ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রসারে তরবারি ( তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

খিলজি (১২৯০-১৩২০) ও তুঘলক (১৩২০-১৪১৩) শাসনামলে ভারতে মুসলিম শাসন বিশাল সেনাবাহিনী ও ব্যাপক ভূখণ্ড নিয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আফিফ উল্লেখ করেছেন, সুলতানের ক্ষমতা এ সময় এতই ব্যাপক ছিল যে, ‘কারো সাহস ছিল না উচ্চ-বাচ্য করার’।

বহু হিন্দু বিদ্রোহ দমনের জন্য অভিযান চালানোর পাশাপাশি সে বিধর্মী অঞ্চলগুলোকে মুসলিম নিয়ন্ত্রণে আনার উদগ্র আকাক্সক্ষায়ও বহু অভিযান চালায় সেসব অঞ্চলে।

এসব অভিযানে সে বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠিত মাল কব্জা করে, যার মধ্যে ছিল ক্রীতদাস; কিন্তু সে সম্পর্কে লিখিত দলিল খুব কম। সম্ভবত এর কারণ হলো: ক্রীতদাসকরণ ও লুণ্ঠন এসময় একেবারে জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সমসাময়িক কালের লেখকদের রেখে যাওয়া সামান্য কিছু প্রামাণ্য দলিল বিবেচনা করলে সে সময়ের সম্পর্কে সাধারণ ধারণা পাওয়া যাবে। খিলজি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জালালুদ্দিন খিলজির শাসনকালে (১২৯০-৯৬) হিন্দু বিদ্রোহীদের দমন ও সুলতানাতের সীমানা সম্প্রসারণের নিমিত্তে নির্মম ও নিষ্ঠুর অভিযান শুরু করা হয়। সে কাটিহার, রাঁথাম্বর, জেইন, মালোয়া ও গোয়ালিয়রে অভিযান চালায়। রাঁথাম্বর ও জেইন অভিযানে সে মন্দিরসমূহ বিধ্বস্ত এবং বিপুল লুণ্ঠন ও বন্দি সংগ্রহের মাধ্যমে একটা “স্বর্গের নরক” সৃষ্টি করে—লিখেছেন আমির খসরু। আমির খসরু আরো লিখেছেন: মালোয়া অভিযান থেকে বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠন দ্রব্য (যার মধ্যে সর্বদা থাকতো ক্রীতদাস) দিল্লিতে আনা হয়।

পরবর্তী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি (শাসনকাল ১২৯৬-১৩১৬) আগের সব সুলতানকে ছাড়িয়ে যায়। সে ১২৯৯ সালে গুজরাটে এক বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে সবগুলো বড় বড় শহর ও নগর, যেমন নাহারওয়ালা, আসাভাল, ভানমানথালি, সুরাট, ক্যামবে ও সোমনাথ তছনছ করে। মুসলিম ইতিহাসবিদ ইসামি ও বারানী জানান: ‘তিনি এ অভিযানে বিপুল পরিমাণে লুণ্ঠিত মালামাল ও উভয় লিঙ্গের ব্যাপক সংখ্যক বন্দি সংগ্রহ করেন।’

ওয়াসাফের তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম বাহিনী বিপুলসংখ্যক সুন্দরী তরুণীকে বন্দি করে, যার সংখ্যা ছিল প্রায় ২০,০০০ এবং সে সঙ্গে উভয় লিঙ্গের শিশুদেরকেও বন্দি করে নিয়ে যায়। ১৩০১ সালে রাঁথাম্বর ও ১৩০৩ সালে চিতোর আক্রমণ করা হয়। চিতোর আক্রমণে ৩০,০০০ লোককে হত্যা করা হয়েছিল এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মুসলিমরা পরাজিতদের নারী-শিশুকে ক্রীতদাস করে। এ সময় কিছু রাজপুত নারী জওহর বরণ করে আত্মহত্যা করে।

