বাঙালি হিন্দুর মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা:অনুপস্থিতি উপস্থিতি

বাঙালি হিন্দু কোন ধোয়া তুলসী পাতা নয় ; বরং গঙ্গাজলের মতই নোংরায় পূর্ণ। বঙ্গীয় হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতার উৎসমুখ সন্ধানে নেমে দেখছি হিন্দুর ধর্ম কম, সমাজ বেশী। দুনিয়ার যত কুপ্রথা আর কুসংস্কারকে ধর্মের নামে সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছে এরা। তারপর একদিন হিন্দুর সেই সমাজ এমনই কঠিন- কঠোর, এমনই প্রভাব- প্রতাপশালী হয়ে উঠেছে যে ধর্মীয় রীতির নামে সমাজে যেসব প্রথা এবং অনুশাসন প্রচলিত ছিলো সেগুলোর আদৌ কোন ধর্মীয় ভিত্তি আছে কিনা এই প্রশ্ন যখনই কেউ তুলেছে তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তেড়ে গেছে তার দিকে।তবে প্রশ্ন থেমে নেই, যথারীতি তেড়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়নি।

হিন্দুর ধর্মশাস্ত্র অগণিত কিন্তুু শাস্ত্রের পাঠক নগন্য। হিন্দুর ধর্মীয় আচরণ নামে যা প্রচলিত আছে সেগুলোর বেশিরভাগ সম্পর্কেই হিন্দুদের ধারনা শৃন্যের কোঠায়। সিংহভাগ হিন্দু ধর্মীয় আচরণ যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে একটা পারিবারিক ঐতিহ্য হিসাবে ; এসবের ধর্মগত ভিত্তি সামান্য, ঐতিহ্যগত ভিত্তিটাই অসামান্য। এইযে ধর্মশাস্ত্রের সাথে হিন্দুদের একটা বিরাট যোগাযোগহীনতা, অমোচনীয় দূরত্ব এর বেশকিছু সুবিধা অসুবিধা আছে।ইতোমধ্যেই বলেছি বাঙালি হিন্দু মূলত ঐতিহ্যের পূজারী,শাস্ত্রের ভগবানের নয়। গ্রন্থের দেবতারা বারো মাসে তের পার্বনের দিনগুলোতে হিন্দু সমাজে হাজির হয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হিসাবে, যেখানে শাস্ত্রীয় বিধান কম ,সামাজিক অনুশাসন বেশী। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের সাথে হিন্দুদের যোগাযোগ কম থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধাটা হচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদমুক্ত থাকা। ধর্মগ্রন্থের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকলে গ্রন্থের বিধিবিধানের প্রতি যে শর্তহীন আনুগত্য তৈরী হয় এবং ধর্মীয় আচরণ ও তত্ত্বকথাকে অবশ্যমান্য ও শাশ্বত সত্য বলে একটা দৃঢ় ধারণা মনের মধ্যে গেঁথে যায় সেখান থেকেই ধর্মীয় মৌলবাদের সৃষ্টি হয়। ধর্মশাস্ত্রের সাথে হিন্দুদের ঘনিষ্টতা কম থাকায় অর্থাৎ শাস্ত্রবচণ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে বাঙালি হিন্দুর ধর্মজাত মৌলবাদিতা অনেক কম।হিন্দুর মৌলবাদিতা হচ্ছে তার অবিবেচক কর্মকান্ড, ভণ্ডামোপূর্ণ ধর্মাচার এবং নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিহিত। এই তিনের সম্মিলিত প্রযোজনায় সৃষ্ট একটা কুপ্রথা হচ্ছে সতীদাহ, যার পেছনে খানিকটা শাস্ত্রীয় ইন্ধনও আছে সম্ভবত। আর আছে জাতিভেদ, ছোঁয়াছুঁয়ি ও জাত যাওয়া এমন সব হৃদয়হীন এবং অসামাজিক কারবার। তবে হিন্দুধর্মের বিগত দুশো বছরের সামাজিক ইতিহাস বিবেচনায় নিলে দেখা যায় এই ধর্মের গ্রন্থের কোন সংস্কার হোক বা না হোক হিন্দুর সমাজ সংস্কার হয়েছে।হিন্দুর সমাজটাই যেহেতু মুখ্য তাই এইখানেই সংস্কার জরুরী।দেখা যায় সংস্কারের বহমানতা অব্যাহত থেকেছে, জলঅচলকুঠুরিতে পরিণত হয়নি হিন্দু সমাজ। যদিও পরিবর্তনের গতি খুবই মন্থর তবুও চলমান। এইটা সম্ভব হয়েছে ধর্ম শাস্ত্রের সাথে সংযোগ কম থাকার এবং সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি অর্থাৎ ইহজাগতিকতার দিকে নজর বেশী রাখার কারনে। ব্রিটিশ ভারতের নানান রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনে হিন্দু সম্প্রদায় দ্রুতই সাড়া দিয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদেই তারা নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারটুকু করে নিয়েছে। সবসময়ই যে সৎ উদ্দেশ্যে এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সংস্কারসাধন হয়েছে তা নয়। সংস্কারের পথে ধর্ম বাধা হয়ে এসেছে তবুও একটু একটু করে নিজেদেরকে ইহজাগতিকতার দিকে নিয়ে এসেছে এই ধর্মগোষ্ঠী। এই পরিবর্তন সমাজতত্ত্বের নিয়মানুযায়ীই হয়েছে সংঘাত এবং আপসের মধ্য দিয়ে। কারণ মানুষ যদি ধর্মের আফিমে মত্ত না থাকে তাহলে সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্দীপকগুলোর প্রতি যুক্তিশীলতার ভিত্তিতে সাড়া প্রদান করবে। ইসলামিক শাস্ত্রের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক এমনই প্রগাঢ় যে মুসলমানেরা সামাজিক রাজনৈতিক উদ্দীপকগুলোর প্রতি সময়ানুগ এবং যথোচিত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনা। ধর্ম তাদের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়।

