লিক্রি, যেখানে সময় থেমে থাকে অন্তহীন।


১.
রেমাক্রী জলপ্রপাতের ঠিক সামনে দুপুরে রান্নার জন্য একটি আড়াই কেজি ওজনের মাছকে কাটাকুটু করছিলাম, পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল ছোটভাই অজল, জয়, রেদোয়ান এবং স্থানীয় দু-একজন। ঠিক সেসময়,কয়েকজন পর্যটক সেখানে উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন মাছটি এখানকার নদীর মাছ কিনা। কথাবার্তার এক পর্যায়ে তারা জানতে চাইলেন আমরা কতটুক পর্যন্ত গিয়েছি । আমরা জানালাম লিক্রি পর্যন্ত গিয়েছি। তারপর তাঁদের একজন জানতে চাইলেন, লিক্রিতে কি আছে??? আমি উত্তরে বলেছিলাম, লিক্রিতে মানুষ আছে ।
২.
তখন থানচিতে তুমুল খাদ্য সংকট, মানুষের পাঠানো সহযোগীতা পৌঁছে দিতে রেমাক্রী বাজার থেকে দৌলিয়ানের পথে হাঁটছি আর হাঁটছি। ঘামে চুপসে যাওয়া সবার সামনে ছিলাম আমি, আমার পিছনে স্থানীয় একজন এর কিছু দুরে সবাই । পথে দেখা হলো একদল বিজিবি’র সাথে। দেখা’র সাথে সাথে কোন কথা ছাড়াই সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, এই বাড়ি কই??? আমি উত্তরে বলেছিলাম, বাংলাদেশ।
৩.
থানছি’র লিক্রি, সূর্যমনি, মালুংগ্যা, থাংকোয়াইন, বুলু, পানঝিড়। দেশের একপ্রান্তের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শঙ্খ নদীর পাড়ে গড়ে উঠা এক একটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত,দূর্গম গ্রাম। বাংলাদেশ শেষ সীমার কাছে থাকা এসব মানুষদের জন্য সবসময় কিছু একটা করার তাড়না ছিল। যাদের বিশ্বায়নে কোন মাথাব্যাথা নেই, বৈশ্বিক উঞ্চতা, পরিবেশ বিপর্যয়ের কোন ধারণা নেই, নগরায়ন-শহরায়ন পর্যটন জানেনা, মৌলিক চাহিদা-অধিকারের জন্য তারা অচ্ছ্যুৎ। প্রকৃতি নির্ভর সন্তানেরা,আদি অকৃত্রিম মানুষেরা সাঁজিয়েছে তাঁদের মত সভ্যতা । তাঁদের দেখে এসে তাঁদের গল্প হবে আজ।
৪.
দেশ বিদেশ থেকে পাঠানো সহযোগীতায় কেনা ৫০৪টি কম্বল, তিন বস্তা ব্যবহার করা ভাল কাপড়, এক কাটন ঔষধ ছিল আমাদের আর্ত মানুষের পাশে থাকার ভ্রমণে। সহযোগীতা পৌঁছে দেয়ার চালেঞ্জ বুকে নিয়ে তিনটি বোটে এসব মালামাল এবং দেশের একএক প্রান্ত থেকে জড়ো হওয়া সমমনা একদল স্বাপ্নীক মানুষ। ভৌগলিক, প্রাকৃতিক বৈরিতা ছিল বরাবর। কোটি কোটি পাথুরে ভড়া নদী শঙ্খের বাক পেরিয়ে থানছি থেকে উজানে পদ্মমুখ, তিন্দু, রেমাক্রী, তারপর ছোটমদক, বড়মদক, জাবারং, বাসিঅং, ম্রংওয়া হয়ে আন্ধারমানিক, ছাইপোক, ইয়াংবং উপর-নিচ, ম্রংগং। এক এক করে পেরিয়ে কখনো বোট ঠেলে, কখনো পিচ্ছিল ছোট পাথরে হোছট খেয়ে তুমুল জীবন ঝুকিময় পথে এগিয়ে যাওয়া লিক্রি তারপর আরো উজান…….। থানছি থেকে পানিপথে ৯৪কিলোমিটার উজানে, বোটে ২৪ঘন্টা থেকে,এ এক মানুষের পাশে থাকার অনন্য ভ্রমণ। জীবনের ফ্রেমে বেঁধে রাখার মত স্বাপ্নিক স্মৃতি।
৫.
