ভাষার ক্ষমতা ও ক্ষমতার বৈধতা

শোষণ বঞ্চনা বৈষম্য ও সহিংসতা (যুদ্ধ) আছে কারণ আধিপত্যকারী শ্রেণী আছে। এদের ক্ষমতা আছে অব্যাহতভাবে এই সহিংস আধিপত্যব্যাবস্থা চালু রাখার।

এই ব্যাবস্থা চালু রাখার অন্যতম হাতিয়ার রাষ্ট্র,বা রাষ্ট্রযন্ত্র। সমাজকে নিয়ন্ত্রণের জন্য, তিন ধরনের ক্ষমতা দরকার; সামরিক বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতা যা রাষ্ট্র করে, টাকার বা পুঁজি ও ব্যাঙ্ক বীমা প্রতিষ্ঠানের তথা বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, এবং জ্ঞানের মানে স্কুলের ও মিডিয়ার কনটেন্ট বা বিষয়বস্ত নির্ধারনের ক্ষমতা।

টাকা দিয়ে কিনে বা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে কোন ব্যাবস্থা চালু রাখা কঠিন। কোন ব্যাবস্থা চালু থাকার পক্ষে বৈধতার ও অনেকের সম্মতির দরকার হয়। ব্যবস্থা কোন ষড়যন্ত্র করে টিকে থাকেনা, টিকে থাকে প্রকাশ্য বা ছদ্মবেশি সমর্থন লাভ করে। শ্রেণী সমাজে স্কুল ও মিডিয়ার কাজ ব্যাবস্থার চরিত্র আড়াল করা, অস্বীকার করা এর বৈশিষ্ট্য, বিকল্পকে নিন্দা করা, এবং সন্মতি আদায় করে আধিপত্যকে বৈধ করা।

শ্রেণী ও পিতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থা বজায় রাখা ও তা পুনরুৎপাদনের জন্য, জ্ঞানের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখে। বৈধতা ও সন্মতি আদায়ের জন্য জ্ঞান এক মারণাস্ত্র, আক্ষরিক অর্থেই “বাক্যবাণ”।

যুদ্ধসহিংসতা আড়াল করার একটি কৌশল অপরের প্রতি নিন্দার ভাষারীতি, যাকে বলা হয় ‘এনিমি ডিসকোর্স’। এটা ‘আমরা ও তোমরা’ এই সরলিকরণ করে, একাধারে আমরা মহৎ ও তোমরা মানবেতর এরকম ধারনা প্রচার করে, যুদ্ধের বা জ্বিহাদের বৈধতা ও সন্মতি আদায় করে। এটিই প্রোপাগান্ডা, মিডিয়া ব্যাবহার করে। আর একাডেমিয়া (স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়) ব্যবস্থার পক্ষে, এই প্রোপাগান্ডার তত্ত্বগত ভিত্তি দেয়ার জন্য ইন্সট্রুমেন্টাল নলেজ বা কৌশলগতজ্ঞান বিতরণ ও বিক্রয় করে।

ক্রিটিকাল ডিসকোর্স এনালিসিস (CDA) নামে জ্ঞানের একটি শাখা ‘ওয়ার অন টেরর’ নিয়ে এরকম এনিমি ডিসকোর্স বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে তাঁরা দেখেছেন কানাডীয় প্রধান মিডিয়া সাদ্দাম হোসেনকে ইঁদুর নামে অভিহিত করেছে। এটি অমানবিকায়ন বা মানবেতর অবস্থানে নামিয়ে আনার উদহারন।

পিতৃতন্ত্র নারীদের ক্ষেত্রে এই এনিমি ডিসকোর্স ব্যাবহার করে, অমানবিকায়ন ও বস্তুকরন (Objectification) এর মাধ্যমে। মাল, মালে গনিমত, তেঁতুল, ইত্যাদি আমাদের জানা।

