পর্নোগ্রাফিক নিষ্ঠুরতা !! (পর্ব -২)

পর্নোগ্রাফিক নিষ্ঠুরতার প্রথম পর্বে আমরা অতি স্বল্প হারে জেনেছিলাম কেন পর্নোগ্রাফিক বিষয়বস্তু আমাদের ত্যাগ করা উচিত | এমনকি এও বলেছিলাম যে পরবর্তী পর্বে আমরা পর্ন ছবির আড়ালে একজন পর্ণস্টারের জীবনী সম্পর্কে জানবো | চলুন তাহলে আজ জেনে নেয়া যাক এমন একজন পর্নস্টারের কাহিনী যিনি ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন অন্ধকারের জীবন থেকে এবং পরবর্তীতে বর্ণনা করেছেন তার প্রত্যক্ষ করা পর্নোগ্রাফিক নিষ্ঠুরতার কথা !

ছবিতে যাকে দেখছেন , উনার নাম শেলি লুবেন (shelley lubben) যিনি একজন সাবেক পর্ন তারকা | তবে পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে রক্সি (Roxy) নামেই পরিচিত | তিনি ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন | মধ্যবৃত্ত ধার্মিক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম তার | তিন সন্তানের পরিবারে তিনি ছিলেন বড় | জন্মের পর থেকে প্রথম আট বছর পরিবারের সাথে তার জীবন বেশ স্বাভাবিক কাটছিলো | সেই সময় তিনি একটি চার্সে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলে পড়তে থাকেন | কিন্তু যখন তার বয়স নয় বছর তখন পারিবারিক সমস্যার দরুন তারা স্বপরিবারে তার জন্মস্থান ত্যাগ করেন | এবং পরবর্তীতে তার বাবা মা পরস্পরের মধ্যে দন্দের কারণে সে বেশ একা হয়ে পড়ে | পরিবারের সঙ্গ সঠিকভাবে না পেয়ে সময় কাটানোর জন্য সে বেছে নেয় বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামকে | প্রথমদিকে তার মানসিকতায় বেশ নোংরা প্রভাব ফেলে বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রাম যা ওই বয়সে তার জন্য মোটেই প্রযোজ্য ছিলো না | তাছাড়া সেই সময় তার এক প্রতিবেশী বান্ধবী হয় | সেই বান্ধবী এবং বান্ধবীর ভাই মিলে তাকে প্রথম প্রভাবিত করে যৌনতা নিয়ে বিভিন্ন ভ্রান্তির পথে | আস্তে আস্তে সেকচুয়াল ব্যাপারগুলো তার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং হয়ে পড়ে | একটি ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে তিনি এও উল্লেখ করেন যে তার বয়স যখন মাত্র এগারো কী বারো তখন থেকেই সে মাস্টারবেট থেকে শুরু করে ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে বিভিন্ন যৌনতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়েন |

ছোটবেলা থেকেই সে ছোট গল্প ও কবিতা লিখায় বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন | কিন্তু তার পরিবারের অবহেলা এবং অবজ্ঞায় সেই সৃজনশীলতা আর কাজে লাগানো হয়ে ওঠে না | বরং পরিবারের থেকে যথেষ্ট সঙ্গ না পেয়ে সে ফ্রাস্টেশনে ভুগতে থাকে | অবশেষে খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে এবং কষ্ট ভুলে থাকতে অতি অল্প বয়সেই সে ডুবতে থাকে এ্যালকোহল , নাইট ক্লাব এবং অবাধ যৌনতার মতো অন্ধকারের জগতে | এই সুযোগে তাকে ব্যবহার করে অনেকেই | ব্যাপারটা যখন তার বাবা মার নজরে আসে , তখন তারা তাকে বোঝানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেন | তখন থেকে তার মা বাবা সবসময় চেষ্টা করতো তাকে এ এসব থেকে ফিরিয়ে আনার | কিন্তু তার কাছে মনে হয় তার পরিবার সময়মতো তার প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে | প্রচণ্ডরকম মনক্ষুণ্ণ হয়ে সে অন্য মানুষের মাঝে নিজের পরিবার , একটুকু ভালবাসা খুজতে থাকে এবং সে তা খুজে পায় একদল খারাপ সঙ্গী এবং বিভিন্ন প্রকার নেশার মধ্যে |

অবশেষে তার বয়স যখন আঠেরো হয়ে যায় তখন তার বাবা মা ব্যাপারগুলো সহ্য করতে না পেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় | হঠাৎ শূণ্য হাতে ঘরছাড়া হয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে | সেই সময় তার পরিচয় হয় এক লোকের সাথে যে তাকে সাহায্য করতে চায় | লোকটি তাকে ভীষণ সহানুভূতি দেখায় এবং এক পর্যায়ে সাহায্যের নামে সে লুবেনকে জানায় কেউ একজন তার সাথে যৌনতায় লিপ্ত হতে চায় যে তাকে টাকা দিবে | একে ঘরছাড়া পরিবারহীন মানুষ , কোন উপায় না পেয়ে লোকটির কথায় সে রাজি হয়ে যায় | মাত্র পয়ত্রিশ ডলারের বিনিময়ে সে নিজেকে বিক্রি করে লোকটির কাছে এবং শুরু হয় তার পতিতাবৃত্তির জীবন !

শিঘ্রই তার পরিচয় হয় এক পতিতা সর্দারের সাথে যিনি তাকে রাতারাতি এই ব্যবসায় লিপ্ত করেন | প্রায় আট বছরের মতো সে লিপ্ত থাকে দেহ ব্যবসায় | এর মাঝে সে তিনবার সন্তানসম্ভাবী হয় এবং প্রথম দুবারই পতিতা সর্দার কাজের সুবিধার জন্য এ্যাবোশন করাতে বাধ্য করে | তার কাছে ব্যাপারটা অনেক অসহ্য লাগে এবং তৃতীয়বার সবার সাথে লড়ে অবশেষে নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় | কিন্তু একজন পতিতার মেয়ে হিসেবে তার মেয়েটি ভীষণরকম অবহেলার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকে | এমনকি তার ছোট সন্তানটির সামনেই তার দিনের পর দিন যৌনতায় লিপ্ত হতে হয় | প্রতিনিয়ত সে নিজের হেরে যাওয়া জীবন নিয়ে অসহায় হয়ে কাদতে থাকে | অবশেষে একসময় সে পতিতাপল্লী ত্যাগ করে এবং জানতে পারে পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রের কথা | সে পর্ন ইন্ডাস্ট্রির সাথে যোগাযোগ করলে তাকে বোঝানো হয় অতি অল্প সময়ে অনেক টাকা ইনকামের কথা | ফলে সে পর্ন ছবিতে কাজ শুরু করে | রাতারাতি তার মনে হতে থাকে সে এর দ্বারা যথেষ্ট পরিচিত এবং অর্থবান হয়ে ওঠবে | সে ভাবতে থাকে তার সময় হয়েছে সবাইকে নিজের ক্ষমতা দেখানোর যারা তাকে অবহেলা করেছে | কিন্তু দিনদিন পর্ণ চলচ্চিত্রে কাজ করাটাও তার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে | অভিনয়ের জন্যও তাকে সহ্য করতে হয় ভীষণ রকম শারিরীক অত্যাচার | সহ্য করতে না পেরে সে যখন পর্ন ইন্ডাস্ট্রি ছাড়তে চায় তখন এক পর্যায়ে তাকে জোর করে বাধ্য করা হয় কাজ করতে | নানাভাবে অত্যাচারিত হতে থাকে সে | ইতিমধ্যে কনডম কিংবা অন্য কোন প্রটেকশন ছাড়াই তাকে জোর করে এমন অনেক পর্ন তারকার সাথে তাকে যৌনতায় লিপ্ত করানো হয় যারা কিনা এইডস (HIV) , হার্পিসের (HERPES) এর মতো আরো ভয়ানক রকম যৌন রোগে আক্রান্ত | অবশেষে এভাবে চলতে থাকলে ২০০৪ সালে প্রথম Adult industry medical foundation (AIM) কতৃক প্রথম যৌনকর্মীদের এইডস এর মতো অন্যান্য Sexually transmitted disease (STD) অর্থাৎ যেসকল রোগ যৌন সম্পর্কের কারণে ছড়ায় তা প্রতি মাসে পরীক্ষা করে দেখা শুরু হয় | সেই সুবাদে লুবেন জানতে পারে সে হার্পিস (HERPES) দ্বারা আক্রান্ত | কিন্তু তখনো পর্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে সে মুক্ত হতে পারে না | তখনো তাকে দিয়ে জোর করে পর্নোগ্রাফিতে কাজ করানো হয় | ব্যথা , যন্ত্রনা আর অন্ধকার জীবন নিয়ে চিৎকার করে হাহাকার করতে থাকা নারীটি তবু হার মানে নি | অবশেষে বহু চেষ্টার পর সে এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে সক্ষম হয় গ্যারেট (Garrett) নামক এক ব্যক্তির মাধ্যমে | সে তাকে ওখান থেকে মুক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন | অনেক চিকিৎসার পর শেষে লুবেন সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া পুরো পর্ণোগ্রাফিক নিষ্ঠুরতার কথা গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন বিভিন্ন ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে |

পুরো ঘটনা জানার পর এখন কী ইচ্ছে হচ্ছে লুবেনের বর্তমান অবস্থা জানতে কিংবা তার সন্তান বা ঐ ব্যক্তিটি যে তাকে মুক্ত করেছিলো ? হ্যা গ্যারেট নামক সেই ব্যক্তিটি বর্তমানে লুবেনের স্বামী যে এক সন্তান সহ গ্রহণ করেন লুবেন কে | আর বর্তমানে বহির্বিশ্বে শেলি লুবেন একজন সচেতন পর্ণোগ্রাফি বিরোধী নারী চরিত্র | আলোড়ন সৃষ্টিকারী “Truth behind the fantasy of porn” বইটি তারই লিখা | এছাড়া “Pink cross foundation” নামক একটি সংস্থা তিনি চালান যার প্রধান কাজই হচ্ছে সেক্স ওয়ার্কার বা পতিতাদের অন্ধকার জীবন থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করা | প্রতিনিয়ত তিনি এখনো কাজ করে যাচ্ছেন সেই সব অন্ধকারের বাসিন্দাদের জন্য যাদের ডাক কারও অবধি পৌছায় না | ২০১১ সালে ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভাষণ দেন যেখানে তুলে ধরেন পর্নোগ্রাফিক নিষ্ঠুরতা এবং এর ক্ষতিকর বিষয়গুলো | অনলাইনে তিনি পর্নোগ্রাফি বিরোধী বিভিন্ন সাইট তৈরির মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এখনো |

একটা মিনিট একটু ভেবে দেখুন | আপনি আজ যে পর্ন ছবি দেখে এতো আনন্দ পাচ্ছেন , মজা নিচ্ছেন , আপনাকে এটুকু দিতে কারও জীবনের অবস্থা কতোটা দুর্বিসহ হয়ে পড়ছে কখনো ভেবে দেখেছেন ! আপনার আনন্দ , আপনার একেকটা ক্লিক , একেকটা ডাউনলোড কারও জন্য কান্নার কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে | এখনো ইচ্ছে হয় পর্ণোগ্রাফি দেখার ? এখনি সময় , রুখে দাড়ান পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে | পর্নোগ্রাফিক নিষ্ঠুরতার পরবর্তী পর্বে আরও নিষ্ঠুরতম কোন সত্য ঘটনা তুলে ধরবো আপনাদের সামনে | জানতে চোখ রাখুন ইস্টিশনের পাতায় …

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =