মনোয়ার আলী – ফিরে আসা এক চরমপন্থী জিহাদীর মনের কথা।

অাজ আমি আপনাদের সামনে এমন এক মানুষ হিসেবে হাজির হয়েছি যে এখন তার জীবনের পুরোটা উপভোগ করছে। কিন্তু অনেক বছর ধরে আমি শুধু মৃত্যুবরন করার জন্য বেঁচে ছিলাম।

আমি এমন এক তরুন ছিলাম যে বিশ্বাস করতো জিহাদ কে শুধু জোর-জুলুমের ভাষার মাধ্যমে বুঝতে হবে। ক্ষমতা ও বল প্রয়োগের মাধ্যমে ভুলগুলোকে আমি ঠিক করার চেষ্টা করেছি। অন্যদের কষ্ট দেখে আমার গভীর চিন্তা হতো। এবং তাদেরকে সাহয্য করার মাধ্যমে তাদের কষ্ট দুর করার তীব্র ইচ্ছা কাজ করতো। চরম জিহাদ কে আমি মনে করতাম মহৎ, মর্যাদাপূর্ণ এবং অন্যের কষ্ট দুর করার শ্রেষ্ট উপায়।

এটা এমন একটা সময় যেখানে আমাদের অনেক মানুষ, বিশেষ করে তরুনরা, আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেট, এবং একই রকম অন্য দলগুলির দ্বারা চরমপন্থাকে গ্রহন করার ঝুঁকিতে আছে। এই সব দলগুলি দাবী করে যে তাদের এসব ভয়ঙ্কর বর্বরতা এবং উগ্র কাজ কর্মই সত্যিকারের জিহাদ। কিন্তু আমি বলতে চাই যে জিহাদ সম্পর্কে তাদের ধারনা ভুল। তারা সম্পূর্ণরুপে ভুল। সেই সময়টাতে যেমন আমার ধারনা গুলোও ছিল, পুরোপুরি ভুল

জিহাদ মানে একজনের নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। যার মধ্যে প্রচেষ্টা ও আধ্যাত্মিকতা, আত্মসুদ্ধি ও গভীর আরাধনা থাকবে। এটার মানে শিক্ষালাভ, জ্ঞানলাভ এবং সৃষ্টিকর্তাকে স্মরন করার মাধ্যমে খারাপ থেকে ভালোর দিকে নিজের পরিবর্তন কে বোঝায়। জিহাদ শব্দটা এগুলোকে একসাথে বোঝায়। জিহাদ একটা সময় লড়াইয়ে রুপ নিতে পারে, কিন্তু সেটা শুধু মাত্র ক্ষেত্রবিশেষে এবং দু-এক বার হতে পারে। এবং সেটাও হতে হবে কঠোর শর্ত, নিয়ম এবং সীমার মধ্যে।

ইসলাম ধর্ম মতে, কোন কাজের ফলাফল সেই কাজ করতে গিয়ে সাধিত ক্ষয়-ক্ষতি বা কঠোর পরিশ্রম কে অবশ্যই ছাড়িয়ে যেতে হবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, কোরানে জিহাদ বা যুদ্ধ বিষয়ক যে সকল আয়াত আছে সেগুলো কখনো দয়া, ক্ষমা, পরোপকার, এবং ধৈর্য্য ধারন বিষয়ক আয়াতগুলোকে বাতিল করে দেয় না।

কিন্তু এখন আমি বিশ্বাস করি যে – পৃথিবীতে এমন কোন পরিস্থিতি নেই যা চরমপন্থী জিহাদের অনুমতি দেয়। কারন চরমপন্থী জিহাদ শুধু বড় ক্ষতির দিকেই নিয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমানে জিহাদ করার ধারনাটা ছিনতাই হয়ে গেছে। যেখানে মুসলমানরা কষ্টের মধ্যে থাকে সেখানে আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেটের মতো ইসলামী ফ্যাসিবাদী দলগুলো জিহাদের ধারনাকে উল্টোরুপে প্রচার করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি যে নিজের সাথে সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী করা এবং সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য লাভে সততা, বিশ্বস্ততা, সত্য বলা, অন্যকে সন্মান করা, দয়া, সমবেদনা, আস্থা অর্জন ইত্যাদি মানবীয় গুনাবলি, যা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই আছে, সেসব অর্জন করতে পারার নামই সত্যিকারের জিহাদ।

