আপন ভূমে উপজাতি!

উত্তর বঙ্গে বাড়ি হওয়াতে সাঁওতালদের আমার অনেকটা ঘনিষ্ঠ ভাবেই দেখার সুযোগ হয়েছে। সেই ছোট বেলা থেকেই সাঁওতাল নারী পুরুষদের মাঠের জমিতে কামলা খাটতে দেখেছি। হাটে, মাঠে, ঘাটে সর্বত্রই নাক বোঁচা, কাল চামড়া, কোঁকড়া চুলের এই মানুষদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ত। স্কুলে পড়ার সময় আমার একজন সাঁওতাল সহপাঠীও ছিল। অন্য স্কুলে পড়ুয়া কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাঁওতাল বন্ধুও ছিল; এতদিন পর সেই সহপাঠী এক রাফায়েল হাসদা আর বন্ধু আমিন ছাড়া আর কারো নামও মনে করতে পারছিনা। আমাদের গ্রামের আশপাশে অনেকই সাঁওতালদের পাড়া, যদিও শেষ কয়েকবার দেশে গিয়ে সাঁওতাল পাড়ায় বেড়াতে গিয়ে অনেকটা হতাশ হয়েছি। শুনেছি অনেকেই ভারতে চলে গেছে! ছোট ছোট ঘরবাড়ির গিজগিজ করা গ্রাম গুলি অনেকটায় ফাঁকা ফাঁকা! বুঝতে পেরেছি শান্তির ধর্মের অতিসহ্যের প্রভাব শুধু হিন্দুদের উপর পড়েনি, এদের উপরও পড়েছে।

সাঁওতাল রমণীদের মাথায় খড়ি বা নাড়ার বোঝা নিয়ে জমির আইল ধরে সারি বেধে হেঁটে যাওয়া, পুরুষের পাশাপাশি মাঠের কাদা জমিতে ধান লাগানো, কিংবা দুধের শিশুকে খোলা মাঠে গামছা পেতে শুয়ে রেখে মায়ের ক্ষেতে কাজ করা, থালা দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরা, এসব উত্তর বাঙলার খুবই পরিচিত দৃশ্য। ঘরের রান্নাবাড়া, লেপাপোঁছা থেকে শুরুকরে হাট বাজার সহ সব ধরনের কাজ করতেই সাঁওতাল নারীরা অভ্যস্ত। হিন্দু মুসলিম প্রধান এই দুই ধর্মের মানুষের সব রকম বঞ্চনা এবং ঘৃণার শিকার এই মানুষ গুলো সম্ভবত তা শুধুমাত্র চামড়ার কাল রঙের কারণে। তা ছাড়া ঝকঝকে তকতকে লেপাপোঁছা, পরিপাটি করে আলপনা আঁকা ঘরদোর দেখলে অহংকারী এবং ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড বর্ণবাদী দুই ধর্ম হিন্দু আর মুসলিমের ঘরবাড়ির সাথে পরিচ্ছন্নের পার্থক্যটা খুব সহজেই চোখে পড়বে।

উৎসব প্রিয় এই জাতীর সবায় নাচতে জানে, গাইতে জানে, বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানে। আদিম অকৃত্রিম সমাজ ব্যবস্থায় আজও ওদের গ্রামের কোন একজনের বিয়ে মানে সবার উৎসব। ঘর ঘর গিয়ে দাওয়াত করার প্রয়োজন পড়েনা, নির্দ্বিধায় সবায় অংশগ্রহণ করে। নারীরা হাতে হাত ধরে নাচে, পুরুষেরা ঢোল মাদল বাজায়, একসাথে পান করে, নাচে গায়, আনন্দ উল্লাসে পুরো গ্রাম মেতে ওঠে। প্রায় সপ্তাহ ব্যাপী চলে সেই উৎসব। হলুদ শাড়ী লাল পাড়, মাথায় লাল জবা ফুল প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকা এই জাতি প্রাকৃতিক লতা পাতা ফুল এসব দিয়ে সাজতেও জানে অপরূপ ভাবে। মোরাগ, গাঁদা, রক্তজবা সহ আরো দুই চার রকমের ফুলের দেখা কৃষক মুসলমানের পাড়ায় না মিললেও দিন মুজুর খাটা হতদরিদ্র সাঁওতালদের উঠোনে ঠিকই মিলবে।

