বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্রের গল্প

মা বাবার একটি মাত্র ছেলে । নাম … থাক নামটি না হয় বললাম না । তারপরও ছদ্ম নাম দিলাম । ছেলেটার নাম দিলাম দৃশ্য । ৫ ফুট সাড়ে ৪ ইঞ্চির মতো লম্বা হবে ছেলেটা, দেখতেও একেবারে খারাপ নয়। পড়াশুনাতেও খুব ভালো । এই তো এ বছরই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এস.এস.সি তে জিপিএ ৫ পেয়েছে । সুযোগ হয়েছে বিজ্ঞান কলেজে । বাবা গ্রামে থাকে মাঝে মাঝে ঢাকা আসে ছেলেকে দেখতে ।

বাবা মায়ের খুব আশা দৃশ্যকে নিয়ে । ছেলে মানুষের মতো মানুষ হবে। আমাদের ছায়া হয়ে দাড়াবে । রাতে ঘুমতে পারে না মা । কোন মা কি পারে এক মাত্র ছেলেকে দূর হতে আদর করতে, স্নেহ করতে? রোজ ৩ বার করে মোট ৬ বার কথা হত।
দৃশ্য ৩ বার কল দিত আর মা ৩ বার কল দিত। এক বারও যদি ভুল হয়, মা থাকতে পারতো না । লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত। তাই রোজ সকালে মা পুজো দেয় ঠাকুরের কাছে ।চোখের জল ছেড়ে বলে, হে ঠাকুর আমার ছেলে যেন ভালো থাকে।
বাবা অনেক পরিশ্রম করে প্রতি মাসে টাকা পাঠায়। মাঝে মাঝে ধার করেও পাঠায়। কিন্তু কখনোই দৃশ্যকে বুঝতে দেয় না ।মাঝে মাঝে যখন বাবা ঢাকা আসে তখন দৃশ্য জিজ্ঞেস করে,
– বাবা তোমরা ভালো আছো তো?
তখন হাসি দিয়ে বাবা বলে,
– বাবা আমরা ভালো আছি । তুই পড়াশুনা শেষ কর, ভালো চাকরি কর, তখন আরও ভালো থাকবো ।

এভাবেই চলে গেলো প্রায় ৬ মাস।
এখন আর দৃশ্য প্রয়োজন ছাড়া মাকে কল দেয় না । যখন টাকার প্রয়োজন তখনই কল দেয়।
একদিন মা ককল দিল,
– দৃশ্য বাবা ক্যামন আছিস ?
– ভালো, তুমি ?
– এই আর কি! তুই তো এখন আমাদের ভুলেই গেলি ?
– কি যে বল মা! আসলে আমি সময় পাইনা ।
– কেন কি করিস বাবা যে সময় পাস না?
– সব কথা কি বলা যায় নাকি! ধ্যাত।
এই বলে কল কেটে দিল দৃশ্য।

মা আঁচল মুখে চেপে চোখের জল ছেড়ে দিয়ে বলে,
– দৃশ্য এতো বদলে গেলো কিভাবে(!)?
ঠিক এই সময় দৃশ্যের বাবা আসলো। জিজ্ঞেস করলো,
– কি ব্যাপার, তোমার চোখে জল ?
– কই? কোথায় ?
– এই তো, আমি দেখতে পাচ্ছি। চোখ লাল হয়ে গেছে!
– ওই আরকি, চোখে ময়লা গিয়েছে ।
কিন্তু মায়ের মন যা বলছে তাই ঠিক। দৃশ্য এখন ৩ টা টিউশনি করে সকালে একটা আর সন্ধ্যায় ২ টা । এই কথা দৃশ্য মা, বাবাকে বলেনি। কারন যদি বলে তাহলে বাড়ি থেকে আর টাকা পাঠাবে না ।

এখন কথা হল, কেন দৃশ্য টিউশনি করা শুরু করলো ?
দৃশ্য ভালো ড্রেসও পরে না । বেশি একটা স্টাইলও করে না । একে বারে সাধারন ভদ্র ছেলেদের মতই চলাফেরা করে । চা, পান, সিগারেটও খায় না। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন দৃশ্য টিউশনি করে? এতো টাকা ওর কিসের প্রয়োজন?

দৃশ্য এখন প্রেমে পড়েছে । প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে এক সুন্দরি ললনার। তবে চোখ ছাড়া কিছু দেখা যায় না । তবে মেয়ে অনেক সুন্দর ধরে। মেয়েটার ননাম দিলাম জান্নাতুল ফেরদৌসি । দৃশ্যের কাছে সবসময় দৃশ্যমান জান্নাতুল। ভুলে থাকতে পারে না এক মুহূর্তও। শয়নে, স্বপনে, সব সময় জান্নাত আর জান্নাত । ও ভাবে আমি এর থেকে আর ভালো মেয়ে পাবো না । এতো সুন্দর, এতো রূপ। এ আমি হাত ছাড়া করতে পারবো না । জান্নাত কে পেতে হলে আমার যা কিছু করার দরকার সব করবো ।

