চেকপয়েন্টঃ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ (পর্ব ৪/৪) – শেষ পর্ব

“প্রথমে তিনি তার মুক্তা অলংকৃত পিস্তল কোমরের বেল্ট থেকে খুলে এনে সমর্পন করলেন, এরপর তার সোর্ড, এরপর ডানকাঁধ থেকে র‍্যাঙ্ক ব্যাজ অপসারন করে নিজেকে সেই পদবী থেকে নিজেকে অপসারন করলেন নিজেই, এরপর তিনি সেগুলো খুলে লেঃ জেঃ অরোরার হাতে দিলেন। এরপর তার মাথা হালকা অবনত করলেন আত্মসমর্পন করছেন এটা বোঝাতে। তিনি নিজেকে সমর্পন করলেন এবং সেইসাথে সমর্পন করলেন তৎকালীন পাকিস্তান নামক রাস্ট্রের অর্ধেক, যাকে পূর্ব পাকিস্তান বলা হতো। উদয় হলো একটি রাষ্ট্রের, একটা পতাকার, আমাদের সোনার বাংলাদেশের।“


প্রথম পর্ব পর্ব – ২ তৃতীয় পর্ব
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
বিকেল ৫ টা ৫ মিনিট

আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর সম্পন্ন হবার পরপরই আত্মসমর্পনের সামরিক প্রথা মেনে লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজী, (সিতারা ই জুরাত) অথবা ‘টাইগার’ নিয়াজী আত্মসমর্পনের জন্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন, যিনি পরবর্তীতে একটি আত্মজীবনী লিখবেন “Betreyal of East Pakistan” শিরোনামে, যেখানে তিনি দাবী করবেন, উনি লড়াই করতে চেয়েছিলেন, জেনারেল হেডকোয়ার্টারে লেখা তার সব বার্তার শেষেই নাকি তিনি লিখতেন, “Last man, last round”।

“প্রথমে তিনি তার মুক্তা অলংকৃত পিস্তল কোমরের বেল্ট থেকে খুলে এনে সমর্পন করলেন, এরপর তার সোর্ড, এরপর ডানকাঁধ থেকে র‍্যাঙ্ক ব্যাজ অপসারন করে নিজেকে সেই পদবী থেকে নিজেকে অপসারন করলেন নিজেই, এরপর তিনি সেগুলো খুলে লেঃ জেঃ অরোরার হাতে দিলেন। এরপর তার মাথা হালকা অবনত করলেন আত্মসমর্পন করছেন এটা বোঝাতে। তিনি নিজেকে সমর্পন করলেন এবং সেইসাথে সমর্পন করলেন তৎকালীন পাকিস্তান নামক রাস্ট্রের অর্ধেক, যাকে পূর্ব পাকিস্তান বলা হতো। উদয় হলো একটি রাষ্ট্রের, একটা পতাকার, আমাদের সোনার বাংলাদেশের।“


(পাকিস্তানীরা কাদের কাছে সারেন্ডার করেছিলো এই ব্যাপারে এই ছবিটা একটা দলিল। “BANGLA DESH” নামটা চোখে না পড়বার কিছু নেই। এই যুদ্ধ আমরা একসাথে লড়েছিলাম, আমরাও একা নয়, ভারতও একা একাই নয়।)

টাইগার নিয়াজীর তার দেশের এবং ৯৩,০০০ যুদ্ধাপরাধী সেনার পক্ষ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের সাথে সাথে পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয় মেনে নিলেন এবং “তাদের” পূর্ব পাকিস্তানকে হস্তান্তর করলেন বাঙ্গালীদের হাতে। সাথে সাথেই সমাপ্তি ঘটলো দীর্ঘ সাড়ে নয়মাসের গনহত্যা, ধর্ষন, লুট, অগ্নিসংযোগ এবং ভারতের সাথে ১৩ দিনের স্বপ্লমেয়াদী যুদ্ধের। পূর্ব পাকিস্তান পরিনত হল গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে এবং পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশে।

যেই মুহূর্তে জেঃ অরোরা জেঃ নিয়াজীর মিলিটারী ব্যাজ খুলে নিলেন এবং রিভলবারটি গ্রহণ করলেন, হার হাজার জনতা বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে, মুক্তির অকৃত্তিম আনন্দে চিৎকার করে উঠলো, “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!!”