১৩০৫ থেকে ১৩১১ সালের মধ্যে মালোয়া, সেভানা ও জালোর অভিযান করে বিপুল সংখ্যক লোককে বন্দি করা হয়। সুলতান আলাউদ্দিন তার রাজস্থান অভিযানেও বহু ক্রীতদাস আটক করে। আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে ক্রীতদাস ধরা যেন শিশু-খেলার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমির খসরু লিখেছেন: ‘তুর্কিরা তাদের খেয়াল-খুশিমতো যে কোনো হিন্দুকে ধরতে, কিনতে বা বিক্রি করতে পারতো।’ ক্রীতদাসকরণ এতটাই ব্যাপক ছিল যে, সুলতান ‘তার ব্যক্তিগত কাজের জন্য ৫০,০০০ হাজার দাস-বালক নিয়োজিত ছিল এবং তার প্রাসাদে ৭০,০০০ ক্রীতদাস কাজ করতো’, জানান আফিফ ও বারানী। বারানী সাক্ষ্য দেন: ‘সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির রাজত্বকালে দিল্লির দাস-বাজারে নতুন নতুন দলে অবিরাম বন্দিদের আনা হতো।’

১৩২০ সালে এলো তুঘলকরা। ভারতে সবচেয়ে শিক্ষিত ও জ্ঞানী মুসলিম শাসকদের মধ্যে একজন ছিল মোহাম্মদ শাহ তুঘলক (১৩২৫-৫১) এবং সুলতানাত আমলের (১২০৬-১৫২৬) সবচেয়ে শক্তিধর শাসক। তার কীর্তি কুখ্যাত আলাউদ্দিন খিলজির কৃতিত্বকেও ম্লান করে দিয়েছিল। তার শিহাবুদ্দিন আহমদ আব্বাস লিখেছেন: ‘সুলতান বিধর্মীদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে তার অন্তরের উদগ্র বাসনা পূরণে কখনো পিছপা হননি… প্রতিদিন অত্যন্ত সস্তা দরে হাজার হাজার ক্রীতদাস বিক্রি হয়, বন্দিদের সংখ্যা এমনই বিপুল।’ তার কুখ্যাত শাসনামলে ভারতের দূর-দূরান্তে ইসলামি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সে সুদূর বাংলা ও দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বহু অভিযান পরিচালনা করে। এছাড়াও সে চরম নিষ্ঠুরতার সাথে ১৬টি প্রধান প্রধান বিদ্রোহ নিস্তব্ধ করে। এসব বিজয় ও দমন অভিযানের অনেকগুলোতে বিপুল পরিমান লুণ্ঠিতদ্রব্য কব্জা করে, যার মধ্যে অনিবার্যরূপেই থাকতো প্রচুর সংখ্যক ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রাচুর্য এমন ছিল যে, পরিব্রাজক ইবনে বতুতা যখন দিল্লিতে পৌঁছন, সুলতান তাকে ১০ জন ক্রীতদাসী উপহার দেয়।

ইবনে বতুতার নেতৃত্বে সুলতান চীন সম্রাটের কাছে উপঢৌকনসহ এক কূটনৈতিক বহর পাঠায়। সে বহরের সঙ্গে ছিল একশ’ ফর্সা ক্রীতদাস এবং একশ’ হিন্দু নৃত্যশিল্পী ও গায়িকা। সুলতান ইলতুতমিস ও ফিরোজ শাহ তুঘলকের (মৃত্যু ১৩৮৮) শাসনকালে খলিফা ও শাসকদের কাছে উপহারস্বরূপ ক্রীতদাস পাঠানো ছিল সাধারণ ঘটনা। ইবনে বতুতা লিখেছেন: ‘সুলতান সারা বছর ধরে ক্রীতদাস সংগ্রহ করতেন এবং ইসলামের প্রধান দুই ঈদ-উৎসবের দিন তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দিতেন।’

