‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ – ধর্ষণের বৈধতা ও ধর্ষকের বাঁচার রাস্তা করে দিবে

সরকারের ভাষায়, ‘দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে সামনে এগিয়ে চলছে’। অথচ দেশের এই এগিয়ে চলার সময়ে সরকার এমন একটি আইন করতে যাচ্ছে, যাতে মনে হচ্ছে দেশ আসলে কয়েক বছর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। সরকার বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন বাস্তবায়নের জন্য মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাচ্ছে। বাল্য বিবাহ রোধে বিয়ের বয়সই কমিয়ে দেয়া হচ্ছে, সরকার কি বুদ্ধিমান। আজ যদি কোন মেয়ের বিয়ে ১৬ বছর বয়সে হয়, তাহলে সেটা বাল্য বিবাহ বলে বিবেচিত হবে। অথচ নতুন বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন কার্যকর হলে (হয়তো আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে), ধরুন সেটা ২০২০ সাল, কোন মেয়ের ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হলেও সেটা বাল্যবিবাহ বলে গন্য হবে না!! তাহলে দেশ কি এগিয়েছে না পিছিয়েছে?

সংবাদে দেখলাম, যারা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের সমালোচনা করছেন, আজ সংসদে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী তাদের ধুয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ”যারা আইনের সমালোচনা করছেন, তারা কখনো গ্রামে ছিলেন না, তারা গ্রামের আর্থ সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত নন।”

আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো গ্রামেই বড় হয়েছেন, গ্রাম থেকে এমপি হয়েছেন! যদি গণভবনটা ঢাকা থেকে সরানো যেতো, তাহলে হয়তো তিনি সেটা গ্রামে নিয়ে যেতেন! তার চেয়ে গ্রামের অবস্থা সমালোচনাকারীদের বেশি বোঝার কথা নয়। অবশ্য মাননীয়ার এই কথা শুনে আমার মনে একটা প্রশ্ন কিলবিল করছে, আচ্ছা প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া, আমাদের দেশে কি গ্রামের জন্য এক আইন আর শহরের জন্য আলাদা আইন? যদি না হয়, তাহলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রনয়নে গ্রাম – শহরের বিবেচনা কেন করছেন?

সংবাদে আরো দেখলাম, দেশপ্রেমের খনি, মহাজ্ঞানী, তথ্যভান্ডার, মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “যারা বেশি সমালোচনা করছে, তাদের সমাজের প্রতি দায় দ্বায়িত্ব কম। তারা এনজিও চালিয়ে টাকা কামানোর জন্যই এই সমালোচনা করছেন!”
অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী কত দয়ালু আর কত দ্বায়িত্ববান। তিনি বলেছেন, যদি কোন কারণে ( কি কারণে…?) একটি মেয়ে ১৩ -১৪ বছর বয়সে গর্ভধারণ করে এবং সেই মেয়ে যদি সন্তান প্রসব করে, তাহলে জন্ম নেয়া সন্তানের কি হবে, তাকে কি সমাজ গ্রহণ করবে? এক্ষেত্রে সমাজ তাকে গ্রহণ করতে হলে মেয়েটিকে বিয়ে দিতে হবে। কিন্ত কার সাথে বিয়ে দিবে, যে ‘কারণটি’ ঘটিয়েছে, তার সঙ্গে?? তাছাড়া জন্ম নেয়া শিশুটি কার পরিচয়ে বড় হবে? এই চিন্তা করে শিশুটির প্রতি দয়াশীল হয়েই প্রধানমন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাকে যে অবৈধভাবে জন্ম দিয়েছে, সেই অপরাধের বৈধতা দেয়ার জন্য, শিশুটিকে পিতার পরিচয়ে পরিচিত করার জন্য এই আইন প্রনয়ন করতেই হবে। এর বিকল্প কিছু নেই।

আমাদের দায়িত্ববান প্রধানমন্ত্রী কি বুঝতে পারছেন, আপনার আইনের এই ফাঁক ফোকর দেশে ধর্ষণের সংখ্যা বাড়িয়ে দিবে? একজন ধর্ষক একটি ১৪ বছরের মেয়েকে যদি ‘কারণ’ ঘটিয়ে দেয় এবং সেই মেয়েটি যদি গর্ভধারণ করে, তাহলে এই আইন অনুযায়ী, সমাজের কথা বিবেচনা করে সেই মেয়েটিকে ‘কারণ’ ঘটানো লম্পট লোকটির সাথে বিয়ে দিতে হবে! অর্থাৎ এই আইনের মাধ্যমে ধর্ষক বাঁচার একটি পথ পেয়ে গেলো!

এবার একটু সিরিয়াস কথা বলি, মাননীয়া, আমারা আসলেই উন্নয়নের দিকে এগুচ্ছি। নারী শিক্ষা বৃদ্ধির হার সেই উন্নয়নের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। এসএসসি, এইচএসসি’র মতো পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের প্রায় সমান। সেটা গ্রাম শহর তারতম্য করে আলাদা করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া, আপনার চোখে যারা সমালোচনাকারী, তারা গ্রামে থাকে কিনা আমি জানি না। কিন্তু আমি গ্রামের একজন মানুষ হিসেবে জানি, আজকে গ্রামের একজন দিনমজুরও চায় তার মেয়েটি লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হোক। আপনি গ্রামের আর্থসামাজিক অবস্থার দোহায় দিয়ে নিজের ভুলকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করবেন না। আপনি এই আইন পাশ করিয়ে মেয়েদের শিক্ষা জীবনকে অনিরাপদ করে দিবেন না। কেননা, এই আইন হয়ে গেলে, কোন বখাটে একটা মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে আটক রেখে ‘কিছু ঘটালে’ তাকে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তখন সমাজ এবং পরিবারের কথা বিবেচনায় মেয়েটি হয়তো বিয়ে করতে বাধ্য হবে , কিন্তু জয়ী হবে সেই পশুটি-ই।

সর্বশেষ বলবো , মাননীয়া, আইনটি পাস করার আগে আইনের যদি কিন্তুর মারপ্যাচ দূর করুন। মেয়েদের বিয়ের নূন্যতম বয়স ১৮ রেখেই বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পাশ করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 + = 85