সামাজিকতা ও একজন নারী

আমার মায়ের পক্ষের এক আত্মীয়া। জীবনে সুখ কি তা দেখেছে বলে খুব একটা মনে হয়না। বাবা মা অশিক্ষিত থাকায় তাদের দেদার সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে গ্রামের মেম্বার। ৫ বোনের পরিবার ছিলো, বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে আমি তখন খুব ছোট। তাই তার কথা মনে নেই। কিন্তু এখানে যার কথা বলছি? তাকে আমি চিনি খুব ভালো করে। আমি তার খুব প্রিয় মানুষদের মাঝে একজন ছিলাম। এখনো আছি হয়তো। কিন্তু যোগাযোগ নেই।

যা বলছিলাম। খুব মেধাবী ছিলেন তিনি। নিজের বই না থাকায় মামাতো ভাইয়ের বই পড়ে এক রাতে শেষ করে মাধ্যমিকে পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করতেন। তার এই গুনকে তখন থোরাই কেয়ার করতো সবাই। কারন ও যে মেয়ে! তার উপরে গরিবের ঘরের। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে বা ফোরে পড়ি। তখন সে এইট পাস করে ঢাকায় আসেন কাজের সন্ধ্যানে। গার্মেন্টস কাজ করে মা আর বাকি তিন বোনের খরচ চালাতেন, বাবা, আর তার রোজগারে মোটামুটি চলে যেত সংসার। তবুও হিমসিম খেতে হত তাদের, তার মায়ের হাপানী রোগের কারনে অনেক টাকা খরচ হত প্রতিমাসে। বোনেরা পড়াশোনা করে তার খরচ, সাংসারিক খরচ। সব মিলে চলে যেত এক প্রকার অভাবেই। ঢাকায় এক বছর থাকার পরেই তারই এক সহকর্মীর প্রেমে পড়ে বিয়ে করে তাকে। বাল্যবিবাহ বললেই চলে। দুজনার কেউই তখন বিয়ের যোগ্য তো দূরের কথা শিশু শ্রমের বাইরেও ছিলোনা। সেই বয়সে, শিশু শ্রম, বাল্যবিবাহ এই দুই রকম অভিশাপের মাঝে আরেক বড় অভিশাপ ছিলো তার অভাব আর মেয়ে বলে তাচ্ছিল্য পাবার মত বালাই। এতটুকু মেয়ের আবার এরি মধ্যে একটা মেয়ে সন্তান হলো। মেয়েকে তার মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় কাজ করতো সে। এরি মধ্যে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে তার অনুমতি ছাড়াই। বিষয়টা আদালত পর্যন্ত গড়ালে সমাজে মান সন্মান থাকবেনা ভাবে। নিজের ইচ্ছায় তালাকনামায় স্বাক্ষর করে দিলেন তার স্বামীকে সামাজিক বন্ধন থাকে মুক্তি। স্বামী তার তালাক পেয়েই ক্ষান্ত ছিলে না। সাথে তার দরকার মেয়েটিকে। তাও দিয়ে দিলেন। মেয়েকে নিয়ে সৎ মায়ের আড় চোখা চাহুনি আর কাজের বুয়ার কাজ করানো ছাড়া আর কিছুই দিতে পারল না সেই বাপ। বার বার মেয়েকে এখানে সেখানে আনা নেয়াতে স্কুলে ভর্তির বয়স অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। স্কুলে আর পোড়া হলোনা ঐ বয়সে। বেচারি ভর্তি করিয়েছিলেন একবার মাদ্রাসায়। সেখান থেকে কি মনে করে নিয়ে এলো জানিনা। আবাসিক মাদ্রাসায় মেয়েদের রাখাতে তিনি যৌক্তিক মনে করলেন না। যাই হোক। এর মাঝে তার আরকটি বিয়ে হয়। সে স্বামী বেচারা প্রেমের ফাঁদে ফেলে, মেয়ে সহ তাকে বিয়ে করতে রাজি করে। পরে দেখা গেলো তার নিজের চলাই দায়। গ্রামে তার আরেক সংসার আছে। দুঃখ, বেচারিকে ছাড়তে নাই চাইলো। নিজের মেয়ে কে নিয়ে নতুন স্বামীর ঘর করতে থাকলো। তবে এখানে স্বমীকে নিজের আয়ত্বে রাখতে পারলেন। কিছুদিন পরে মনে হলো তার আরেকটা পরিবার আছে। তারা এই লোকের উপর নির্ভরশীল, সে কেন তাকে এভাবে বস করে রখবে। একদিন স্বামী গেলো তার গ্রামের বাড়িতে। সে আর ফিরলোনা। পরে খবর পেলেন লোকটা স্ট্রোক করে মারা গেছে। আবার তার একলা জীবন। মেয়েকে নিয়ে এখানে ওখানে ধর্না দেয়া। মেয়েকে রেখে কাজ করা সম্ভব না। নিজের আত্মীয়দের কাছে মেয়েকে টাকার বিনিময় রেখে নিজে রোজগারের তাগিদে গার্মেন্টসে কাজ করা শুরু করে আবার। এভাবেই চলতে থাকে জীবন। এর মধ্যে মেয়ের বাবা আবার এসে মেয়েকে নিয়ে যায়।