একইভাবে শ্রেণীবাদ (দাস, সামন্ত, পুঁজিবাদ) ও বর্নবাদ সবসময় সমাজতন্ত্রের ও সাম্যবাদের বিরুদ্ধে এই একই জ্ঞানের কৌশল ব্যবহার করে, এনিমি ডিসকোর্স ব্যাবহার করে।

রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র বহাল হয়েছিল কারণ ঐ একই, অনেক মানুষের সন্মতি ও বৈধতা লাভ করে ছিল। চীন, রাশিয়া বা কিউবায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই সন্মতি ও বৈধতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় রাশিয়া আবার পুঁজিবাদে ফিরে গেছে। কিভাবে এই বৈধতার সন্মতি শূন্যে নেমে এল? বাইরের প্রোপাগান্ডা ও নিজেদের ক্রিটিকাল জ্ঞানের ক্ষমতার যোগফল কারণেই।

পশ্চিমা লিবারেলরা বলেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুদার, চীনপন্থী বামেরা বলেছে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’, পরিশেষে ভেতরের কমিউনিস্টরাও বলেছে ‘বদলাতে হবে’, ব্যাস সন্মতি শূন্যের কোঠায়। ঠিক বিপরীত চীনে ঘটেছে। সাম্র্যজাবাদি প্রোপাগান্ডা ছিল, কিছু তরুণ ছাত্রও ছিল, কিন্তু চীনে পুঁজিবাদী গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারনা আছে, চীন সোভিয়েতের পথে যায়নি।

বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার পুঁজিবাদে ও রাষ্ট্রীয় সমাজতান্ত্রিক দেশে কতটা আছে, কিভাবে আছে, কার আছে, এর মাত্রা কি? এই সব প্রশ্ন, প্রোপাগান্ডা নয়, সমাজবৈজ্ঞানিক। কিউবাতে বা চীনে এগুলো নেই আর আমেরিকায় আছে, এই ধরনের ভাবনা স্রেফ পুঁজিবাদী প্রোপাগান্ডা, মানে এনিমি ডিসকোর্স এর দখলে নিজেদের ভাবনাকে রেখে দেয়া।

প্রোপাগান্ডায় আছি নাকি বিশ্লেষণে আছি, বুঝব কিভাবে?

প্রথমতঃ তথ্য গুলো কি ভালমত যাচাই করেছি? চীনের দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে মৃত্যু নিয়ে দুই ধরনের ব্যাখ্যা আছে, এর মধ্যে ফ্যাক্ট আর প্রোপাগান্ডা কি, তা কি ক্রিটিকালি যাচাই করেছি? চীন একটি উদহারন, এরকম আরও আছে। এখানে বৈজ্ঞানিকের নিরপেক্ষতা ও সততা দরকার। কিউবার সমাজকে বুঝতে হলে পুঁজিবাদী এনিমি ডিসকোর্স দিয়ে বোঝা যাবেনা।

দ্বিতীয়তঃ আমরা কেউ নিরপেক্ষ নই, মূল্যবোধ বা মতাদর্শের প্রশ্নে। আপনি কার পক্ষে? কি আপনার কাছে ভালো, তা সামনে রাখা জরুরী। আমাদের যুক্তি কোন ভাষা কৌশলে (এনিমি ডিসকোর্স নাকি তথ্যউপাত্ত), তা থেকে প্রমাণিত হয়, আমরা কোন পক্ষে। আমরা কি শোষণ বঞ্চনা বৈষম্য ও যুদ্ধকে, শ্রেণী ও বর্নবাদী আধিপত্যকে কি সন্মতি ও বৈধতা দিচ্ছি?

পরিশেষে, আপনি কি ‘সত্য’ প্রকাশ করছেন তা বিচার করব আপনার এই ‘সত্য’ কথন কি ভূমিকা রাখছে, তার ভিত্তিতেও। আমাদের বহুবিচিত্র বাক্যবান কোন ক্ষমতাকে বৈধতা দিচ্ছে, চূড়ান্ত বিচারে সেটাই প্রধান বিবেচনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 5 =