এক মহামানবের বিরুদ্ধে বহুমুখী ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র


বাঙালি জাতির জনক বা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্রের কোন অন্ত ছিল না। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে পারিবারিক সদস্যদের নিয়ে পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর তার পরিবারের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে অর্জিত সকল সুনাম-খ্যাতি এবং তাঁর ভাবমূর্তিকে বাংলার জনমানসে নস্যাৎ করাই ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের মূল লক্ষ্য। শুধুমাত্র স্বাধীনতা বিরোধীরা একা নয়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চক্র নিয়ে তারা সর্বাত্মকভাবে জনমনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালবাসাকে তারা বিষিয়ে তুলতে চারিদিক থেকে চক্রান্তের জাল বুনেছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের বড় শত্রু ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার দল-সহযোগীরা। তাদের নেতৃত্বে যে বাংলার মানুষ স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন মানচিত্র খচিত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। দুঃখের বিষয়, সেই স্বাধীনতা বিরোধীরা আজও আমাদের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করতে উৎ পেতে বসে থাকে। সময়-সুযোগ পেলেই তারা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের সার্বিক দায়িত্ব নিতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তখন ছিল না কোন প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, পুল-কালভাট। চারিদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ আর ধ্বংসযজ্ঞ। তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু তার আন্তর্জাতিক সুনাম কাজে লাগিয়ে দ্রুত দেশ পুনর্গঠনের কাজে মনোনিবেশ করলেন। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা এবং বঙ্গবন্ধু বিরোধীরা হাল ছাড়েনি। তারা জনমনে বঙ্গবন্ধু প্রশাসন সম্পর্কে একের পর এক অপপ্রচার এবং চক্রান্তের জাল বুনেই যাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনামলে, ১৯৭২ সালে জামায়াতে ইসলামীকে যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত থাকার কারনে এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার কারনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তৎসময়ে জামায়াতের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে পাকিস্থান, যুক্তরাজ্য এবং পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। যুক্তরাজ্যে শরণার্থী থাকাকালীন সময়ে, গোলাম আজম পূর্ব পাকিস্থান পুনরুদ্ধার কমিটিও গঠন করেছিল। বিদেশের মাটিতে থেকেও বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্রের চাল চেলে যাচ্ছিল একে একে। স্বাধীনতার বিরোধীদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মূল হাতিয়ার ছিল বঙ্গবন্ধু তথা তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অপপ্রচার-গুজব।

অপপ্রচার নং ১. বঙ্গবন্ধুর ধর্মীয় মতবাদ ও তাঁর জন্ম পরিচয় নিয়ে মিথ্যাচার। সংখ্যাগরিষ্ঠ এই বাংলাদেশে তারা গুজব রটানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছিল যে বঙ্গবন্ধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তিনি হিন্দু পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা-মা হিন্দু ছিল ইত্যাদি।

মিথ্যাচারের সংক্ষিপ্ত জবাব-
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম ছিল ‘খোকা’। শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা শেখ লুৎফর রহমান, তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত গোপালগঞ্জ জেলা দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন। শেখ মুজিবের পূর্ব পুরুষ দরবেশ শেখ আওয়াল ১৪৬৩ সালে হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রাঃ) এর সঙ্গে ইসলাম প্রচারের জন্য ইরাকের বাগদাদ হতে বঙ্গীয় এলাকায় আগমন করেন।

যাই হোক, ধর্ম পালন সম্পর্কে, বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠাতা বা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একটি ঘোষণা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনার জন্য যে সম্মেলন হয়, সে অধিবেশনে তিনি সেই ঘোষণা দেন, ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার স্ব-স্ব অধিকার অব্যাহত থাকবে। আমরা আইন করে ধর্ম-কর্ম চর্চা বন্ধ করতে চাই না এবং তা করবও না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করবে। তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের কারো নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করবে। কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম, খ্র্রিষ্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। আমাদের আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলবো, ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ মূলত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জাতিরজনকের ধর্ম নিরপেক্ষতার উৎস ছিল মহানবীর (স.) মদিনার সেই শিক্ষা ও দীক্ষা যেখানে অন্যতম শর্ত ছিল: ‘মদিনায় ইহুদি-নাসারা-পৌত্তলিক এবং মুসলমান নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’

অর্থাৎ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ভাষায়, ‘যার যার ধর্ম তার তার কাছে।’ আর ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার তাগিদ পবিত্র কোরআন শরীফে বারংবার দেয়া হয়েছে এবং পবিত্র কোরআন শরীফে উল্লেখ আছে, ধর্ম নিযে বাড়াবাড়ি করে অতীতে বহুজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। মহানবীর (স.) একজন অনুসারী বা উম্মত হিসেবে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে তাই বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের জনমানসে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন সমকালীন মুসলিম বিশ্বে এর দৃষ্টান্ত বিরল।

বঙ্গবন্ধুর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের কিছু যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।

১) ১৯৭২ সালেই তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
২) প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ সী’রাত মজলিশ, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড পুনর্গঠন করেন তিনি। পূর্বে সায়ত্বশাসিত মাদ্রাসা বোর্ড ছিল না।
২) বিশ্ব এজতেমার জন্য টঙ্গীতে সরকারি জায়গা বরাদ্দ দেন।
৩) সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ হতে প্রথম পবিত্র হজ্জ জন্য সরকারী খরচে প্রতিনিধি প্রেরন করেন বঙ্গবন্ধু।
৪) পবিত্র হজ্জ পালনের জন্য বিমান ভাড়া করাসহ সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেন।
৫) কাকরাইলের মারকাজ মসজিদের জন্য জমি বরাদ্ধ করেন তিনি।
৬) ঈদে মিলাদুন্নবী (স.), শবে কদর, শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং উল্লিখিত দিনগুলোতে সিনেমা হলে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
৭) মদ, জুয়া, হাউজিং ও অসামাজিক কার্যকলাপ যা ইসলাম ধর্ম বিরোধী তা নিষিদ্ধকরণ এবং শাস্তির বিধান করেন তিনি।
৮) রেসকোর্স ময়দানে ঘৌড়দৌড় প্রতিযোগিতা বন্ধ করেন, রাশিয়ায় প্রথম ধর্ম প্রচারে তাবলীগ জামায়াত প্রেরণ করেন।
৯) আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরব বিশ্বের পক্ষে সমর্থন দেন ও সাহায্য প্রেরণ করেন।
১০) ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন এবং পরে ওআইসি সম্মেলনে যোগদান ও মুসলিম বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন দৃঢ়ভাবে।
১১) রাশিয়াতে প্রথম তাবলীগ জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। ইত্যাদি…

তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবদানের কথা আজ দলমত ভেদে সবার জানা উচিত। মিডিয়ায় এবং সংবাদপত্রে তা প্রতিনিয়ত ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রকাশ করা জরুরি। এক্ষেত্রে ইসলামী ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব এবং কর্তব্য সবচেয়ে বেশি। তাই সচেতন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সদস্যর উচিত সেকথার প্রচার ও প্রকাশ করা। তাহলেই প্রত্যেক আমজনতা জানতে ও বুঝতে পারবে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে জাতিরজনকের অবদানের কথা। আর ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করছে, করছে অপ-রাজনীতি তাদেরকে আমজনতা চিহ্নিত করতে পারবে, ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলাও করতে পারবে।

অপপ্রচার নং ২. চীনাপন্থী সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহী কমরেড সিরাজ শিকদারের মৃত্যু এবং জনমনে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের নির্দেশদানের অপপ্রচার।

সংক্ষেপে মিথ্যাচারের জবাব-
সিরাজ শিকদার বাংলাদেশের একজন চীনা পন্থী মাওবাদী (বামপন্থী) বিপ্লবী নেতা ছিলেন। তিনি ১৯৪৪ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবার আদি নিবাস ছিল বরিশালের বানারীপাড়ায়। ১৯৬৮ সালের ৮ই জানুয়ারি সিরাজ শিকদার সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন যার লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধতা করা ও সত্যিকারের বৈপ্লবিক কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করা। তাঁদের মূল প্রত্যয় ছিল: পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ এবং ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের’ মাধ্যমে এ ঔপনিশিক মাসনের অবসান ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠিত হয়। তারপর ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে তিনি ঢাকা শহরে মাও সে তুং গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তান সরকার এটি পরবর্তীকালে বন্ধ করে দেয়।

১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে দ্রুত বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ভারতীয় বাহিনীর এই তৎপরতাকে সাদা চোখে দেখেনি সর্বহারা পার্টি। পার্টি মনে করে, পাকিস্তানের উপনিবেশ থেকে দেশ এবার ভারতীয় উপনিবেশের মধ্যে গিয়ে পড়েছে। এ সময় নতুন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্নে সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশের সরকারের প্রতি একটি খোলা চিঠি লেখে। তবে মুজিব সরকার সর্বহারা পার্টির সেসব দাবির অনেকগুলোকেই তৎকালীন সরকার যুক্তিযুক্ত মনে করেনি।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সর্বহারা পার্টির কোনো দাবি না মেনে নেওয়া এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই সর্বহারা পার্টির মতাদর্শকে তেমনভাবে মূল্যায়ন না করার কারণে সিরাজ সিকদার নতুন থিসিস দিলেন। এই নতুন থিসিসের নাম দিলেন, ‘পূর্ব বাংলার বীর জনগণ আমাদের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি, পূর্ব বাংলার অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব (জাতীয় মুক্তি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা) সম্পূর্ণ করার মহান সংগ্রাম চালিয়ে যান।’ এই দলিলটি বের হয় ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে, পরে যা আবার ১৯৭৪ সালের মার্চে পুনঃপ্রকাশিত হয়। এই দলিলে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়, কিভাবে বাংলাদেশ নামের নতুন দেশটি ভারতীয় অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। মূলত এই দলিলের মাধ্যমেই শোষিত শ্রেণীর জন্য প্রকৃত জনমুক্তির বাংলাদেশ গড়তে ‘সশস্ত্র সংগ্রাম’ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সর্বহারা পার্টি। এর ফলে বাংলাদেশ সৃষ্টির পরও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন এলাকায় থানা লুটের ঘটনা ঘটতে থাকে, একই সঙ্গে শ্রেণীশত্রু খতমের নামে স্থানীয় ভূস্বামী, জোতদার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সচ্ছলদের হত্যা করা হতে থাকে গোটা বাংলাদেশে। উল্লেখ্য যুদ্ধের পর পর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে এই চীনাপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই অস্ত্র জমা দেয়নি।

সর্বহারা পার্টি মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গ মনে করেনি কখনোই, তাদের চোখে এটি ছিল পাকিস্তানের শোষণ থেকে বেরিয়ে ভারতের আগ্রাসনের মুখে পড়ার একটি পর্ব মাত্র। এ কারণে সর্বহারা পার্টি ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে পালন না করে ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ দিবস হিসেবে কালো দিবস ঘোষণা করে ওইদিন হরতাল পালনের আহ্বান জানায়। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে সর্বহারা পার্টি সারা দেশে হরতালের ডাক দেয়।

১৯৭২-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত মাওবাদী গ্রুপগুলোর মধ্যে রণনীতি নিয়ে বিভেদ দেখা দেয়। শিগগিরই শুরু হয়ে যায় পরস্পরকে বহিষ্কার ও মৃত্যূদণ্ড ঘোষণা। সিরাজ শিকদার সর্বহারা পার্টিকে নিষ্কণ্টক রাখতে ‘নিপাত চক্র’ নামে পার্টির ভেতরে একটি অনুগত গ্রুপ করেছিলেন। এদের মূল কাজ ছিলো, পার্টির ভেতরের প্রতিক্রিয়াশীলদের হত্যা করা। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত হয় মাওপন্থীরা। আজিজ মেহের বলেনঃ বৃহত্তর বরিশালের কাকচিরা গ্রামের ও বরিশাল কলেজের ছাত্র কমরেড সেলিম শাহনেওয়াজ ছিলো সিরাজ শিকদারের পার্টির সদস্য। ১৯৭১-এর পরে ১৯৭৩-এ পার্টির সঙ্গে মতানৈক্য হওয়ায় সিরাজ শিকদারের নির্দেশে এই আত্মত্যাগী তরুণকে হত্যা করা হয়, যেমন হত্যা করা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ুন কবিরকে। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে সর্বহারা পার্টি সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়। পার্টির মুখপত্র ‘স্ফুলিঙ্গ’ ও প্রচারপত্রে বলা হয়, ১৬ ডিসেম্বর হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী শক্তির কাছে মুজিব সরকারের আত্মসমর্পণ দিবস। একমাত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমেই জনগণের বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করে প্রকৃত বিজয় আসতে পারে। সর্বহারা পার্টি ঢাকায় হরতাল আহ্বান করলে সন্তোষ। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আত্মগোপনে যান।

