীল সমাজের অনেক বিশ্লেষক সমালোচক আলোচক এমন মন্তব্য করেছেন, রাজনীতিতে হয়তো স্থিতিশীল অবস্থা ফিরে আসছে। দেশ ও জনগণের কথা চিন্তা করে উভয় দল আজ আলাপ আলোচনার পথ বেছে নিচ্ছে। আর কত অস্থিতিশীলতা দেখবো! আর কত নিসংশতা দেখবো! এবার পথ খুলবে, স্বস্তি আসবে!

বিভিন্ন সুশীল সমাজের বক্তব্য, মন্তব্য শুনলাম, জানলাম, দেখলাম। কিন্তু মানতে পারলাম না। মনে এক ভয়াবহ চরম আশংকা থেকেই গেলো। ইতিবাচক হাওয়া ??? বাংলাদেশে??? এতো তাড়াতাড়ি??? এতো সহজে??? এতটাই আপোষকামি বিরোধীদল??? এতটাই উদার সরকার??? অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সংলাপ কি হবে???

ইতিবাচক হবে কিনা সেটা ৩ তারিখেই প্রধানমন্ত্রীর সংলাপে বসার আহ্বান জানানোর পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদের বক্তব্যেই অনেকাংশে প্রকাশ পেয়েছিল। “ সংলাপে বসতে সরকারের আহ্বান রাজনৈতিক অপকৌশল ও জনগণকে বিভ্রান্তির চেষ্টা”
এবং ৪ তারিখ বিএনপির ১৮ দলীয় সমাবেশে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে একথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন , বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা এক অলৌকিক অবাস্তব ধারণা মাত্র। সংলাপ , আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কোন সঠিক রূপরেখায় পৌঁছানো আদৌ সম্ভব নয়।

একপক্ষ আহ্বান জানাচ্ছে আলোচনায় বসার(হোক অপকৌশল বা সুকৌশল), অন্য পক্ষ অনড় তাদের দাবী দাওয়া নিয়ে। এক পক্ষ চাচ্ছে নির্দলীয় সরকার, অন্যপক্ষ চাচ্ছে সর্বদলীয় সরকার। দু পক্ষই তাদের অবস্থানে স্থির হয়ে আছে । কিন্তু সরকার যখন আহ্বান জানিয়েছে আলোচনায় বসার সেখানে বিএনপি যদি অন্তত লোক দেখানোর জন্য হলেও আলোচনায় বসতো তবে বিএনপিকে সমালোচনা করা অনেকাংশে কমে যেতো। এই জন্য যে তারা সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে, সংসদে বা অন্য কোন জায়গায় বৈঠকের মাধ্যমে আলাপ আলোচনা করেছে, নিজেদের দাবী পেশ করেছে। এবং সংলাপ শেষে জানিয়ে দিতো যা খালেদা জিয়া ৪ তারিখের ভাষণে বলেছে। একটি গণতান্ত্রিক পন্থায় অন্তত দুপক্ষই আলোচনায় যেতে পারতো। পরিণামে দু’দলই পরবর্তীতে অনড় থাকতো নিজেদের দাবীতে।
কিন্তু এখন খালেদা জিয়া নিজেই সমালোচনার পথ বৃহৎ আকারে উন্মোচন করে দিয়েছে কোন আলাপ আলোচনা, সংলাপের ধারে কাছে না গিয়েই আল্টিমেটাম দিয়ে। এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে এই ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামে সরকার নির্দলীয় সরকারের দাবী মেনে নিবে না, এবং ফলাফল হরতাল, সহিংসতা , তাণ্ডব, হত্যা, খুন, যুদ্ধাপরাধ বিচারে বিলম্ব।

এই ৪৮ ঘণ্টার আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ। যে হেফাজতের মধ্যে আমারা স্পষ্টতই দেখতে পাই এক ভয়ংকর সহিংস রাজনীতির উত্থান। হেফাজতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে অনেকেই সাহস দিচ্ছেন, কিন্তু আমি ভয় পাই। এদের ক্ষমতা আর টাকার দৌড় দেখে আমি আতংকিত। প্রিয়জনের উপর আক্রমণের ভয়ে আমি সদা তটস্থ।
হয়তো ভয় পেতাম না যদি সরকারকে আপোষ করতে না দেখতাম। অত্যন্ত সুনিপুণ কৌশল অবলম্বন করে সরকার হেফাজতের সাথে আপোষ করেছে, করে যাচ্ছে। যে আপোষের পরিণামে ৪ ব্লগার আজ জেলে অসহনীয় জীবন যাপন করছে। সরকার হেফাজত এবং গণজাগরণ দুপক্ষকেই সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য, এক দিকে ব্লগারদের জেলে পাঠাচ্ছে, অন্য দিকে সরকারের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলে যাচ্ছেন হেফাজতের দাবী মেনে নেওয়ার মতো না।