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা, স্বাধীন বাংলাদেশ
বিকেল সাড়ে ৫ টা

জেনারেল নিয়াজী, ওরফে টাইগার নিয়াজী, যিনি দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারন করেছিলেন শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন, তাকে বিমর্ষ এবং অশ্রু বিজরিত চেহারায় দেখা যাচ্ছে আত্মসমর্পনের দলিলে সাক্ষর করবার পর। এসময়ে জেঃ অরোরা তাকে জেনারেলের সম্মান প্রদর্শন করেন এবং স্বান্তনা দিতে দেখা যায় যদিও তার যোগ্য তিনি ছিলেন না।

১০০ পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা এবং ১০০ সৈনিক তাদের র‍্যাঙ্ক ব্যাজ খুলে ফেলে এবুং অস্ত্র সমর্পন করে লেঃ জেঃ নিয়াজীকে অনুসরন করলেন প্রতীকী রুপে। পুরো আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো খুব অল্প সময়ে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বাদবাকী পাকিস্তানী সেনাদের ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হলো যুদ্ধবন্ধী হিসেবে।

আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে না হতেই জনতা ছুটে আসে মঞ্চের দিকে। কোনভাবেই আর তাঁদের আটকে রাখা সম্ভব হয়না। জেঃ অরোরাকে দেখা যাচ্ছে জনতার কাঁধের উপর, এমন অবস্থা যৌথবাহিনীর কর্তাব্যক্তি এবং সেনা সবারই। তাঁরা আজ সূর্য্য ছিনিয়ে এনেছে, তারাদের আলোয় আজ চাঁদের রুপের কথা বলা হবে পৃথিবীর এই কোণে, এই সূর্য্য সন্তানেরা চাঁদকেও মনে হয় অধিকারে নিয়ে এ ভূমিতে রেখে দিয়েছে আজ।!!

পাকিস্তানী নিপীড়ন থেকে মুক্তির আনন্দ আজ সকল কিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো। তাঁদের আবেগের উপর আজ আর কারো নিয়ন্ত্রন নেই। তারা সকলেই আজ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক!!

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১
ভারতীয় লোকসভা, দিল্লী
ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এইমাত্র ভারতীয় লোকসভায় ঘোষণা করলেন,

“ঢাকা এখন স্বাধীন একটি দেশের মুক্ত রাজধানী!”

লোকসভার সকল সদস্য এই ঘোষণার সাথে সাথে উল্লাসে ফেটে পড়লো। টেবিল চাপড়ে, ফাইলের কাগজ উড়িয়ে তারা আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁদের কন্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিলো,

“জয় বাংলা, জয় ইন্দিরা গান্ধী!!”

তিনি আরও বললেন,

“এই অধিবেশন এবং পুরো জাতি এই ঐতিহাসিক ঘটনা চিরদিন স্মরণে রাখবে। আমরা বাংলাদেশের জনতাকে সম্ভাষন জানাই তাদের এই বিজয়লগ্নে। আমরা মাথানত করি সেইসকল তরুন যুবকদের প্রতি এবং মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের প্রতি তাঁদের বীরত্ব এবং দৃঢ় সংকল্পের জন্য।“

এর বাইরে তিনি দৃপ্ত কন্ঠে আরও ঘোষণা করলেন,

“ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক মুহুর্তও বেশি সময় অবস্থান করবে না!“

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১
ঢাকা, বাংলাদেশ
বিকেল, সন্ধ্যা, রাত, গভীর রাত এবং তারপর তারপর…

সন্ধ্যা থেকে শুরু করে পুরো রাত জুড়ে ঢাকার প্রতি কোনে কোনে জনতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করছে আজ। শহরের কোন মিস্টির দোকানেই আর কোন মিস্টি নেই, সবই বিতরন করা হয়ে গেছে। শহরের এখানে সেখানে মাইকে বাজছে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষন এবং দেশাত্মবোধক গান। কে জানে এতোদিন মানুষজন এসব কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলো?!

এমন দৃশ্য দেশবাসী আর কখনও দেখবে না। এমন বিজয়ের মুহুর্ত একটা দেশের ইতিহাসে একবারই আসে। আর কোন কিছুর সাথে এর তুলনা হয়না। হয়তো এদের প্রায় সবাই প্রিয়জন হারানোর বেদনা বুকে নিয়েও উল্লাসে মেতেছে আজ, বিজয়ের উল্লাসে!!

“জয় বাংলা! জয় বাংলা!!” শ্লোগানে মুখরিত আজ শুধু এই ঢাকাই নয়, পদ্মাপাড়, বক্ষপুত্রপারের মানুষ, সোনালী ধানক্ষেত, সর্ষে রঙের পাহাড়ঘেরা অঞ্চল সবই আজ এই শ্লোগানে মুখরিত। তাঁদের কেউ কেউ চলন্ত বাসের উপর লাফিয়ে নাচতে ব্যস্ত, কেউ শহরের অলিতে গলিতে দৌড়ে দৌড়ে গাইছে, “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি!”। তারা লুকোনো কোনো জায়গা থেকে আজ নির্ভয়ে বের করে আনছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এখানে সেখানে আজ এই পতাকা সদর্পে পতপত করে উড়ছে!