ঠিক কি অবস্থায় সিরাজ শিকদার পুলিশের হাতে শেষপর্যন্ত আটক হন, এবং ঠিক কখন কোথায় কীভাবে তার মৃত্যু হয় সে সম্পর্কে অস্পষ্টতা রয়েছে। এদিকে বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকেরেনহাস ১৯৮৬ সালে ‘বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ নামক প্রামান্য গ্রন্থে তুলে ধরেন সিরাজ সিকদার হত্যার বিস্তারিত দিক। এর আগে মুজিব সরকারের পতনের পর ১৯৭৬ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এ সংক্রান্ত কিছু সাক্ষাতকারভিত্তিক তথ্য প্রকাশিত হয়।

উলেখ্য, মাসকেরেনহাসই প্রথম সাংবাদিক যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের দি সানডে টাইমস পত্রিকায় তখনকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাক-বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরে ধরেন। তার সেই নিবন্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামান্যগ্রন্থ ‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ’ সারা বিশ্বে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে গুরুত্পূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই সাংবাদিকের ছিলো একে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দীন, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানসহ শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।

‘বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে মাসকেরেনহাস মুজিব হত্যা, তিন জাতীয় নেতা হত্যা, জিয়উর রহমান হত্যাসহ যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নানা নাটকীয় ঘটনা নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে বর্ণনা করেন। এ জন্য তিনি শাতাধিক সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন।

মাসক্যারেনহাস বলছেনঃ সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কাছাকাছি এক এলাকা থেকে (টেকনাফ) পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হন। স্থানীয় লোকজনের মতে, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। চট্টগ্রাম থেকে আত্মগোপন করে সিরাজ সিকদারকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল তার পার্টির গোয়েন্দা উইং। কিন্তু তিনি পার্টির শহীদ এক কর্মীর বাসায় যাচ্ছিলেন দেখা করার জন্য। এরপরই চট্টগ্রাম ত্যাগ করে কোনো ঘাঁটি অঞ্চলে গা ঢাকা দেবেন। একটি স্কুটার নিয়ে পাহাড়তলী যাবেন। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় এলে স্কুটার থামায় সাদা পুলিশ। সিরাজ সিকদার নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজেকে পরিচয় দেন ব্যবসায়ী হিসেবে। এমনকি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সদস্য হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলে ঘাবড়ে যায় ডিবির সাদা পুলিশের দল। এবার কয়েক ব্যবসায়ীকে ফোন করা হয়। তাঁরা জানান, তিনি একজন ভালো ব্যবসায়ী। তবে ঢাকার গোয়েন্দা সদর দপ্তর নিশ্চিত করে যে যাকে ধরা হয়েছে তিনিই সেই কুখ্যাত রাষ্ট্রদ্রোহী সিরাজ সিকদার। ওই দিনই সিরাজ সিকদারকে বিমান যোগে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।

তারপর, পরদিন ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ রাতে পুলিশ ভ্যান দিয়ে শেরেবাংলা নগর থেকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়ার পথে সে ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে এবং সে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এদিকে সিরাজ সিকদারকে, শেখ মুজিবের নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছে বলে কুচক্রিমহল সারাদেশে একটি মিথ্যা গুজব রটিয়ে দিল।

অপপ্রচার নং ৩. শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামাল মেজর ডালিমের স্ত্রীকে হাইজ্যাক করে শালিনতাহানির চেষ্টা করেছিল।

অপপ্রচারের সংক্ষিপ্ত জবাব-
মেজার ডালিমের স্ত্রীকে উত্যক্ত করা নিয়ে শেখ কামালের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। অথচ যে বিষয়টি শেখ কামাল ভাল করে জানতেন ও না সেটা কি করে শেখ কামালের বলে চালিয়ে দেয়া হলো। প্রকৃত ঘটনা হল- মেজর ডালিম বঙ্গবন্ধুর এবং বেগম মুজিবের প্রতি অনুগত ছিলো, বঙ্গবন্ধু ও ডালিম একসঙ্গে মুড়িও খেত। সমস্যার সূত্রপাত হয় যখন ডালিমের বোনের বিয়েতে ডালিমের সুন্দরী স্ত্রী তাসনিমকে গাজী গোলাম মোস্তফার এক ছেলে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে। ডালিম তাকে চড় মারে। তখন গাজী গোলাম মোস্তফা মেজর ডালিমকে মুজিবের বাড়িতে নিয়ে যায় এবং সবসময় বিরোধ নিষ্পত্তিকারী শেখ মুজিবুর রহমান পারিবারিক বন্ধু ও শুভাকাঙ্খি হিসেবে গাজী ও ডালিমের হাত মিলিয়ে দেন ও বিরোধ দূর করে খুশি হন এবং সবাইকে মিষ্টি খেতে বলেন। কিন্তু ব্যাপারটি এখানেই শেষ হয় না। পরবর্তীতে, প্রতিশোধপরায়ণ মেজর ডালিম কতিপয় সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে গাজীর নয়াপল্টনের বাড়িতে আক্রমণ করে এবং সবকিছু তছনছ করে ফেলে, যা অনেকেরই অজানা। যা হোক, এসব ঘটনার সঙ্গে শেখ কামালকে জড়ানো বঙ্গবন্ধুর সম্মানহানির ঘৃণ্য চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

স্বয়ং মেজর ডালিম (পরে লে. কর্নেল) এর লিখিত গ্রন্থ “যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি” পড়ে জানতে পারলাম, ঘটনার সাথে শেখ কামাল মোটেও জড়িত নন। এখানে তার বই থেকে ঘটনা তুলে দিচ্ছি –