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বরাবর কোন বিশেষণ, উপমায় উপস্থাপণ করা যায়না। অগণিত ছোট ছোট ঝর্ণা, কোটি কোটি পাথরে ভরা হিম শীতল জল। নদীপথে পাঁকা চালতার গন্ধ আজীবন নাকে রয়ে যাবে। ঘন জঙ্গল,রাতে হরিণের হ্রেষা ডাঁক, নদীর পাড়ে বুনো হরিণ চড়ে বেড়ানো, ছোট বড় নাম না জানা পাখি, মরা গাছের গুড়িতে ছোট ছোট কচ্ছপ বাচ্চার রোদ পোহানোর দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি এখানে প্রকৃতিই রয়েছে। এখানেই প্রকৃতির নিজস্ব জগৎ। এখানকার মানুষরাও প্রকৃতির মত। সহজ সরল, অতিথি পরায়ণ, আলাদা করে একটা ঘটনার কথা না বললেই নয়, ফেরার পথে ঝুকি ছিল বেশী কেননা নদীর প্রবল স্রোত,আর পাথর। এসবের কোনটার মাঝে যদি ধাক্কা লেগে যায়, আমি জানিনা বাঁচার উপায় থাকবে কিনা। ফেরার পথে বোটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটু দেরী হয়েছিল। আন্ধার মানিক থেকে ম্রংগং শঙ্খ নদীর এ এলাকাটা হচ্ছে খুবই বিপদজনক। দু-পাশে খাড়া পাথুরে দেয়াল, পানিতে প্রবল স্রোত,বড় বড় পাথর। এ এলাকার মাঝখানে অন্ধকারে আশাহীনভাবে যখন আমাদের বোট পাথরে ধাক্কা খেয়ে চলছিল,বুকে হাজার দূর্ঘটনার শঙ্কা নিয়ে বসেছিলাম ঠিক তখনি দেবদূতের মত উপস্থিত হয়েছিল নদীর চড়ে অস্থায়ীভাবে বাসা বাঁধা এক মার্মা পরিবার। ছাইপোক নামে ছোট ঝিড়ি’র মুখে তারা ছিল, আমাদের এহেন অবস্থা দেখে এত যে সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছিল আমি মুগ্ধ। তারা তাঁদের তাবু ছেড়ে দিয়েছিল আমাদের জন্য। নিজেদের জন্য রাখা শেষ সামান্য খাবার আমাদের খেতে দিয়েছিল। জুমের আলু পুড়ে খেতে দিয়েছিল। এ স্মৃতি কখনো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে যে অসহায় প্রাকৃতিক চাহনি দেখেছি, কখনো ভূলতে পারবোনা।
৬.
আর্ত মানুষদের গরম কাপড়ে জড়ানোর এবারের ভ্রমণে আমরা সাংগু সংরক্ষিত অঞ্চলে মোট ২৩টি গ্রামে ৫০৪টি কম্বল, ঔষধ বিতরণ করে এসেছি । তাছাড়া সাঙ্গু নদীর পাশে অস্থায়ী ভাবে থাকা ১৪পরিবারকে কম্বল, শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি । ভ্রমণে মানবিকতা কি যে প্রশান্তির কাজ!!!!
শীতবস্ত্র বিতরণের একটা ঘটনা উল্লেখ না করলে এ কাজের পূর্ণতা পাবেনা কখনো, তাই……
আমাদের দলের ভূলের কারণে ছোট ইয়াংবং নামের একটা গ্রামে দু-বার কম্বল বিতরণ হয়েছিল । পরে তিনজন গ্রামের মহিলা নদীর পারে অপেক্ষা করেছিল তা ফেরৎ দেয়ার জন্য। আমরা যখন ফিরছিলাম আমাদেরকে এমনভাবে হাত নেড়ে, ইশারা করে দাঁড়াতে বলছিলেন আমি অবাক হয়ে ছিলাম। তখন তারা কম্বলসব ফেরৎ দিয়েছিল, তারা বলেছিল সবার ভুলে তারা দু-বার করে কম্বল পেয়েছে তাই এইসব কম্বল অন্যসব পরিবারে যেন দিয়ে দিই, বিতরণ করি। আমি নির্বাক হয়েছিলাম, কারা মানুষ???!!! কারা প্রকৃত মানুষ??!!!! কারা প্রকৃত মহৎ, বিবেকবান।
?_nc_eui2=v1%3AAeFcD9e0jE2JPmG9KI4E3ptMltgFEk6PY1dyPg-DeKC30trh1COcpKXmt4EXdi2LiQih1I82LnOLDJMAJbzfIU_qc5gpBOcYifIJGHyI9qPAww&oh=8608c45732721c34719daaac3d1e118c&oe=58F11C0D
৭.
লেখার শুরুতেই আমি দুটো ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলাম কারণ এখানকার নিরাপত্তা বাহিনী এবং অধিকাংশ পর্যটকদের দৃষ্টিভঙ্গি,ব্যবহার বরাবর এমনটি। তারা সময়ে সময়ে, বারবার এমন ব্যবহার সবার সাথে করে এসেছে। তাই তারা সবার সাথে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আর শহরের কিছু আবাল মার্কা আলাল যায়, যাদের চিন্তায় থাকে সবসময় মাস্তি, টাকা উড়াউড়ি, জলসা বসানো, মজা লুটা। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেনা, অনুভব করেনা এলাকার সংষ্কৃতি, জীবনযাত্রা, সেসবের শ্রদ্ধা। প্রকৃত মানুষকে মানুষ ভাবার যার অনুভূতি নেই সে নিজে কখনো মানুষ হতে পারেনা সে হোক পর্যটক অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ।
আমার উত্তরও হয়তো পাথুরে নির্লিপ্ত হয়েছিল, কিন্তু আমি এখনো মনে করি তা যথার্থই ছিল।
৮.
প্রকৃতির নিজস্বতা দেখলে, মানুষের অকৃত্রিমতা দেখলে বরাবর মনে হয়, সময় থেমে থাকে এসবে। প্রকৃতির সন্তানেরা কতদিন প্রাকৃতিক থাকবেন আমি জানিনা, পর্যটনের ঠেলায়, উন্নয়নের ঠেলায় তারা কতটুক কুলিয়ে উঠতে পারবে তাও জানিনা। আমি মনে করি তাঁদেরকে তাঁদের মত থাকতে দেয়া উচিত।
উল্লেখ্য যেঃ আমরা কিছু সমমনা স্বাপ্নিক দেশের অন্যতম দূর্গম গ্রাম লিক্রিতে একটি আবাসিক স্কুল করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আপনাদের সহযোগীতা বিশেষ প্রয়োজন। জানি পাশে থাকবেন। ইতিমধ্যে,গ্রামের পাশে ১৫একর জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে।
কৃতজ্ঞতা জানাই সেসব মানুষদের যারা সহযোগীতা পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ জানাই দলের সবাইকে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1