বাংলাদেশের জাতীয় দিবসে পাহাড়ে চলমান সহিংসতার রাজনীতি

?oh=7144ec1113a937006bf53d9056cb980c&oe=58E20D3C” width=”500″ />
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস এলেই অজানা আশঙ্ক্ষায় বুক কাঁপে, এই বুঝি আবার শুরু হলো। ফেলে আসা দিনগুলো আমাদের বারবার এটাই মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় আমার বোনের ধর্ষিত লাশের রক্তমাখা মুখ, মনে করিয়ে দেয় ঘর-বাড়ি হারিয়ে মানুষের কান্নাভরা মুখ, আবার পাহাড়ের মানুষদের আতঙ্কভরা চোখ। অথচ এ দেশের প্রতিটি মাটি পাকিস্তান থেকে মুক্ত করতে বাঙালিদের পাশাপাশি পাহাড়িরাও যুদ্ধ করেছিল, প্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু এক চাকমা রাজার কারণে এই সকল পাহাড়ি মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রতিটি জাতিসত্ত্বাকে আজো অপবাদ সহ্য করতে হচ্ছে দেশবিরোধীতার। এ দেশ কি আমরা চেয়েছিলাম?? এ দেশ পাওয়ার জন্যই কি বীর বিক্রম ইউ. কে চিংরা যুদ্ধ করেছিলেন জীবনবাজি রেখে??

উত্তর আমাদের জানা নেই। এ দেশ আমার হওয়ার পরও, দেশকে ভালোবাসার পরও এ দেশ আমার নয়। এ দেশ আমাকেই আজ হত্যা করতে উদ্যত, আমাকেই আজ আমার নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে বদ্ধপরিকর। ১৯৯৭ সালে বহুল আলোচিত “পার্বত্য চুক্তি” করা হলেও পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসে নি। ২০০১ সালে ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাশ করা হলেও এখনো এটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বারবার এভাবে হতাশার দেয়ালে আমাদের ঠেলে দেয়া হয়েছে। অপারেশন দাবানল পরিবর্তিত হয়ে অপারেশন উত্তরণ-এ পরিণত হয়েছে। পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতির ঠেলায় সাধারণ পাহাড়িদের জীবন আরো প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। কারণ, অপারেশন উত্তরণের নামে আসলে বাস্তবায়িত হচ্ছে অপারেশন দাবানলের প্রক্রিয়া। তাই পাহাড়ে আজো আগুন নেভে না। শান্তি-সম্প্রীতির বাণীদের দেয়াল, ব্যানার, পোস্টারেই শুধু শোভা পায়। আর জাতীয় দিবসগুলো যেন এই আগুন জ্বলার অন্যতম এক সময়। গত দুই বছর ধরেই পাহাড় অবলোকন করছে জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় আর্মির নিপীড়ন, সেটেলারদের আস্ফালন। ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বরে উম্রাচিং মারমার ধর্ষিত লাশ, ১৬ ডিসেম্বরে রাঙ্গামাটির বগাছড়িতে পাহাড়ি গ্রামে হামলা-অগ্নিসংযোগ, ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, জালিয়াপাড়ায় পরিবহন থেকে নামিয়ে পাহাড়িদের বেড়ধক পিটুনি আর সর্বশেষ ১৪ ডিসেম্বর নানিয়ারচরে আবারো সাম্প্রদায়িক হামলা।
?oh=b19e8e7b86eb97447b0d1734284f2765&oe=58F09ECF” width=”500″ />

উম্রাচিং মারমা যে পরিচিত ছিল ছবি মারমা নামে, তাকে ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ধর্ষণের পর হত্যা করে রানা ও নিজামউদ্দীন নামে দুই সেটেলার। মাত্র ১৪ বছর বয়সী উম্রাচিং জে.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। জুমে মরিচ সংগ্রহ করতে গিয়ে সে ধর্ষণের শিকার হয়। আর ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে রানা ও নিজামউদ্দীন। মেয়ের লাশের সামনে বসে উম্রাচিং এর মা কি বলেছিল জানেন??

“আমার মেয়েকে না মেরে যদি হাত-পাও ভেঙ্গে দিত তাহলেও আমি খুশি হতাম, দরকার হলে তাকে ভিক্ষা করে খাওয়াতাম”। এ বিলাপের কতটুকু মর্যাদা দিয়েছে এই ধর্ষক রাষ্ট্র?