“রেডক্রস চেয়ারম্যান এবং তদানীন্তন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ প্রধান গাজী গোলাম মোস্তফা নিম্মী এবং আমাকে বন্দুকের মুখে লেডিস ক্লাব থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়”।-মেজর ডালিম

উপরের তথ্যগুলোতে কারো সন্দেহ থাকলে দয়া করে মেজর ডালিম (পরে লে. কর্নেল) এর লিখিত গ্রন্থ “যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি” পড়ে মিলিয়ে নিবেন। অযথা বঙ্গবন্ধু তার নিজের বাসায় ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন বলে কুৎসা রটনাকারীরা তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শেখ কামালের মত একজন দেশপ্রেমিক, নির্দোষ, মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে আজীবন এই অপপ্রচার ও মিথ্যাচার চালিয়েছেন। আজ সময় এসেছে পুরো জাতির প্রকৃত ঘটনা জানার এবং শেখ কামালের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অপপ্রচারের অবসানের।

অপপ্রচার নং ৪. বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালে বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির অপবাদ।

সংক্ষেপে অপবাদের জবাব-
প্রথমেই একটি কথা বলিঃ প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে টাকার মালিক হওয়ার জন্য ব্যাংক ডাকাতির প্রয়োজন হয় না। দু’নম্বর অনেক রাস্তায় কাড়িকাড়ি টাকার মালিক হওয়া যায়। প্রমাণ; প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার দুই ছেলে, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। তারা ভাঙ্গা সুটকেস ও ছেড়া গেঞ্জি দেখিয়ে দেশে-বিদেশে কত টাকার মালিক হয়েছেন তা সঠিকভাবে হিসেব করতে হয়তো কয়েক মাস সময় লাগবে।

ইতিহাসের কুখ্যাত কতিপয় চক্রান্তকারীর সীমাহীন ছলনাময় চক্রান্তের কারণে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির অপবাদ রটানো হয়েছিল এবং তা এখনো ক্ষেত্রবিশেষে বার বার বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। আসলে সেদিন কী ঘটেছিল? প্রত্যক্ষদর্শী সেই বিএনপি নেতা বিএনপির মন্ত্রী টুকু, তার বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল প্রেক্ষাপটটি।

শেখ কামাল সেদিন আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েক বন্ধুকে নিয়ে। রাত তখন আনুমানিক ৯টা কি সাড়ে ৯টা। আজকের বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার সালমান এফ রহমান যিনি কিনা শেখ কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, ফোন করলেন হঠাৎ করেই। অর্থাৎ সেই রাতে। জানালেন নতুন একটি ভঙ্ ওয়াগন কোম্পানির মাইক্রোবাস কিনেছেন। টেলিফোনের এ প্রান্তে শেখ কামাল খুশিতে লাফ দিয়ে উঠলেন এবং সালমান রহমানকে অনুরোধ করলেন গাড়িটি একটু পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য নতুন গাড়িতে চড়ে ঢাকা শহরটি একটু চক্কর দেওয়া। অনুরোধমতে গাড়িটি এলো রাত আনুমানিক ১০টার দিকে। উপস্থিত বন্ধুরা শেখ কামালকে প্রস্তাব করলেন পুরান ঢাকার চিনুর বিরিয়ানির দোকানে গিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ানোর জন্য। যেই কথা সেই কাজ, শেখ কামাল আরও দু-তিন বন্ধুকে ফোন করলেন এবং ফোন করলেন বিএনপির মন্ত্রী টুকুকেও। তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেন। কিন্তু নতুন ভঙ্ ওয়াগন গাড়িতে চড়া এবং চিনুর বিরিয়ানির লোভ সামলাতে পারলেন না। বললেন যাওয়ার সময় এলিফ্যান্ট রোডে তার বাসার সামনে থেকে তাকে তুলে নেওয়ার জন্য। রাত সাড়ে ১০টায় এলিফ্যান্ট রোড থেকে তাকে তুলে শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা কাকরাইল, জোনাকী সিনেমার সামনের রোড দিয়ে ফকিরের পুল হয়ে গুলিস্তান এবং গুলিস্তান হয়ে বংশাল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অর্থাৎ রাতের নিরিবিলি ঢাকায় নতুন গাড়িতে চড়ার আনন্দ উপভোগ। এভাবেই তারা কাকরাইল মোড় পর্যন্ত এগোলেন। বিপত্তি বাধল মোড় পার হওয়ার পরই। এই বিপত্তি নিয়ে কিছু বলার আগে তৎকালীন রাজনীতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু না বললেই নয়।

বঙ্গবন্ধু সরকারকে সমূলে বিনাশ করার জন্য যেসব দেশি-বিদেশি প্রবল প্রতিপক্ষ কাজ করছিল তাদের মধ্যে মরহুম সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি বা নকশালেরা অন্যতম। এরা মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ডে থেকে অপতৎপরতা চালাত। তখনকার নকশালীদের গুম, হত্যা, ডাকাতির বীভৎস রূপ এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। অন্যদিকে জাসদ নামক রাজনৈতিক দলটির গণবাহিনীর তৎপরতা ছিল আরও ভয়াবহ। তারা রাজনীতি করত জাসদের নামে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাত ‘গণবাহিনী’র নামে এবং অপপ্রচার চালাত ‘গণকণ্ঠ’ নামে তাদের মালিকানায় প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে। আমরা যে রাতের কথা বলছি সেই রাতে কাকরাইল পল্টন এলাকায় টহলের দায়িত্বে ছিল এই কিবরিয়া বাহিনী। তারা সাদা পোশাকে সশস্ত্র অবস্থায় প্রাইভেট গাড়িতে ঘুরত মূলত গণবাহিনী বা নকশালীদের ধরার জন্য। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই চ্যালেঞ্জ করত এবং ক্ষেত্রবিশেষে গুলি চালাত।

শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা যখন কাকরাইল মোড় পার হলেন তখন সামনে একটি প্রাইভেট কারে কয়েকজন সশস্ত্র লোককে দেখতে পেলেন। তারা মনে করলেন প্রাইভেট কারটি হয়তো গণবাহিনীর গুণ্ডাদের বা নকশালীদের। মাইক্রোবাসটি প্রাইভেট কারের চেয়ে উঁচু এবং উজ্জ্বল হেড লাইটের কারণে শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা গাড়ির আরোহীদের দেখতে পাচ্ছিলেন। অন্যদিকে গাড়ির আরোহী সাদা পোশাকধারী পুলিশের কথিত কিবরিয়া বাহিনীর সদস্যরা মাইক্রোবাসের উচ্চতার কারণে ভেতরের আরোহীদের দেখতে পাচ্ছিলেন না। কাকরাইল মোড় পার হয়ে শেখ কামালদের গাড়ি যখন নাইটিঙ্গেল রেস্তোরাঁ অতিক্রম করছিল তখন তাদের তারুণ্যময় অ্যাডভেঞ্চারে পেয়ে বসল। তারা মনে করলেন সামনের গাড়িটি গণবাহিনী বা নকশালীদের। ভুলে গেলেন চিনুর বিরিয়ানির কথা। ভাবলেন কোনমতে যদি ওই সন্ত্রাসীদের ধরা যায় তাহলে সারা দেশে হয়তো একটি ধন্য ধন্য রব পড়ে যাবে। তারা গাড়িটি ধাওয়া করলেন। রাত তখন ১১টা। অন্যদিকে প্রাইভেট কারে বসা কিবরিয়া বাহিনীর সদস্যরা মাইক্রোবাসের আরোহীদের মনে করলেন গণবাহিনীর সন্ত্রাসী। পুলিশের গাড়ি হঠাৎ মতিঝিল থানার মধ্যে ঢুকে পড়ল। তাদের অনুসরণ করে শেখ কামাল ও তার বন্ধুরাও মতিঝিল থানা কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়লেন। এরপর পুলিশ সদস্যরা গাড়ি থেকে নেমে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে লাগলেন মাইক্রোবাসে বসা শেখ কামাল ও তার বন্ধুদের ওপর। সবাই মারাত্মক জখম হলেন কেবল বিএনপির এই নেতাটি ছাড়া। এরই মধ্যে পুলিশ বাহিনী যখন বুঝতে পারল আসল ঘটনা তখন আহতদের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু পরিবার তখন জানে না ঘটনা সম্পর্কে। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বিএনপি নেতাটি ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে ঢুকে শেখ জামালকে খবরটি দিয়ে পুনরায় ঢাকা মেডিকেলে চলে এলেন।

শেখ কামালকে “ব্যাংক ডাকাত” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটা চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ১৯৭৪ সাল থেকে এই প্রচারণার শুরু। আমিও এই প্রচারে বিভ্রান্ত ছিলাম দীর্ঘদিন। আমি নিশ্চিত এই লেখার পাঠকদের অনেকে এখনো বিশ্বাস করেন, দলবল নিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে শেখ কামাল গুলিবিদ্ধ হন। সুযোগ পেলেই বিএনপি নেতারা, এমনকি বেগম খালেদা জিয়া নিজেও শেখ কামালকে ‘ব্যাংক ডাকাত’ বলে থাকেন। জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক কার্যবিবরণীতেও তাদের এমন বক্তব্য পাওয়া যাবে।

এ নিয়ে মেজর জেনারেল মইন তার “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইতে স্বাধীনতাত্তোর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নানা তথ্য দেন। তিনি লিখেন, ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবসের আগের রাতে ঢাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সিরাজ শিকদার তার দলবল নিয়ে এসে শহরের বিভিন্নস্থানে হামলা চালাতে পারেন। এ অবস্থায় সাদা পোশাকে পুলিশ গাড়ি নিয়ে শহরজুড়ে টহল দিতে থাকে। সর্বহারা পার্টির লোকজনের খোঁজে শেখ কামালও তার বন্ধুদের নিয়ে মাইক্রোবাসে করে ধানমন্ডি এলাকায় বের হন। সিরাজ শিকদারের খোঁজে টহলরত পুলিশ মাইক্রোবাসটি দেখতে পায় এবং আতংকিত হয়ে কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই গুলি চালায়। শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা গুলিবিদ্ধ হন। গুলি শেখ কামালের কাঁধে লাগে। তাকে তখনকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জেনারেল মইন তখন ৪৬ ব্রিগেডের অধিনায়ক। বিজয় দিবসে মানিক মিয়া এভিনিউতে সম্মিলিত সামরিক প্যারেড পরিচালনা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সালাম নেন। জেনারেল মইন লিখেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব অত্যন্ত গম্ভীর ও মলিন মুখে বসে ছিলেন। কারো সঙ্গেই তেমন কথা বলেননি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে জেনারেল মইন বইতে লিখেন, ওইদিন শেখ মুজিব তার সঙ্গেও কথা বলেননি। ‘৭২ সাল থেকে অনেকবারই তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু এতোটা মর্মাহত কখনো তাকে আগে দেখেননি। মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধের সময় জেনারেল ওসমানীর এডিসি শেখ কামালও জেনারেল মইনের ঘনিষ্ট ছিলেন। প্যারেড শেষে মইন পিজিতে যান শেখ কামালকে দেখতে। হাসপাতালে বেগম মুজিব শেখ কামালের পাশে বসেছিলেন। মইন লিখেন, প্রধানমন্ত্রী তার ছেলের ওই রাতের অবাঞ্ছিত ঘোরাফেরায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং শেখ কামালকে হাসপাতালে দেখতে যেতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানান। পরে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে যান।

জেনারেল মইনকে এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা শেষে তিনি লিখেন, “এদিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা এই ঘটনাকে ভিন্নরূপে প্রচার করে। ‘ব্যাংক ডাকাতি’ করতে গিয়ে কামাল পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে তারা প্রচারণা চালায় এবং দেশে-বিদেশে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। যদিও এসব প্রচারণায় সত্যের লেশমাত্র ছিল না।