আমি বাংলাদেশে জন্মগ্রহন করেছি কিন্তু যুক্তরাজ্যে বেড়ে উঠেছি। আর আমার স্কুল জীবনও কেটেছে এখানে। আমার বাবা শিক্ষার সাথে যুক্ত ছিলেন। তার কাজের সুবাদে আমরা যুক্তরাজ্যে যেতে পেরেছি।

?oh=27290a9e75eae5b996a2edda5db3767d&oe=58F4B011″ width=”500″ />

১৯৭১ সালে সবকিছু যখন বদলে গেলো, তখন আমরা দেশে ছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের উপর খুব ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছিল – পরিবারে বিরুদ্ধে পরিবার, প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মাত্র ১২ বছর বয়সে আমি যুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা লাভ করি। পরিবারে দুর্ভোগ ও ২২ জন আত্বীয়ের মৃত্যুর সাথে সাথে আমার আপন বড় ভাইয়ের মৃত্যুও অবলোকন করি। মানুষ হত্যা দেখেছি….. রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ খাচ্ছে পশু-পাখি, চারদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার, অবাধ ভয়ঙ্কর আর অমানবিক। তরুন বয়সের সেই আমি অনেক আইডিয়ার প্রতি মোহান্নিত ছিলাম। আমি শিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ৪ বছর আমি স্কুলে যেতে পারিনি।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে আমার বাবাকে জেলে যেতে হয়। আড়াই বছর তিনি সেখানে ছিলেন। প্রতি সপ্তাহে আমি তাকে দেখতে যেতাম এবং বাড়িতেই লেখাপড়া করতাম। ১৯৭৩ সালে ছাড়া পেয়ে তিনি শরণার্থী হয়ে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে আসেন। তারপর পরিবার সহ আমরা সেখানে চলে আসি। আমার বয়স তখন ১৭।

এসব অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং বিশ্বে ঘটতে থাকা চরম অন্যায় ও অবিচারের প্রতি তীক্ষ্নভাবে সচেতন করে তুলেছিল। তাই আমার মধ্যে সব ভুলগুলো ঠিক করার এবং দমন-পীড়নে ভুক্তভোগীদের সহায়তা করার এক শক্তশালী ইচ্ছা – যা খুবই গভীর এক চাওয়া – তৈরি হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যে কলেজে পড়ার সময় অনেকের সাথে পরিচয় হয় যারা আমাকে ধর্মের দেখানো পথে আমার সেই সব তীব্র চাওয়াগুলোকে বস্তবে রুপান্তরিত করতে পারার রাস্তা দেখিয়েছিল। আর আমি চরম পন্থা বেছে নিয়েছিলাম – যা উগ্রপন্থাকে সঠিক বলে বিবেচনা করা, এবং এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মহৎ একটা গুন বলে মেনে নেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

?oh=44c20562caf4cb0df595e0b883765612&oe=58B5055D” width=”500″ />

আর সে কারনে আমি আফগানিস্তানে যাই এবং জিহাদে যোগ দেই। আফগানিস্তানের মুসলমানদেরকে আমি সোভিয়েত সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আর আমি ভেবেছিলাম সেটাই আমার জিহাদঃ আমার পবিত্র দায়িত্ব, যা পালন করার কারনে আল্লাহতায়ালা আমাকে পুরস্কৃত করবেন।

আমি আমার বিশ্বাস [জিহাদ] প্রচার করতে শুরু করি। যুক্তরাজ্যে যাদের মাধ্যমে ইসলামিক উগ্রবাদের [জিহাদের] সূচনা ঘটেছিল, আমি তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলাম। আমি তরুনদেরকে আকৃষ্ট করে দলে ভিড়িয়েছি, তাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছি, এবং তাদের প্রশিক্ষন দিয়েছি। আমি ফ্যাসিবাদী আদর্শ ধারনকারী ইসলামি দলগুলোর প্রচার করা বিকৃত জিহাদের ধারনার সাথে প্রকৃত জিহাদের ধারনাকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। তারা [ফ্যাসিবাদী ইসলামিক দল] তাদের ক্ষমতা লিপ্সা, কর্তৃত্বপরায়নতা, এবং নিয়ন্ত্রন ধরে রাখাকে জায়েজ করতে জিহাদ কে [বিকৃত করে] ব্যাবহার করে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত জিহাদের ধারনাকে বিকৃত করে ব্যাবহারকারী দলগুলোর মধ্যে আল কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট [আইএস] অন্যতম।

