একটি নিমকহারাম জাতি আর লাল গোল্লা

আমাদের পতাকার মাঝখানের লাল গোল্লাটা আমার কাছে আমার মায়ের দুই ভ্রু-এর মধ্যেখানে গোল করে দেয়া লাল সিঁদুরের মত লাগে।
সুন্দর লাগে।
ভালো লাগে।

ছোটবেলার একটা ঘটনা বলি।
ফুটবল বিশ্বকাপের সময় সবাই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইতালির পতাকা টাঙ্গিয়েছে ছাদে, দেয়ালে, পানির ট্যাংকির ওপর।

বাবার কাছে আমিও বায়না ধরলাম, পতাকা কিনে দাও প্লিজ।
বাবা ঠিক-ই পতাকা কিনে দিলো।
তবে লাল-সবুজের পতাকা।

আমি নিলাম না। রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম।
বাবা আমার ক্রিকেট ব্যাটের ডাঁটে পতাকাটা বেঁধে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, এখানে সবুজের উপর লাল মানে কি জানিস?

আমি ওদিক ফিরে উত্তর দিলাম, আর্জেন্টিনার পতাকা কিনে দাও।

বাবা আমাকে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। হাত-পা নেড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলাম।
বাবা আরো জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বললো, এটা হলো আমাদের দেশের পতাকা।

– জানি।

– এখানে লাল আর সবুজ আছে কেন জানিস…?

– জানি না। আমাকে আর্জেন্টিনার পতাকা…

– এখানে সবুজ হচ্ছে আমাদের দেশের রং।

– দেশের রং হয় বাবা?

– হয় তো। আমাদের দেশে সবখানে দেখবি সবুজ। গাছের পাতা, ঘাস, সবুজ বন…
সবুজ মানে সেটা ভালো।

– আর লাল মানে তাইলে খারাপ?

– বলা যায়। কিন্তু এ লাল সেই খারাপ লাল না।

– তাইলে?

– কোথাও যদি তুই ব্যথা পেলি, কি হয়?

– অষুধ লাগাই।

– আরে বাবা, ব্যথা পাবার পর রক্ত পড়ে না?

– হ্যাঁ তো। পড়ে।

– রক্তের রং কি?

– লাল।

– মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অনেক মানুষকে পাকিস্ততানীরা কষ্ট দিয়েছে। মেরে ফেলেছে। সবুজ দেশের চারদিকে ছিলো রক্ত।
সেই রক্তের মানুষ গুলা এক হয়ে শত্রু পাকিস্তানীদেরকে হারিয়ে দিয়েছিলো।

– সারা দেশের ছড়িয়ে থাকা রক্তগুলো এক হয়ে মাঝখানে এসছে বাবা?

বাবা একগাল হেসে আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো।
সে জড়িয়ে ধরার মধ্যে আলাদা কিছু ছিলো।
অনেক আলাদা কিছু।

.

আমার প্রথম কাপড়ের পতাকা।
আমি কপালে পড়ে ঘুরতাম।
মাথায় বেঁধে ঘুরতাম।
প্লাস্টিকের পিস্তল থেকে হলুদ হলুদ বুলেট দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার মারার খেলা খেলতাম।
নিজে নিজে।
একা একা।

বাসায় কেউ বেড়াতে এলে,
অথবা গ্রামে গেলে-
আমি সবাইকে শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম। তখন কে কি করেছে, কোথায় থেকেছে জিজ্ঞেস করতাম।
ভালো লাগতো।
আরো আগ্রহ লাগতো।

.

আমার পরিধিটা একদম-ই ছোট ছিলো।
যাদের সাথে মিশতাম, সবাই কিছু আমার পৃথিবীর।
আমার মতন কল্পনা করা মানুষ।

কিন্তু একটু বড় হয়ে যখন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে পা রাখলাম,
আমি হরেক রকম মানুষ দেখলাম!

