পাহাড়ে আবারো বিজয় দিবস বর্জন করুন

আরো ৫ দিন পর মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পনের মধ্যে দিয়ে এদেশ চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।এর গুরুত্ব অবশ্যই তাৎপর্যময়।কিন্তু এটি কি দেশের সকল অংশের জন্য আনন্দময়,গর্বের হতে পেরেছে?উত্তর হবে —না।

বাংলাদেশ জাতিগত বৈষম্য, ভাষাগত-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইত্যাদি প্রতিবাদ প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে জম্ম নিয়েছিল।সেসব ভুলে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ তথা বাঙ্গালিরা দেশের এক দশমাংশ এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সেখানে বসবাসরত ১৩ টি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা যারা “জুম্ম জাতীয়তাবাদ”এ বিশ্বাসী তাদের পদাবনত করে রাখার হীন প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উগ্র বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।নিরবে-নিভৃতে চালানো হচ্ছে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক,সামরিক আগ্রাসন।

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সামরিকায়িত করে কারাগার বানিয়ে রাখা হয়েছে।
সকল প্রকার গণতান্ত্রিক অধিকার, মৌলিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত ১১ দফা নির্দেশনার মাধ্যমে পাহাড়ে অঘোষিত সেনাশাসনকে একপ্রকার বৈধতা দেওয়া হয়েছে।যেখানে ৬ নাম্বারে উল্লেখ আছে,”পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সাথে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমূহ দায়িত্ব পালন করবে”।

এর মাধ্যমে পাহাড়ে সেনাসন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য আগের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সভা-সমাবেশে পুলিশের পরিবর্তে নিজেরাই গিয়ে হামলা করছে,বেআইনীভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
বিভিন্ন অপকর্মের মদত দিয়ে যাচ্ছে। ভূমি বেদখল,হামলা,লুট-পাট,হত্যা-ধর্ষণে সেটলারদের উসকানি ও মদত দিয়ে যাচ্ছে।২০১৫ সালের ২৯ শে নভেম্বর “ফিলিস্তিন সংহতি দিবসের সমাবেশে সেনারা হামলা চালিয়েছিল।এবং দুইজন নারী নেত্রীকে তুলে নিয়ে পুলিশে সোর্পদ করেছিল।

তাছাড়া রাতের আধারে তল্লাশির নামে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে অহেতুক হয়রানি করছে।নিরীহ পাহাড়ি জনগণকে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে মারধর করা,তাদের অস্ত্র গুঁজে দিয়ে সন্ত্রাসী তকমা লাগিয়ে দিচ্ছে।এক আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে।

কেউ সভা,সমাবেশ করতে পারছে না,সে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে,উন্নয়নের নামে,পর্যটনের নামে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে ভূমি বেদখল করা হচ্ছে।সাজেক,বান
্দরবানের নীলগিরি এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। কিছুদিন আগে পর্যটনের নামে ত্রিপুরা গ্রাম উচ্ছেদ করে খাগড়াছড়ির আলুটিলায় ৭০০ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল,যা আন্দোলনের মুখে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।কিন্তু পাহাড়ে তেল,গ্যাস খননের নামে আবারো ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে যা এখনো প্রচার পায়নি।

এগুলো পার্বত্য এলাকার জুম্ম জনগণের কোন উপকারে আসেনি। মানিকছড়ির সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্র তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।যার উৎপাদিত গ্যাস সবটায় সমতলে ব্যবহার করা হচ্ছে।
একদিকে নিপিড়ন,নির্যাতন করা হচ্ছে, অন্যদিকে তাতে মলম লাগানোর ও আয়োজন করছে সেনা আর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সুচতুরভাবে।লোক দেখানো শান্তি কনসার্ট,চিকিৎসা কার্যক্রম যার উদ্দেশ্য হচ্ছে জুম্ম জনগণকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা।

যুব সমাজকে অকর্মণ্য করার জন্য মাদকের বিস্তার ঘটিয়ে দিচ্ছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা।
পাহাড়ে নিপিড়নের জন্য সরকার,সেনা-সেটলারদের সাধারণ আর বিশেষ দিনের কোন পার্থক্য নেই।২০১৪ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে ছবি মারমাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মহান বিজয়ের আগমনী উদযাপন করেছিল সেটলার বাঙ্গালিরা! তারপরের দিন,১৬ই ডিসেম্বরের ঘটনা তো ইতিহাস! এদিন নান্যচরের বগাছড়িতে ১২ টি দোকানসহ ৬০ টি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে বিজয় দিবস পালন করেছিল সেনা-সেটলাররা। পাহাড়িদের নি:স্ব করে দেয়া হয়েছিল।তারা ঘরের কোন জিনিসপত্রই রক্ষা করতে পারেনি।তীব্র শীতে খোলা আকাশের নীচে দিন যাপনে বাধ্য হয়েছিল।ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা পূরণ করা হয় নি।এখনও তারা ঘুরে দাড়াতে পারেনি। এখানে বারবার সেনাবাহিনীর নাম উল্লেখের কারণ হচ্ছে সেটলারদের উত্তেজিত করে নিজেরাই ব্যাকআপ হিসেবে ছিল।এবং পাহাড়ের প্রতিটি সাম্প্রদায়িক হামলায় সেনাবাহিনী এ ভূমিকায় আসীন হয়।পাকিস্তানি হানাদারদের প্রেতাত্মা এখনও তাদের মাঝে বিরাজমান।

বগাছড়ির ঘটনার প্রতিবাদে আমরা “বিজয় দিবস” বর্জন করেছিলাম।আমরা এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত,নিপিড়ন-নির্যাতন,সামরিক শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত নয়।বরং দিন দিন তা আরো তীব্রতর হচ্ছে নতুন
ভাবে,নতুন কৌশলে।

তাই বিজয় দিবস বর্জন এখনও প্রাসঙ্গিক এবং যতদিন সামরিক শাসন বন্ধ হবে না,সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবো না, স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হবে না ততদিন বিজয় দিবস বর্জন চলমান থাকুক।
বিজয় দিবস বর্জন হোক উগ্র বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার,সেনাশাসন,ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

60 − 59 =