ধর্ষণ!

বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করেছে।পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণ-গণধর্ষণের খবর পাওয়া যায়।দিনে দিনে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই বাদ যাচ্ছে না।এর কারণ নানাবিধ হতে পারে।যার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে মানুষের মূল্যবোধের অভাব,পর্ণগ্রাফি দেখার মাধ্যমে বিকৃত মানসিকতা তৈরি হওয়া,বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও সঠিক বিচার না হওয়া।

মানুষের মূল্যবোধ এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।
তারা অপরাধ সংঘটনে কোন বাছ-বিচার করছে না।এক্ষত্রে আইনী গলদও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে।

প্রায় শতবর্ষের পুরনো প্রমাণ সংক্রান্ত আইনের (এভিডেন্স অ্যাক্ট) কারণে ধর্ষণের অভিযোগ থাকার পরও অনেক আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। শতকরা ৭৫ ভাগ আসামী এ ধারার সুবিধা নিচ্ছে।

১৮৭২ সালে প্রমাণ আইনের ১৫৫(৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যখন কোনও পুরুষকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় বা তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয় তখন ভুক্তভোগী নারীকে চরিত্রহীন হিসেবে দেখানো হতে পারে। ’
অধিকার কর্মীদের মতে, সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যদি প্রমাণ করা যায় ধর্ষণের শিকার নারীর অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে ওই নারীকে চরিত্রহীন হিসেবে অভিহিত করা হয়। একইসঙ্গে অপরাধীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও অনেকটা লঘু হয়ে যায়। তারা বলেন, ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামীদের ৭৫ ভাগই প্রমাণ সংক্রান্ত আইনের ১৫৫ (৪) ধারা অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ হাজির করে আদালতে। আইনের ফাঁক গলে তারা খালাস পেয়ে যায়।

১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের শিকার ৪ হাজার ৩০৪ জনের মধ্যে ৭৪০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ধর্ষণের শিকার ৩০৭ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১১৪ জনকে। ২০০৯ সালে ধর্ষণের শিকার ৩৯৩ জনের মধ্যে ১৩০ জন, ২০১০ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৯৩ জনের মধ্যে ৬৬ জন, ২০১১ সালে ধর্ষণের শিকার ৬৩৫ জনের মধ্যে ৯৬ জন, ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার ৫০৮ জনের মধ্যে ১০৬ জন, ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ৫১৬ জনের মধ্যে ৬৪ জন, ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৪৪ জনের মধ্যে ৭৮ জন এবং ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার ৮০৮ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৮৫ জনকে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান বলছে, (জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য) ২০০১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হন ১৮১ জন গৃহকর্মী। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণের পর মোট কতজনকে হত্যা করা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত বছরেই ধর্ষণের শিকার ১১ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় চারজন গৃহকর্মীকে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের ৯ (২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে। ’ একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, ‘যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং উক্ত ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে’।

এতকিছুর পরও ধর্ষণের হার কমছে না।অনেক ক্ষেত্রে, পুলিশ প্রশাসনই ধর্ষকদের আশ্রয় দেয়।তাছাড়া ধর্ষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক কোন পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না সরকারের তরফ থেকে।অন্যদিকে,পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণকে ব্যবহার করা হয় জাতিগত নিপিড়নের হাতিয়ার হিসেবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি নারী ও শিশু ধর্ষণ-ধর্ষণ প্রচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন ৩৪ জন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৭ জনে। এক বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুনে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালে কমপক্ষে ৩৩ জন পাহাড়ি নারী-শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪ জন এবং ধর্ষণ প্রচেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৯ জন। এছাড়া অপর এক পাহাড়ি নারী বাঙালি ব্যবসায়ী কর্তৃক মারধরের শিকার হয়েছেন।সবকটি ঘটনায় সেনাবাহিনী আর সেটলাররা জড়িত।

সেনা-সেটলার কর্তৃক আমাদের জুম্ম মা বোন ধর্ষণের শিকার হলেও সুবিচার পাওয়া যায় না।বরং উল্টো ভিকটিমের মেডিক্যাল রিপোর্টে নেগেটিভ রেজাল্ট দেয়া হয় অর্থাৎ ধর্ষিত হয়েও ধর্ষিত নয়।এ থেকে নির্মম,অমানবিক আর কি হতে পারে?মেডিক্যাল রিপোর্টের ক্ষেত্রে যারা দায়িত্বে থাকে,তাদেরকে নেগেটিভ রেজাল্ট দিতে সেনাবাহিনী চাপ প্রয়োগ করে।

ফলে ভিকটিম মারা গেলেও পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে আসামীরা খালাস পেয়ে যায় আর সেনা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থাকে।জুম্ম নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়,তাদের দিকের হায়েনার মতো করে চেয়ে থাকে সেনা-সেটলার রা।গতকাল (৭ ডিসেম্বর ২০১৬)এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ধর্ষণের প্রচেষ্টা চালায় এক সেটলার বাঙ্গালি ট্রাক চালক।

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের রাঙাপানিছড়া এলাকায় এসএসসি পরীক্ষার্থী এক পাহাড়ি(চাকমা) ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৭ ডিসেম্বর) বেলা দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
ধর্ষণ চেষ্টাকারী দুর্বৃত্তের নাম মোঃ আলা উদ্দিন (২৫), পিতা- শামসুল আলম, গ্রাম- ফটিক নগর, রাউজান। পেশায় একজন মিনিট্রাক ড্রাইভার। সে রাস্তা নির্মাণ কাজের জন্য ইট আনার কাজ করে থাকে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, কাউখালী ভোকেশনালের ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ওই ছাত্রী ক্লাশ শেষে তার এক বান্ধবীসহ পায়ে হেঁটে ছোট ডলুতে বাড়ি ফিরছিল। ফেরার পথে রাঙাপানি ছড়া মুখ স্থানে পৌঁছলে মোঃ আলা উদ্দিন তাকে ঝাপটে ধরে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এতে ওই ছাত্রী ও তার বান্ধবী চিৎকার দিলে আশে-পাশের লোকজন ছুটে এসে মোঃ আলা উদ্দিনকে ধরে ফেলে। পরে তাকে কাউখালী থানা পুলিশে সোপর্দ করে।

উক্ত ঘটনায় ওই ছাত্রীর পিতা বাদী হয়ে কাউখালী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

অামরা জানি এ ঘটনার বিচার প্রক্রিয়াও সেনা প্রশাসন দ্বারা সেন্সরশিপ করা হবে। লোকদেখানো প্রহসন চলবে কিছুদিন!এভাবে বিচারহীনতা আর কতকাল চলবে?তনু,সবিতা চাকমা,তুমাচিং মারমা,ছবি মারমাদের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার কি হবে না?

আসুন,পাহাড় এবং সমতলে আমরা ধর্ষণের বিরুদ্ধে “না” বলি।দোষীদের বিচারের দাবি জানায়।আমরা তরুণরা নিজেরা সচেতন হই,অন্যদের হতে সাহায্য করি।
_________________________________
তথ্য সূত্র:
১.Chtnews.com
২. দৈনিক সংগ্রাম
৩. প্রথম আলো
৪. অন্যান্য………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 + = 43