সেঁজুতি এখন হাসতে পারে

সেঁজুতির মনে হলো: সে অনেকদিন হাসে না। আর সে যেন হাসতে একেবারে ভুলেই গেছে। আজকাল সে সারাদিনে মাত্র দুই-চার-বার একটুআধটু হাসতে চেষ্টা করে। অফিস-শেষে তার বাবা যখন বাসায় ফেরে তখন সে এই হাসবার চেষ্টাটুকু করে থাকে। বাকীটা সময় সে খুব মনমরা হয়ে থাকে। বাসায় তার মা থাকে। আরও আছে ছোট একটি ভাই। তবুও তার খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়। আসলে, সে এতোদিন বান্ধবীদের সঙ্গে বেশ মজা করে সময় কাটিয়েছে। ইদানীং এতে ভাটা পড়ায় তার মনটা ভীষণভাবে খারাপ হয়ে গিয়েছে।

সে আজকাল তার মা-কে ছাড়া কোথাও যেতে পারে না। আর মা-কে ছাড়া তার কোথাও যাওয়া একেবারে বারণ। তার বাবাও এটাই চায়। তাই, সে চুপটি করে মায়ের সঙ্গে কলেজে যাতায়াত করে থাকে। প্রায় একবছর হতে চললো সে কোনো বান্ধবীর বাসায় যেতে পারে না।

সেঁজুতি অনেকক্ষণ যাবৎ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ঢাকের আওয়াজ শুনছিলো। আর সে ভাবছিলো ক’দিন পরেই পূজা। এসময় তার মনটা আনন্দে ভরে থাকার কথা। কিন্তু গত একবছর আগের এই দুর্ঘটনার পর থেকে তার মনটা কেমন যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। আগের মতো সে আর কোনোকিছুতেই আনন্দ খুঁজে পায় না। সে কলেজে নিয়মিত যাতায়াত করছে সত্য। কিন্তু সে আগের মতো আর বাইরে ঘুরতে যেতে পারে না। এব্যাপারে তার ওপর পারিবারিক বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছে। অবশ্য সেসব সেঁজুতির ভালোর জন্য। তাই, সে বাইরে যাওয়ার জন্য আর-কখনও তার মা-বাবাকে পীড়াপীড়ী করে না।
এই এলাকায় সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে সে। এইজন্য সেঁজুতির হয়েছে ভীষণ বিপদ। আজকাল পাড়ার অনেক ছেলে-ছোকরা তার পিছনে কার্তিক-মাসের কুকুরের মতো ছুটাছুটি করছে। আর এই পাড়ারই বাচ্চু-নামের একটি ছেলে তো তাকে একদিন হুমকি দিয়েই বলেছে: বিয়ে করলে শুধু তাকেই করতে হবে! আর যদি সেঁজুতি আর-কাউকে বিয়ে করে তাহলে তাকে নাকি সে জানেই মেরে ফেলবে।
সেই থেকে সেঁজুতি কলেজে যাতায়াত ছাড়া আর-কোথাও যেতে পারে না। আর-কোথাও তার যেতে ইচ্ছেও করে না।

বাচ্চু মুসলমানের ছেলে। তার বাপ এই এলাকার বিখ্যাত কেউ নয়। শোনা যায়: আগে নাকি তার বাপ সিঁদেল-চোর ছিল। এখন সে কাঁসা-পিতলের দোকান দিয়েছে। আর-কিছু পয়সাও কামিয়েছে। আর তারই বখাটে ছেলে বাচ্চু কলেজপড়ুয়া-সুন্দরী সেঁজুতিকে গায়ের জোরে এখন গ্রাস করতে চায়। নামধারীমুসলমান বলে কথা! ওরা হিন্দুনির্যাতনকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করে থাকে!

