চেকপয়েন্টঃ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ (পর্ব ২/৪)


১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
মিরপুর ব্রিজ, আমিনবাজার, ঢাকা
সকাল ৮ টা

জেনারেল নাগরা এবং তার সেনারা মিরপুর ব্রিজের অদূরে পৌছেছেন। মুক্তিবাহিনীর নানা দল আগেই এসে সেখানে অবস্থান নিয়েছিলো। জেনারেল নাগরা সেখানে পৌছে একটি কলম এবং ছোট রাইটিং প্যাড থেকে ছিঁড়ে একটুকরো কাগজ বের করলেন পকেট থেকে। প্যাডের পেপারটি জীপের হুডের উপর রাখলেন এবং তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত চিট-টি (সংক্ষিপ্ত অফিসিয়াল নোট) লিখবেন লেঃ জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর উদ্দেশ্যে, যা পরবর্তীতে দেশ বিদেশের নানা সংবাদ মাধ্যমে হুবহু প্রতিলিপি হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে।

উনি লিখেছিলেন,

“My dear Abdullah, I am here. The game is up. I suggest you give yourself up to me and I’ll look after you.”


প্রথম পর্ব
১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১
টঙ্গী, পূর্ব পাকিস্তান

নিয়তির অমোঘ বিধানের মত চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো ঘটনাপ্রবাহ। ভারতীয় সেনাদের একটি অংশ মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় টঙ্গীর কাছাকাছি পৌছে গেছে। পাকিস্তানীরা তাদের ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষনের মাধ্যমে স্বাগত জানায়। যদিও নামকাওয়াস্তে দু-চারটি ট্যাঙ্ক আর কিছু সৈনিক ছাড়া সেখানে তেমন কোন প্রতিরক্ষা ছিল না। তবে এর ফলে ভারতীয় বাহিনী মনে করলো যে ঢাকা-টঙ্গী সড়ক সুরক্ষিত রয়েছে, যার ফলে ভারতীয়রা ঘুরো পথে মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। ভাগ্যক্রমে কর্নেল হামিদের অধীন পাকিস্তানী সেনারা কেবলই সে পথ থেকে সরে গিয়েছিলো ৬ তারিখ খুলনা থেকে পালিয়ে আসবার পর। কর্নেল হামিদের সেনাদের অনুপস্থিতি ভারতীয় সেনা এবং মুক্তিবাহিনীকে মুক্তভাবে দক্ষিন পশ্চিম থেমে ঢাকা অভিমুখে অগ্রযাত্রার সুযোগ করে দেয়। নাহলে বিজয়ের আগে ঢাকার খুব কাছে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিলো উভয় পক্ষেরই।

ব্রিগেডিয়ার বশীর এই মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্ট বাদে বাদবাকী প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার সুরক্ষার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত, যদিও এ জন্য তার হাতে পর্যাপ্ত সৈন্য কিংবা গোলাবারুদের মজুদ কিছুই নেই। আজ দুপুরের দিকে তিনি জানতে পেরেছেন মানিকগঞ্জ-ঢাকা সড়ক পুরোপুরি অরক্ষিত। উনি রাতের প্রথম অর্ধেক পার করলেন ইপিসিএফের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিট সমুহকে জড়ো করতে, এভাবে তিনি এক কোম্পানীর মত শক্তি সম্পন্ন একটা সেনাদল প্রস্তুত করলেন এবং মেজর সালামতের অধীনে মিরপুর ব্রীজের কাছে মোতায়েন করলেন। ভারতীয় বাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের একটি দল ১৬ ডিসেম্বর শেষরাতের দিকে এদিক দিয়ে ঢাকায় অগ্রসর হতে চাইলেন, মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে তাদের কাছে খবর ছিল যে এই পথটি অরক্ষিতই রয়েছে।। কিন্তু ততক্ষণে মেজর সালামতের দল সেখানে প্রস্তুত ছিলো এবং ভারতীয়দের দিকে অন্ধের মত গোলাবর্ষণ শুরু করে। এতে বেশ কিছু ভারতীয় সেনা মারা যায় এবং দুটি ভারতীয় জীপ পাকিস্তানীদের হস্তগত হয়। হস্তগত হয় একটি দিনের অর্ধেকেরও কম সময়ের জন্য!!