?oh=3f823957b66609f17655a5c5d8f2f4fc&oe=58B6AC4D” width=”500″ />

আফগানিস্থানে সুদীর্ঘ ১৫ বছর যুদ্ধ করার পাশাপাশি অল্প সময়ের জন্য আমি কাশ্মির এবং বার্মাতেও যুদ্ধ করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল – হামলাকারীদের বের করে দেওয়া, অন্যায়-অবিচারের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা এবং অবশ্যই সেখানে একটি ইসলামি শাষন ব্যাবস্থা [আল্লাহ’র আইন (খিলাফাত)] প্রতিষ্ঠা করা। আর খোলাখুলি ভাবেই আমি এসব করেছি। আমি কোন আইন ভাঙ্গিনি। একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে আমি কৃতজ্ঞ ও গর্বিত ছিলাম এবং এখনো তাই আছি। আর এটার বিরুদ্ধে আমি কোন বৈরিতা পোষন করি নাই – আমার দেশের বিরুদ্ধে, বা অমুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধেও না – এবং আমি এখনো তেমন [বৈরি] মনোভাব পোষন করি না।

?oh=e6f799c6764729e0288d5b27a183b15e&oe=58E97876″ width=”500″ />

আফগানিস্তানে এক যুদ্ধের সময় আমি সহ আমার আরো কিছু ব্রিটিশ সহযোগীর সাথে ১৫ বছর বয়সী এক আফগান ছেলের সাথে খুবই সু-সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার নাম আব্দুল্লাহ। সে ছিল নিষ্পাপ, চমৎকার এবং ভালোবাসাময় এক কিশোর, যে অন্যকে সন্তুষ্ট করতে সবসময় উদগ্রীব থাকতো। সে গরীব ছিল। আর তার মতো আরো অনেক কিশোর ক্যাম্পে চাকর-বাকরের কাজ করতো। তাকে যথেষ্টই সুখী মনে হতো। এবং আমি বিষ্ময় নিয়ে ভাবতাম – তার বাবা-মাও হয়তো তাকে মিস করে। তারা অবশ্যই তাদের সন্তানের ভালো এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। এক যুদ্ধের পারিস্থিতির শিকার, নির্মম এক পরিস্থিতি নির্দয় সময়ে তার উপর আঘাত হেনেছে।

?oh=ae278679c6075255409243d4e5914d29&oe=58B47766″ width=”500″ />

একদিন এক ট্রেঞ্চ [সৈনিকদের জন্য তৈরি খাদ] থেকে আমি অবিষ্ফোরিত এক মর্টার শেল তুলে আনি। তারপর সেটাকে মাটির তৈরি অস্থায়ী পরীক্ষাগারে স্থাপন করি। তারপর আমি এদিক সেদিক ছোট ছোট যুদ্ধের জন্য – বেশীরভাগ সময় সেসব যুদ্ধ ছিল উদ্দেশ্যহীন – বেরিয়ে পরি। আর কয়েক ঘন্টা পর ফিরে এসে দেখতে পাই সেই ছেলেটি, আব্দুল্লাহ, মরে পড়ে আছে। সেই মর্টার শেল থেকে সে বিষ্ফোরকগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। শেলটা বিষ্ফোরিত হয়েছিল। তার শরীর টুকরো টুকরো হয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়েছিল। বস্তুত যে মর্টার শেলটা আমার কাছে ক্ষতিকর মনে হয়নি, সেটাই আব্দুল্লাহকে করুন এক মৃত্যু দিয়ে গিয়েছিল। সে কারনে আমি নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করলাম। এই মৃত্যু [আব্দুল্লাহ’র] কিভাবে কোন উদ্দেশ্যে সফল করছে? কেন সে মারা গেল আর আমি বেঁচে থাকলাম?

