চেতনার বিপণন, বঙ্গবন্ধুর বাণিজ্যিকীকরণ এবং আমাদের লজ্জা

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাসে এসে পড়েছি আমরা। মুক্তিই চেয়েছিলাম আমরা। আজ হিসেব কষে দেখলে সবাই একমত হবেন যে মুক্তি হয়নি আমাদের। তাই বলে যুদ্ধটা বিফলে গেছে তা নয়। পাকিস্তানের কবল থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। সেটাও কম কথা না। ইতিহাসে এই প্রথমবার বাঙালি তার নিজের ভাগ্যের গতি নির্ধারণের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করলো। কিন্তুু আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিলো আরো বিস্তৃত, আমাদের পাবার ছিলো বিস্তর। অথচ সেসব আকাঙ্ক্ষারা আজ মৃত। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ শাসন থেকে মুক্তি অর্জন করে কিছু বছরের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশে আবার ফিরে এসে মরহুম পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ এখনো সেই পাকিস্তানবাদের আছরে কবলিত। দেশে চলছে পাকিস্তানের ভৌতিক শাসন। অথচ দেশের শাসনক্ষমতায় আসীন রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে দল উদ্বুদ্ধ করেছিলো সাত কোটি বাঙালি সন্তানকে। শেখ মুজিবের নামে তাঁরই অনুপস্থিতিতে বাঙালির সন্তানেরা বিশ্বের সামনে উদ্বোধন করেছিলো অপরাজেয় দেশপ্রেম, অপরিমেয় সাহস আর অত্যুজ্জ্বল ত্যাগ। অথচ আজ …

আজকাল চেতনা শব্দটা শুনলেই কেমন জানি অচেতন বোধ হয় আমার । চেতনার সাথে যখন মুক্তিযুদ্ধ যোগ হয়ে ” মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ” হয় তখন খিচুনি শুরু হয়। আর কথাটা যখন আওয়ামীলীগ বলে তখন আমি মূর্ছা যাই। দ্বিতীয়ত, আজকের দিনে ভোট মানে বাণিজ্য। সবদলের ক্ষেত্রেই। আওয়ামীলীগের এই ভোট বাণিজ্যের মূল পণ্য বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অন্যান্যদের বিষয় বাদ রাখলাম। আওয়ামীলীগের যে ইতিহাস সেই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগ নামের পাশে তাদের নাম উচ্চারিত হবার যোগ্যতা রাখেনা। এই দুটো স্বীকার্য।

এবার মূল উপপাদ্যে আসি। পঁচাত্তরে খুনিরা শেখ মুজিবুর রহমানকে খুন করতে পেরেছিলো, খুন করতে পারেনি আপামর জনতার শ্যাখ সাহেবকে, বাঙালির বঙ্গবন্ধুকে। যে মানুষটা তার স্বদেশবাসীকে বলতেন “আমার মানুষ” (“কীসের রাউন্ড টেবিল, কার সাথে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সাথে বসবো?” অথবা “আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় …….” – ৭মার্চের ভাষণ); যিনি বলেন “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, এদেশের মানুষের অধিকার চাই”; যিনি নেতৃত্বগুণে উত্তুঙ্গ অদ্রিশৃঙ্গে অবিসংবাদিতভাবে বিরাজমান; যিনি নায়ক হয়েও জনমুখী; যিনি প্রতিটা বাঙালির ব্যক্তিগত আপনজন ; তাঁকে খুন করা যায়না। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরিক্রমায় একাত্তরে তিনি যখন সারা পৃথিবীর শেখ সাহেব হয়ে ,আমাদের স্বপ্ন ও সোনালি সাফল্যের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছেন, সেই প্রতিমূর্তিকে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে খুন করে ফেলতে পারে এমন ভয়াল বুলেট, এমন নৃশংস ঘাতক পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি, হওয়া অসম্ভব। ঘাতকেরা যেটা পেরেছে তা হলো একজন ব্যক্তি শেখ মুজিবকে হত্যা করেছে।