স্পষ্টতই এটা ছিল ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির নিমিত্তে।

পরবর্তী সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (শাসনকাল ১৩৫১-৮৮) ভারতীয়দের প্রতি ছিল যথেষ্ট দয়ালু, কারণ সেই প্রথম মুসলিমদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারতীয়দেরকে (ধর্মান্তরিত মুসলিম) সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করে। তার শাসনাধীনেও বিধর্মীদেরকে ক্রীতদাসকরণ অত্যন্ত জোরের সাথেই চলতে থাকে। আফিফ সাক্ষ্য দেন: ‘তার প্রাসাদে তিনি ১৮০,০০০ তরুণ ক্রীতদাস বালককে সংগ্রহ করেছিলেন।[৫১] পূর্বসূরী মোহাম্মদ তুঘলকের মতোই তিনি সারা বছর হাজার হাজার নারী ও পুরুষ ক্রীতদাস আটক করতেন এবং ঈদ-উৎসবের দিন তাদের বিয়ে দিতেন।’

আফিফ জানান: ফিরোজ শাহ তুঘলকের অধীনে ‘ক্রীতদাসের সংখ্যা অগণিত হয়ে উঠে’ এবং ‘দেশের প্রতিটি কেন্দ্রে এ প্রথার (দাসপ্রথার) ভিত্তি মজবুত হয়ে উঠে।’

মধ্য এশিয়া থেকে আগত আমির তিমুর একজন ‘গাজী’ কিংবা ‘শহীদ’ হওয়ার ইসলামি গৌরব অর্জনের খায়েশে ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত হয় (১৩৯৮-৯৯)।

দিল্লি পৌঁছাবার আগে সে ইতিমধ্যে ১০০,০০০ বন্দিকে কব্জা করেছিল। দিল্লি আক্রমণের আগে সে সেসব বন্দিকে নির্বিচারে হত্যা করে। দিল্লি আক্রমণ থেকে শুরু করে তার রাজধানীতে ফেরা পর্যন্ত পথিমধ্যে সে রেখে যায় বর্বরতার লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ইতিহাস: হত্যা, ধ্বংসলীলা, লুটতরাজ ও ক্রীতদাসকরণ, যা সে তার নিজস্ব স্মৃতিকথা ‘মালফুজাত-ই তিমুরী’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছে।

১৩৯৮ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তার দিল্লি আক্রমণে, লিখেছে তিমুর: ‘১৫,০০০ তুর্ক সেনা হত্যা, লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হয়। লুঠের মালামাল এতই বিপুল ছিল যে, প্রত্যেকে পঞ্চাশ থেকে একশ জন করে পুরুষ, নারী ও শিশুকে ভাগে পেয়েছিল। কারো ভাগেই কুড়ি জনের কম ক্রীতদাস পরেনি।’ যদি প্রতিটি যোদ্ধা গড়ে ৬০ জন বন্দিকেও পেয়ে থাকে, সেদিন কমপক্ষে ১,০০০,০০০ (১০ লাখ) ক্রীতদাস কব্জা করা হয়েছিল

তিমুর বর্ণনা করেছে, মধ্য এশিয়ায় তার রাজধানীতে ফেরার পথে সে সেনানায়কদেরকে নির্দেশ দেয় যে, পথমধ্যে প্রত্যেক দুর্গ, শহর ও গ্রামে হানা দিয়ে সমস্ত বিধর্মীকে তরবারির খাদ্যে পরিণত করতে। তার বর্ণনা মতে: ‘আমার সাহসী সঙ্গীরা তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে অনেককে হত্যা করে এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে বন্দি করে।’

কুতিলায় পৌঁছানোর পর সে সেখানকার বিধর্মীদেরকে আক্রমণ করে। তিমুর লিখেছে: ‘সামান্য প্রতিরোধের পর শত্রুরা পলায়ন করে, কিন্তু তাদের অনেকেই আমার সৈনিকদের তলোয়ারের নিচে পড়ে। বিধর্মীদের সকল স্ত্রী ও সন্তানকে বন্দি করা হয়।’