একদিন দুজনে হাতিরঝিলে ঘুরতে যাবে বলে প্লান করেছে । দৃশ্য প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করার পর একটা রিক্সা থেকে নামলো জান্নাত । সে একেবারে বোরকা,হিজাব পরে । এখানেও ঠিক চোখ ছাড়া কিছু দেখা যায় না। দৃশ্য মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
– এই তো এই মাত্র আমিও আসলাম।
এই কথা বলার কারন আছে। দৃশ্য অপেক্ষা করা কখনোই পছন্দ করে না। এখানে প্রেমিকা বলে কিছু হয় নি। এখানে যদি ওর অন্য কোন বন্ধু হত তাহলে চিরদিনের জন্য সম্পর্ক শেষ করে ক্ষান্ত হত দৃশ্য। কিন্তু জান্নাতুল হল দৃশ্যের কাছে হুর ।
কিন্তু দৃশ্য এখন পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। আজ ছোঁবে বলে প্রতিজ্ঞা করে এসেছে। কে না চায় এরকম হুর না ছুঁতে (!)?

বুক ভরা সাহস নিয়ে দৃশ্য বলল,
– আচ্ছা জান্নাত আমি তোমার হাত ধরে হাটি?
জান্নাত একটু সময় নিয়ে বলল,
– না …।
দৃশ্যের মাথায় যেন বজ্রপাত হল ।
জান্নাত তখন বলল,
– তুমি আমার স্বামী না হওয়া পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না।
– আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমিও আমাকে ভালোবাসো। তাহলে ছুঁলে অন্যায় কি ?
– গুনাহ । আমি তোমার জন্য গুনাহগার হতে পারবো না ।
তুমি যদি আমাকে ছুঁতে চাও তাহলে তোমাকে আমায় বিয়ে করতে হবে ।
দৃশ্য কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলো জান্নাত বলে,
– সত্যি তুমি আমায় বিয়ে করবে ?
দৃশ্য বলল,
– হ্যা করবো । তোমাকে পেতে হলে আমি সব করবো, সব ।
এই কথা শুনে জান্নাত বলল,
-চল একদিন আমার বাসায়।
দৃশ্য রাজি হয়ে গেলো।
একদিন শুক্রবার জান্নাত কল দিলো দৃশ্যকে।
বলল,
-তুমি এখুনি আমার বাসায় আসো।
দৃশ্য জিজ্ঞেস করলো,
– ক্যান ?
– আগে আসো তারপর বলব।

দৃশ্যের একটা পাঞ্জাবি ছিল। জিন্সের উপর পাঞ্জাবি পরে ঘাড়ের দুই পাশে সেন্ট মেরে ভয় ভয় অনুভব করে গেলো জান্নাতের বাসায় ।
কলিং বেল টিপ দেয়ার সাথেই জান্নাত খুলে দিলো দরজা ।
বলল,
– দৃশ্য বসো। আমি বাবাকে খবর দিচ্ছি ।
দৃশ্য বলল,
– জান্নাত আমাকে এক গ্লাস পানি দাও ।
জান্নাত বলল,
– পাঠাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর জান্নাতের মা পর্দাশীল অবস্থায় এসে এক গ্লাস পানি দিল।
– নাও বাবা পানি খাও ।
পানি খাওয়া শেষ না হওয়া মাত্রই জান্নাতের বাবা হাজির।
গাল ভরা লাল পাকা দাঁড়ি, দেহে আরবিও পোশাক।
একে বাড়ি খাটি সহি মুসলিম পরিবার ।
জান্নাতের ববাসা বসেই দৃশ্যকে জিজ্ঞেস করলো,
– তোমার নাম কি?
দৃশ্য বলল,
– আমার নাম দৃশ্য।
হ্যা নামটা আমি শুনেছি জান্নাতের কাছে।
তবে এই নামটার আগে কিছু বসাতে হবে।
দৃশ্য অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
– মানে ?
– মানে, খুব সোজা। দৃশ্যের আগে শুধু মুহাম্মদ লাগাতে হবে। মানে তোমাকে ইসলাম গ্রহন করতে হবে । যদি এই শর্তে রাজি হও তাহলে আমি আমার মেয়ে সহ এই বাড়ি-ঘর সব লিখে দিবো ।
তুমি ভেবে দেখো কি করবা । তোমাকে ২ দিন সময় দেয়া হল।

এই কথা শুনে দৃশ্য চলে আসলো।
ঠিক তখন ওর মা কল দিয়েছে,
– বাবা তুই ক্যামন আছিস? কত দিন তোর সাথে কথা বলি না।
দৃশ্য রেগে গিয়ে বলল,
– তোদের জন্যেই এই পরিনতি আমার।
এই বলে কল কেটে দিলো।
এই কথার মানে একটু বলে দেই,
মানে কেন ও মুসলিম হয়ে জন্মালও না? এর জন্য দায়ী মা আর বাবা ।