ব্যক্তিকে হত্যা করা যায় বটে । কিন্তুু ব্যক্তি যখন সকলের ব্যক্তিগত আশা আকাঙ্ক্ষার সমষ্টিতে একজন প্রতিমূর্তি, একটা প্রতীক, একটা আদর্শ এবং শেষমেষ বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হয় তখন সেই প্রতীক বা প্রতিমূর্তিকে যার নাম দিয়েছি বঙ্গবন্ধু, তাকে ঘাতকেরা খুন করতে পারেনা। কিন্তু ঘাতকের সেই অসম্পূর্ণ দুরূহ কাজটা গত চল্লিশ বছর ধরে স্বেচ্ছায়, বুঝে বা না বুঝে একটু একটু করে সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল। আওয়ামীলীগের কাঁধে দায় ছিলো বেশী বঙ্গবন্ধু আদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার। অথচ তারাই এখন পশ্চাদমুখী আর প্রতিক্রিয়াশীলদের পুরোধাতে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর সকল পরাধীন জাতি ১৯৭১ সালের পর থেকে প্রতীক্ষা করেছে যে তাদের মধ্যে একজন বঙ্গবন্ধুর জন্ম হোক। সকল পরাধীন জাতির জন্য বঙ্গবন্ধু আর বাঙালি ছিলো প্রেরণার উৎসস্থল। মুক্তিকামী জনগনের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিব। দিয়ে বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। অথচ আমরা-বঙ্গবন্ধুর বাঙালিরাই -শেখ মুজিবকে মেরে ফেললাম পঁচাত্তরে।

শুধু মুজিবকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি আমরা, বঙ্গবন্ধুকেও মারতে চেয়েছি। একের পর এক সংবিধান কাঁটা ছেড়া করে, অধ্যাদেশ জারি করে, সামরিক শাসনের যাঁতাকলে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সমস্ত চেতনাকে পিষ্ঠ করার আয়োজন চলেছে এদেশে । এসবের মধ্য দিয়েই আসলে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কাজটা সম্পন্ন হচ্ছে । বঙ্গবন্ধু এই স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন, যত্রতত্র এইসব বলে বলে বঙ্গবন্ধুকে সস্তা করে ফেলা হচ্ছে । তাঁর সাথে মানুষের ,সহজ মানুষের যে সহজ সম্পর্ক ছিলো সেটা কোথায় আজ? তাঁর কোন আদর্শ আজ আওয়ামীলীগ বাস্তবায়ন করছে? সোনার বাংলার স্বপ্ন? স্বপ্ন দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ,খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু স্বপ্ন দেখে বসে থাকলেই বা একের পর এক স্বপ্ন দেখলেই তো হয়না। স্বপ্ন পূরনের জন্য তিনি যতটুকু পেরেছিলেন করেছেন। তিনি প্রথমত নিজের স্বপ্নকে সব বাঙালির স্বপ্নের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন, বাঙালির ইতিহাসে আর কেউ কখনো যেটা পারেনি। স্তরবিন্যস্ত এবং শ্রেণীস্বার্থ দ্বারা বিভাজিত এই সমাজকে, এই সমাজমানসকে তিনি একটা বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করতে পেরেছিলেন। সেই বিন্দুর নাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, সেই বিন্দুর নাম মুক্তির সংগ্রাম। পেরেছিলেন বলেই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। খুব বেশি স্বপ্ন দেখার সুযোগ তাঁর হয়নি। তিনি প্রথম পর্যায়ে শোষণমুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। একাত্তরে তার কিছুটা অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলাম আমরা। এরপর যখন স্বাধীন দেশের দায়িত্ব নিলেন তিনি , তখনই আসলে তাঁর দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার পালা এলো। কিন্তুু সে অবসর হলো না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, কোষাগার শূন্য, সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব, সকল অপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাড় বাড়ন্ত ( স্বাধীনতাবিরোধী, দেশী শয়তান, বিদেশী চক্রান্ত ইত্যাদি) । এতোসব সামলে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবেন কখন? বর্তমান নিয়েই তো হিমশিম খাচ্ছেন! এরই মধ্যেই তাঁকে আমরা খুন করে ফেললাম! যদিও তিনি আমাদের স্বপ্ন দেখার জন্য একটা দেশ, স্বপ্ন জমা রাখার জন্য স্বাধীন মাতৃভূমি দিয়ে গেছেন, সেই স্বাধীন মাটিতে, স্বাধীন নদীতে, স্বাধীন সবুজ বন বাগান প্রান্তরের মুক্ত বাতাসে আমরা তাঁকে শান্তিতে তাঁর লোকেদের সাথে থাকতে দিইনি।

এটা আমাদের শোক শুধু নই, এটা আমাদের লজ্জা। তার চেয়েও বড় লজ্জা আমরা সেই স্বপ্নগুলোকেই ভুলে যাচ্ছি, আমাদেরকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওইরকম মহৎ কিছু জাতীয় স্বপ্ন না থাকলে জাতি টিকতে পারেনা। আমরা পারবো কিনা সেটাই দেখার অপেক্ষা!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − 9 =