সামনে অগ্রসর হয়ে গঙ্গা-স্নান উৎসবের সময় গঙ্গাতীরে পৌঁছানোর পর তার যোদ্ধারা ‘বহু অবিশ্বাসীকে হত্যা করে এবং যারা পাহাড়ে পালিয়ে যায় তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে।’ ‘লুঠের মালামালের পরিমাণ ও সংখ্যা, যা আমার যোদ্ধাদের হস্তগত হয়, তা সকল গণনা ছাড়িয়ে যায়,’ লিখেছে তিমুর।

তিমুর সিউওয়ালিক পৌঁছে লিখেছে, ‘তাদেরকে দেখেই বিধর্মী ‘গাবর’রা পলায়ন করে। ধর্মযোদ্ধারা তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে নিহতদের স্তূপ বানায়।’ অগণিত লুঠের-মাল তার বাহিনীর হাতে আসে এবং ‘উপত্যকার সমস্ত হিন্দু নারী ও শিশুদেরকে বন্দি করা হয়।’

নদীর অপর তীরে রাজা রতন সেন তিমুরের অগ্রসর হওয়ার খবর শুনে তার যোদ্ধাদের নিয়ে ত্রিসর্তর (কাংড়ার) দুর্গের ভিতরে আশ্রয় নেন। তিমুর লিখেছে: দুর্গটি আক্রমণ করা হলে ‘হিন্দুরা ছত্র ভঙ্গ হয়ে পলায়ন করে এবং আমার বিজয়ী যোদ্ধারা তাদেরকে ধাওয়া করলে মাত্র কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তারা বিপুল পরিমাণ লুঠের মাল কব্জা করে, যা ছিল গণনার অতীত। প্রত্যেকে ১০ থেকে ২০ জন করে ক্রীতদাস পায়।’ এর অর্থ দাঁড়ায়: এ আক্রমণে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার লোককে ক্রীতদাস বানানো হয়

সিউওয়ালিক উপত্যকার অপর অংশে ছিল নগরকোট নামক ভারতের একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর। তিমুর উপসংহার টেনেছে: এ আক্রমণে ‘পবিত্র ধর্মযোদ্ধারা মৃতদেহের বিশাল স্তূপ সৃষ্টি করে এবং বিপুল সংখ্যক বন্দিসহ ব্যাপক পরিমাণ লুঠের মালামাল ও ক্রীতদাস নিয়ে বিজয়ী বীরেরা অতি উল্লসিত চিত্তে ফিরে যায়।’

দিল্লি থেকে ফেরার পথে তিমুর হিন্দু দুর্গ, নগরী ও গ্রামে প্রধান পাঁচটি আক্রমণ করে। এছাড়াও অন্যান্য ছোট ছোট আক্রমণ করা হয়েছিল এবং প্রতিটিতে ক্রীতদাস শিকার করা হয়েছিল। কব্জাকৃত ক্রীতদাসদের আনুমানিক সংখ্যা একমাত্র কাংড়া আক্রমণের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়, যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজারের মতো। অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুরূপ সংখ্যায় ক্রীতদাস ধরা হলে সে তার ফেরার পথে ১০ থেকে ১৫ লাখ ক্রীতদাস সংগ্রহ করেছিল। এর সঙ্গে যদি দিল্লিতে কব্জাকৃত ক্রীতদাসদের যুক্ত করা হয়, তাহলে সে অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ ভারতীয় নাগরিককে ক্রীতদাস বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তার রাজধানীতে। সে দিল্লিতে কয়েক হাজার শিল্পী ও কারিগরও বাছাই করেছিল তার রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

সহজেই অনুমেয়, হয় মর নয় ক্রীতদাস হও এবং অতঃপর ইসলাম গ্রহণ বাধ্যতামূলক! পাঠক সহিংস জিহাদ হলো ইসলামের প্রাণ, যার বিনা ইসলাম হয়তো বা সপ্তম শতাব্দীতেই মৃত্যুবরণ করতো!