সেঁজুতির খুব ঘুরতে ইচ্ছে করে। আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজবও করতে তার মনে চায়। কিন্তু তার কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই। তার মা তাকে সবসময় দেখেশুনে আর চোখে-চোখে রাখেন। একটা মুহূর্ত তিনি সেঁজুতিকে চোখের আড়াল করতে চান না। কলেজে যাওয়া-আসার সময় তিনি নিজে মেয়ের সঙ্গে থাকেন। তবুও এপাড়ার কয়েকটি মুসলমান-ছেলে তাকে কী দরদ দেখিয়ে মাসী বলে ডাকার চেষ্টা করে। আর তার সঙ্গে অহেতুক খাতির জমাবার চেষ্টা করে থাকে। তাদের হাবভাব দেখে মনে হয়: তারা যেন তার কতদিনের আপন! সেঁজুতির মা দীপ্তিরাণী ওদের চালাকি আর শয়তানী সবই বুঝতে পারেন। কিন্তু তিনি কখনও কিছু বলেন না। বরং তিনি সবসময় হাসিমুখে ওদের পাশ কাটিয়ে চলেন। ওরা একেকটা যে আস্ত-শকুন—তা তিনি খুব ভালোভাবে জানেন। আর সবকিছু জানেন বলেই আজকাল তিনি মেয়ের সঙ্গে কলেজে যাতায়াত করে থাকেন।

সেঁজুতির বাবা বছর তিনেক হলো এই মফস্বল-শহরে বদলি হয়ে এসেছেন। তিনি তিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত-ব্যাংকের কর্মকর্তা। বদলির পরে এখানে এসে তিনি বছর দুয়েক ভালোই ছিলেন। আর তখন তার মেয়েটি ছোট ছিল বলে কারও নজরে পড়েনি। কিন্তু এসএসসি-পরীক্ষার সময় থেকেই নানারকম শকুন তার মেয়েটির পিছু নিতে শুরু করে। আর এব্যাপারে সবার চেয়ে এগিয়ে বাচ্চু। তার পূর্বপুরুষ এলাকার নামকরা চোর ছিল। সেইজন্য তার সাহস খুব বেশি। তাছাড়া, এখন তার বাবা নানারকম ধান্দাবাজি আর কায়কারবার করে অর্থ কামিয়েছে। আর তারই দাপটে সমাজে এখন বাচ্চুদের মতো অতি-বখাটেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছে।

সেঁজুতির বাবা সৌরেন্দ্র বাবু একসময় রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি বেশ বুদ্ধিমান আর সাহসীলোক। কিন্তু মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি আর সাহস দেখাবার সাহস পান না। নিজের থেকেই তিনি ঝিমিয়ে পড়েন। একটিমাত্র মেয়ে তার। যদি কিছু-একটা হয়ে যায়! এইসব বখাটের না আছে ধর্ম, আর না আছে কোনো মনুষ্যত্ব। তাই, তিনি প্রতিবাদের ভাষা বুকের ভিতরে চেপে অফিস করেন। আর ঢাকা-শহরের কোনো একটি শাখায় বদলি হওয়া যায় কিনা তারই তদবির করতে থাকেন। কিন্তু ইদানীং তিনি বুঝতে পারছেন: সহজে তিনি ঢাকা-শহরের কোনো শাখায় বদলি হতে পারবেন না। তারচেয়ে ভালো জিলা-শহরে চলে যাওয়া। আর এইজন্য তিনি পাবনার আতাইকুলাবাজার-এলাকা ছেড়ে রাজশাহী কিংবা পাবনা-শহরে চলে যেতে চাচ্ছেন। আর সেখানেও আবার অনেক প্রতিযোগী। সবমিলিয়ে তিনি হাল ছেড়ে না দিয়ে মনের জোরে অন্যত্র বদলির জন্য জোরপ্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

সৌরেন বাবু অফিস থেকে ফেরামাত্র সেঁজুতি তার পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে বেশ একটা মমতাময়ী মায়ের মতো বলতে থাকে, “বাবু, তোমার বদলি হবে না? আর কতদিন এভাবে আমরা থাকবো?”
সৌরেন বাবু মনখারাপ না করে মেয়ের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে বললেন, “হবে মা হবে। আর-একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আর সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে আমার বদলি এবার হবে।”
বাবার কথা শুনে সেঁজুতি একটু ভরসা পায়। আর তখন সে একটুখানি হাসবার চেষ্টা করে থাকে।

আর এইসময় সবকিছু দেখে সেঁজুতির মা বললেন, “তুমি এলে তবুও ওর মুখে একটু হাসির রেখা দেখা যায়। আর নয়তো মেয়েটি আমার সারাদিন কেমন মনমরা হয়ে থাকে।”
তারপর তিনি স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওগো, তুমি তাড়াতাড়ি একটা বদলির ব্যবস্থা করো না! আমরা তাহলে একটু বেঁচে যাই।”
সব শুনে সৌরেন বাবু বলেন, “সেই চেষ্টাই তো করছি—গত ছয়মাস ধরে। দেখি কী হয়।”