ওদিকে হেফাজতরা বলে যাচ্ছে তারা কোন রাজনৈতিক দল না, কোন রাজনীতির সাথে তারা জড়িতও নয়। যদি রাজনীতির সাথে জড়িত না হয়ে থাকে তবে এই বক্তব্যের মানে কি দাঁড়ায় যে ৫ তারিখের পর দেশ তারাই চালাবে। যখনই দেশ চালানোর প্রশ্ন আসে তখনই রাজনীতির ব্যাপার চলে আসে। রাজনীতি ছাড়া দেশ পরিচালনা সম্ভব না। নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধেই যদি এদের আন্দোলন হয়ে থাকে তবে এখানে দেশ পরিচালনার কথা কেন আসছে। দেশ কি এখন কোন নাস্তিক সরকার পরিচালনা করছে? নাকি বাংলাদেশের সংবিধানে কোথাও নাস্তিক্যবাদ প্রাধান্য পেয়েছে? তাদের প্রত্যেকটি দাবী স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। দেশের সংবিধানের মূল ভীতটাই তারা পালটে দিতে আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, নারী স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতার চেতনা সবই তারা সমূলে উৎপাটন করে ফেলে দিতে চাচ্ছে। আর এমনই একটি দলের দাবী নিয়ে সরকার আক্রান্ত। অনেকটা ভয়ে জর্জরিত। যে দল স্বাধীনতার চেতনার পক্ষে বলে এতদিন জেনে এসেছি সেই আওয়ামীলীগ সরকার আজ এদের হুংকারে নড়েচড়ে বসছে। এদের জন্যই চারজন নিরাপরাধ ব্লগারকে জেলে আসামির মতো বেঁধে রাখছে । ফেসবুক ব্লগে নজরদারি করছে। অথচ যে জামাত শিবিরের বাশেরকেল্লা পেইজ থেকে বিভিন্ন ভুয়া মিথ্যা বানোয়াট উস্কানিমূলক তথ্য প্রচার করে বিভিন্ন সহিংস কার্যকলাপ চালাচ্ছে সেই পেইজের মোডারেটরা ৪ তারিখের ১৮ দলীয় সমাবেশে দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে স্লোগান দিতে পারছে।

অন্যদিকে বিএনপি হেফাজতকে সমর্থন দিচ্ছে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু দেখি না। যেখানে বিএনপি জামাত শিবির তথা যুদ্ধাপরাধীর দল নিয়ে জোট বানাতে পারে, সরাসরি বলতে পারে সাইদি, নিজামি মুজাহিদ গোলাম আজম এরা কেউ যুদ্ধাপরাধী নয় সেখানে হেফাজতকে সমর্থন দিবে এটাই স্বাভাবিক।
এ সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার যে হেফাজত হচ্ছে জামাত শিবিরের আরেকটি ছদ্ম পোশাক। যে পোশাকের ভেতরে জামাত শিবির তাদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। হেফাজতের প্রত্যেকটি দাবির সাথে জামাত শিবির এক মত। হেফাজতের অন্নদাতা, ত্রাণ দাতা, অর্থ দাতা, শক্তি দাতা সবই জামাত শিবিরের শীর্ষস্থানীয় মহল থেকেই আসে। বাংলাদেশের অস্তিত্ব জামাত শিবির কখনই স্বীকার করে নি। আমার স্বাধীন দেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তালেবান বানানোর জন্য এরা সদা প্রস্তুত।

যখন গণজাগরণ মঞ্চ হল, দেশ ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবীতে, তখন জামাত শিবির তাদের মনোবাসনা পূরণ করার জন্য উত্থাপন করলো হেফাজতে জামাত ইসলাম। যার পরিণাম কি ভয়াবহ তার কিছু আংশিক রূপ আমরা ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছি। বাক স্বাধীনতা আজ হুমকির মুখে, স্বাধীনতার লাল সবুজের চেতনা আজ শেয়াল কুকুর ছিঁড়ে খাচ্ছে, গণতন্ত্র আজ প্রায় কবরে পৌঁছে গেছে।
লিখতে আমার হাত কাঁপছে যে হেফাজত আর জামাত শিবিরের যে আসল উদ্দেশ্য , যুদ্ধাপরাধীর বিচার নতসাৎ করা তাতে তারা অনেকাংশেই এগিয়ে গেছে। আমাদের দাবী, স্বাধীনতার চেতনার পক্ষের মানুষের দাবী যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি। শুধু ফাঁসির রায় নয়, ফাঁসি কার্যকরও হতে হবে। তবেই হবে ন্যায় বিচার। কিন্তু এই হেফাজত জামাত শিবিরের হুমকি, তাণ্ডব , বিএনপির নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন সবই আজ প্রভাবিত করছে যুদ্ধাপরাধীর বিচারকে। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে যদি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয় তবে সেটা আওয়ামীলীগ সরকার আমলেই হতে হবে। নতুবা কখনই সম্ভব না। এ সত্যের পিছনে আছে আরেকটি সত্য তা হল এই সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। মেয়াদ শেষ হলে সরকার পদত্যাগ করবে কি করবে না তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মেয়াদ যত দিন আছে তাতে যদি প্রত্যেকটি যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় হয়ও বা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ এক কালসাপ হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপিল নিষ্পত্তি হতে সময় লাগবে মাসা-ধিক। প্রত্যেকটি রায়, এবং রায়ের আপিল নিষ্পত্তি হতে যে দীর্ঘ সময়ের অপচয় তার মধ্যেই এই সরকারের আয়ু নিভে যাবে। আয়ুষ্কালের পর কি হবে সে অজানা, অনিশ্চিত। তবে এই সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে আদৌ আমারা সুবিচার পাবো কিনা।

