ভূ-বঙ্গে স্বাভাবিক যৌনতা অপরাধঃ ধর্ষণ-বলাৎকার-শিশুকামীতা উৎসাহিত!

ক.
হাটে-বাজারে কিংবা মেলায় নারী-পুরুষ বা তরুণ-তরুণী এক সাথে হাটা প্রায় অসম্ভব। চাইলেও পারা যায়না। বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে সর্বত্র একই চিত্র। সব বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে হাটলেও কতো বার যে ভীড় ভাট্টায় পরে নারী বা তরুণী যে পরিমাণ হেনস্থা হয় তার কিছুটা স্বাক্ষী প্রমাণ প্রতিদিন ধরে রাখে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। নাটক বা সিনেমা হলেও এক সাথে পাশাপাশি বসে নাটক সিনেমা উপভোগ করা যায়না।

খ.
নির্জনে একাকি বা পার্কে প্রেমিক-প্রেমিকা হাত ধরে ঘুরতে ফিরতে পারেনা। বাদাম খেয়ে খেয়ে একে অন্যের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেনা। একসাথে হাতে হাত ধরা অবস্থায় দেখলে দুর্বৃত্ত-ভিলেনাকারে পুলিশ এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নির্ভেজাল ভালোবাসায় কলঙ্ক দিয়ে মারধর, জেল-জরিমানা অবধি পর্যন্ত গড়ায়। স্কুল-কলেজ তো নয় যেনো একেকটা টর্চারসেল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেনো সাক্ষাৎ যমালয়। ছেলে-মেয়ের প্রেম বা বন্ধুত্ব হলে শিক্ষক থেকে অভিভাবক এমনকি সহপাঠী পর্যন্ত বিরুদ্ধাচার করে। বাধা দেয়, আপত্তি তোলে। নানান কেচ্ছাকাহিনি রটায়।

গ.
অন্যদিকে মাদ্রাসায়-মক্তব-মসজিদে হুজুর মুল্লারা নারীর হায়েজ-নেফাস (ইসলামে বর্ণিত ঋতুস্রাব ও গর্ভকালীন পবিত্রতা)’র নাম করে নারীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিষয়কে নিয়ে পানসুপুরির রস চিবুতে চিবুতে রসিয়ে রসিয়ে সেগুলোর যে রগরগে বর্ণনা করে তা পাক পবিত্রতাকে ছাপিয়ে পর্নকেও হার মানায়। মাদ্রাসার অষ্টম নবম দশম থেকে উচ্চতর ক্লাসে কুরান-হাদিসের নাম করে এই শারীরবৃত্তীয় প্রাকৃতিক ব্যাপারকে এই মুল্লামৌলভিরা চটির মতো উপস্থাপন করে। জনা কয়েক তরুণী আর ক্লাস ভর্তি তরুণেরা। শিক্ষক তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের রসিয়ে রসিয়ে তা আদি রসাত্মকারে উপস্থাপন করে। তরুণীরা লজ্জায় আনত হতে হতে ভাবে, ধরণী দ্বিধা হও, লুকাই।

ঘ.
বয়ানেরই ফাঁকেফাঁকে লম্বা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চলে কিশোরী-তরুণীদের শরীরের নানান জায়গায় বেত্রাঘাত। বাদ যায়না তরুণেরাও। অজু ঢিলা-কুলুপ হয়ে স্বপ্নদোষ হয়ে নারী সঙ্গমের পর কিভাবে নিজেকে সাফ সুতরো করে পাকপবিত্র হতে হয় চলে তার দীর্ঘ বয়ান। আর এসব হয় রগরগে, আদিরসাত্মকারে। ক্লাসে তখন পিনপতন নিরবতা। পাজামা পানজাবি হয়ে টুপি অবধি মরুর গনগনে গরম বয়ে যায়। চোখমুখ লাল, শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী। গোটা ক্লাসরুমে যেনো লু হাওয়া বইছে, শ্বাস তো নয় যেনো বদ বায়ু!

ঙ.
নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ককে দিনের পর দিন ঘরে বাইরে সর্বত্র করে রাখা হয়েছে নিষিদ্ধ। গোপনীয়। যৌনতা ভয়ংকর ট্যাবু। খেয়াল করে দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায় এই ভূ-বঙ্গে ধর্ষণ পছন্দ ও জনপ্রিয়। শিশুকামীতায় আপত্তি নেই। বলাৎকারও স্বাভাবিক। অরুচি নেই। বারবণিতা গমনেও অনাপত্তি নেই। রুটিন করে যায়। আপত্তি শুধু স্বাভাবিক যৌনতায়। আগ্রহ গোপন যৌনতায়! উৎসাহ দেয় নারী শিশুদের নিগ্রহ করে ধর্ষণ, গণিকাগমন, বলাৎকার ও শিশুকামীতায়। এই এক ঝলকের মহিমাময় যে জীবনপ্রাপ্তি তা যে কোনো এক নারী আর পুরুষের ভালোবাসে সানন্দ যৌন-ক্রিয়ার ফল তা যেনো লুকিয়ে আড়ালে গোপনে রাখাতে সমস্ত মহিমা নিহিত। বাচ্চারা যখন ধীরেধীরে বুঝতে শেখে তখন প্রশ্ন করে আমি কিভাবে হলাম? উত্তর হয় এরকম … তুমি আসমান থেকে পড়েছো, বা তোমাকে আল্লা পাঠিয়েছেন না হয় বলা হয় তোমাকে কুড়িয়ে পেয়েছি!

