প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধ কিছু উপাখ্যান…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। একে এখানকার ছাত্ররা গর্ব করে বলে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন- একে কেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। অনেক ঘাটাঘাটি করে জানলাম, একে অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করা হয় দুটি কারনে। প্রথমত, দুটি প্রতিষ্ঠানই ছিল পুরনাঙ্গ আবাসিক। এতে করে ছাত্ররা তাদের ডিপার্টমেন্টের পূর্বে তাদের হলের সাথে সংযুক্ত হতে হয়। হলের মাধ্যমেই সব অফিশিয়াল কাজকর্ম করতে হয়। দ্বিতীয়ত, অক্সফোর্ডের মতো ঢাবিতেও ছিল তিন বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স। তাছাড়া একাডেমিক ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের সিলেবাস অনুসরন করে পরানো হত। এই দুটি কারনেই ঢাবিকে অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করা হত। কিন্তু এগুলা এখন শুধুই ইতিহাস। এখন অনেকেই বলে থাকে, ঢাবির ফোর্ড বিদায় নিছে থেকে গেছে শুধু অক্সগুলো।

ঢাবি হয়তোবা কোন একসময় আবাসিক ছিল। এখন শুধু আছে তা কাগজে কলমেই। সময়ের সাথে হলের সংখ্যা বেড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। একে এখানকার ছাত্ররা গর্ব করে বলে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন- একে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয় কেন? অনেক ঘাটাঘাটি করে যেটা জানতে পারলাম প্রধানত দুটি কারনে একে অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করা হত। প্রথমত, দুটি প্রতিষ্ঠানই ছিল পূর্ণাঙ্গ আবাসিক। ছাত্ররা তাদের বিভাগের আগে নির্দিষ্ট হলের সাথে যুক্ত হন। সব কার্যক্রম করা লাগে নিজের হালের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, অক্সফোর্ডের মতো ঢাবিতেও তিন বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স চালু হয়। এবং পড়ানোর ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের সিলেবাস অনুসরন করা, তারচেয়েও বেশি বেড়েছে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। ছাত্রছাত্রীদের ভারে সে আজ নুয়ে পড়েছে।এরা হলগুলোতে সংযুক্ত থাকলেও একটা বৈধ সীট পাওয়া যে কি সৌভাগ্যের ব্যাপার যে পাইছে সেও জানে যে পাই নাই সেও জানে। হাজার হাজার প্রতিযোগীর সাথে রীতিমত যুদ্ধ করে যারা চান্স পায়, ভর্তির পর তাদের উজ্জ্বল মুখটা আর উজ্জ্বল থাকে না। হলে উঠতে হয় পলিটিকাল বড়ভাইদের মাধ্যমে। একটা রুম এ গাদাগাদি করে থাকতে হয় বিশ ত্রিশ জনকে। এক হলে তো বারান্দায় থাকতে হয় ঝড় বৃষ্টিকে সঙ্গি করে। খেতে হয় ক্যান্টিনের বাসি পচা খাবার। একটা নুন তেল দিয়ে সিদ্ধ করা মাংসের টুকরো খেয়ে মাকে বলতে হয়- মা, আজকে মুরগির মাংস দিয়ে খেলাম। তারপর শুরু হয় এদের মান্যার শিখবার পালা। কিভাবে সালাম দিতে হয়, কিভাবে হ্যান্ডশেক করতে হয়, কিভাবে হলে চলতে হয়? এরপর শিখতে হয় কিভাবে ফাঁপর দিতে হয়। এর হাতেখড়িটা হয় ক্যান্টিনের ছোট বাচ্চদের ফাঁপর দিয়ে। এরপর ননপলিটিক্যাল নিরীহ ছাত্র কর্মচারীদের ফাঁপর দিয়ে পুরনাঙ্গ শিক্ষা লাভ করে। কেউ অন্যকে ফাঁপর দিতে না পারলে তার কপালে জোটে বড়ভাই অর্থাৎ পাতি নেতাদের ঝাড়ি। গেস্টরুম নামক টর্চার সেলে তার উপর বর্ষিত হয় সুন্দর সব গালির বর্ষণ। কোন ভুল করলে তো কোন কথাই নেই, ভাগ্য খারাপ থাকলে মাইরও জুটতে পারে। তারপর শিখতে হয় তেলবাজি, চাপাবাজি, চামচামি। হলে ভালভাবে থাকতে গেলে এগুলোর কোন বিকল্প নেই। বড়ভাইদের চামচামি করাটা খুবই জরুরি, এতে নাকি বড়ভাইদের সাথে সম্পর্ক ভাল হয়। এতে করে মিলবে ভাল কোন থাকার সীট। তেলবাজি, চামচামি করতে না পারলে পিছিয়ে পরতে হবে। এটা হয় চেইন অনুযায়ী। ধরুন, অতিক্ষুদ্র পাতি নেতা পা চাটতেছে ক্ষুদ্র পাতি নেতার, ক্ষুদ্র পাতি চাটতেছে পাতি নেতার, পাতি নেতা বড় পাতি নেতার, এভাবেই চলছে। সবাই সবার পা চাটতেছে, আবার সবাই চাটতেছে। কিছু কিছু তো কয়েক ধাপ এগিয়ে পারলে বিশেষ অঙ্গও চেটে দেয়। মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসে বড় নেতারা (তারাও কারো না কারো পা চাটে) আসে, এদের অপেক্ষায় যখন পাতি নেতারা দাড়িয়ে থাকে, তখন এদের কুত্তার দলের চেয়ে কম মনে হয় না। গাড়ীর পিছনে এদের দৌড় দেখলে যে কেউ এটা ভাবতে বাধ্য। তবে এতে পাতিনেতাদের অনেক উপকার হয়। বড় নেতাদের সুনজরে থাকলে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিরীহদের অত্যাচারের লাইসেন্স মেলে। এটাই বা কম কিসে? এভাবেই চলে যায় এই অক্সফোর্ডের অক্সদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। কিছু কিছু পাতি নেতা তো পুরাই হিটলার, এদের সামনে কথা বললে সমস্যা, হাততালি না দিলে সমস্যা, এমনকি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেও সমস্যা। এই হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেই হাসিমুখে চলতে হয় নিরীহ অক্সদের।