মাঝে তার মা মারা যায়, সেজো বোন খুন হয়, বাবা আরেকটা বিয়ে করে। সে সব কথা অন্য দিন বলবো। আজ তার কথাই বলি।

এর পরে নিজের মত চলতে থাকে, ইচ্ছে মেয়ের জন্য কিছু টাকাকড়ি জমিয়ে শান্তিতে মরতে যাতে পারে সে। কিন্তু ঐ যে সমাজ? যার এমন যৌবন ঠিকরে পড়া দেহ, সে এমন একা? তাও আবার নারী! আশেপাশে কান কথায় বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে অল্পদিনেই। এক প্রকার বিয়ে করতে বাধ্য করলো বোন জামাই, চাচাতো ভাই, আরো কিছু আত্মীয়। কিছু না জেনে, না বুঝে, খোঁজ না নিয়ে। যেন বিয়ে দিলেই এ মেয়ের মুক্তি! সামাজের দ্বায়বদ্ধতার সমাপ্তি। বিয়ের কিছুদি পরেই জানা গেলো ঐ লোকের আরেকটা সংসার আছে গ্রামের বাড়ীতে। অত দিনে সে ৫ মাসের অন্তঃসত্বা। যখন সে জানতে পারলো ঐ লোকের আরেকটা পরিবার আছে। ঐ লোক নিরুদ্ধেশ হলো। পেটের সন্তানের ভূমিষ্ঠ হবার অপেক্ষায় প্রহর গুনে গুনে দিন পার করে যাচ্ছিলো।

এরি মাঝে আমার সাথে তার শেষবারের মত দেখা হয়েছিলো। আমার নানুবাড়িতে। তখন আমার ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে আমার পরিবার সহ আমার আশেপাশেরর লোকেদের মাথায় প্রথম বাজ পোড়েছিলো। আমি যতই যুক্তি দেই তারা একই যায়াগায় গিয়ে ঠেকছিলো। তখন এই লোকটা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো আর বলছিলো।
“তুই এগুলো এদের বোঝাতে পারবিনা। এরা কোনো দিন মেনে নেবেনা। আমি জীবনে অনেক ধর্ম কর্ম করেছি। অভাব আমাকে ছাড়েনি। আমার জীবনটা কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তুই দেখেছিস, জানিস। কই? আল্লা তো আমার প্রার্থনা শুনলোনা, আমি কি দুনিয়াতে কোনো ভালো কাজ করিনি? আমার জীবনে কেন এত দুঃখ? আমি জানি, যদি সত্যি আল্লা বলে কিছু থাকতো তবে আমার জীবনের এতটা বছরেও কেন আমার জীবনে সুখ এলোনা? আসলে বুঝলি! টাকাই সব। আমার বাবার টাকা থাকলে আমি শিক্ষিত হতাম, ভালো চাকরি করতাম, আমার সন্মান হত সমাজে। আমার বোনকে খুন হতে হত না। আমার মাকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হতনা।”

আমি ঢাকায় চলে আসার পরে আর আমাদের যোগাযোগ হয়নি। শুনেছিলাম তার মেয়ে হয়েছিলো। মেয়েকে এক নিঃস্বন্তান দম্পতিকে দিয়ে দিয়েছে। আর নিজে ঢাকায় চলে এসেছে। এখন কেউই তার খোজঁ জানেনা। আমি বার কয়েক তাকে খোঁজ করার চেষ্টা করেছি। পাইনি।

উপসংহারঃ
সমাজে যৌবনবতী নারীর যৌবন উপলব্ধি করতে পারে সাবাই। তার পেটের ক্ষুধা, আর স্বাভাবিক জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুর কথা কারো ভাবনাতে এক চিমটি তুলোর মতোও স্পর্শ করেনা। একজন মায়ের কষ্ট একজন মা ছাড়া আর কেইবা বুঝতে পারে। আমি তো অবলিলায় লিখেছি, তিনি আপন সন্তানকে দান করে দিয়েছেন। বিষয়টা কি এতই সহজ ছিলো একজন মায়ের কাছে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সামাজিকতা ও একজন নারী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 20 = 26