চ.
দিন যায় সময় পরিক্রমায়। দিনকে দিন এইভাবেই বেড়ে উঠি আমরা। শরীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যাপারগুলোকে রহস্য করে একে করে দেওয়া হয় অস্পৃশ্য। নিষিদ্ধ। শরীর-মনে চলে বিরামহীন সাপলুডু খেলা। ফুসফাস হয়। স্বাভাবিক প্রেম ভালোবাসা যৌনতাকে বিরাট অপরাধ জ্ঞান করে বেড়ে উঠি। প্রেম-ভালোবাসা, সেক্স যেনো হাজারো বছরের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি! ধর্ষণ বলাৎকার যেনো এক পশলা বৃষ্টি! মা-বাবার কোনো এক সময়ের স্বাভাবিক আন্তঃ সম্পর্কের ফল যে আমরা তা যেনো আমাদের ভুলিয়েভালিয়ে দিতে সবাই সদা তৎপর।

ছ.
এই ভূমে স্বাভাবিক যৌন শিক্ষা অপরাধ হিসেবে পরিগণিত। বেড়ে ওঠা শরীর যেনো আজন্ম পাপের ফল। নারীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেনো গন্ধম ফল। যেনো নিষিদ্ধ লোবান। নারীর কাছে পুরুষ যেনো হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ। নিমিষেই পুড়িয়ে খাক করে দেবে। পুরুষ তো নয় যেনো বীর্যদারী ঝর্ণা। লাঙল আর জমিনে যেমন ঘষাঘষি কর্ষণ চলে নারী আর পুরুষেও তেমনি! টক আর লবন যেমন মিলেমিশে চকাশচকাশ তেমনি। জিভে জল আসা আর নারী পুরুষে এক হওয়া একই কথা।

জ.
মানব-মানবীর সহজাত প্রাকৃতিক প্রেম ভালোবাসাকে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত-অঘোষিতভাবে দিনের পর দিন নিষিদ্ধ করে একে স্রেফ আদি গন্ধমকারে যৌনগন্ধী আদিম রুপ দেওয়া হয়েছে। যার কোনো নিদান সহসা দেখিনা। তুকতাক তো নয়ই।

ঝ.
“অবিবাহিত বাঙালি যুবকদের বিছানার চাদর ধুয়ে নারীকে খাওয়ালে নারী গর্ভবতী হয়ে যাবে” ‘বাঙালী জীবনে রমণী’ —-নীরদচন্দ্র চৌধুরী। (স্মৃতি থেকে ঝেড়েছি। সুতরাং শব্দের এদিকওদিক হতে পারে।)

এই অবস্থায় পর্নকে নিষিদ্ধ করার কি ফল হতে পারে, না পারে বা কিভাবে কি করা যায় তা সংশ্লিষ্টরা বিশদ ব্যাখ্যা করবেন। জানাবেন। পরামর্শ দিবেন। শ্রী নীরদচন্দ্র মহয়াশয়ের শরণাগত হওয়ার কারণ হলো এই যে, বাঙালি ইংরেজ এই ভদ্রলোক গুরুতর অভিযোগ ও আকাট্য প্রমাণ তুলে ধরে একে আরও জটিলকুঠিল করে তুলেছেন।

ঞ.
এই বাদামি চামড়ার দেশি ইংরেজ বাঙালির ‘বিছানা-দোষ’কে চোখে দুরবিন দিয়ে চোখের সামনে বড় করে ‘দাগ’টা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন। ‘আজন্ম পাপের ফল’ এই বাঙালি জনজাতিকে পাপোদ্ধার থেকে মুক্তি দিতে শ্রীমতি তারানা হালিম কী পারবেন কাঁথা, বিছানা, চাদর কিবা বস্তা-চটকে ধুয়েমুছে পাপস্খলন-পাপমোচন করতে? বিষয়টি সবিতা ভাবি, রসময় গুপ্তের পর্নের থেকেও গুরুতর। এ যে প্রাগৈতিহাসিক জন্মদাগ গো! মহাশয়া ভেবে দেখবেন কি…?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 − 60 =