অপপ্রচার নং ৫. বিএনপি এবং জামায়েতিরা প্রায়ই মিথ্যা অভিযোগ করে থাকে যে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর প্রশাসনই দায়ী ছিল। তাদের মিথ্যা অভিযোগ হল “চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমান খাদ্যশস্য ভারতে পাচারই দুর্ভিক্ষের মূল কারণ। বঙ্গবন্ধুর সরকার চোরা-চালানকারীদের বাধা দেয়নি কারণ তারা নাকি সবাই আওয়ামীলীগের কর্মী বা সদস্য ছিল”।

মিথ্যাচারের সংক্ষিপ্ত জবাব-
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর, বঙ্গবন্ধুর নামে যে কুৎসা রচনার প্রতিযোগীতা শুরু হয় তারই ধারাবাহিকতায় এই অবান্তর ও অতিরঞ্জিত কাহিনী প্রচার করে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে খাটো করার অপচেষ্টা চালানো হয়। খালেদা জিয়া, এরশাদ বা জামায়েত-শিবির সবাই এই অপপ্রচারে নিজেদের সামিল করেছেন। ইত্তেফাকে বোবা বাসন্তীকে জাল পরিয়ে আফতাব আহমেদের সেই বিখ্যাত ছবিও একই ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।

সত্যিকারের ইতিহাস হল, ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী কারণগুলো আসলে বাংলাদেশ সরকারের আয়ত্ত্বের বাইরে ছিল। একটি বড় কারন হল ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিশাল বন্যা। দ্বিতীয় বিষয়টি পরে জানা যায়, ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত আমেরিকার কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশানস এর ত্রৈমাসিক পত্রিকা ”ফরেন এ্যাফেরার্স” এর এক গবেষণামূলক নিবন্ধে, যেখানে এমা রথসচাইল্ড বিচিন্ন সরকারী দলিলপত্র দিয়ে প্রমাণ করেন যে, ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল আসলে মার্কিন সরকার। তারা বাংলাদেশের সাথে কিউবার পাট রপ্তানির চুক্তির কারনে খাদ্য সহযোগিতা করতে নাকচ করে দিয়েছিল। অথচ কিছুদিন আগেই আমেরিকা কিউবার সাথে তাদের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। দুই দেশ একযোগে বাণিজ্য করার বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হন।

যাই হোক, সাধারনত যখন খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায় না তখন সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো বাণিজ্যিক বাজারে খাদ্য ক্রয় করবে। ১৯৭৪ সালে বিশ্বের ৩২ টি দরিদ্র রাষ্ট্র, যাদের অর্থনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষি পণ্য ক্রয় করেছিল। তারা ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে কৃষি পণ্য আমদানি তিনগুন করেছিল, যাকে সিআইএর বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বলা যেতে পারে, গমের বাণিজ্যের শো-রুমগুলিতে ব্যাপক অভিবাসন।

পরবর্তীতে, বাংলাদেশ ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে বাণিজ্যিক বাজার থেকে আমেরিকান খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিল দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করার জন্য। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপট বিশৃঙ্খলার ফলাফল বর্ণনা করে, যেখানে খাদ্য নীতি উদ্দেশ্যহীনভাবে বাজারে গৃহীত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের প্রথমাংশে বাংলাদেশ সরকার গমের আমদানি চাহিদা পূরণের জন্য কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করেছিল। বিদ্যমান উচ্চ বাজার দরের এই ক্রয়গুলো স্বল্প মেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করার কথা ছিল। ১৯৭৪ সালের গ্রীষ্মে বাংলাদেশ সরকার, যা তখন চরম বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ছিল, এই ঋণটি পেতে ব্যর্থ হয়। যার ফলশ্রুতিতে, আমেরিকান গম কোম্পানিগুলোর দুইটি বৃহৎ বিক্রয় যেগুলো শরতে সরবরাহের কথা ছিল সেগুলো বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ পেতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দরে দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খাদ্য বাজার থেকে কিনে আনা শস্য বোঝাই জাহাজ ডুবে যায়। এটা কোন স্বাভাবিক দুর্ঘটনা ছিল না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরাই শস্য বোঝাই করা জাহাজ তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ডুবিয়ে দিয়েছিল। যেসব কারনে বঙ্গবন্ধুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে পুরোপুরি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি।

অপপ্রচার নং ৬. ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ ও ‘জাল বসনা বাসন্তী’

মিথ্যাচারের সংক্ষিপ্ত জবাব-
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ট্রাজেডির নাম ‘বাসন্তী’। কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় এক জেলে পরিবারের বাক প্রতিবন্ধী মেয়ে বাসন্তীর জাল পরে লজ্জা নিবারণের ছবি প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায়। আর সেই বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ছবির ফটোগ্রাফার ছিলেন ইত্তেফাকেরই নিজস্ব আলোক চিত্রি আফতাব আহমেদ। অনেকে ছবিটির নাম দিয়েছেন জাল-বসনা বাসন্তী। ছবিটিতে দেখানো হয় বাসন্তী ও দুর্গাতি নামের দুই যুবতী মেয়েকে। অভাবের জন্য যারা সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারছিল না। ছবিতে বাসন্তীর পরনে ছিল একটি মাছ ধরার জাল। এই ছবি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধু সরকারকে রাজনৈতিক সংকটে ফেলে দিয়েছিল। দেশের আনাচে কানাচে দুর্ভিক্ষের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে রেখেছিল বিশাল ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু সরকারের পতনকেও ত্বরান্বিত করে ছবিটি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং এই ছবির মধ্যেও যোগসূত্র রয়েছে এমন দাবী অনেকেরই। কিন্তু সেই ছবি প্রকাশিত হওয়ার কিছুকালের মধ্যেই বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য। বাসন্তীকে নিয়ে হলুদ সাংবাদিকতা ও নোংরা রাজনীতির খোলস থেকে বেরিয়ে এসেছে আসল রূপ। পরিষ্কার হয়ে যায় ছবিটি ছিল সাজানো। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয় পরবর্তীতে।

আজ থেকে সতেরো বছর আগে ৯৬ সালের ৫ অক্টোবর দৈনিক খবর-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘‘চিলমারীর বন্দর থেকে কয়েকশ গজ দূরে বেশকিছু কুঁড়ে ঘর। এখানেই বাসন্তীদের আবাস। জেলেপাড়ায় ঢুকতেই একটি মনোহারি দোকান। দোকানের মালিক ধীরেন বাবুর সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, ‘৭৪-এর অনেক কথা। যেদিন বাসন্তীদের ছবি তোলা হয়, সেদিনও তার পরনে কাপড় ছিল। কিন্তু ছেঁড়া জাল পড়িয়ে কৌশলে তাদের ছবি তোলা হয়। এটা এক ধরনের চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয় বলে মনে করেন অনেকেই।’’

সেই ছবি তোলার প্রত্যক্ষদর্শী হলেন, রাজো বালা। তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন। প্রকৃত দৃশ্য বর্ণনা করতে চান না। এখনো ভয় পান। তার মতে, এসব বললে ক্ষতি হতে পারে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে বলে আর লাভ কি। পরে অনেক আলাপ-আলোচনার পর রাজো বালা বর্ণনা করেন সেই দৃশ্য। ছলছল চোখে আনমনা হয়ে কথা বলেন তিনি। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে যখন বাসন্তী-দুর্গাতিদের ছবি তোলা হয়, তখন ছিল বর্ষাকাল। চারদিকে পানি আর পানি। এমনকি প্রেক্ষাপটে তিনজন লোক আসেন বাসন্তীদের বাড়িতে। এদের মধ্যে একজন ছিল তৎকালীন স্থানীয় রিলিফ চেয়ারম্যান তার নাম আনছার। অপর দুজনকে রাজো বালা চিনতে পারেনি। বাসন্তী-দুর্গতিদেরকে একটি কলা গাছের ভেলায় করে বাড়ি থেকে বের করা হয়। আর অন্য একটি ভেলায় রেখে তাদের ছবি নেয়া হয়। এ সময় পাশের একটি পাট ক্ষেতে ছিলেন রাজো বালা। ছবি তোলার আগে আগন্তুকরা বাসন্তীদের মুখে কাঁচা পাটের ডগা দিয়ে বলে এগুলো খেতে থাকো। এর বেশি আর কিছু জানাতে পারেননি রাজো বালা। বাসন্তীর কাকা বুদুরাম দাসের কাছে সেই ছবি তোলার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কাঁচুমাচু করেন। এক পর্যায়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করেন সেই ছবি তোলার নেপথ্য কাহিনী। শেষ পর্যায়ে তিনি ঐ ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং প্রতিকার চান।’

অপপ্রচার নং ৭. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাকশাল করে একনায়কতন্ত্র চালু করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিলেন।

সংক্ষেপে মিথ্যাচারের জবাব-
বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ বা সংক্ষেপে বাকশালই তৎকালীন একমাত্র আইনগতভাবে বৈধ রাজনৈতিক দল যার জন্ম হয়েছিল ৭ ই জুন ১৯৭৫ সালে, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্য দিয়ে। বাকশাল আহ্বান করেছিল, সব ছোট খাটো রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনকে একত্রিত হয়ে যুদ্ধপরবর্তী দেশ গড়ার জন্য এবং সকল অপরাজনীতি, অপশক্তি এবং সকল শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য।
সপরিবারে মৃত্যুর আগপর্যন্ত, এমনিতেই বৈধভাবে রাষ্ট্রের সর্ব ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রাহমান, তাই আলাদা করে তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার দরকার ছিলো না।

যে গণতন্ত্র হত্যার কথা বলে কুমিরের কান্না কাঁদে কেউ কেউ, তার জবাবটাও মুজিব সাক্ষাতকারে দিয়েছেন। তবে তাকে সপরিবারে হত্যার পেছনে এটাকে যতই অজুহাত হিসেবে দেখানো হোক, আসলে কেনো হত্যা করা হয়েছে সেটা তো এখন পরিষ্কার (যদিও মুজিব তাকে হত্যার আশঙ্কা জানিয়ে গেছেন এই সাক্ষাতকারে)। দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে, সেটা না পেরে ঢালাও ভাবে সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের গণ ফাঁসি আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিদের পুনর্বাসন। নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে কত গল্পই না বানালো খুনী আর নেপথ্যের কুশীলবরা। বাকশাল তারই একটি, আর এটাই সময় এ নিয়ে মিথ্যা ভাঙার। স্বাধীনতা যদি বিপ্লব হয়, সেই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় এসেছিল বাকশাল। হঠাৎ করে নয়। প্রথম বিপ্লব, স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মুক্তি। দ্বিতীয় বিপ্লব অর্থনৈতিক মুক্তি, সাধারণ মানুষের।

বাকশাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার দেশের মাত্র ৫ পার্সেন্ট লোক ৯৫ পার্সেন্ট লোককে দাবিয়ে রাখছে, শাসন-শোষণ করছে। বাকশাল করে আমি ওই ৯৫ ভাগ মানুষের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা করেছি। এতকাল মাত্র ৫ ভাগ শাসন করেছে, এখন থেকে করবে ৯৫ ভাগ। ৯৫ ভাগ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে ৫ ভাগকে মিশতে হবে। আমি মেশাবোই। এজন্য বাকশাল করেছি। এই ৯৫ ভাগ মানুষকে সংঘবদ্ধ করেছি তাদের পেশার নামে, তাদের বৃহত্তর কল্যাণে, তাদের একক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশালে। মূলত বাকশাল হচ্ছে বাঙালীর সর্বশ্রেণী সর্বস্তরের গণমানুষের একক জাতীয় প্লাটফর্ম, রাজনৈতিক সংস্থা, একদল নয়। এখানে স্বৈরশাসনেরও কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাঙালী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বা সমষ্ঠিগত শাসন ব্যবস্থায় কে কার উপর স্বৈরশাসন চালাবে? প্রত্যেক পেশার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে শাসন পরিষদ গঠন করা হবে। কোনো পেশা বা শ্রেণী অন্য পেশার লোকদের ওপর খবরদারী করতে পারবে না। যে কেউ যিনি জনগনের সার্বিক কল্যাণের রাজনীতিতে তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তিনি এই জাতীয় দলে ভিড়তে পারবেন”। জিয়াউর রহমান নিজেও বাকশালের সদস্য হয়েছিলেন এবং যারা বাকশালে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তাদের চিঠি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