সেদিন সকাল থেকে ঢাকের আওয়াজ বেড়ে গেল। তাই দেখে সেঁজুতির ছোটভাই সুজিত কী আনন্দে ছুটে এসে তাকে বললো, “দিদিরে, কাল থেকে পূজা শুরু হবে। আমি দেখতে যাবো। আর একেবারে মণ্ডপের সামনে গিয়ে বসবো। তুই যাবি না দিদি?”
খবরটা শুনে সেঁজুতি মনখারাপ করে বললো, “জানি নারে। তুই যাস। আমার অসুবিধা আছে। আর তুইও সাবধানে থাকিস। আর মনে রাখিস: আমরা কিন্তু এই দেশে সংখ্যালঘু। আমরা চাইলেই সবকিছু নিজের মতো করতে পারবো না।”

এদিকে সেঁজুতির কলেজও বন্ধ হয়েছে দুদিন আগে। কিন্তু সেঁজুতির আর বাইরে যাওয়া হচ্ছে না। সে খুব মনখারাপ করে বাসায় বসে থাকে। আর তা-ই দেখে তার মা বললেন, “মনখারাপ করিস না, মা। দেখি, পরিবেশ একটু ভালো হলে আমরা কাল বিকালে পূজো দেখতে যাবো।”
সব শুনে সেঁজুতি বললো, “থাক মা, যেয়ে কাজ নেই। কুকুরগুলো আমাদের দেখলে আবার বিপদ হতে পারে। ওই কুকুরগুলো আমার পিছ ছাড়বে না। তাই, এসব বাদ দাও মা।”
মা বললেন, “না, তুই মনখারাপ করে আছিস তো তাই বললাম।”
সেঁজুতি বললো, “আমি তো সেজন্য মনখারাপ করিনি মা, আমি মনখারাপ করেছি আমাদের সমাজের কথা ভেবে। এখানে, ভিন্নধর্মের মানুষদের কী চোখে দেখা হয়! আর তাই ভেবে অবাক হচ্ছি। আর খুব কষ্ট পাচ্ছি। আর আমার কষ্টটা সেইখানে, মা।”
এবার দীপ্তিরাণী বললেন, “সে-তো আমিও বুঝি। দেশটা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর সেই সাতচল্লিশ সাল থেকে আমরা ঘরছাড়া হচ্ছি। অথচ, ঊনিশ’শ একাত্তর সালে তোর বড়-কাকাবাবু এই দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন।”

এমন সময় সৌরেন বাবু ফোন করলেন অফিস থেকে। ফোন ধরলো সেঁজুতি। আর সে বললো, “হ্যালো বাবু, বলো।”
একটু পরে সে বাবার নির্দেশমতো ফোনটা তার মাকে দিলো। আর দীপ্তিরাণী ফোনটা ধরেই মিনিটখানেকের মধ্যে একেবারে চুপসে গেলেন। একটা ভয়ানক খবর শুনেছেন যেন তিনি।
এর একটু পরে ফোনটা তিনি রেখে দিলেন। আর তাই দেখে সেঁজুতি মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বললো, “কোনো সমস্যা হয়েছে মা?”
ওর মা বললেন, “হ্যাঁ, মা। ওই বজ্জাতটা—মানে বাচ্চু গতকাল রাতে নাকি চাঁদার টাকা না পেয়ে অখিল-মাস্টারকে খুব কুপিয়েছে। আর মাস্টারসাহেব মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। তাই শুনে তোর বাবা আমাদের আরও সাবধানে থাকতে বললেন।”
সেঁজুতি বললো, “তা-ই হবে মা। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি। আমাদের পূজো দেখতে কোথাও যেতে হবে না। ঘরে বসেই আমরা ঢাকের আওয়াজ শুনবো। আর ওতেই আমাদের মন ভরে যাবে।”