বড় হয়ে জানতে পেরেছি বাঙলা দেশের আদিম বাসিন্দা আসলে ওরায়। বাঙালীদের আদিম পুরুষের সন্ধান করতে গেলে উত্তর ভারত, ইরান, ইয়েমেন, তুর্কী, তুর্কমেনিস্তান, তাজাকিস্থান, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমি জানিনা। কিন্তু এ জনপদে হিংস্র জন্তু জানোয়ারের আবাস বন জঙ্গল কেটে ওরায় প্রথম মানুষের বসতি গড়েছিল। এ ভূখণ্ডে আদিম বসতের ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক স্বীকৃতিটা ওদেরই। ওদেরই রয়েছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবার বীরোচিত ইতিহাস, পাকদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের অবদান আর এদেশের মাটি আর প্রকৃতির সাথে গভীরতম সম্পর্ক যুক্ত বর্ণিল সংস্কৃতি।

যদিও সবায় সাঁওতালদের আদিবাসী বলেই ডাকে তবুও সম্ভবত কেউই “আদিবাসী” শব্দটার অর্থ অনুধাবন করতে পারেনা, পারলে এ জনপদের আর সব জাতীদের অন্তত ওদের প্রতি কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞতার নমুনা থাকা উচিৎ ছিল। আসলে এই অঞ্চলে “সাঁওতাল” ঘৃণা ব্যঞ্জক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর আদিবাসী কিছুটা করুণা স্বরূপ তারই বিকল্প শব্দ। হিন্দুদের আর বর্তমানে মুসলমানের ঘৃণা, অবজ্ঞা, নিষ্পেষণ আর প্রতারণার শিকার হতে হতে এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্ররায় আজ ভূমিহীন।

বাংলাদেশের যতগুলো জাতি উপজাতির বাস সম্ভবত তারচেয়ে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ওরা, তবুও এদের মধ্যে সাধারণত ভিক্ষুকের দেখা মেলেনা, এরা হাত পেতে ভিক্ষা করতে জানেনা। প্রচণ্ড পরিশ্রমী এরা যতদিন শরীরে শক্তি থাকে পরিশ্রম করেই খায়। অভাব অনটনে শাক কচু, বনআলু, ব্যাঙেরছাতা, শালুক, শামুক, ঝিনুক, আর হাতের বর্শা, তীর ধনুক দিয়ে নানান শিকারের প্রাণী দিয়েই পেটের ক্ষুধা মেটায়।

সবচেয়ে মর্মান্তিক হল প্রচণ্ড বর্ণবাদের শিকার ওরা। এই অঞ্চলের হিন্দু মুসলমানেরা ওদেরকে যতটা ঘৃণা করে ততটা ঘৃণা কুকুর, শেয়াল, বিড়ালকেও করেনা। সর্ব ক্ষেত্রেই অপাংক্তেয় ওরা। একজন কৃষকের বাড়ীতে পাঁচজন কামলার সাথে বসেও খেতে পারেনা ওরা। ওদের জন্য ব্যবস্থা হয় ঘরের বাহিরে কিংবা কিছুটা দূরে কোথাও। সাধারণ ওদের জন্য আলাদা থালা প্লেট থাকে নয়তো কলার পাতায় ব্যবস্থা করতে হয়।
ইউরোপ আমেরিকার সভ্য মানুষদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বর্ণবাদ প্রথা বিলুপ্ত প্রায়। ওদের কাছ থেকে শিখে আমরাও ফেসবুকে, ব্লগে, রেডিও, টিভি, বক্তৃতা বিবৃতিতে মুখে খই ফোটানো মানবতার বাণী আওড়াই। দিনশেষে আমরা তো বেশ আছি সাঁওতাল, ডোম, ছত্রি, মেথর, মুচির মত নিম্নবর্ণের মানুষ গুলোর সস্তা শ্রম আর আমাদের বাবুগিরি নিয়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 + = 71