এখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারগোষ্ঠীও কেন বিজয়দিবস পালন করে

এখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারগোষ্ঠীও কেন বিজয়দিবস পালন করে
সাইয়িদ রফিকুল হক

মাছের মা’র পুত্রশোক বাংলাদেশে খুব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর এটা সেই পাকিস্তানআমল থেকেই পাকিস্তানের একটি দালালশ্রেণী এগুলো আমাদের সামনে বারবার প্রদর্শন করে চলেছে। এদের বহুরূপীচেহারা এই দেশের অনেক মূর্খ-মুসলমান এখনও উপলব্ধি করতে পারেনি। এরা সবসময় ধর্মকে পুঁজি করে নিজেদের আখের-গোছানোর কাজে সদাসর্বদা নিয়োজিত। আর এই দেশের একশ্রেণীর ‘হুজুগে মুসলমান’ (পাকিস্তানীমুসলমান) এই ধর্মব্যবসায়ীচক্রের সঙ্গে হাতমিলিয়ে সবসময় বাংলাদেশবিরোধী শয়তানী-নাশকতায় লিপ্ত রয়েছে।

বাঙালি-জাতির গৌরবজনক বিজয়দিবসের ৪৫বৎসর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। জাতির এই বিজয় এমনিএমনি অর্জিত হয়নি। এরজন্য এই জাতিকে ত্রিশলক্ষ জীবন-উৎসর্গ করতে হয়েছে। মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি ভূখণ্ডের জন্য এতো আত্মত্যাগ সত্যি বিস্ময়কর। আর এই পৃথিবীর বুকে আর-কোনো জাতিকে একটি ভূখণ্ডের জন্য এতো আত্মত্যাগ করতে হয়নি।

১৯৭১ সালে, বাঙালি-জাতিকে তিনটি ‘শয়তানী-অপশক্তি’র বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিলো। আর এই তিনটি ‘শয়তানী-অপশক্তি’ হচ্ছে:
১. পাকিস্তান নামক একটি শয়তানরাষ্ট্র;
২. পাকিস্তানের একনিষ্ঠ-দালাল এদেশীয় কিছুসংখ্যক কুলাঙ্গার (রাজাকার, আলবদর, আলশামস, পাকিস্তানরক্ষার জন্য ‘শান্তিকমিটি’ ইত্যাদি;
৩. পাকিস্তানের সমর্থক কতিপয় ‘শয়তানরাষ্ট্র’—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কতিপয় আরবরাষ্ট্র, চীন, ইতালী, ইংল্যান্ড ইত্যাদি।
আর এই ‘তিন-অপশক্তি’কে পর্যুদস্ত করার জন্য বাঙালি-জাতিকে প্রাণপণ লড়াই করতে হয়েছে। পাকিস্তানীনরপশুদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য বাঙালি-জাতি সেদিন ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো। এরই ফলশ্রুতিতে বাঙালি-জাতি নয়টি-মাসের রক্তক্ষয়ী-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়-অর্জন করে। এই বিজয় জাতির জীবনে কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি আমাদের জন্য এক মহাবিজয়। কারণ, আমরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র-অবস্থায় আত্মরক্ষার জন্য ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শুরু করে মাত্র নয়টি-মাসে পাকিস্তানসহ পাকিস্তানের মদদদাতা বিশ্বের সকল শয়তানরাষ্ট্রকে পরাজিত করে এই বিজয় অর্জন করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো: জাতি আজও তা উপলব্ধি করতে পারেনি।

কথা হচ্ছে, বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই বিজয়দিবসকে ছিনতাই করতে চাচ্ছে একটি দালালশ্রেণী—১৯৭১ সালে, যারা সরাসরি পাকিস্তানীহায়েনাদের পক্ষ নিয়ে বাঙালি-জাতিকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। এরা, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানীদের সঙ্গে পরাজিত হওয়ার পর বিভিন্নভাবে বিভিন্নস্থানে গা-ঢাকা দিয়ে আত্মগোপন করেছিলো। এরপর ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পরে এরা এদের আদিপিতা (রাজাকারদের আদিপিতা) জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আবার সংগঠিত হতে থাকে, এবং রাজাকারপিতা জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ-মদদে এরা আবার স্বাধীনবাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকারলাভ করে। সেই থেকে এরা নতুনভাবে বাংলাদেশে আবার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে সংগঠিত হতে চাচ্ছে। এরা এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য নতুন করে ‘বাংলাদেশী’ হতে চাচ্ছে। আর তার নমুনা হিসাবে অতিসম্প্রতি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীসংগঠন ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান’ তাদের দলীয় সংগঠনের নাম ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসাবে পরিবর্তন করেছে। এটি আসলে, তারা ধোঁকাবাজির মাধ্যমে এই দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থেই করেছে—বাংলাদেশকে ভালোবেসে নয়। আর এরা কখনও ‘বাঙালি’ হবে না—কিন্তু তাদের আদিপিতা জিয়াউর রহমানের মতো ‘বাংলাদেশী’ হওয়ার অপচেষ্টা করছে।