আমি কেঁদেছিলাম। আমি কাশ্মীরে যুদ্ধ করেছি। ফিলিপাইন, বসনিয়া এবং চেচনিয়ার জন্য আমি লোক সংগ্রহ করেছি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন, আরো প্রশ্ন বাড়তে থাকলো।

আরো পরে, বার্মাতে আমি রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের সাথে মিলিত হয়েছি। ওরা কিশোর বয়সের চেয়ে অনেক কম বয়সী – জঙ্গলে জন্ম, সেখানেই বেড়ে ওঠা – মেশিন গান ও গ্রেনেড লঞ্চার বহন করছিল। ১৩ বছর বয়সী দুজনের সাথে আমি নম্র হয়ে ভদ্রভাবে কথা বলেছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে তাদেরকে সেখান থেকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমার কাছে কড়জোড়ে বিনতি করেছিল। তাদের স্বপ্ন ছিল তারা স্কুলে যাবে। সে সময় আমার পরিবার – তাদের বয়সী আমার নিজের বাচ্চারা স্কুলে যায় – যুক্তরাজ্যে এক নিরাপদ জীবন যাপন করছে। সেসব কিশোররা নিজেদের স্বপ্নের [স্কুলে যাওয়া] কথা কতোবার যে একে অপরকে বলেছে, আমি সেটা ভাবতে গিয়ে বিষ্ময়ে অভিভুত না হয়ে পারলাম না। এ কেমন পরিস্থিতি – যেখানে গৌরব এবং ক্ষমতার প্রতি নেতাদের ব্যাক্তিগত লোভ-লালসার শিকার হয়ে এই দুজন কিশোর জঙ্গলের এবড়ো-থেবড়ো শক্ত মাটিতে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখছে।

খুব শীঘ্রই আরো দেখলাম যে প্রতিদ্বদ্বি দলগুলোর নিজেদের মধ্যে কোন্দলের সময় সে দু-জনের মতো কিশোররা একে অপরকে খুন করছে। আফগানিস্তান, কাশ্মীর, বার্মা, ফিলিপাইন, চেচেনিয়া সহ সকল যায়গায় একই চিত্র ছিল – ছোট ছোট যুদ্ধবাজ নেতারা জিহাদের নামে কম বয়সী এবং অরক্ষিত এসব কিশোরকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে একে অপরকে স্রেফ খুন করাচ্ছে। বহিঃশক্তি অথবা দখলদারদের কাছ থেকে কাওকে রক্ষা করছে না। যারা ক্ষতিগ্রস্থ আর অন্যায়ের শিকার হয়েছে তাদের শান্তির বা মুক্তির জন্য কিছুই করছে না। অনৈতিক ভাবে এবং অন্যায়ভাবে বাচ্চাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে – এমন অন্যায় যুদ্ধে অন্যায় ভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে, আর জিহাদের নামে আমি সেটাকে সমর্থন করে চলেছিলাম। আজো ঠিক তেমনটাই ঘটে চলেছে।

?oh=4e449c18bbaccb4f3f01a174da1869f3&oe=58F382C1″ width=”500″ />

নিজ অভিজ্ঞতায় যা কিছু দেখেছি এবং যেটাকে আমি পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করেছি – এই দুই বিষয়ে গভীর চিন্তা করে আমি বুঝতে পেরেছিলাম –

বহির্বিশ্বে আমি যেই উগ্র জিহাদে যোগ দিয়েছি তা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই দেশে, যুক্তরাজ্যে, আমার কাজকর্ম নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছি। আর বুঝতে পেরেছি যে জিহাদ প্রচার করা, সদস্য সংগ্রহ করা, তহবিল সংগ্রহ করা, প্রশিক্ষন দেয়া এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ন – মগজ ধোলাই করে তরুনদের আমার মতো করে যুদ্ধ করতে এবং মরতে পাঠানো সহ সব ছিল বিশাল বড় এক ভুল।

?oh=51a37e6771ced87257587fe203a8729f&oe=58B47C18″ width=”500″ />

যাই হোক, ৮০’র দশকের মাঝামাঝি আফগানিস্তান দিয়ে শুরু করে আমি উগ্র জিহাদে জড়িয়ে পড়ি। আর যখন এসব থেকে বের হয়ে আসি তখন ২০০০ সাল। আমি এতে [জিহাদে] বুঁদ হয়ে ডুবে ছিলাম। আমার আসেপাশের মানুষগুলো তাদের নাম ব্যবহার করে করা এসব কর্মকে সমর্থন দিয়েছে, প্রশংসা করেছে, এমনকি উৎযাপনও করেছে। কিন্তু ২০০০ সালে যখন আমার ভুল বুঝতে পারি, বোধের উদয় হয়, ততোদিনে ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে।

