ব্যর্থতার আবোল তাবোল

চারদিকে ধোঁয়া। কুয়াশার ধোঁয়া নয় নব্য সিগারেট পোড়ার ধোয়া। নিকোটিন আর বমির উৎকট গন্ধে পুরো কক্ষটি নরকরূপ ধারন করেছে। আয়তনে ছোট মাস্টারবেড রুম এটি। রুমে ঢুকতেই ডানদিকে তিন ফুট বাই ছয় ফুটের একটা খাট। তার সামনেই পড়ার টেবিল। টেবিলে শুধু সিগারেটের খালি প্যাকেট । কালকে পর্যন্ত এখানে বই ছিল, পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে গল্প উপন্যাস সব।সমরেশের প্রায় সব বই পড়া আছে আলিফের। এতক্ষন চোখবুঝেই সিগারেট খাচ্ছিল সে। চোখখুলে সরাসরি নজর দিল ঘড়ির দিকে। ঘড়িতে এখন সময় রাত একটা বাজে। বাবা মা ঘুমিয়ে পরেছে। আরেকটা সিগারেট আনতে যাবে হঠাৎ মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখল, মেঝেতে বমি শক্ত হয়ে জমাট বেধে গেছে। এটা দেখার পর পেটে পাক দিয়ে আবার বমি হল আলিফের। ঘরটা পরিস্কার করা উচিত কিন্তু করতে ইচ্ছা করছে না তার। বুঝতে পারলো অতিরিক্ত সিগারেট খাওয়ার কারনেই বমির উদ্রেক হচ্ছে। প্রচন্ড ক্ষুদায় তার পাকস্থলী যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারাচ্ছে ধীরে ধীরে।কিন্তু তার খেতে ইচ্ছা করছে না। আলিফ কয়দিন আগে সিধান্ত নিয়েছে সে এভাবেই তার শরীর নষ্ট করে খুব শিঘ্রই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে।

আলিফ হঠাৎ করেই খাট থেকে উঠে দাড়ালো এবং নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে শুরু করল। হয়ত হেলুসিনেশন অথবা নিজেই নিজের বিপরীতে কথা বলছে।

তুমি এমন কেন করছো ?

কারন আমি চূড়ান্ত রকমের একজন ব্যার্থ একজন মানুষ। আমার মনে হয় দুনিয়ার সকল ব্যার্থ মানুষের নিজেকে কষ্ট দিয়ে শেষ করে ফেলা উচিত।

তোমার কি এমন ব্যার্থতা ?

আমার বয়স এখন ত্রিশ। ভাল স্কুল ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার আমার ভাগ্যে হয় নাই। অথচ আমি বরাবর ভাল ছাত্র ছিলাম।

আর কিছু ?

হুম। সব মানুষের জীবনেই প্রেম আসে।কলেজ থাকাকালীন সময়ে আমার জীবনেও প্রেম আসে।মেয়েটাকে দেখলেই মন ভাল হয়ে যেত। সময়ে অসময়ে ছুটে যেতাম তার কাছে। দূর থেকে দেখে চলে আসতাম। একসময় দুজনে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পরলাম। দুজনে একই ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। ক্লাসরুম থেকে ক্যান্টিন সবসময় একই সাথে থাকতাম। এই জন্য আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুর সংখ্যা তেমন বাড়ে নাই। দুইবছর চলে গেলো দুজনের একসাথে। দুইজনে মিলে বেশ ভাল রেজাল্ট করে স্নাতক কমপ্লিট করলাম। একদিন রাস্তার পাশের দোকানে বসে দুজনে ফুচকা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে রোদেলা বলল, আমাকে একমাসের মধ্যে বিয়ে কর। ছোটখাটো একটা চাকরি হলেই হবে। প্রথমে দশ বারো হাজার হলেই হবে। একরুমের একটা বাসা নিব। একটা ছোট আলমারি থাকবে।আলমারি ছোট হলেই হবে কারন দুজন মানুষের বড় আলমারির কোন প্রয়োজন নেই। একদিন আমিষ আরেকদিন নিরামিষ এই রুটিনে চলবে সারা মাস। এতে একদিকে খরচ বাঁচবে অন্যদিকে স্বাস্থ্যও থাকবে ঠিক। রোদেলার এই কথা শুনে আমি হেসেছিলাম আর বলেছিলাম অভাবে থাকলে ভালবাসা পানসে হয়ে যায়। একটু স্যাটেল হয়েই বিয়ে করে ফেলব।রোদেলা শুধু আমার হাত ধরে বলেছিল, বিয়ে করবে তো ? আমি বলেছিলাম, হুম। সে হেসেছিল। আমি নিশ্চিত সে হাঁসিতে সমাজতন্ত্র আর গনতন্ত্র একসাথে মিলিত হয়েছিল।
প্রায় একমাস পর রোদেলার মামা আমাকে ফোন দিয়ে বলল রোদেলা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করছে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল। কিছুদিন ধরে যে মেয়েটার চোখে মুখে আনন্দের ঝলকানি দেখতাম, সে আত্মহত্যা করে কিভাবে। পরের কাহিনী বলার ক্ষমতা আমার নাই। শুধু এটুকু বলব ওর লাশবাহী কফিনের ভর আজও আমি বয়ে চলি। আমার মনে হয় আমি সবসময় কাধে রোদেলার কফিন নিয়ে চলছি।এভাবে মৃত্যুর কারণটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। কয়েকদিন পর গেলাম থানায়। কিন্তু থানা আমার অভিযোগ নিল না, উলটা আমাকে হুমকি দিল। ও আরেকটা কথা বলাই হয় নাই, রোদেলার বাবা-মা কেও নেই। ও ওর মামা মামীর কাছে বড় হয়েছে।তাই সারাক্ষন দুঃখী হয়ে থাকতো। ও শুধু বলত, আলিফ তুমি ছাড়া আমার কোন সুখ নেই। একথা শুনে আমিও মাঝে মাঝে চোখ ভেজাতাম। দীর্ঘ দুইবছর আমি তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করেছি।