একটু পরে সেঁজুতি বললো, “মা, সুজিতকেও বেশি বাইরে যেতে দিয়ো না। এখন দিনকাল ভালো নয়। ও-কেও সাবধানে রাখতে হবে।”
মা বললেন, “ঠিকই বলেছিস মা। তুই ও-কে একটু দেখে রাখিস তো। এখন থেকে ও-কেও সাবধানে থাকতে বলতে হবে। তোর কথাই ঠিক।”
তারপর ‘কী যে হবে আমাদের’ কথাটি বলে তিনি ঘরের একদিকে চলে গেলেন।
আর সেঁজুতি বিছানায় শুয়ে শরৎচন্দ্রের ‘বামুনের মেয়ে’ পড়তে লাগলো। বইটি ও যতো পড়ে ওর ততো ভালো লাগে। আর এই ভালোলাগার যেন কোনো শেষ নেই। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—বইটি ওর বাবারও ভালো লাগে। এমনকি ওর মা-রও ভালো লাগে।

সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরলেন সৌরেন বাবু। তার কাছে আরও অনেক খবর আছে। তিনি সন্ধ্যার পরে চা পান করতে-করতে সবার সঙ্গে কথার বলার একফাঁকে বললেন, “বাচ্চু-হারামজাদা খুব খারাপ ছেলে। গতবছর ও নাকি ঢালারচরে একটা মার্ডারও করেছে। সে খবর আমরা তো এতোদিন জানতে পারিনি। গতরাতে অখিল-মাস্টারকে কুপিয়ে জখম করার পর আজ অফিসে সবাই ওর সম্পর্কে এসব বলাবলি করছিলো। আরও শুনলাম: সে নাকি খুব খারাপ ছেলে। দিনে দুপুরে মানুষখুন করতে পারে। এর আগে সে নাকি একটি মেয়েকে রেপও করেছে। সে মেয়েটি মুসলমান। আর সে দরিদ্র-পরিবারের মেয়ে বলে ওরা সহজে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দিয়েছে। তাই, আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। আর বদলিটা হয়ে গেলে বেঁচে যাই। একবার যদি রাজশাহী-শহরে যেতে পারি তাহলে আর ওখান থেকে আর-কোথাও যাবো না। একেবারে ওখানেই থেকে যাবো।”
সব শুনে দীপ্তিরাণী বললেন, “ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি: তা-ই যেন হয়। আর দুর্গা-মা যেন আমাদের সহায় হন।”
তারপর তিনি তার দুর্গা-মায়ের উদ্দেশ্যে বিরাট একটা প্রণাম ঠেকিয়ে বললেন, “মা, তুমি আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো, মা। রক্ষা করো, মা। আমার স্বামী-সন্তানসন্ততিকে রক্ষা করো, মা।”

সন্ধ্যার পরে সৌরেন বাবু বাজার করতে বের হলেন। আর তিনি দেখলেন, এলাকায় পুলিশের গাড়ি ঢুকেছে। বাজার করার ফাঁকে-ফাঁকে তিনি লোকের কাছে শুনলেন, বাচ্চুর খোঁজে পুলিশ নেমেছে। আর প্রয়োজনে নাকি র‌্যাবও আসতে পারে। এই খবরটা শুনে তিনি খুশি মনে একব্যাগ বাজার নিয়ে ঘরে ফিরলেন।
দীপ্তিরাণী এতো বাজার দেখে অবাক! আর তার বিস্ময়ভাব দেখে সৌরেন বাবু স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে খুশিতে বলতে লাগলেন, “এলাকায় পুলিশ নেমেছে। বাচ্চু-হারামজাদাকে খুঁজছে। আরও শুনলাম: র‌্যাবও নাকি আসতে পারে। আর-একজন বললো, এবার নাকি সে পালাতে পারবে না। ধরা তাকে পরতেই হবে।”
একথা শোনার পর দীপ্তিরাণী হেসে ফেলে বললেন, “তা-ই যেন হয়। মা-দুর্গা সহায় হও।”
তিনি আবার দুর্গার উদ্দেশ্যে একটা প্রণাম ঠুকে দিলেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে সেঁজুতি শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ পড়ায় ব্যস্ত। একফাঁকে সে নাস্তার কাজটিও শেষ করলো। বাবার সঙ্গে আজ সকালে তার দেখা হয়নি। আজ অনেকদিন পরে সে এতো বেশি ঘুমিয়েছে। অবশ্য গতরাতে সে বিভূতিভূষণ-এর ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’ উপন্যাসটি পড়তে-পড়তে অনেক রাত করে ফেলেছিলো। আর তাই, সকালে সেঁজুতির গভীর ঘুম দেখে তার বাবা তাকে আর ডাকেনি। পরে সকালে ঘুম থেকে উঠে সেঁজুতি মায়ের মুখে তা-ই শুনেছে।