?oh=5dd56f64dc397b1d100ae9b950b193b7&oe=58F8BC26″ width=”500″ />

তাহলে ভুলটা ঠিক কোথায় ছিল? আমরা [ধর্মীয়] গুণ নিয়ে ব্যাস্ত ছিলাম, আর একটা মাত্র ধারনা দিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে দেয়া হয়েছিল। এবং আমরা নিজেদেরকে গুণী চরিত্রের অধিকারী হওয়ার সুযোগ দেই নাই। আমরা নিজেদের বুঝিয়েছিলাম – আমরা নিপীড়িত ও শোষিতদের জন্য লড়ছি কিন্তু সেগুলো ছিল অজেয় যুদ্ধ। আমরা এমন হাতিয়ারে পরিনত হয়েছিলাম যার দ্বারা আরো বেশী প্রানহানী ঘটেছিল। এবং হাতে গোনা অল্প কিছু হিংস্র মানুষের স্বার্থ লাভের জন্য আরো বেশী দুর্দশা বয়ে এনেছিলাম।
তাই অনেক সময়, লম্বা এক সময় পর, আমি চোখ খুলেছি। আর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার, চিন্তা করার, এবং কঠিন প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সাহস করেছি। আমি আমার আত্মার সন্ধান পেয়েছি।

এ থেকে আমি কি শিখলাম? আমি জানলাম যে উগ্রবাদী জিহাদের সাথে জড়িত মানুষ, এবং যারা এমন চরমপন্থার প্রতি আকৃষ্ট, তারা আর সব মানুষের কাছে তেমন আলাদা কিছু নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে এসব মানুষ পরিবর্তন হতে পারে। তারাও তাদের হৃদয় এবং মনের [নিয়ন্ত্রন] ফিরে পেতে পারে এবং সেগুলো মানবিক মূল্যবোধ [গুণাবলি] দিয়ে পরিপূর্ন করতে পারে, যা ক্ষত শুকিয়ে দেয়।

যখন আমরা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করি, তখন আমাদেরকে যা বলা হয় আমরা বিনা প্রশ্নে সেটাই মেনে নেই। এবং আমরা [জীবনের] সেই সব উপহার এবং সুযোগগুলোকে উপেক্ষা করি যা যে কোন মানুষ এক মুহূর্তের জন্য হলেও [তাদের জীবনে] উপভোগ করতে চাইবে। আমি এমন কাজে জড়িত ছিলাম যাকে আমি সঠিক বলে মনে করতাম। কিন্তু আমি এখন প্রশ্ন করি – আমি যেগুলো জানতাম, সেগুলো আমি কিভাবে জানতে পেরেছি? মানুষকে আমি নিরন্তরভাবে সত্য [জিহাদ] গ্রহন করতে বলে যেতাম। কিন্তু সন্দেহকে [প্রশ্ন করাকে] আমি তার যথাযোগ্য এবং ন্যায্য স্থান দিতে ব্যার্থ হয়েছি।

মানুষ পরিবর্তন হতে পারে, এই দৃঢ় প্রত্যয়ের শেকড় আমার জীবনের পথ ও অভিজ্ঞতার মধ্যেই নীহিত আছে। বিস্তর লেখাপড়া, গভীর চিন্তা, কর্মের উপর প্রতিফলন, ও আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি যে – তাদের নিজেদের বিশ্ব এবং আমাদের সম্পর্কে তাদের [ফ্যাসিবাদী ইসলামি আদর্শের দল] বানানো বিশ্ব আসলে মিথ্যা এবং অন্যায্য। [পূর্বের অবস্থায় থাকাকালে] আমরা যেসব [সত্য] বলে দাবী করতাম – অলঙ্ঘনীয় সত্যের কাছে, অকাট্য সত্যের কাছে – সেসবের অনিশ্চয়তাকে বিচার করে আমি আরো অনেক সুক্ষ্ম [সত্য ও মিথ্যার] পার্থক্যও বুঝে গেছি।