এটিই খুব সম্ভবত ঢাকার আসেপাশের কোন এলাকায় সর্বশেষ মুখোমুখি সংঘর্ষ ছিলো। এরপর আত্মসমর্পনের আগে ও পরে ঢাকা ও আসেপাশের নানা এলাকায় বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চলে যাতে যৌথবাহিনী এবং পাকিস্তানীদের বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা

ঘড়ির কাটা ১২ টা পার করেছে, শুরু হয়েছে নতুন দিনের। যা দুই দেশের ইতিহাসে দুভাবে লেখা থাকবে। প্রায় সবজায়গায় বার্তাটি পৌছে গেছে ইতিমধ্যেই। এরপরেই অফিসার কমান্ডিং ৪ নং এভিয়েশন স্কোয়াড্রন লেঃ কর্নেল লিয়াকত বুখারীকে তার শেষ ব্রিফিঙের জন্য তলব করা হয়েছে। তাকে বলা হলো ৮ জন পশ্চিম পাকিস্তানী নার্স এবং ২৮ পরিবারের সদস্যকে সে রাতেই বার্মার (বর্তমানে মায়ানমার) আকিয়াবে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার উপর দিয়ে।

দুটি হেলিকপ্টার রাতেই বার্মার দিকে উড়ে গেলো এবং তৃতীয়টি সকালের আলো ফোটার পর রওনা দিলো। সেখানে জেঃ রহিম সহ আরো বেশ কয়জন ছিলেন, কিন্তু নার্সদের নেয়া যায়নি তাদের সময়মত জড়ো করতে না পারার কারণে। .হেলিকপ্টার গুলো বার্মায় পৌছেছিলো এবং এর আরোহীরা পরে নিরাপদেই করাচী পৌছায়। পাকিস্তানীরা ততক্ষণে তাদের নিয়তির ব্যাপারে জেনে গিয়েছে। আরো কিছুদিন লড়াইয়ের ইচ্ছা থাকলে তারা হেলিকপ্টারগুলো তখনই পাঠিয়ে দিত না, যেহেতু নানা বিচ্ছিন্ন ফর্মেশনে রসদ পৌছানোর একমাত্র অবলম্বনই ছিলো এই হেলিকপ্টারগুলো।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান

সূর্যোদয় হচ্ছে, ঠিক একই রকম সূর্য যা গতকালও উঠেছিলো। আজও ঠিক সেভাবেই উঠছে। কিন্তু আজকে এই সূর্য অন্য এক ইতিহাসের সাক্ষী হবে!

জেনারেল নাগরার সেনারা ঢাকার পশ্চিম উপকন্ঠে এসে পৌছেছেন যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক ১২ দিন পরেই। ইতিমধ্যে দেশের নানা স্থানে পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পন করতে শুরু করেছিলো এবং টাইগার নিয়াজী বুঝতে পারছিলেন খেলা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

(জেনারেল নাগরা আর জেনারেল নিয়াজী একে অপরের পরিচিত ছিলেন, বন্ধুও বলা চলে। তারা দুজনেই রাজকীয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং এর আগে দেহরাদুন মিলিটারী একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে কোর্সমেট ছিলেন। তাদের চেনাজানা আর বাড়ে যখন জেঃ নাগড়া করাচীতে ভারতীয় হাইকমিশনের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন এবং জেনারেল নিয়াজী সিন্ধুর একটি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন।)

একসময়ের বন্ধু, ক্লাসমেট এবং কোর্সমেট এই দুই জেনারেল আজ প্রতিপক্ষ হিসেবে যুদ্ধে লিপ্ত, নিজ নিজ দেশের হয়ে। যদি জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পনের জন্য রাজী হন তবে জেনারেল নাগরা চাইছিলেন পুরোনো এক বন্ধুর কাছেই সেই আত্মসমর্পনের সুযোগ দিতে।

ভোর থেকেই জেঃ নিয়াজী বেতারে অস্ত্রবিরতির আহবান জানিয়ে বার্তা প্রচারের নির্দেশ দেন যা যৌথ বাহিনীর সেনারা ইন্টারসেপ্ট করেন। ভোরের দিকে জেনারেল নাগরা সাভারের কাছে পৌছালে ৯৫ নং মাউন্টেন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ক্লের তাঁকে এই বার্তা সম্পর্কে অবগত করলেন।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
মিরপুর ব্রিজ, আমিনবাজার, ঢাকা
সকাল ৮ টা