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১
দিল্লী, ভারত

ভারতীয় লোকসভা অধিবেশনে আবার ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তিনি যৌথবাহিনীর এ বিজয় সম্পর্কে বললেন,

“এটা বিজয়, কিন্তু কেবল অস্ত্রের বিজয় নয়, বিজয় একটি আদর্শের। মুক্তিবাহিনী এতটা নির্ভয়ে লড়াই করতে পারতোনা যদিনা তাঁদের স্বাধীনতার জন্য এমন অদম্য স্পৃহা এবং আত্মপরিচয়ের জন্য স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কামনা না থাকতো। আমাদের নিজেদের সেনারাও এমন নির্ভয় এবং নিমগ্ন হতে পারতোনা তাঁদের লক্ষ্য অর্জনে যদিনা তারা এর কারণ সম্পর্কে আবগত না থাকতো। “

এর মাধ্যমে ভারতীয়দের মনের ভাবনার কি প্রকাশ পাওয়া যায় সেটা বলা সম্ভব না হলেও বোঝা যায় যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অন্তত এই বিজয়কে কেবল ভারতের বিজয় মনে করছেন না। তিনি এই বিজয়ের কৃতিত্ব দিলেন বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতাকে। এ বিজয় ছিলো সেই অস্থির সময়ে আমাদের জনতার, যাদের সব ধরনের সাহায্য করেছিলো ভারতীয়রা দুঃসময়ের মিত্র হয়ে। এ বিজয় বাঙ্গালীর, এ বিজয় মিত্র বাহিনীর। এ যুদ্ধ আমরা একসাথে লড়েছিলাম!

১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ – ফেব্রুয়ারী ১৯৭২
স্বাধীন বাংলাদেশের তখন পর্যন্ত পরাধীন বিভিন্ন অঞ্চল

সামরিক বাহিনীর প্রথা অনুসারে প্রতিটি পাকিস্তানী পদাতিক ডিভিশন, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী এবং অন্যান্য আধা সামরিক বাহিনী আলাদা আলাদা ভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মসমর্পন করে ১৬ই ডিসেম্বরের আগে এবং পরে। জীবন রক্ষার তাগিদে অনেক পাকিস্তানী ইউনিট (ডিভিশন থেকে কোম্পানী পর্যন্ত) ব্যাজ খুলে এবং অস্ত্র সমর্পন করে আত্মসমর্পনের দলিলে সাক্ষর করে। তখনো পর্যন্ত দেশের নানা স্থানে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছিলো কারণ হাই কমান্ডের আত্মসমর্পনের পরেও বেশ কিছু পাকিস্তানী ইউনিট আত্মসমর্পনের নির্দেশনা না মেনে অথবা যোগাযোগহীনতার কারণে নির্দেশনা না পেয়ে লড়াই চালিয়ে যায়। কিন্তু এসব সংঘর্ষ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১০৭ নং ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খান ৪০০০ হাজারের বেশি সেনা সহ খুলনায় জনসম্মুখে আত্মসমর্পন করেন ১৭ই ডিসেম্বর। ১৮ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পাকিস্তানী সেনারা আমসমর্পন করে এবং চট্টগ্রাম মুক্ত হয়। চার হাজার পাকিস্তানী সেনা ২০শে ডিসেম্বর নওগাঁয় আত্মসমর্পন করে। বেশ অনেকগুলো বিহারী প্যারামিলিটারী বাহিনীর এবং সশস্ত্র পাকিস্তান সমর্থকদের ছোট ছোট দল দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থানের নিয়ন্ত্রনে ছিলো। বিশেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর, উত্তরবঙ্গ এবং পার্বত চট্টগ্রামে এমন অনেক ছোট ছোট পকেট ছিলো। ঢাকার মিরপুর মুক্ত হয় ৩১ শে জানুয়ারী। এই অভিযানের সময়ই নিখোজ কিংবা শহীদ হন জহীর রায়হান। তবে ফেব্রুয়ারীর মধ্যেই দেশের সকল অঞ্চল আলোচনা এবং সীমিত মাত্রার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মুক্ত হয়।

১০ জানুয়ারী, ১৯৭২
দিল্লী, ভারত

বাংলাদেশের জন্মের পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন ৮ জানুয়ারী। সেখান থেকে তিনি লন্ডনে উড়ে যান। এরপর সেখান থেকে রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে দিল্লীতে এসে পৌছেছেন আজ। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সহ পুরো মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সকল সাংসদ বিমানবন্দরে উপস্থিত। সেখান থেকে তারা সরাসরি চলে এলেন সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষন দিতে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বললেনঃ

“আমরা ভারতের জনতার কাছে তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। প্রথমত, যারা ভারতে শরনার্থী হয়ে এসেছিলো তারা বাংলাদেশে আবার ফেরত যাবে। দ্বিতীয়ত, আমরা মুক্তিবাহিনী এবং বাংলাদেশের মানুষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো । এবং তৃতীয়ত, আমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্ত করবো। আমরা আজ আমাদের তিনটি প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেছি।“

দুঃখের বিষয় হচ্ছে এটাই, যে আমরা এই মহীয়সী নারী এবং নেত্রীকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথাযথ সম্মান দেইনি কখনোই। দেশ স্বাধীন হবার পর ভারত বিদ্ধেষ চরমে ওঠে, এবং নানা রাজনীতির মারপ্যাচে আমরা এসব অবদান কিংবা সাহায্যের কথা ভুলে যাই। আমরা কেবল সে ঘটনাগুলোর কথাই মনে রেখেছি যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভারতীয় বাহিনীর দ্বারা হয়েছিলো, এটা ভেবে দেখিনা যে ভারতীয় বাহিনীর সেই সময়ে আসলে কি করবার সক্ষমতা ছিলো। স্বাধীনতার পর আমাদের চল্লিশ বছর লেগেছে রাস্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা জানাতে এই মহীয়সী নারীকে। চল্লিশটা বছর একটু দীর্ঘ্য সময়ই বটে!

শেখ মুজিবুর রহমান আবেগাপ্লুত কন্ঠে ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আপনার সরকার, সেনাবাহিনী এবং জনগন যে মততা দেখিয়েছে এবং যে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশের জনগন তা কখন ভুলবেনা। শ্রীমতী গান্ধী সারা বিশ্ব ঘুরে তাঁর সাধ্যমত করেছেন এটা নিশ্চিত করতে যে আমি নিরাপদে আছি। আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার সাড়ে সাত কোটি জনতা তাঁর এবং তাঁর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ!”

ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক দক্ষতা এবং দুরদর্শিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের দৈর্ঘ্যকে সংক্ষিপ্ত করে। ইন্দিরা গান্ধী এ সময় সাহসী এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সকল প্রতিকুলতা আর আন্তর্জাতিক চাপ সামলে। পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকান এবং চীনা সমর্থনের পালটা পদক্ষেপ হিসেবে তিনি দক্ষ কূটনোইতিক ডীপি ধরকে মৈত্রী চুক্তির জন্য সৌভিয়েত ইউনিয়ন প্রেরণ করেন যা তাঁকে নির্ভয়ে এবং মুক্তভাবে নানা পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। উনি তাঁর দেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় অর্জনে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন যা ভারতকে তাঁর ৬২ ও ৬৫ তে হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে এবং একটী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে। উনি দৃঢ়চিত্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং জাতিসংঘের নানা চাপ সামাল দেন প্রায় একাই।

১৭ মার্চ, ১৯৭২
ঢাকা, বাংলাদেশ

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রনে ঢাকায় এসেছেন। এসেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রথম যে ঘোষণাটি দিলেন, তা হচ্ছেঃ

“ভারতীয় সেনাদের প্রয়োজন বাংলাদেশে ফুরিয়েছে। তারা এবার নিজের দেশে প্রত্যাবর্তন করবে।“

১৬ ডিসেম্বর দেয়া কথা তিনি রাখলেন। স্বাধীনতা অথবা বিজয় লাভের কেবল ৩ মাসের মধ্যে বিজয়ী কোন বাহিনীর সহযোগী মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহারের ব্যাপারে পৃথিবীর ইতিহাসেই একটা দৃস্টান্ত হয়ে রইবে।

স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিপূর্ণ আত্মপ্রকাশের সাথে সাথেই আমাদের উপর অর্পিত হয় অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশ হিসেবে মাথা উচু করে দাড়াবার দ্বায়িত্ব; শ্রদ্ধ্যা, সম্মান এবং অহংকার নিয়ে…

ইস্টিশনে পূর্বে প্রকাশিত, পরিমার্জিত
চেকপয়েন্টঃ আদর্শ, দেশপ্রেম, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার অল্প গল্প) – ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − = 10