দিল্লির ক্ষমতা বিধ্বস্ত করে তিমুরের প্রত্যাবর্তনের পর স্বল্প সময়ের জন্য তুঘলকরা ও পরে সৈয়দরা তাদের ক্ষমতা সংহত করতে অনেক অভিযান পরিচালনা করে।১৪৩০ সালে কাবুলের আমির শেখ আলী পাঞ্জাবের শিরহিন্দ ও লাহোর আক্রমণ করে। ফেরিশতা লিখেছেন: লাহোরে ‘গুণে গুণে ৪০,০০০ হিন্দুকে হত্যা করা হয় ও বিপুল সংখ্যক হিন্দুকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়’; টুলুম্বায় (মুলতানে) তার বাহিনী ‘স্থানটি লুটপাট করে, অস্ত্রবহনে সক্ষম সব পুরুষকে হত্যা করে এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে বন্দি করে নিয়ে যায়।’

লোদী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান বাহলুল ছিল এক স্বেচ্ছাচারী লুণ্ঠনকারী এবং বন্দিদেরকে দিয়ে তিনি এক শক্তিশালী বাহিনী গঠন করে। নিমসারের (হারদয় জেলায়) বিরুদ্ধে আক্রমণে সে সেখানকার বাসিন্দাদের হত্যা ও ক্রীতদাসকরণের মাধ্যমে স্থানটিকে একেবারে জনশূন্য করে ফেলে। তার উত্তরসূরী সিকান্দার লোদী রেওয়া ও গোয়ালিয়র অঞ্চলে একই দৃশ্যের অবতারণা করে।

১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করার মাধ্যমে আমির তিমুরের গর্বিত উত্তরসূরী জহিরুদ্দিন শাহ বাবর ভারতে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করে। তার আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা ‘বাবরনামা’য় কোরান থেকে তুলে ধরা আয়াত ও সূত্রের অনুপ্রেরণায় সে হিন্দুদের বিরুদ্ধে জিহাদ অভিযান চালায় বলে বর্ণনা করেছে।

বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অবস্থিত তৎকালীন ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্য বাজাউর আক্রমণ সম্বন্ধে বাবর লিখেছে: ‘তাদের উপর সাধারণ হত্যাকাণ্ড চালানো হয় এবং তাদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে বন্দি করা হয়। আনুমানিক ৩,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। (আমি) আদেশ দিলাম যে, উচ্চস্থানে ছিন্ন-মস্তক দ্বারা একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।’ একইভাবে সে আগ্রায় হিন্দুদের ছিন্ন-মস্তক দিয়ে স্তম্ভ নির্মাণ করেছিল। ১৫২৮ সালে কনৌজের শত্রুদেরকে আক্রমণ ও পরাজিত করে এবং ‘তাদের পরিবার-পরিজন ও অনুসারীদেরকে বন্দি করা হয়’।

আকবর ১৫৬৮ সালে চিতোরের যুদ্ধে নিহত রাজপুত সেনাদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে ক্রীতদাসকরণের নির্দেশ দেয়, যারা বিষপানে বা অগ্নিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়ে তাদের সম্ভ্রম রক্ষা করেছিল। নিষিদ্ধ ঘোষণা সত্ত্বেও প্রদেশগুলোতে ক্রীতদাসকরণ অব্যাহত থাকে আকবরের আমলে।

মোরল্যাণ্ড লিখেছেন: আকবরের শাসনকালে স্বাভাবিক সময়ে শিশুদেরকে চুরি বা অপহরণ ও বেচা-কেনা করা হতো; বাংলা ছিল এসব অপকর্মে কুখ্যাত, যেখানে তা সবচেয়ে বীভৎসরূপে (ক্রীতদাসদের খোজাকরণ ইত্যাদি) চর্চা করা হতো।

