বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমেরিকা এবং জাতিসংঘের ভূমিকা


বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার মত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে আমেরিকার তৎকালীন নিক্সন সরকার ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানিয়ে আসছিল।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন বাংলাদেশের বিজয় সুনিশ্চিত ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ‘পাকিস্তান বনাম ভারত-বাংলাদেশ’ যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের গতিবেগকে স্তিমিত করে পাকবাহিনীকে পুনরায় অস্রে সজ্জিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। আমেরিকা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশ অভিমুখে ৭ম নৌবহরও পাঠিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) হুমকির মুখে আমেরিকা শেষ পর্যন্ত এ নৌবহর প্রেরণ বন্ধ করে।

তবে আমেরিকার ডেমোক্রেটিক দলের উদারপন্থী নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অনেকটা সোচ্চার ছিলেন। আমেরিকার গণযোগাযোগ ও প্রচার মাধমের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দ্বিধাহীনভাবে প্রচার চালিয়েছিল যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ভারতে আশ্রিত বাংলাদেশী শরণার্থীদের জন্য আমেরিকার সমর্থকগোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ সাহায্য-সামগ্রী পাঠিয়েছিল যা অস্বীকার করার উপায় নেই। ডেমোক্রেটদের চাপের মুখে নিক্সন সরকার অবশেষে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পর অনতিবিলম্বে স্বীকৃতি দেয়।

অন্যদিকে, পৃথিবী থেকে যুদ্ধের ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা দূর করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, বিশ্বমানবাধিকার এবং মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু অনিয়মতান্ত্রিক এবং অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখে বাঙালিদের স্বাধীনতা অর্জনের ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পাকিস্তান কর্তৃক নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাওয়াকে জাতিসংঘ প্রতিবাদ বা ধিক্কারটুকু জানায়নি। পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাঙালিদের মৌলিক মানবাধিকার লঙগণের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোন কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করেনি। বরং পরোক্ষভাবে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীকে সমর্থন জানিয়েছে।

শুধু তাই নয়, মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিকে জাতিসংঘে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে কোন বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সমর্থক বাঙালি রাজাকার নেতারা পাকিস্তানের পক্ষে অবলীলায় বক্তব্য প্রদানের সুযোগ পেয়েছিল।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিকে জাতিসংঘে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হলেও যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানের সংকটকালে যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার প্রদত্ত ভেটো’র ফলে নিরাপত্তা পরিষদের এ কৌশলী প্রস্তাব কার্যকর হতে পারেনি।

সুতরাং, বিশবমানবতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পতাকাবাহী জাতিসংঘ বাংলাদেশের নির্যাতিত, অধিকারহারা, স্বজনহারা মানুষজনের বিপক্ষে নির্লজ্জ ও দুঃখজনক ভূমিকা পালন করেছিল। যা জাতিসংঘ নামক এ পুরো বিশ্ব সংস্থাটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক
ই-মেইলঃ [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমেরিকা এবং জাতিসংঘের ভূমিকা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − = 62