হিন্দুদের ধর্মীয় মৌলবাদিতা কম বলে হিন্দুরা সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত তা কিন্তুু নয়। সেও চরম সাম্প্রদায়িক অন্তত যখন তার পুঁজি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি থাকে। সেই ইতিহাস আমরা জানতে পারি দেশভাগের আগের সময়ের বিভিন্ন পাঠ থেকে। সেটা অন্য কাহিনী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “বাঙালি হিন্দুর মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা:অনুপস্থিতি উপস্থিতি

  1. আপনি ছাগলের মতো ম্যা ম্যা
    আপনি ছাগলের মতো ম্যা ম্যা ভালোই করলেন!!! এখনও হিন্দুরাই যা একটু ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা করে। মুসলিমরা তাদের ধর্ম গ্রন্থ পড়ে শুধু সওয়াব আদায়ের জন্য, অর্থ বুঝে লাখেও একজন পড়ে না। বর্বর আরবের ধর্মে না আছে কোন দর্শন চর্চা, না আছে বিজ্ঞান চর্চা। মুসলিমদের নবী নাকি ছিলেন উম্মি মানে নিরক্ষর! এই নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সেইরাম গর্ব! যারা তাদের নবীর মূর্খতা নিয়ে গর্ব করে তারা আর জ্ঞান পাবে কোথা থেকে? ভারতীয় ধর্মসমূহেই কেবল ধর্মের সাথে দর্শন সম্পর্কিত। হিন্দুদের আছে পূর্ব মীমাংসা ও উত্তর মীমাংসা নামে ২টি দর্শন বিভাগ। এর আবার আছে ৬টি দর্শন শাস্ত্র যা ষড় দর্শন নামে পরিচিত। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো বেদান্ত বা ব্রহ্মসূত্র। বেদ হিন্দুদের প্রধান বা আদি ধর্ম গ্রন্থ, আর উপনিষদ হলো সেই বেদের দার্শনিক ব্যাখ্যা যা বেদান্তের অন্তর্গত। গীতা হলো হিন্দুদের সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ যা নির্মল জ্ঞানের উৎস। আমি সব ধর্মের গ্রন্থগুলোই পড়েছি তার মধ্যে কোরান হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও পরস্পর বিরোধী কথা-বার্তায় পূর্ণ। হিংসা-বিদ্বেষ ও মানবতাবিরোধী একটি গ্রন্থ হলো কোরান! হিন্দুদের গীতা পড়ুন মুস্তফী সাহেব। তাহলে বুঝবেন আসলে মানুষের ধর্ম কত মহান হতে পারে। পড়ুন, তাহলে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। ধন্যবাদ….