বৈচিত্রতা এবং [ভিন্ন] মাতামতে পরিপূর্ন এ দুনিয়ায় আমি আরো বুঝতে পেরেছি – আগে আমি যেমন ছিলাম, তেমন বেকুব [গাধা] ধর্ম প্রচারকরাই শুধু মিথ এবং ফিকশন (myths and fictions) – যা তারা সবসময় সত্য প্রচারের জন্য ব্যবহার করেন – এর মধ্যে স্ববিরোধী কোন কিছু খুঁজে পান না। আর সেই কারনে আমি আত্মজ্ঞান বা আত্ম-উপলব্ধি, রাজনৈতিক সচেতনতা, এবং আমাদের নিজি দায়িত্ববোধ সম্পর্কে গভীর ধারনা থাকা, এবং আমাদের কর্ম ও অন্যের উপর সেই কর্মের প্রভাব – এসব বিষয়ের অপরিহার্যতা [গুরুত্ব] বুঝতে পেরেছি।

পরিশেষ, সবার প্রতি আমার অনুরোধ – বিশেষত তাদের প্রতি যারা আন্তরিকভাবে উগ্রপন্থি [ইসলামিক] জিহাদে বিশ্বাস করেন – যুক্তিহীন, গোঁড়া কর্তৃত্ব বর্জন করুন। ক্রোধ, ঘৃনা, এবং উগ্রতা প্রশমিত করুন। নৃশংস, অন্যায়, এবং অসার অচরন [কাজকর্ম] সমর্থন করার [জায়েজ করা] নূন্যনত চেষ্টাও বাদ দিয়ে ভুলগুলোকে [অন্যায়, পীড়ন, অবিচার] ঠিকঠাক [প্রতিবাদ, প্রতিকার] করার চেষ্টা করুন। সুন্দর এবং কাজের কিছু করার চেষ্টা করুন যা আমাদেরকে স্মরনীয় করে রাখবে। সারা বিশ্বের প্রতি, সব জীবনের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যান। সারা বিশ্বের বৈচিত্রতা এবং অন্যের মাঝে থাকা সদগুণ, সৌন্দর্য, ও তাদের সত্যেকে দেখার জন্য নিজের হৃদয় কে প্রস্তুত করুন। সে ভাবেই আমরা আমাদের কাছে, একে অন্যের কাছে, সমাজের কাছে, এবং অামার মতে আল্লাহ’র কাছে সবার চেয়ে বেশী গুরুত্ব পাবো। আর এটাই এখন আমার জিহাদ। আমার সত্যিকারের জিহাদ।

সবাইকে ধন্যবাদ।

মনোয়ার আলী। (অন্য নামঃ আবু মুনতাছির)

টেড সাইটে লেকচারটি প্রকাশিত হয়ঃ অক্টোবর ২০১৬

ইংরেজী থেকে ভাষান্তরঃ
মাহামুদ হাসান
১২/১২/২০১৬

সংযুক্তিঃ

  1. টেড সাইটে মনোয়ার আলীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ http://www.ted.com/speakers/manwar_ali
  2. টেড সাইটে লেকচারটির [ইংরেজী] লিংকঃ http://www.ted.com/talks/manwar_ali_inside_the_mind_of_a_former_radical_jihadist
  3. লেকচারটির ইউটিউব লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=zwpiI18TBdE
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মনোয়ার আলী – ফিরে আসা এক চরমপন্থী জিহাদীর মনের কথা।

  1. ভাই , এই পোস্ট দিয়ে কি বুঝাতে
    ভাই , এই পোস্ট দিয়ে কি বুঝাতে চাইলেন? জিহাদ ভুল রাস্তা ? আরে মিয়া , ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জিহাদ দিয়ে। মুহাম্মদ নিজেই এটা করেছে , তার সাহাবীদেরকে এটা করতে বলেছে আর বলেছে এটা কেয়ামত পর্যন্ত চলবে। মুহাম্মদ বলেছে – তরবারীর নিচে জান্নাত। আর আপনি এসে একজনের গল্প ফেদে কি বুঝাতে চাইলেন ? আপনি তো মনে হচ্ছে মুহাম্মদের চাইতে ইসলাম বেশী বোঝেন।

    1. মুসলমানরা মুসলমান পরিচয়ে এই
      মুসলমানরা মুসলমান পরিচয়ে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে সন্ত্রাসে মদদদাতা গ্রন্থ কোরান সংস্কার ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 − 14 =