আমি সেই লাল-সবুজের দেশে থেকেও বুঝতে পারলাম, এখানে অনেকে-ই লেগে আছে পাকিস্তান আর রাজাকারদের কাজকে শুদ্ধ বানাতে।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম।
এরা অনেক জানে।
খুব জানা মানুষ যখন ভুল দিকে জ্ঞানকে চালিত করে, খুব ভয়ঙ্কর হয়।
আমি কিছু-ই জানি না।
কথা গুছিয়ে বলতে পারি না।

মা বলতো, তুই হিন্দুর ছেলে।
এসব নিয়ে কারো সাথে ঝগড়া বাঁধাবি না।

আমি ওদের বিতর্কে অনেক পিছিয়ে থেকে হেরে যাচ্ছিলাম।
ওদের যুক্তিগুলো ভেঙ্গে আমি বলতে পারছিলাম না, তোমরা রক্তকে অস্বীকার করতে পারো না।

একজন আমাকে প্রশ্ন করেছিলো-

আচ্ছা, ধরো তুমি চট্টগ্রামে থাকো। চট্টগ্রামের কিছু মানুষ বিদ্রোহী হয়ে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা ঘোষণা করলো। তখন বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে দমন করতে গেলে তুমি কাকে সাপোর্ট করবে…?

আমার সে মুহুর্তটা একদম ভালো লাগে নি। প্রচন্ড রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে আমি তাকে কিছু-ই বলতে দিলাম না। শুধু নিজে-ই বলে গেলাম।
বললাম-

তুমি যদি এমন যুক্তি দাঁড় করিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করো যে যুদ্ধাপরাধীদের পাক সরকারকে সাপোর্ট করাটা বৈধ, পাকিস্তান সরকার যা করেছে তা বৈধ, তবে তোমার উপর আমার লজ্জা হয়।

বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান) পাকিস্তান স্বাধীন হবার পর থেকে যে পরিমাণ অত্যাচার চালানো হয়, এখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্থানের উন্নয়ন করা- এসব কথা তোমরা মানো না, কারণ তোমরা ব্রেনওয়াশড।

কালরাত্রীতে মানুষ ধরে ধরে যেভাবে মেরেছে, সেভাবে এতমানুষ হত্যার পর ধর্ম ছাড়া আর কোন বিষয়ে মিল না থাকা বহু দূরের একটা ভূ-ঘন্ড থেকে শেষমেশ আলাদা হতে চাওয়া সেই বাংলাদেশের তখনকার অবস্থাকে তুমি বানিয়ে দিতে চাইছো “জাস্ট কিছু বিদ্রোহী স্বাধীন করতে চেয়েছে”? কিভাবে পারো তোমরা?

আরো অনেক কথা বলেছি।
বললাম-ই তো আমি গুছিয়ে বলতে পারি না।
রেগে গেলে তো আরো পারি না।
শুধু এটা-ই মনে রাখতে পারি, রক্তের বিন্দু গুলো আমার মায়ের সিঁদুরের মত।

.

সেদিন একজন প্রশ্ন করলো, যাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে তা কি সঠিক কিনা!

আমি অবাক হয়ে ফিরতি প্রশ্ন করলাম, তুমি কি বলতে চাও? প্রশ্নটা একটু বুঝিয়ে দেবে?

সে আবার বললো, খুন ধর্ষণ তো এরা করে নি। রাজনৈতিক কারণে-ই কিনা এদেরকে খুনি -ধর্ষক বানানে হলো!

আমি প্রচন্ড রাগ চেপে গেলাম। উত্তর দিলাম,

তুমি আমার বন্ধু না হয়ে অপরিচিত কেউ হলে তোমার জন্মপরিচয় নিয়ে আমি প্রশ্ন করতাম। এ প্রশ্ন কোন পাকিস্থানী, বা অন্য কোন দেশের কেউ করলে আমি অবাক হতাম না। বাংলাদেশী হয়ে কি করে করলে এমন প্রশ্ন।

এরপর একটা শব্দ “ছি!” ছাড়া আর কিছু-ই মুখে এলো না।

.

আমাদের পতাকার মাঝখানের লাল গোল্লাটা আমার কাছে আমার মায়ের দুই ভ্রু-এর মধ্যেখানে গোল করে দেয়া লাল সিঁদুরের মত লাগে।

আর এই লাল গোল্লা এনে দেয়ার জন্য যে মানুষগুলো বুকের রক্ত দিয়েছে, তারা আজকে খুব কষ্ট পাচ্ছে আমি নিশ্চিত।

একটি জাতির সব ভালো মানুষগুলো বোধ হয় তখন মরে গেছে।

তারা মরে গেছে…
একটি নিমকহারাম জাতিকে বাঁচাতে!
তাদের রক্তের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “একটি নিমকহারাম জাতি আর লাল গোল্লা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − = 59