এই হলগুলোর দায়িত্বে থাকেন প্রভোস্ট নামের কাঠের পুতুল। এদের কাজ শুধু কাগজে সিল মারা আর পকেটে হল উন্নয়নের নামে চুরির টাকা ঢোকানো। এদের দেখলে আমার বাংলা সিনেমার পুলিশের কথা মনে পড়ে।

এত গেল ছাত্রছাত্রীদের কাহিনী। এবার আসি মহান শিক্ষকদের উপাখ্যানে। এখানকার মহান শিক্ষকরা পড়ানোর চেয়ে টাকা কামাতে আর গবেষণার চেয়ে রাজনীতি বেশি পছন্দ করেন। তারা নীল দল, লাল দল, সাদা দল নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে ক্লাস নেয়া বা গবেষণা করার মতো সময় তাদের থাকে না। আবার প্রোক্টর, ভিসির পা চাটতে হয় প্রমোশনের জন্য। ব্যক্তিগত বিশ্ববিদ্যলয়গুলোতে ক্লাস নিতে হয় উপরি ইনকামের জন্য। সবাই পা চাটা আর পকেটে টাকা ঢোকাতেই ব্যস্ত। এরা পড়াতে না পারলেও দুর্নীতি করতে পারে ভাল। শিক্ষক নিয়োগ, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বাজেট থেকে পকেটে টাকা ঢোকাতে এরা সিদ্ধহস্ত। সৃষ্টিশীল কোন কাজের আসে পাশেও নেই। সৃষ্টিশীল কাজ করার মতো ঘিলু অধিকাংশের মাথায় আছে বলে মনে হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন, এমনকি এখনও প্রতিটি আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ঢাবির এই অবদানগুলো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু দিনে দিনে ঢাবি গর্বের এই জায়গাটাও হারিয়ে ফেলছে। এখন নেতা কর্মীরা আদর্শে নয় তেলবাজিতে বিশ্বাসী। সবাই নিজের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টায় ব্যস্ত। ছাত্র, শিক্ষক সবাই নিজের জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। হারানো গৌরব ফেরানোর তাগিদ কারো মাঝেই নেই।
বিঃদ্রঃ এটা পুরো ঢাবির চিত্র নয়, কিন্তু অধিকাংশ ছাত্র ও শিক্ষক এর অন্তর্ভুক্ত। এটা মনে হয় না কেউ অস্বীকার করতে পারবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 80 = 85