কেন পড়ি কবিতা?

কবিতা- একটা সীমাহীন, সীমানাহীন অদৃশ্য অথচ অনুভবযোগ্য সুবৃহৎ জগৎ। বসবাসযোগ্য কুটির অথবা পালিয়ে থাকার মত অরণ্য , নিরাশ্রয়ীর গৃহ, বিত্তহীনের সম্পদ, ক্ষমতাহীনের সাম্রাজ্য এমনি আরও অনেক অনেক কিছু । কবির কাছে কবিতা দিগন্তহীন বিশ্বলোক। কিন্তু যারা কবি নন তারাও কেন কবিতার কাছে যায় ? পৃথিবীতে যদি কেউ কোনোদিন একটাও কবিতা না লিখতো ? কবিতা কি অনিবার্য ছিলো মানুষের সৃজনশীলতার ইতিহাসে?মানুষ পদ্যের ভাষায়, ছন্দ মিলিয়ে কথা বলতো একসময়। কিন্তুু সেটা কবিতা নয়। সৃজনশীল সচেতন প্রয়াসের মধ্য দিয়ে কবিতা রচনা কেন করলো মানুষ? এগুলোর কোন সার্বজনীন উত্তর সম্ভবত নেই । সবাই একই কারণে কবিতা লেখেনা বা পড়েনা । প্রত্যেকের নিজস্ব একটা উত্তর থাকে বলে মনে হয় ।

প্রশ্নগুলোর উত্তর আর একটা প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া যায়। কবিতা আমাকে কি দিচ্ছে অথবা আমি কবিতার কাছে কি পাচ্ছি ? বলা যায় যে কোন কবিতা, তা কবির এক বিশেষ অভিজ্ঞতালব্ধ মুহূর্তের ফসল, অনুভূতি বা অনুভবের ভাষিক রূপায়ন । কবিতা যতটা না বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন তার চাইতে অনেক বেশি আবেগের সঞ্চরণ ।তবে শুধু আবেগিক প্রযোজনাই কবিতা নয়। কবিতা হয়ে উঠার জন্য প্রয়োজন সংযত আবেগের শৈল্পিক উপস্থাপন । কবিতায় যদি এই নিয়ন্ত্রিত আবেগ সঞ্চালনের সাথে মননের সুষম প্রবাহ থাকে তখন তা উৎকৃষ্ট কবিতা হয়ে ওঠে । অর্থাৎ আবেগ ও অনুভবের সাথে চিন্তার যথার্থ শৈল্পিক সজ্জ্যায়ই কবিতা । এ অর্থে কবিতা ব্যক্তিনিষ্ঠ । কিন্তুু যথার্থ শিল্পের শক্তি ও সৌন্দর্য এইখানেই যে তা ব্যক্তিগত ভাবের প্রকাশ হলেও হয়ে ওঠে নৈর্ব্যক্তিক, সার্বজনীন । প্রকৃত কবিতার যাত্রা তাই ব্যক্তি থেকে বিশ্বের দিকে। পাঠক যখন কোন কবিতা পাঠ করে তখন সে নিজেও কবিতায় বর্ণিত অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায় । সাহিত্য মানুষের আবগেকে জাগিয়ে দেয় । কবিতা এই কাজটা সবচাইতে নিখুঁতরূপে করতে পারে । কবিতা পাঠের সময় পাঠকের সামনে তার নিজের ভেতর লুকানো জগতের প্রকাশ ঘটে । সে নিজেকে আবিষ্কার করে বর্ণিল বিচিত্রতায়, বহুরূপী সময় আর নানামুখী অভিজ্ঞতার সদর দরজায় । নিজেকে এইযে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবিষ্কার আর ভেতরের আবেগের জাগরণ – এটা পাঠককে সুখ দেয় । এই আবিষ্কার আসলে নিজেকে নতুন ভাবে সৃষ্টি করা । সৃষ্টির ফলে স্রষ্টার অর্থাৎ পাঠকের (পাঠক এখানে স্রষ্টা কারণ সে নিজে কবিতার অর্থ ও তাৎপর্য দাড় করায়) সুখ লাভ হয় । অর্থাৎ কবিতা সুখদায়ী।Robert Frost যেমন বলেছেন a poem begins in delight and ends in wisdom. এ সুখ কোন স্থুল বিনোদন নয়,বরং উচ্চতর মানসিক প্রশান্তিময় অবস্থা । Frost এর মতে শুধু সুখ লাভই শেষ কথা নয় । ভালো কবিতা পাঠকের মনে ও মননে ঢেউ তোলে, আর ভাবিয়ে তোলে নিজেকে ও জগতকে নিয়ে । পাঠককে এই ভাবনার অবকাশটুকু দিতে কবিতায় থাকা দরকার হয় বুদ্ধির প্রয়োগ । উল্লেখ্য , কবিতা দর্শন নয়, তবুও কবিতায় দার্শনিক প্রত্যয় কবিতার অর্থের গভীরতা দান করে । অনুসন্ধিৎসু কিংবা সুখপিপাশু পাঠকের কাছে এমন একটা কবিতা হয়ে ওঠে অনন্ত রহস্যের স্বর্গোদ্যান । পরম তৃপ্তির সাথে চলে জীবনের অর্থ অনুধাবনের মহৎকাজ । এই অবকাশটা কবিতা আমাকে (পাঠককে) দিচ্ছে বা বলা যায় শুধু কবিতাই পারে এমনটা দেওয়ার ক্ষমতা ধারণ করতে ।

অন্যদিকে কবিতা এক ধরণের আশ্রয়, আশ্রম ।আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, অতীতের বেদনামাখা স্মৃতি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা অথবা এই অনিশ্চত ভবিষ্যৎ কে নিয়ে দুর্ভাবনা যখন আমাদের শঙ্কিত, বিচলিত করে, তখন প্রয়োজন হয় পলায়ন । কারণ যাপিত জীবন বিশ্রী লাগে, অসজ্য ঠেকে । সাহিত্য সাধনা বা শিল্প চর্চা এই বাধ্যতামূলক পলায়নের উৎকৃষ্ট মাধ্যম । এর মধ্যে ডুবে থাকা যায়, ভেসে থাকা যায় । আর কবিতাই সেক্ষেত্রে হতে পারে নিরাপদ আশ্রয়স্থল । মাতৃস্নেহতুল্য মমতায় কবিতা তার বক্ষে ধরে রাখে পলায়নকারীকে । কবিতা যেমন আশ্রয় দিয়ে করুণ জীবন থেকে সাময়িক মুক্তি দেয় তেমনি আবার নিজেকে আবিষ্কারে সুখও দেয় । কবিতা আমাকে (পাঠককে) সুখ ও ভাবনার খোরাক দিচ্ছে আর আমি (পাঠক)পাচ্ছি আশ্রয়। এ জন্যই মানুষ (আমি) কবিতার কাছে যায় বার বার । খোঁজ করে ভালো কবিতার । একটা ভালো কবিতা পারে পাঠককে দৈনন্দিন, ক্লিশে হয়ে যাওয়া ভাবনার বৃত্ত থেকে বের করে এনে নতুন চিন্তার দিকে ধাবিত করতে । অর্থাৎ কবিতা আমাদের দুর্ভাবনাকে ভাবনায় রূপান্তরিত করে, আমাদের বিরহ ব্যথাকে সহনীয় করে, আমাদের দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে আমাদের বেঁচে থাকাকে সুন্দর ও সার্থক করে তোলে ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 + = 61