    1. আপনার জ্ঞানের বহর দেখে আমি
      আপনার জ্ঞানের বহর দেখে আমি স্তম্ভিত!আমার লেখাটা হিন্দু শাস্ত্রের জ্ঞান বা দর্শন নিয়ে নয়। এই সহজ বিষয়টুকুই যে বোঝেনি সে বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র পড়ে সব বুঝে ফেলেছে এটা অবিশ্বাস্য! আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হোক!

  2. হিন্দুদের বিরুদ্ধে আপনার
    হিন্দুদের বিরুদ্ধে আপনার বিদ্বেষ স্পষ্ট হলেও কথাগুলো অনেকাংশে সত্যি। তবে হিন্দুরা অন্তত কোন মুসলমান দেশ আক্রমণ করেনি। বিনাকারণে উস্কানীমুলক কথা বলে না। আমার হিন্দু বন্ধুরা কেউ কথায় কথায় ‘আমাদের ধর্মে আছে’ জাতীয় বাক্য বলে না। যদি মুসলমানরা এই ভারতবর্ষে না আসতো, তাহলে হিন্দু ভারতবর্ষ বিশ্বকে কি দিতে পারতো, তা চীন-জাপানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আপনি নিজেই বলেছেন হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থগুলো কম পড়ে। তাহলে তাদের ধর্ম কোথায়? তাদের ধর্ম তাদের জীবনবোধে। আমরা যে অসাম্প্রদায়িকতা, নারী অধিকার ইত্যাদি বলি, তা হিন্দু সমাজের কাছ থেকে শেখা। মধ্যযুগে এই ভারতে মেয়েরা স্বপোর্জিত স্বাধীন ছিল (ঈশ্বরী পাটনি)। স্বয়ম্বর নামক এক মহা অধিকার একমাত্র হিন্দু নারীরা ভোগ করতো যা ইসলামি সন্ত্রাসবাদের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে যাই হোক, তাদের সমাজ ভালো হোক খারাপ হোক, আমার তাতে কোন যায় আসে না। আমি ও আমরা মুসলমানরা তাদের মুখের উপর তাদের ধর্ম সম্পর্কে খারাপ কথা বললেও তারা নিস্ক্রিয় থাকে। কিন্তু আমার ভাইয়েরা আমাকে খুন করতে চায় মোহাম্মদকে লম্পট বলার কারণে। আপনার কাছ থেকে হিন্দু-খ্রিস্টান-ইহুদী-বৌদ্ধ, কনফুসিয়াস-তাও এদের সম্পর্কে কোন কথা শুনতে চাই না। নাসিরনগর নিয়ে বলুন। বার্মার মুসলিম রাখাইনদের কথা বলার আগে পটুয়াখালির বৌদ্ধ রাখাইনদের উপর কারা অত্যাচার করে, তাদের জমিজমা কারা দখল করে, তাদের মেয়েদেরকে কারা অপমান করে, কাদের কারণে তারা দেশত্যাগ করে বার্মায় চলে যাচ্ছে সে কথা বলুন। আত্মসমালোনার সাহস অর্জন করুন। ধন্যবাদ

    1. আমার লেখার কোথায়
      আমার লেখার কোথায় হিন্দুুবিদ্বেষের নিশানা পেয়েছেন একটু দেখিয়ে দিলে কৃতার্থ হতাম। আর লেখাটা শুধুই হিন্দু সমাজ নিয়ে, কোন তুলনামূলক বিশ্লেষণ না। আপনাকে আমার অন্য লেখাগুলো দেখার পরামর্শ রইল। ধন্যবাদ।

  3. হিন্দুর মৌলবাদিতা হচ্ছে তার
    হিন্দুর মৌলবাদিতা হচ্ছে তার অবিবেচক কর্মকান্ড, ভণ্ডামোপূর্ণ ধর্মাচার এবং নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিহিত। -এই লাইনটি কি বিদ্বেষপ্রসূত নয়। কোন জাতিগুষ্ঠি সম্পর্কে এই জাতীয় বাক্য চরম আক্রমণাত্মক এবং আপত্তিকর।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

97 − = 96