সেদিন রাতে, ১৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির বগাছড়িতে সেটেলারদের দখল করা জমিতে আনারস গাছ কে বা কারা কেটে দিয়েছিল। কিন্তু যত দোষ যেন নন্দ ঘোষ! এ যেন কিছু ঘটলেই পাহাড়িরা করবে। আর তাই পরের দিন মহান বিজয় দিবস সেটেলাররা আর্মির প্রত্যক্ষ সহায়তায় পালন করলো উন্মত্ততার সাথে। পাহাড়ি গ্রামে হামলা করে, বাড়ি-বৌদ্ধ বিহার জ্বালিয়ে, পাহাড়িদের মারধর করে বিজয় পালন করলো তারা।
যার আনারস বাগান কেটে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে তার মালিক মোঃ আফসার আলী। যদিও সেই ২ একর জমির প্রকৃত মালিক প্রফুল্ল চাকমা। এই দখল করা জমি নিয়ে অনেকদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। তাই যখন আনারস বাগান কেটে দেয়া হয়েছে আর সেটা পাহাড়িরা ছাড়া আর কেউ তো করবে না! এরপরই শুরু হলো তান্ডব। সে তান্ডবে তিনটি গ্রামের ৫০টির বেশি বাড়ি ও ৭টি দোকান পুড়ে যায়। স্থানীয় করুণা বৌদ্ধ বিহারে প্রবেশ করে ওগাসা ভিক্ষুকে মারধর করে বৌদ্ধ বিহার ভাঙচুর করে এবং ৪টি পিতলের বুদ্ধমূর্তি লুট করে নিয়ে যায়। এ হামলায় আর্মিরা পাশেই অবস্থান করছিল কিন্তু কোনরূপ বাধা প্রদান না করে বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সে এলাকার পাহাড়ি জনগণ এখনো আগের মতো স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেনি। এখনো সেখানে পাহাড়িদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করে।

এই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে খাগড়াছড়ির আলুটিলা এলাকায় আজিজুল হক শান্ত নামের এক মোটরসাইকেল চালকের লাশ উদ্ধার করা হয়। যেহেতু সেটেলার মরেছে তাই নিশ্চিতভাবেই পাহাড়িরা মেরেছে!! আর তাই তো মাটিরাঙ্গা-গুইমারা-জালিয়াপাড়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম-ফেনী থেকে আগত পরিবহনগুলো থেকে পাহাড়ি যাত্রীদের নামিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এই হত্যার প্রতিবাদে সেটেলারদের ছাত্র সংগঠন বাঙালি ছাত্র পরিষদ ২২ ফেব্রুয়ারি পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবিতে খাগড়াছড়ি জেলায় অবরোধ পালন করে। এ ঘটনায় ধন বিকাশ ত্রিপুরা ও খগেন্দ্র ত্রিপুরা নামে দুইজনকে আটকও করা হয়। পরবর্তীতে পরকীয়ার জের ধরে এই হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হয়েছে এটি প্রকাশ হয়ে পড়লে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে। হত্যাকারী সেটেলার যুবক-যুবতী গ্রেপ্তার করার পরই এটি প্রকাশ হয়।
গত ১৪ ডিসেম্বর, এবার রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকা। ঠিক যেন দুই বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার সরাসরি দখলের জন্য সেটেলাররা মংসানু মারমার জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গেলে পাহাড়িরা বাধা দেয়। পরে, সেটেলাররা আর্মির সহায়তায় হাতিমারা এলাকায় গিয়ে পাহাড়িদের ঘর-বাড়ি ভাঙচুর চালায়।

এভাবেই চলছে পাহাড়ে জাতীয় দিবস উদযাপন। এভাবেই চলছে পাহাড়িদের নির্যাতন-নিপীড়ন। এদেশের বিজয় দিনের উৎসব পাহাড়িদের পালন করা হয় না। বরং দিবসটি পালিত হয় কান্নায়, পালিত হয় ক্ষোভে, পালিত হয় প্রতিবাদে। তাই, আজ কিভাবে বলি এ দেশ আমার? এ মাটি আমার??

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 7