জেনারেল নাগরা এবং তার সেনারা মিরপুর ব্রিজের অদূরে পৌছেছেন। মুক্তিবাহিনীর নানা দল আগেই এসে সেখানে অবস্থান নিয়েছিলো। জেনারেল নাগরা সেখানে পৌছে একটি কলম এবং ছোট রাইটিং প্যাড থেকে ছিঁড়ে একটুকরো কাগজ বের করলেন পকেট থেকে। প্যাডের পেপারটি জীপের হুডের উপর রাখলেন এবং তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত চিট-টি (সংক্ষিপ্ত অফিসিয়াল নোট) লিখবেন লেঃ জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর উদ্দেশ্যে, যা পরবর্তীতে দেশ বিদেশের নানা সংবাদ মাধ্যমে হুবহু প্রতিলিপি হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে।

উনি লিখেছিলেন,

“My dear Abdullah, I am here. The game is up. I suggest you give yourself up to me and I’ll look after you.”

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
সদর দপ্তর, ১৪ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
সকাল ৯ টা

জেনারেল নাগরার লেখা সরল ব্যক্তিগত মেসেজ, যা জেনারেল নিয়াজীকে মানসিকভাবে আরো ভেঙ্গে দেয়ার জন্যই হয়তো লেখা হয়েছিলো, তা জেনারেল নাগরার এডিসি (এইড ডি ক্যাম্প) ক্যাপ্টেন মেহতা এবং ২ নং প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের এডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন নির্ভয় কুমার একটি খোলা জীপে করে সাদা পতাকা উড়িয়ে ১৪ নং ডিভিশনের সদর দপ্তরে এসে পৌছে দিয়েছেন। রাস্তায় তাদের দেখে অনেক বাঙ্গালী ‘জয় বাংলা” শ্লোগান তুলছিলো আনন্দের আতিশয্যে, পাকিস্তানী সেনা এবং তাদের সমর্থকদের পরোয়া না করেই।

মেজর জেনারেল জামশেদ, মেজর জেনারেল ফরমান এবং রিয়ার এডমিরাল শরীফ জেনারেল নিয়াজীর সাথেই ছিলেন যখন আনুমানিক ৯ টার সময় এই নোটটি পৌছে দেয়া হয় তার হাতে। জেনারেল ফরমান, যিনি তখনো “যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার” বার্তার অপেক্ষায় ছিলেন, জেনারেল নিয়াজীকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “Is he ( General Nagra) the negotiating team?”

জেনারেল নিয়াজী কিছু বললেন না।

তখন তাদের মনে একটাই চিন্তা কাজ করছিলো যে জেনারেল নাগরাকে আলোচনার জন্য নিয়ে আসা হবে নাকি প্রতিরোধ করা হবে, যিনি ইতিমধ্যে শহরের উপকন্ঠে পৌছে গেছেন।

কিছুক্ষণ পর সব জেনে জেনারেল ফরমান জেনারেল নিয়াজীকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “’Have you any reserves?”

জেনারেল নিয়াজী এবারও কিছু বললেন না। রিয়ার এডমিরাল শরীফ এবার উর্দুতে পাঞ্জাবী উচ্চারণে বললেন,

– “কুজ পাল্লে হ্যায়? (Have you anything in the kitty?)”

জেনারেল নিয়াজী এবার ঢাকার ডিফেন্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল জামশেদের দিকে তাকালেন, যিনি মাথা নাড়লেন, যার একমাত্র অর্থ করা যায়, “কিছুই নেই!“

জেনারেল ফরমান এবং এডমিরাল শরীফ প্রায় একসাথেই বললেন,

– “যদি তাই হয়, তবে সে (জেঃ নাগরা) যা চায় তাই করুন। (If that is the case, then go and do what he (General Nagra) asks!)”

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের মাথারা মেনে নিলেন যে যুদ্ধ তারা হেরে গেছেন!!