একদিন বাবা এসে বলল, আমরা বৃদ্ধ মানুষ। আর্থিকভাবেও প্রায় পঙ্গু। তুই এভাবে বেকার থাকলে কিভাবে চলবে।নিজের প্রতি না থাক বাবা-মার প্রতি তো সন্তানের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। আমি ভাবলাম, বাবা ঠিক বলেছে। যেই চিন্তা সেই কাজ। চাকরি তে জয়েন করলাম।ভাল অঙ্কের স্যালারির চাকরি। বাবা মাও খুশি। বাবার পাকস্থলীতে ক্যানসার ধরা পরেছে। প্রতিমাসে একটি করে থেরাপি দিতে হয়। থেরাপির খরচ প্রায় বিশহাজার টাকা।বেতনের টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা বেশ ভালো ভাবেই হয়ে যায়। কিন্তু গত তিনমাস ধরে আমার চাকরি নেই। কোম্পানী দেওলিয়া ঘোষনা করা হয়েছে। জমানো টাকা দিয়েই বাবার চিকিৎসা চলছে। অনেক খুঁজেছি চাকরি পাচ্ছি না।

আমি নিন্তাতই অসফল মানুষ। মেয়েটাকে আমি যদি একমাসের মধ্যে বিয়ে করতাম। তাহলে হয়ত মেয়েটা বেঁচে যেত। একটা মুহূর্ত সুখ না পেয়ে মরে গেল সে। সে তো আমার কাছে তেমন কিছু চাই নাই। তাহলে কেন আমি বিয়ে করলাম না। কেন ?
অন্যদিকে। বাবাকে বাঁচাতে না পারি অন্তত চিকিৎসা করাচ্ছি সেটাতেই সুখ খুঁজে নিতাম। কিন্তু এখন অবস্থা এমন যে, তার চিকিৎসাও আমি করাতে পারছি না। আমার কাছে মনে হয় আমি চাইলেই রোদেলাকে বাঁচাতে পারতাম। আমার উপর নির্ভর করছে বাবার মৃত্যু আর বেঁচে থাকা। কিন্তু আজকেই আমার জমানো টাকা শেষ। কালকেই বাবার থেরাপির ডেট। তাই চিন্তা করছি আজকেই মরে যাব। মৃত মানুষের কোন ব্যার্থতা নেই।

আলিফ তুমি খুব আবেগি মানুষ। তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস কর ?

হুম করি।

তাহলে তোমার এটাও বিশ্বাস করা উচিত। মৃত্যু অবধারিত।আর রোদেলার মৃত্যুতে তোমার কোন হাত নেই। তুমি মনে মনে এটা ভাবো, তুমি তাকে সত্যিই ভালবেসেছিলে। প্রকৃতি হয়ত চাইনি তোমরা মিলিত হও। রোদেলা তোমার কাছে অমর হয়ে থাকুক। তুমি বরং রোদেলার জন্যই আবার নতুন করে শুরু কর। আমার বিশ্বাস, তোমার বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা চলে যাবার কারনই হল তুমি চাকরি পাচ্ছ না। তুমি অনেক বড় হও। রোদেলার মত যারা আশ্রিত হয়ে অন্যায়ভাবে অত্যাচারিত হচ্ছে তাদের পাশে গিয়ে দাড়াও।
আলিফ চুপ করে থাকলো কিছুক্ষন। সে মেঝে পরিস্কার করল। জামা কাপড় ইস্ত্রী করে আলমারিতে রাখলো। বাবা মার ঘরে গিয়ে দেখলো। দুজনেই প্রশান্তির ঘুম দিচ্ছে। আলিফের চোখে জল আসল। তার ঘুমিয়ে পরতে হবে কারন সকালে একটা ইন্টারভিউ আছে।

হতাশা, গ্লানি সবকিছুই জীবনে চলার পথে থাকবে। হাজারো ব্যাস্ততার মাঝেও নিজের কথা শুনতে হবে। নিজেকে সময় দিতে হবে। মৃতদের ব্যর্থতা থাকে না, আর জীবিত মানুষের কাজই হল ব্যর্থতাকে সফলতার মোড়ক দেয়া

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ব্যর্থতার আবোল তাবোল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =