চেকপয়েন্টঃ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ (পর্ব ৩/৪)


মলিন চেহারায় ছলছল চোখে জেঃ নিয়াজী একটি কলম ধার করলেন জেঃ অরোরার থেকে। জেঃ নিয়াজী তার নিজের কলম খুব সম্ভবত আত্মসমর্পনের খসড়া স্বাক্ষরের সময় ভুলে ফেলে এসেছিলেন। এমন কিছু আপাত গুরুত্বহীন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে লেঃ জেঃ এ এ কে নিয়াজী এবং যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেঃ জেঃ জগজিত সিং অরোরা দলিলে স্বাক্ষর করলেন। এ দুজনের কেউই এসময় একটা শব্দ পর্যন্ত উচ্চারন করলেন না!!

এই আত্মসমর্পনের দলিলই আজপর্যন্ত প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্ভবত একমাত্র জনসম্মুখে আত্মসমর্পন। এর বাইরেও যদি প্রথাগত যুদ্ধের কথা বলা হয়, তবে এই আত্মসমর্পন আধুনিক সমর ইতিহাসেরই দ্রুততম সময়ে আত্মসমর্পনের অন্যতম নজির!!

দ্যা ওয়ার অফ দ্যা টুইন্স (১৯৯৭) বইতে কৃষ্ণ চন্দ্র সাগর এ দৃশ্যের বর্ণনায় লিখেছেন,

“A grim faced Niazi had to borrow a pen from Gen Aurora as he had lost his own at the moment of signing the surrender deed. Amid such scenes, Gen Niazi of Pakistan and Gen Aurora of India signed the Instrument. Neither of the two uttered a single word.”



প্রথম পর্ব পর্ব – ২
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা
বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিট

ইউএস নেভীর “টাস্ক গ্রুপ সেভেন্টি ফোর” এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার “ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ” সহ ভারত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে যাত্রা করেছে। হাতে সময় ছিলো খুব কম। আত্মসমর্পনে রাজী হবার খবর মুহূর্তেই দিল্লীর উপরমহলে পৌছে গিয়েছিলো। আবার কোনো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়বার আগেই সব আয়োজন সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেয়া হলো। ১০টি হেলিকপ্টারের একটি ফ্লিট ঠিক সাড়ে চারটায় তেজগাঁও বিমানবন্ধরে অবতরণ করলো। একটি থেকে লেঃ জেঃ অরোরা সস্ত্রীক নেমে এলেন। কলকাতা থেকে উনারা ঢাকায় উড়ে এসেছেন।

তাড়াহুড়া এবং পরিস্থিতিগত কারণে আত্মসমর্পনের সাধারণ নিয়মকানুনে ভজঘট লেগে গিয়েছিলো। সাধারণত বিজিত সেনাপতি বিজয়ী সেনাপতির সদর দফতরে এসে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেন, কিন্তু এখানে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব নেয়ার জন্য বিজয়ী সেনাপতি বিজিতের কাছে গেলেন। জেঃ অরোরাও জে নিয়াজীর সাথে একসাথে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। যদিও তিনি জেঃ নাগরা এবং জেঃ নিয়াজীর চেয়ে এক কোর্স সিনিয়র ছিলেন।

লেঃ জেঃ অরোরা এবং তার স্ত্রী ছাড়াও আরও ছিলেন এয়ার মার্শাল এইচ সি দেওয়ান (এয়ার অফিসার কমান্ডিং ইন চীফ, ইস্টার্ন কমান্ড), ভাইস এডমিরাল কৃষনান (ফ্লাগ অফিসার কমান্ডিং ইন চীফ, ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড), লেঃ জেঃ সাগাত সিং (ভারতীয় সেনাবাহিনীর চতুর্থ কোরের কমান্ডার) এবং মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার (ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ অফ বাংলাদেশ ফোর্সেস)। জেঃ নিয়াজী এবং জেঃ অরোরা তাদের অভ্যর্থনা জানালেন। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব একে রায় ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।


অনেক বাঙ্গালী বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো ভারতীয় জেনারেল এবং তার স্ত্রীর দিকে ছুটে এলেন। জেঃ নিয়াজী তাকে স্যালুট করলেন এবং হ্যান্ডশেক করলেন। প্রায় সিকি শতাব্দী পর আবার তাদের দেখা হলো ইতিহাসের অংশ হতে। ল্যান্ড করবার পরপরই জেঃ অরোরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে একটি কালো লিমুজিনে করে রওনা দিলেন, তার সাথে গেলেন বাংলাদেশ সরকারের মুখ্য সচিব রুহুল কুদ্দুস এবং অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ।

জনতার উল্লাসের বিজয় ধ্বনির শোরগোল আর অকৃত্তিম স্বাগতমের মধ্যে দিয়ে তারা চলছিলেন রমনা রেসকোর্স ময়দানের (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দিকে যেখানে আত্মসমর্পনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। রমনা ময়দানই সেই জায়গা যেখানে শেখ মুজিবর রহমান তাঁর বিখ্যাত স্বাধীনতার ভাষণ প্রদান করেছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টোর দম্ভের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। আবার কাকতালীয়ভাবে এটাই সে জায়গা, যেখানে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিলো।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
বিকাল ৫ ঘটিকা

কোন অজানা কারণে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের তেমন কেউ এখানে উপস্থিত নেই। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে মেজর হায়দার, ফ্লাঃ লেঃ ইউসুফ এবং কাদেরিয়া বাহিনির প্রধান কাদের সিদ্দিকী উপস্থিত আছেন। মেজর কে এম শফিউল্লাহও উপস্থিত আছেন, তবে সাইনিং টেবিলের সামনে দাড়াবার কারণে কোনো ছবিতেই তাকে দেখা যাবে না।

৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এর দশদিন পর যখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পন করে তার অনেক আগে থেকেই অস্থায়ী সরকারের কার্যক্রম বেশ ভালোভাবেই চালু ছিলো। তবে ২২ শে ডিসেম্বরের আগে তাদের বেশিরভাগই দেশে প্রত্যাবর্তন করেননি। এবং তার পেছনেও ছিলো ভারতীয় বাহিনীর অনুরোধ। কারণ ১৬ ডিসেম্বরের পর পর দেশের নানা স্থানে প্রতিশোধমূলক এবং সংঘাতপ্রয়াসী নানা ঘটনা ঘটতে থাকে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রনে আনতে অস্থ্যায়ী সরকারের ভূমিকা নেয়া জরুরী ছিলো। কারণ ভিনদেশে মানুষ ভিনদেশী মিত্রের চেয়ে নিজের সরকারের কথাই বেশি শোনে, এখানেও ব্যাপারটা তেমন ছিলো। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং মুক্তিবাহিনীর অনুপস্থিতি এই আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের একটা দূর্বল দিক ছিলো যা ওই মুহূর্তে মেনে নেয়া ছাড়া কারোই কিছু করবার ছিল না। অনেক বাংগালীর মতে এই অনুষ্ঠানটা বাংলাদেশীদের জন্য কিছুমাত্রায় অপমানজনক ছিলো এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে খারাপ সম্পর্কের সূচনা করে।

এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, এ ঘটনা এড়াবার উপায় ছিলনা। তাই হয়েছে যা হবার ছিল এবং যেভাবে হবার ছিলো। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রায় সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের কিংবা দিল্লীর দিক নির্দেশনায়। সেইরুপ ঘটনা ঘটেছে এই আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। ভারতীয়রা চেয়েছিলো কোনোরকম আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কিংবা মার্কিন পরাশক্তির আগমনের আগেই যুদ্ধের একটা ফয়সালা হয়ে যাক। আর তা করতে গিয়ে বাঙ্গালীদের এই আনুষ্ঠানিকতার সময় ঢাকায় উড়িয়ে আনা সম্ভব ছিলো না, কারণ অস্থায়ী সরকারের সবাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যার যার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর আত্মসমর্পনের ঘটনাটা ঘটে খুব দ্রুত, যা হয়তো ভারতীয়রাও আশা করেনি। তবে আত্মসমর্পনের দলিলে ভারত এবং বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর কথাই বলা আছে। আর যেহেতু সিনিয়রিটির দিক দিয়ে জেঃ অরোরা বাকী সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, তারই মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করবার কথা এবং সেটাই যৌক্তিক। আত্মসমর্পন হয় একটা কনভেনশনাল সেনাবাহিনীর আরেকটা কনভনশনাল কিংবা প্রথাগত সেনাবাহিনীর হাতে। মুক্তিবাহিনী কোন কনভেনশনাল ফোর্স ছিলো না, যেটা ছিল ভারতীয় বাহিনী। আর পাকিস্তানীরাও চাইছিলো ভারত যেহেতু জেনেভা কনভেনশনের সাক্ষরকারী দেশ, তাই তাদের কাছেই আত্মসমর্পন করতে। মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলে তারা প্রতিশোধমূলক ঘটনা ঘটবার আশংকা করছিলো এবং সেটা ঘটাই খুব স্বাভাবিক ছিলো।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
বিকেল ৫ টা ১ মিনিট

শীতের আগমনের কারণে কিছুটা বাদামী হয়ে আসা ঘাস আবৃত মাঠে ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এবং আরো সাতজন ভারতীয় অফিসার আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের স্টেজ তৈরী করলেন। একটা সাধারণ কাঠের টেবিল পাতা হলো শীতের স্বচ্ছ নীল আকাশের নীচে।
জনসম্মুখে আত্মসমর্পন অনুষ্ঠান এবং যৌথ গার্ড অফ অনার দেয়া নিয়ে কিছু সমালোচনা হয় অনুষ্ঠান শুরুর আগেই। যদিও সময়টা এসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর মত সুস্থির ছিলনা। এ ব্যাপারে জেনারেল জ্যাকব তার গ্রন্থ্যে উল্ল্যেখ করেন,

“There has been some criticism of the public surrender and the combined guard of honor as well as the simple table set up. As I had no instructions or guidance and had to negotiate the terms in what amounted to obtaining an immediate and unconditional surrender without any time or resources for protocol or ceremonial frills, I acted on my own initiative, and in retrospect I do not regret the modalities adopted…”

উচ্চপদস্থ্য সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জেঃ অরোরা এবং জেঃ নিয়াজী পাশাপাশি বসলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন একজন এয়ার মার্শাল, একজন ভাইস এডমিরাল এবং এছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যান্য কোরের কমান্ডারেরা সারিবদ্ধভাবে পেছনে দাঁড়ান। পেছনে জনতা একে অপরের কাঁধের উপর দিয়ে দেখবার চেষ্টায় আছেন যে জেঃ নিয়াজী ঠিকমত স্বাক্ষর করছেন নাকি কিংবা করতে পারছেন নাকি। জনতা এই দাম্ভিক পাকিস্তানী জেনারেলের জনসম্মুখে অপমানজনক পরিণতি স্বচক্ষে দেখতে উদগ্রীব, যার অধীন সেনারা লাখো মানুষের জীবন নিয়েছে মার্চের সেই কালো রাতের পর থেকে।

আত্মসমর্পনকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে আর কেউ বলতে কেবল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী উপস্থিত আছেন ভঙ্গহৃদয় আর মলীন চেহারার জেঃ নিয়াজীর পাশে। শৌর্য্য বীর্য্যের গর্ব করে বেড়ানো দাম্ভিক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জেনারেলদের জন্য এরচেয়ে বড় অপমান আর কিছু হতে পারতো না এই সময়ে।

মলিন চেহারায় ছলছল চোখে জেঃ নিয়াজী একটী কলম ধার করলেন জেঃ অরোরার থেকে। জেঃ নিয়াজী তার নিজের কলম খুব সম্ভবত আত্মসমর্পনের খসড়া স্বাক্ষরের সময় ভুলে ফেলে এসেছিলেন। এমন কিছু আপাত গুরুত্বহীন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে লেঃ জেঃ এ এ কে নিয়াজী এবং যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেঃ জেঃ জগজিত সিং অরোরা দলিলে স্বাক্ষর করলেন। এ দুজনের কেউই এসময় একটা শব্দ পর্যন্ত উচ্চারন করলেন না!!

এই আত্মসমর্পনের দলিলই আজপর্যন্ত প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্ভবত একমাত্র জনসম্মুখে আত্মসমর্পন। এর বাইরেও যদি প্রথাগত যুদ্ধের কথা বলা হয়, তবে এই আত্মসমর্পন আধুনিক সমর ইতিহাসেরই দ্রুততম সময়ে আত্মসমর্পনের অন্যতম নজির!!

দ্যা ওয়ার অফ দ্যা টুইন্স (১৯৯৭) বইতে কৃষ্ণ চন্দ্র সাগর এ দৃশ্যের বর্ণনায় লিখেছেন,

“A grim faced Niazi had to borrow a pen from Gen Aurora as he had lost his own at the moment of signing the surrender deed. Amid such scenes, Gen Niazi of Pakistan and Gen Aurora of India signed the Instrument. Neither of the two uttered a single word.”

(চলবে…)

ইস্টিশনে পূর্বে প্রকাশিত, পরিমার্জিত
চেকপয়েন্টঃ আদর্শ, দেশপ্রেম, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার অল্প গল্প) – ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 80 = 82