এদিকে জান্নাতের পরিবারে এক আনন্দের বাজার।
কেন বাজার হবে না? কারন ওরা নিশ্চিত স্বর্গের টিকিট হাতের মুঠায়।
দৃশ্যকে মুসলিম বানাতে পারলেই ১৪ পুরুষ জান্নাত বাসি হবে । জান্নাত হবে হুড়ের সর্দার ।
তাই জান্নাতের বাবা জান্নাতকে বলছে,
– মা, যে করেই হোক ওকে ইসলাম গ্রহন করাতেই হবে ।
জান্নাতও প্রতিজ্ঞা করলো,
– হ্যা আমি করবই ।
শুরু হয়ে গেলো রাত ১২ টার ফোন আলাপ ।

বেছে নিলো সেক্সকে কারন জান্নাত জানে ও দৃশ্যকে ছুঁতে চায় । তাই মাঝেই মাঝেই কাম উত্তেজনার কথা বলতে শুরু করলো আর দিতে থাকলো ইসলাম গ্রহনের ফুস মন্তর । ঠিক ফাঁদে পা দিল দৃশ্য।
দৃশ্য এখন নামাজ পড়া শুরু করলো। মাঝে মাঝে কুরান শিক্ষায় দিক্ষা লাভের জন্য জান্নাতুলের বাবার কাছে যায় দৃশ্য। শিক্ষা পেয়েছে অমুসলিমরা হল চতুষ্পদ প্রাণি কাফের, নাসারবান ।
তাই এখন বাবা , মা কল দিলে মাঝে মাঝে কুত্তার বাচ্চা বলতেও দ্বিধা করে না দৃশ্য ।

একদিন দৃশ্যের এক কাছের বন্ধু বলল,
– আচ্ছা তুই যা করছিস ঠিক করছিস ?
দৃশ্য বলল,
– হ্যা ঠিক করছি। আমি আগে ল্যাংটা ছিলাম এখন আমি প্যান্ট পড়া শিখেছি।

দৃশ্য ভুলে গেছে তার মা বাবার কথা । অদৃশ্য হয়ে গেছে মায়ের মমতা, স্নেহের বন্ধন। একদিন গোপনে সেই বন্ধুটি ফোন দিল দৃশ্যের মায়ের কাছে । বলে দিল দৃশ্যের সব কথা ।
মা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো । আর বলল,
– না না এ কখনো হতে পারে না । আমার দৃশ্য এ কাজ করতে পারে না ।
বন্ধুটি বলল,
– আন্টি, আমি মিথ্যা বলছি না। বিশ্বাস না হলে দেখে যান ।

দৃশ্যকে কিছু না বলে মা ঢাকায় আসলো । দেখলও ওর ঘর তালা বন্ধ ।
দৃশ্য এখন জান্নাতুলের বাসায় থাকে ।
বন্ধুটি মাকে নিয়ে গেলো জান্নাতুলের বাসায় ।
চোখ ভরা জল নিয়ে কলিং বেল টিপ দিল মা ।
৩ বার চেষ্টা করার পর খুলল দরজা ।
দেখতে পেল লম্বা দাঁড়ি, মাথায় টুপি ও পাঞ্জাবি জুব্বা পড়া এক ছেলে ।
ছেলেটাই যে দৃশ্য মা ঠাওর করতে পারে নি ।
মা জিজ্ঞেস করলো,
– আচ্ছা বাবা এখানে কি দৃশ্য আছে ?
দৃশ্য মনে মনে ভাবে যাক বাবা বেঁচে গেছি চিনতে পারে নি ।
এই ভেবে বলল,
– না না এই নামে এখানে কেউ থাকে না ।
যখন বলল,
– তখন ঠিকই বুঝতে পেরেছে এই আমার দৃশ্য ।
তখন মা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল দৃশ্যের দিকে।
তখন দৃশ্য জিজ্ঞেস করলো,
– কি দেখছেন এরকম ভাবে?
মা বলল,
– না কিছু না । দেখছি এই কি আমার সেই দৃশ্য যাকে আমি ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারন করেছি?

এই কি সেই দৃশ্য যাকে আমি নিজে না খেয়ে খাইয়েছি? এই কি সেই দৃশ্য যার নামে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি ?

এই কথা শোনার পর দৃশ্য ইতস্থ ও বিরক্তি অনুভব করে মাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বেড় করে দেয় । এবং সেখানেই মায়ের হার্ট এ্যাটাক হয়। তারপর স্থানীয় লোক ও বন্ধুটি হাসপাতালে নিয়ে যায় । অবশেষে অভাগা মা মারা যায় ।
তার পর কিছু সচেতন লোক ও ওই বন্ধুর সাহায্যে দৃশ্য ও জান্নাতুল সহ জান্নাতুলের বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেছে ।

কিন্তু এই খবর জান্নাতুল ও তার বাবা আগে পেয়ে গা ঢাকা দিয়েছে । কিন্তু দৃশ্য কিছুই জানে না । এক পর্যায়ে দৃশ্যকে গ্রেফতার করা হয়। কারণ নিজ মাকে হত্যা। এখন দৃশ্য মানষিক রুগি। একটা মানষিক চিকিৎসালয়ে দৃশ্য আছে।
আমার এই গল্পের পরিশেষটা ভালো হবে না । কারন এটাই আমার প্রথম কোন ছোট গল্প ।

টিটপ হালদার

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্রের গল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 − 10 =