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
মিরপুর ব্রিজ, ঢাকা
সকাল ১০ টা

আরো কিছুক্ষণ আলোচনার পর বর্তমান পরিস্থিতি এবং তাদের অবশিষ্ট শক্তি বিবেচনায় এনে জেনারেল নিয়াজী ঠিক করলেন যে জেনারেল জামশেদকে পাঠাবেন জেনারেল নাগরাকে ‘অভ্যর্থনা’ জানাতে।

জিওসি ১৪ ডিভিশন, মেজর জেনারেল জামশেদ, মেজর জেনারেল নাগরার কাছে মিরপুর ব্রিজের কাছে দৃশ্যত আত্মসমর্পনই করলেন, যদিও তখনো তার কাছে ঢাকা রক্ষা করবার জন্য ২৪,০০০ সেনা মজুদ ছিলো। তিনি নিশ্চিত করে বললেন ঢাকায় ঢুকবার পথে কোন বাধার সম্মুক্ষীন হতে হবেনা। পাকিস্তানী সেনাদের উনি জেনারেল নাগরাকে শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ে যেতে বললেন এবং যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বললেন। যদিও সবাই বুঝে গিয়েছে ইতিমধ্যে যে যুদ্ধবিরতি নয়, আত্মসমর্পনই ঘটতে যাচ্ছে।

সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রথমে ২ নং প্যারা ব্যাটালিয়ানের সেনারা কাদেরিয়া বাহিনীর কাদের সিদ্দিকী এবং তার অনুগত বাহিনী সহ ঢাকায় প্রবেশ করেন। এর কিছু পরেই ব্রিগেডিয়ার হারদেব সিং এর অধীন ৯৫ নং মাউন্টেন ব্রিগেডের ইউনিটগুলোও ঢাকায় প্রবেশ করে কোন বাধা ছাড়াই।

এর মাধ্যমেই দৃশ্যত ঢাকার পতন ঘটলো, যদিও তখনো আত্মসমর্পনের দলিল সাক্ষরিত হয়নি। হৃদরোগীর মতো নীরবে পতন ঘটলো ঢাকার, কোন অঙ্গহানী নেই, কোন মারামারি কাটাকাটি নেই। অনেকটা নীরবেই এই শহরটি একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে পরিবর্তিত হয়ে গেলো। সিঙ্গাপুর, প্যারিস কিংবা বার্লিনের পতনের গল্পের মতো কোনকিছুর নতুন দৃশ্যায়ন ঘটলো না…

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
সকাল ১১ টা

জেনারেল নাগরা তার বার্তা পাঠিয়েছিলে দুঘন্টাও হয়নি সম্ভবত। এখন তিনি জেনারেল নিয়াজীর অফিসে পৌঁছেছেন। জেনারেল নিয়াজী জানতেন যে উনি যুদ্ধে হেরে গেছেন, সময়ের ব্যাপার রয়ে গেছে এখন। আরো দেরী করা মানে দুইপক্ষেই আরো হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকা।

যখন জেঃ নাগরা জেঃ নিয়াজীর অফিসে হেটে প্রবেশ করছিলেন, তখন সবার মুখ দেখে ঠিকঠাক বুঝে গিয়েছিলেন পাকিস্তানীরা কি ভাবছে। জেঃ নিয়াজীর গালে কিছু মাংস লেগেছে, একটু ঝুলে গেছে হয়তো কিন্তু জেঃ নাগরা ঠিকঠিক চিনে নিলেন তাকে।

জেনারেল নাগরা জিজ্ঞেস করলেন,

– “Hello Abdullah, how are you?”

জেঃ নিয়াজী ভেঙ্গে পরলেন, হয়তো পুরা জীবনে এই প্রথমবার। ধরে আসা গলায় বললেন,

– “পিন্ডি মে ব্যায়ঠে হুয়ে লোগোনে মারওয়া দিয়া! (The people sitting in Pindi doomed us.)“

জেনারেল নাগরা তাকে কিছুটা হালকা হতে দিলেন। এরপর পূর্ব থেকেই পরিচিত জেনারেল নিয়াজী এবং নাগরা হাসি তামাশা, প্রকাশ অযোগ্য ঘননীল কৌতুক বিনিময়ে মেতে উঠলেন। এবং চা পানের পালাও শেষ হলো। এরপর বাকীটূকুও ইতিহাস হয়েই রইবে।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
দুপুর ১২ টা

একটূ আগে জেঃ নিয়াজী খবর পেয়েছেন মাগুরায় জিওসি ৯ নং পদাতিক ডিভিশন, মেজর জেনারেল আনসারী আত্মসমর্পন করেছেন তার সকল সেনা সহ। উনি বুঝতে পারলেন উনার হাতের সব তাসই দমকা হাওয়ায় উড়ে গেছে…

জেনারেল নাগরা তেজগাও বিমানবন্দরে চলে গেছেন চীফ অফ ইস্টার্ন কমান্ড মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকবকে অভ্যর্থনা জানাতে, উনি আগরতলা থেকে হেলিকপ্টারে উড়ে এসেছেন। কেবলমাত্র একটা কাজই বাকী আছে, আর তা হচ্ছে আত্মসমর্পনের দলিলের খসড়া তৈরী করা।.

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
দুপুর ১ টা

জেনারেল জ্যাকব ঢাকার বিধ্বস্ত এয়ারফিল্ডে হেলিকপ্টার থেকে অবতরণ করেছেন। উনার স্টাফ অফিসার কর্নেল খারা সহ উনি সরাসরি নিরস্ত্র অবস্থাতেই ঢাকা ক্যান্টোনমেন্টে জেঃ নিয়াজীর অফিসে চলে গেলেন। সেখানে উনি জেঃ নিয়াজীকে অস্ত্রবিরতির চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়ে আত্মসমর্পনের জন্য রাজী করাতে চেষ্টা করলেন। জেঃ নিয়াজী তখনো আশা করছিলেন ভারতীয়রা হয়তো যুদ্ধবিরতিতে রাজী হবে এবং পরে আমিরিকা এবং চায়নার চাপে কোন না কোনভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে।

কর্নেল খারা আত্মসমর্পনের খসড়া দলিল পাঠ করে শেষ করবার সাথে সাথেই জেনারেল ফরমান, যিনি অপারেশন সার্চলাইটের মুল পরিকল্পনাকারী ছিলেন, আপত্তি জানালেন। ঘন্টাখানেক আলাপ আলোচনার পরেও পাকিস্তানীরা রাজী না হতে চাইলে জেনারেল জ্যাকব তার শেষ চাল চাললেন। উনি বললেন, হয় আত্মসমর্পন, নাহলে কিছুই নয়। তখন ব্যাপারটা মুক্তি বাহিনীর উপর ছেড়ে দেয়া হবে। এরপর সবকিছু ভেবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জেঃ নিয়াজীকে ৩০ মিনিট সময় দেয়া হল।

সময় শেষ হবার ১০ মিনিট আগেই জেঃ নিয়াজী আত্মসমর্পনের শর্তাবলী লেখা কাগজ জেনারেল জ্যাকবের দিকে ঠেলে দিলেন।

জেঃ জ্যাকব জেঃ নিয়াজীকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “’General do you accept this document?”

জেঃ নিয়াজী চুপ করে রইলেন, এরপর আরো তিনবার একই কথা জিজ্ঞেস করবার পরেও কোন জবাব এলোনা। জেনারেল জ্যাকব পেপারগুলো তুলে নিলেন এবং বললেন,

– “I’d take it as accepted!”

জেনারেল জ্যাকব জেঃ নিয়াজীর নিরবতাকেই সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন। ঠিক ওই মুহূর্তে পিনপতন নিরবতা বজায় করছিলো সেই কক্ষে, উপস্থিত সকলে লক্ষ্য করছিলো জেঃ নিয়াজীর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কে জানে, এটাও হয়তো জীবনের প্রথম…

জেঃ নিয়াজী বললেন,

– “আমি অন্য কোথাও সারেন্ডার করবোনা। আমি ঢাকা অফিসেই সারেন্ডার করবো! (‘I won’t surrender anywhere else. I’ll surrender in the Dhaka office.’ )”

জেনারেল জ্যাকব বললেন,

– “না, আপনি রেসকোর্সে ঢাকার মানুষের সামনেই আত্মসমর্পন করবেন!”

জেঃ নিয়াজী বিড়বিড় করে বললেন,

– “আপনি মনে হয় গার্ড অব অনারও প্রদান করবেন!”

জেনারেল জ্যাকব পরে তার আত্মজীবনীতে এ ব্যাপারে লিখবেন,

“It was he (Lt Gen Niyazi) who had said Dhaka would fall over ‘my dead body’. That’s why I made it a point to make him surrender in front of the people of Dhaka.”

(চলবে…)

তৃতীয় পর্ব

ইস্টিশনে পূর্বে প্রকাশিত, পরিমার্জিত
চেকপয়েন্টঃ আদর্শ, দেশপ্রেম, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার অল্প গল্প) – ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 83 = 86