যে-সব রাজাকার তথা রাজাকারসংগঠনকে আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের সঙ্গে একসঙ্গে পরাজিত করেছিলাম, তারাই এখন মায়াকান্না দেখিয়ে ইসলামের নামে আবার রাজনীতি শুরু করেছে। এইসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে—জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান তথা আজকের ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’, এদের প্রধান অঙ্গসংগঠন তদানীন্তন ‘ইসলামীছাত্রসংঘে’র পরিবর্তিত নাম ‘ইসলামীছাত্রশিবির’, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, এবং রাজাকারের বীজ থেকে উৎপাদিত বিএনপি ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এরা সবসময় পাকিস্তানের দালাল হওয়া সত্ত্বেও কেন আজকাল ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়দিবস-উদযাপন করে?
এর কারণ হলো:
১. ১৯৭১ সালের পরাজিত-যুদ্ধাপরাধীগোষ্ঠী এখনও মনেপ্রাণে এই দেশটাকে আবার পাকিস্তান বানাতে চায়। কিন্তু সরাসরিতো এই দেশটাকে আর পাকিস্তান বানানো সম্ভব নয়। তাই, এরা আবার সেই পাকিস্তানআমলের মতো ইসলামধর্মের নামে ‘রাজনীতি-খেলা’ শুরু করেছে। আর এদেশীয় একশ্রেণীর মূর্খ-মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য সবসময় পবিত্র ধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। এরা কখনও বাংলাদেশের বিজয় চায়নি। ১৯৭১ সালে, এরা বাংলাদেশের বিজয়কে তাদের পাকিস্তান-বাপের সঙ্গে রুখে দিতে চেয়েছিলো। এরা বাংলাদেশের বিজয়ে খুশি নয়। তবুও এদেশের সাধারণ ভোটারদের ধোঁকা দিয়ে তাদের ভোটচুরি করার জন্য তারা লোকদেখানোভাবে বিজয়দিবসপালন করছে। এই দেশে আজকাল এই রাজাকারশ্রেণীর স্বাধীনতাদিবস কিংবা বিজয়দিবসপালন মানে—রসিকতা, ভণ্ডামি আর স্বাধীনবাংলাদেশের রাজনীতিতে সফলতার জন্য একটা প্রহসন মাত্র।
২. এইসব যুদ্ধাপরাধীসংগঠন বিজয়দিবসপালনের নামে ওরা আমাদের বিজয়দিবসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। আর এটি নিশ্চিতভাবে অপব্যাখ্যা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র ইতিহাসকে বিকৃত করার জন্যই এরা একাত্তরের পরাজিতগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও আজকাল স্বাধীনতাদিবস কিংবা বিজয়দিবস উদযাপন করছে। আর একশ্রেণীর ‘মুক্তিযোদ্ধা-নামধারী’ রাজাকার এতে অংশগ্রহণ করে এদের বাতিল-অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করার অপচেষ্টা করছে।
৩. বিজয়দিবসপালনের নামে এরা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি-ছিনতাই করে আবার তাদের স্বপ্নের পাকিস্তান-কায়েমের পথে অগ্রসর হতে চায়। আর এক্ষেত্রে তাদের প্রধান অস্ত্র হলো ইসলামধর্ম। তাদের পাকিস্তানীপিতারাও এভাবে পবিত্র ধর্মকে নিজেদের স্বার্থের বেড়াজালে বন্দী করে তাদের ভোগবিলাসিতার বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলো। আমাদের দেশের ধর্মব্যবসায়ীচক্রটিও এখন সেই একই কায়দায় আর একইভাবে ইসলামধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতিতে থিতু হতে চাচ্ছে। আর তাই, এরা জীবনে-মরণে পাকিস্তানের দালাল হয়েও এখন বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে লোকদেখানো বিজয়দিবসপালন করছে।
৪. যারা ১৯৭১ সালে, কিংবা এর আগে-পরে থেকে কখনও বাংলাদেশ চায়নি—আর চেয়েছিলো পাকিস্তান—তারা কীভাবে বাংলাদেশের বিজয়দিবসপালন করবে? আমাদের মনে রাখতে হবে: এইসব নষ্ট, বাতিল, আবর্জনা, আর অমানুষরা স্রেফ ধোঁকাবাজির জন্যই এখন বিজয়দিবসপালনের ‘নাটক’ করছে। তাদের এই অপচেষ্টা জাতির সঙ্গে তামাশা ও বেআদবি। আর এদের এই ধৃষ্টতা থামিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
৫. একাত্তরের রাজাকারগুলো বা তাদের জন্মানো সংগঠনগুলো দেশের ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য আজকাল বিজয়দিবসপালনের অপচেষ্টা করছে। আর তাদের বিবিধ শয়তানীঅনুষ্ঠানে হাজির করছে ‘মুক্তিযোদ্ধা-নামধারী’ রাজাকারদের। আর এই রাজাকারগুলো এখনও তাদের অনুষ্ঠান শুরু করে ‘জিন্দাবাদ’ধ্বনির মাধ্যমে।
৬. রাজাকারের দল জিয়ার সংগঠনে মুক্তিযোদ্ধা থাকে কীভাবে? আরে, জিয়াতো বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা-হত্যাকারী আর সর্বশ্রেণীর রাজাকার-লালনপালনকারী। আর পাকিস্তানপ্রেমী এই জিয়াই তো ‘বীর-উত্তম’-খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরসহ হাজার-হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে। আর এরাই এখন স্বাধীনবাংলাদেশে ‘বিজয়দিবসপালনে’র নাটক করছে। শুধু ভোটের রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থে আজ বিএনপিরা বিজয়দিবসপালনের মহড়া দেয়। আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীসংগঠন জামায়াত-শিবিরকে মদদ দেয়।

বাঙালি-জাতির জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা হলো আমাদের বিজয়দিবস। তাই, এব্যাপারে আমাদের সবসময় সর্বোচ্চ সতর্কদৃষ্টি রাখতে হবে যে, কেউ যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে যেন-তেন-প্রকারেণ বিজয়দিবসপালনের অপচেষ্টা না করে। আর এদের দেখামাত্র রাষ্ট্র ও সরকার এদের শক্তহাতে দমন করতে বাধ্য থাকবে। আমাদের বিজয়দিবসে কোনো দেশদ্রোহী, ঘাতক, জল্লাদ আর রাজাকারের অংশগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নাই।

জয়-বাংলা।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৫/১২/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 + = 17