আকবরের উত্তরসূরী জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭) ও শাহজাহানের (১৬২৮-৫৮) শাসনামলে, গোঁড়ামি ও ইসলামিকরণ ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হয়। পরবর্তী সম্রাট শাহজাহানের অধীনে হিন্দু কৃষকদের অবস্থা ক্রমান্বয়ে অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছয়। মুঘল আমলে ভারত সফরকারী পর্যটক মানরিকে দেখেন: কর আদায়কারী কর্মকর্তারা বিপন্ন ও দরিদ্র কৃষক ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে ধরে নিয়ে যেতো, কর আদায়ের জন্য তাদেরকে বিভিন্ন বাজার ও মেলায় বিক্রি করতে। ফরাসি চিকিৎসক ও পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার, যিনি ভারতে ১২ বছর বসবাস করেন ও সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন, তিনিও এরূপ ঘটনার সত্যতা জ্ঞাপন করেছেন। তিনি কর প্রদানে অপারগ দুর্ভাগা কৃষকদের সম্পর্কে লিখেছেন: তাদের শিশুদেরকে ক্রীতদাসরূপে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। মানরিকেও একই ঘটনার সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। আওরঙ্গজেবের শাসনকাল (১৬৫৮-১৭০৭) হিন্দুদের জন্য ভয়ঙ্কর বিবেচিত। তার শাসনামলে কেবলমাত্র ১৬৫৯ সালেই গোলকুণ্ডা (হায়দরাবাদ) শহরে ২২,০০০ তরুণ বালককে খোজা করা হয়।

ইরানের নাদির শাহ ১৭৩৮-৩৯ সালে ভারত আক্রমণ করে ও ব্যাপক নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের পর তিনি বিপুল সংখ্যক ক্রীতদাস সংগ্রহ করে।অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে আফগানিস্তান থেকে আহমাদ শাহ আবদালী তিন-তিন বার ভারত আক্রমণ করে।‘পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ’ (১৭৬১) বিজয়ী হয়ে তিনি নিহত মারাঠা সেনাদের ২২,০০০ স্ত্রী-সন্তানকে ক্রীতদাসরূপে বন্দি করে নিয়ে যায় । ভারতে সর্বশেষ স্বাধীন মুসলিম শাসক টিপু সুলতান ত্রিবাঙ্কুরে ৭,০০০ লোককে ক্রীতদাস করেছিল। তাদেরকে অন্যত্র উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। যতদিন মুসলিমরা ভারতে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব খাটিয়েছে, ততদিন বিধমীর্দেরকে ক্রীতদাসকরণ পুরোদমে চলেছে। উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে ব্রিটিশদের ক্ষমতা সংহত হওয়ার সাথে ক্রীতদাসকরণ ও ধর্মান্তকরণ কর্মকাণ্ড রুদ্ধ হতে থাকে। এমনকি ১৯৪৭ সালে ভারত-ভাগের সময়ও মুসলিমরা হাজার হাজার হিন্দু ও শিখ নারীকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক মুসলিম বানিয়ে মুসলিমদের সঙ্গে বিয়ে দেয়; এটা দীর্ঘকালব্যাপী ইসলামি ধর্মান্তকরণের কিছুটা নমনীয় রূপ মাত্র। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে হামলাকারী পাঠান মুসলিমরা কাশ্মীর থেকে হিন্দু ও শিখ মেয়েদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের ঝেলুম জেলার বাজারে বিক্রি করেছে।

অতঃপর পাঠক, সুফিবাদের মিথ্যা মোড়কে ইসলামের উপমহাদেশে ব্যাপ্তির আসল ইতিহাস ঢাকা যাবেনা। যা সত্যি তা প্রকাশ্যে আসবেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 + = 23