বাদশাদের দিনরাত্রি

চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশন।
কিছু সময় পর পর এক একটা ট্রেন এসে থামে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে চারপাশ।

লোকে লোকারণ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেনে চলতে থাকে ওঠানামা।
এদের সবাই আবার শিক্ষার্থী নয়। শাটল ট্রেনে প্রতিদিনই কিছু মানুষ
শিক্ষার্থীদের সাথে পাড়ি দেয় দীর্ঘ পথ। কারণটা শাটল ট্রেনের বিনা পয়সায়
যাতায়াত সুবিধা।

এছাড়া থাকে কিছু ফেরিওয়ালা আর হাত পাতা মানুষ।
হাতপাতা মানুষ গুলোর মধ্যে একজন হলো বাদশা।

বাদশা নামটা ভিক্ষাবৃত্তির সাথে কেমন যেনো অমিল।
তবুও সে বাদশা।
মায়ের আদরের বড় ছেলে বাদশা।
বয়স ৭।

সকালের ৭টা ৫০মিনিটের শাটল সে কখনোই মিস করে না।
শাটল ট্রেন তার উপার্জন ক্ষেত্র।

নামার পর স্টেশনে সুন্দরী ছাত্রীর ওড়না জাপটে ধরা তার জন্য নতুন নয়। “ইভ টিজিং” বা “যৌন হয়রানী” তার উদ্দ্যেশ্য না। এভাবে ইঁদুরের কলে ফেলে দিলে মেয়েরা সুড়সুড় করে টাকা বের করে দেয়, এটুক তার জানা।

তবে একটা ছেলে যদি হাজির হয়ে যায়,তখন বাদশা সেই জায়গা থেকে এক দৌড়ে হাওয়া।
মার খেতে কে চায়!

ভার্সিটির স্টেশন যখন প্রায় খালি, তখন এই জায়গা বাদশাদের খেলাঘর।
এই খেলায় কি নেই?
হাসতে হাসতে মাটিতে লুটোপুটি,
ব্যথা পেয়ে তীব্র কষ্টে কান্না,
মা-বাবা-চৌদ্দ গুষ্টির রক্ত হিম করা গালাগালি,
আবার ঝগড়া ভুলে মিত্রতা
-এভাবেই শেষ হয় প্রতিদিনের খেলাঘর।

আবার ট্রেন আসে।
আবার হাত পাতে।
করুণ কণ্ঠস্বর আর করুণ চেহারা করে সবার সিমপ্যাথি অর্জন করে দুই এক টাকা করে উপার্জন।

শহরে এসে ট্রেন থামে, আবার ভার্সিটি যায়, আবার আসে –এই আসা যাওয়ায় বাদশাও কর্ম-ব্যস্ত সবসময়।

চারপাশে আঁধার ঝাঁপিয়ে রাত নেমে আসে। কর্মব্যস্ত কাক-পাখির দল আপন নীড়ে ফেরে। বেড়ার উপর প্ল্যাস্টিক দিয়ে তৈরি বস্তির ঘরটি বাদশার যেনো অনেক আপন। ঘরটি যেন বাদশাকে ডেকে গল্প শোনায়।

বাদশার মা এখনো ফেরেনি।
আমিন জুটমিল এর নিম্ন স্তরের কর্মচারী সে। মাঝে মাঝে বড় কলমওয়ালাদের নিচেও যেতে হয়।

কারণ?
পেটের দায় নয়, নেশা।

বাদশা জানে তার মা আসতে দেরি আছে। কেনো দেরি তা বোঝার বয়স তার হয় নি।

বাদশার বাবা কে? কি নাম? কি করে? কোথায় থাকে?-কে জানে!
বাদশারজানা নেই সে কথা।
ছোট বোনটা এখনো বস্তির অন্য বাচ্চাদের সাথে ঘটি-বাটি খেলে। বাদশা মনে মনে ভাবে, আর একটু বড় হলে ওকেও মায়ের সাথে কাজে পাঠাবে।

কোনমতে রান্না শেষে ভাত খায় দুই ভাই বোন। খাওয়া শেষে চটের বিছানায় শুয়ে ক্লান্তি ভিড় করে বাদশার চোখে।

নিভু নিভু করে জ্বলতে থাকা কূপি বাতিটা কেরোসিন ফুরিয়ে নিভে যায়। ঘুমের চাঁদর জড়িয়ে ধরে বাদশার সারাগায়ে।

পরদিন স্টেশনে গিয়ে রাস্তায় ১০০ টাকার একটা নোট খুঁজে পাওয়ার স্বপ্নে হাসি ফোটে বাদশার ঠোঁটের কোণে।
স্বপ্নের মাঝেই।

____________________
জুমবাংলা নামে একটা অনলাইনে লিখেছিলাম “বাদশাদের দিনরাত্রি” শিরোনামে ফিচারটি।
১০ ডিসেম্বর,২০১৪ তারিখে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 41 = 44