সাধের বাংলাদেশ আজ চরম হুমকির মুখে। অপরাজনীতিবিদদের হিংসা বৈরিতা ক্ষমতার লিপ্সা সর্বোপরি অপরাজনীতি আমাদের স্বাধীন দেশের সার্বভৌমিকতাকে আজ গলা টিপে ধরছে। ধর্ষণ করছে আমার স্বাধীন দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে।

এমন ভয়াবহ মর্মান্তিক বাংলাদেশ আমারা চাই নি। এমন অসুস্থ রাজনীতির বলী হোক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, আমরা চাই নি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “অপরাজনীতিবিদগন এবং সাধের স্বাধীন বাংলাদেশ

  1. এমন ভয়াবহ মর্মান্তিক বাংলাদেশ

    এমন ভয়াবহ মর্মান্তিক বাংলাদেশ আমারা চাই নি। এমন অসুস্থ রাজনীতির বলী হোক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, আমরা চাই নি।সত্যিই আমরা চাই নি । তবুও স্বপ্ন , আশা বেচে আছে । থাকবে ।

  2. রাজনীতিরর এ করুন অবস্থা দেখে
    রাজনীতিরর এ করুন অবস্থা দেখে রাজনীতিবিদদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে জনগণ ।কিন্তু হতাশা, দারিদ্র সংকীর্ণ সংস্কৃতি মনন, বিশ্বাস এর অজ্ঞতার কারনে বিভিন্য কালারফুল রং থেকে সঠিক আলো খুজে পাচ্ছেনা।

  3. প্রতিটি দেশের রাজনীতিই
    প্রতিটি দেশের রাজনীতিই ক্ষমতার লোভকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এটাই স্বাভাবিক। আর ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম হচ্ছে জনগণ, সেই ক্ষমতাকে ভোগ করার প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে দেশ। এইজন্য বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদরা এই দুটি ধ্বংস করে রাজনীতি করে না কখনও। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা এটা বোঝেন বলে মনে হয় না। ক্ষমতার মোহে এতোটাই অন্ধ যে, দেশ আর জনগণকে ধ্বংস করতেও এরা দ্বিধা করছে না। এর চরম মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকেই। আগামী কয়েকটা মাসই নির্ধারন করে দেবে এই জাতির ভবিষ্যৎ।

  4. ক্ষমতার জন্য অসুস্থ কামনাই আজ
    ক্ষমতার জন্য অসুস্থ কামনাই আজ বাংলাদেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অসহায় হয়ে আমরা শুধু আজ হাহাকারই করছি। প্রতিবাদের মুখে আজ প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
    দেশকে ভালোবাসি বলে আজো মনে আশা জাগিয়ে রেখেছি, পূর্ণ স্বাধীনতা আসবেই। কিন্তু সময় বড্ড অল্প। এই সময়ই নির্ধারণ করবে স্বাধীনতা স্থায়ী হবে নাকি আবার পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ হবো।

  5. জামাত-শিবির আর হেফাজতকে মাথায়
    জামাত-শিবির আর হেফাজতকে মাথায় ‍তুলেছে বর্তমান সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ ! এর ফলাফল আওয়ামী লীগকেই বহন করতে হবে ! পাবলিক শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে ! চুন খেয়েছে আওয়ামী লীগ জিহবা পুড়বে আওয়ামী লীগ এরই…..

    1. শুধু আওয়ামীলীগই পুড়বে না,
      শুধু আওয়ামীলীগই পুড়বে না, সাথে আমরা সাধারণ জনগণও পুড়বো। এবং তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে।

  6. তবুও স্বপ্ন দেখি। এখনও টিকে
    তবুও স্বপ্ন দেখি। এখনও টিকে আছি,স্বপ্ন দেখতে পারি বলেই। স্বপ্ন দেখি সুদিনের; স্বপ্নের বাংলাদেশের…

    1. মানুষ বলেই এখনও স্বপ্ন দেখতে
      মানুষ বলেই এখনও স্বপ্ন দেখতে পারি, যেদিন স্বপ্ন দেখব না, সেদিন আর মানুষই থাকব না……।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 − = 35