দুপুরে ওরা তিনজন একসঙ্গে খেতে বসবে—এমন সময় ওদের দরজার কলিংবেল বেজে উঠলো। আর কলিংবেলটা ক্রমাগত বাজতেই লাগলো। তা-ই দেখে ওরা ভয় পেয়ে গেল। যদিও ওদের নতুন বিল্ডিংয়ের দোতলা-বাসা—তবুও ওরা সবসময় ভয়ে-ভয়ে থাকে।
সেঁজুতি একসময় বলে বসলো, “থাক মা, দরজা খুলে কাজ নাই। আমি বরং বাবাকে ফোন দেই।” এই বলে সে তার বাবাকে ফোন দিতে লাগলো। কিন্তু ওর বাবা ফোন ধরছে না।”
সেঁজুতি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “মা, বাবু তো ফোন ধরছে না!”
সেঁজুতি ভালোবেসে বাবাকে বাবু বলে থাকে। আর ওর বাবা ও-কে মা বলে ডেকে আনন্দ পান।
এমন সময় ওর মা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ওদের এই বাসার দরজায় কোনো লুকিং গ্লাস নেই। তাই, বাইরের কোনো লোককে বাসার ভিতর থেকে দেখা যায় না। এজন্য ওরা বাড়িওয়ালাকে কতবার বলেছে। কিন্তু লোকটি ওদের কথায় কোনো কর্ণপাত করে না।
ততক্ষণে সেঁজুতিও মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আর সে এবার একটু জোরে চেঁচিয়ে উঠলো, “কে? কে? কে?…”
এমন সময় বাইরে যেন তার বাবার গলার আওয়াজ শোনা গেল। তাই শুনে সেঁজুতি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “মা, মনে হচ্ছে বাবা।”
মা বললেন, “কিন্তু তিনি কেন এইসময়ে আসবেন! অন্য কেউ নয় তো?”
এমন সময় তার বাবা সম্ভবত সদর দরজার সঙ্গে মুখ লাগিয়ে বললেন, “সেঁজুমণি আমি তোর বাবু, দরজা খোল মা।”
সেঁজুতি আর দেরি করলো না।
সে একটানে সদর-দরজার বড় হুড়কোটা খুলে ফেললো। আর তখনই তার বাবা যেন হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পড়লেন।
এতে ওরা সবাই খুব অবাক হলো। আর জানতে চাইলো: এমন কী হয়েছে?—যার জন্য তিনি এমনটি করছেন? আর এমন হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ছুটে এসেছেন!
সৌরেন বাবু একটু শান্ত হয়ে বললেন, “সেঁজুমণিরে একটা সুখবর আছে।”
সেঁজুতি কথাটা শোনামাত্র বাবার কোলঘেঁষে বসে বললো, “কী হয়েছে বাবা?”
সৌরেন বাবু আবেগসংবরণ করতে না পেরে খুশিতে কেঁদেই ফেললেন। আর বললেন, “গতরাতে ওই বাচ্চু-হারামজাদা র‌্যাবের গুলিতে মারা গেছে।”
খবরটা শোনামাত্র দীপ্তিরাণী দুই-হাত কপালে ঠেকিয়ে দুর্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম ঠুকতে লাগলেন। আজ তার মনে বড় আনন্দ। এবার বুঝি তার মেয়েটি মুক্তি পাবে!

আর এই সুখবরটা শুনে সেঁজুতি ভীষণ আনন্দে উদ্বেলিত হলো। আর সে খুশিতে হেসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো: মা, এবার আমি পূজার নতুন জামা পরবো। আর আজ থেকেই পূজো দেখতে যাবো। তোমরা দুজন আমার সঙ্গে থাকবে কিন্তু।
সৌরেন বাবু সবার দিকে চেয়ে বললেন, “তোমরা খাও। আমি এবার অফিসের দিকে যাই। আর আমাকে বদলির চেষ্টা করতে হবে না।”

আর তখন থেকেই সারাঘরে ছড়িয়ে পড়লো সেঁজুতির হাসি। সেঁজুতি এখন মনভরে হাসতে পারছে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৩/১০/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 2 =