বাকশাল ছিল একটি উত্তম পদ্ধতি এবং পরিক্ষাধীন সাময়িক সমাজ ব্যাবস্থা। বাকশাল জাতীয় প্লাটফর্মটি ছিল, সদ্য ভুমিষ্ট শিশুর মত, যার কোন ক্ষতিকারক ভুমিকা এর সমাপ্তি পর্যন্ত আমরা দেখিনি। ষড়যন্ত্রকারিরা সেটাকে এমন ভাবে প্রচার করলো, সে যেন সত্যিই মস্তবড় এক সিন্দাবাদের ভূত বা দানব সমগ্র পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিবে। আমরা জানি, অপ প্রচার এমন এক ব্যাবস্থা যা জনগনের কাছে, তিলকে তাল বানায় এবং তালকে তিল বানায়, সত্যকে মিথ্যা বানায় এবং মিথ্যাকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করে, যদিও তা সাময়িক এবং ক্ষেত্র বিশেষে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা চিরকাল স্থায়ী হয় না, সত্যের জয় একদিন হবেই হবে।

অপপ্রচার নং ৮. জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন ও এর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জনমনে তৎকালীন স্বার্থান্বেষী মহলের পরিকল্পিত মিথ্যা অপপ্রচার। তৎকালীন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দুটো গুজব ‘সত্য’ হিশেবে ছড়িয়ে পড়ে। একটি হল, রক্ষীবাহিনীর সদস্য সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে এবং এদের অধিকাংশ ভারতীয়। অন্যটি হল, রক্ষীবাহিনীর বাজেট সশস্ত্র বাহিনীর বাজেটের চেয়ে বেশি।

সংক্ষেপে জবাব-
মহলবিশেষের পরিকল্পিত নানা গুজবই রক্ষীবাহিনীকে বিতর্কিত করে তোলে। আর এসব গুজব সশস্ত্র বাহিনীর সাথে রক্ষীবাহিনীর একটি প্রকাশ্য মানসিক দ্বন্দ্ব প্রকট করে তোলে। অথচ রক্ষীবাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রম ছিল প্রশংসাযোগ্য; বিশেষ করে সদ্য স্বাধীন দেশে অস্ত্রউদ্ধার, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্ক্ষলার অবনতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি রক্ষীবাহিনী দারুণ ভূমিকা পালন করে।

রক্ষীবাহিনী নিয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য সমালোচনার ব্যবচ্ছেদ করা যাক। উপরোল্লিখিত দুটি তথ্যই সশস্ত্র বাহিনীর ভিতরে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং সরকারের উপর মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে। অথচ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেখা গেল রক্ষীবাহিনীর সর্বমোট সদস্য মাত্র বারো হাজার এবং ভারতীয় কোনো সদস্য পাওয়া গেল না। তবে রক্ষীবাহিনীর উপর পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ হত ভারতে; তৎকালীন সময়ে সেটাই স্বাভাবিক ছিল। তাছাড়া শুধু রক্ষীবাহিনী নয়, সশস্ত্র বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাও ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। আর বাজেটের ক্ষেত্রে দেখা গেল, ১৯৭৩ সালে রক্ষীবাহিনীর জন্য বাজেট ছিল মাত্র ৯ কোটি যেখানে সেনাবাহিনীর জন্য বাজেট ছিল ৯২ কোটি, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১২২ কোটি করা হয়।

কুখ্যাত ‘আদর্শবাদী-সন্ত্রাসী’ সিরাজ শিকদারকে গ্রেফতার থেকে হত্যা পর্যন্ত রক্ষীবাহিনীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অথচ জনমানসে এমনটাই প্রতিষ্ঠিত যে, সিরাজ শিকদারকে রক্ষীবাহিনী হত্যা করেছে। রক্ষীবাহিনীর পোশাকের জলপাই রং নিয়েও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন তোলা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী খাকি পোশাক ব্যবহার করত। তাই রক্ষীবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের ওই পোশাকের প্রতি ঘৃণা কাজ করে। তাই তারা বেছে নেয় ভারত থেকে আনীত জলপাই রং-এর পোশাক। অবশ্য ভারত থেকে খাকি ও জলপাই রং- দুই ধরনের পোশাকই আনা হয়েছিল। কিন্তু বামপন্তীরা গুজব ছড়ায় যে, জলপাই রং-এর পোশাক নেয়ার কারণ হল ভারতীয় সৈন্যরা যাতে একই পোশাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে; যেহেতু ভারতের সেনাবাহিনীরও একই রং-এর পোশাক ছিল। অথচ তখন বাংলাদেশ-ভারতের নৌবাহিনীর পোশাক একই রং অর্থাৎ শাদা ছিল; কিন্তু এটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি কিংবা কারো মনে হয়নি যে, ভারতীয় সৈন্যরা একই পোশাক পরে নৌপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। আর সবচেয়ে বড় উপহাস হল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরবর্তী সময়ে জলপাই রংয়ের পোশাকই বেছে নেয়। অথচ এটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি কখনো।

এরকম আরো অনেকগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব/মিথ্যা ছড়ানো হয় রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে। অবাধ তথ্যের অভাবে সাধারণ মানুষও সেসব বিশ্বাস করতে শুরু করে। ক্রমেই মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে রক্ষীবাহিনী।

পরিশেষে, স্বাধীন বাংলাদেশকে যারা মেনে নিতে পারেনি, যারা এখনও নিজেদেরকে পাকিস্তানের অংশ ভাবে, যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর দোসর হিসেবে মুক্তিকামী মানুষের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে সেসময়ও তাদের মূল অস্ত্র ছিল শঠতা ও মিথ্যাচার, আজো একই কাজ করে চলেছে তারা। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় কুড়িগ্রামের বাক প্রতিবন্ধী বাসন্তীর জাল পরিহিত সাজানো ছবি থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি চাঁদে সাঈদীকে দেখা; যুগে যুগে এমন শঠতার আশ্রয় নিয়ে আসছে জাতির কিছু কুলাঙ্গার সন্তানেরা।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক
ই-মেইলঃ [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “এক মহামানবের বিরুদ্ধে বহুমুখী ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 − = 58