সংস্কৃতির সংকট

সংস্কৃতি কী তা নয় বরং সংস্কৃতি যে কোনো জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত একটা বিষয়, তাহলো এই রচনার সূচনাবিন্দু। তাছাড়া এই রচনার উপজীব্য হলো একটা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি কীভাবে অপহৃত হয়ে যায় তা বুঝতে পারা।

একটা সংস্কৃতির পরিচয় তার নিজের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সর্ম্পকিত। পার্থিব সংস্কৃতির জন্য এটা হলো তার বাস্তবিক একটা পরিচয়। এই দিকটাকে যারা রহিত করতে চায় তারা হলো প্রকৃতই সংস্কৃতির শত্রু। এর জন্য খলের যেমন ছলের অভাব হয় না, তেমনই স্বরূপত ও শব্দগতভাবে সংস্কৃতি তখন হয়ে ওঠে অপব্যবহারের শিকার। বাস্তবের চেয়ে অধিক ভুল বোঝা হয় সংস্কৃতিকে; ভুলভাবে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করা হয়। উপস্থিত মনোবৃত্তি ও বিশ্বাস দ্বারা সংস্কৃতির অবস্থা তখন হয়ে ওঠে কোণঠাসা। এই অবস্থায় কারও গাত্রদাহের কারণটা কী তা শুধু অনুভবের বিষয়। তবে সংস্কৃতি নিজের লক্ষ্যে নিজে কখনো লক্ষ্যচ্যুত হয় না; সংস্কৃতি নিজে সংস্কৃতি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। বস্তুত সংস্কৃতি কেবল জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরিচয়জ্ঞাপক শব্দই নয়; বরং এর চেয়ে বেশি কিছু।

বৃক্ষ তার ফলে পরিচয়; জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরিচয় তার সংস্কৃতিতে। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি জ্ঞাতিগোষ্ঠীর বয়সের দিক থেকে সমান। জীবনের সঙ্গে সমান তাল রেখে বেড়ে ওঠে এই সংস্কৃতি। জ্ঞাতির অবর্তমানে তাই সংস্কৃতি থাকে না; সংস্কৃতির অবর্তমানে জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরিচয় থাকে না। জ্ঞাতিগোষ্ঠী হয়ে ওঠে, জাতি নয়- বিজাতীয় কেউ; নিজসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তার মতো জাতিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জাতি। ব্যক্তির, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরিচয়, তাই ব্যক্তির জ্ঞাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নিজস্ব অস্তিত্বের মূল হলো তার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি নির্ধারণ করে এর সাংস্কৃতিক রূপ, এবং পরিচয়কে।

তাই কোনো জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ের জন্য প্রয়োজন হয় তার শিকড় সম্পর্কে জানা। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর অতীতকে জানার এই সুযোগটা করে দেয় স্বীয় জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস। বর্তমানের ওপর ভর করে যেমন অতীত, সংস্কৃতির ওপর একইভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে তার বর্তমান। এই অতীত থেকে বাস্তব বর্তমান পর্যন্ত একই স্রোতধারায় বিকশিত হয় সংস্কৃতি। তবে তার গতি সবসময় এক থাকে না; বরং বেড়ে ওঠে নির্ভার, নিজস্ব গতিতে। প্রথমে, ভেতর থেকে তার উপাদানের মিথষ্ক্রিয়াকে সংহত করে; তারপর, বাইরের দিক থেকে বিজাতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। বাস্তব পরিবেশ জন্ম দেয় বাস্তব রাজনৈতিক পরিবেশের। স্বভাবত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে একসময় দেখা দেয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

এবার মূলারায় সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুতুলরা বাহ্যত সাধারণ নয়; তবে তারা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণই রাজনীতি সচেতন; শ্রেণিসচেতন, শ্রেণি সম্পর্কে একটা শ্রেণি। এই শ্রেণি সাধারণের মধ্য থেকে একসময় সাধারণকে শাসনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তখন জ্ঞাতিগোষ্ঠীর খপ্পরে পড়ে জ্ঞাতিগোষ্ঠী; জ্ঞাতিগোষ্ঠী গোটা সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ওপর এই শ্রেণিসংস্কৃতির প্রবল হওয়ার অর্থ হল সাধারনের ওপর একটা বিশেষ ধরনের, বিশেষ শ্রেণির আধিপত্য। বাস্তবে তখন একটা সুবিধাভোগী শ্রেণি সাধারণ সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। সার্বিকের বিপরীতে বিশেষ, সমগ্রের দিক থেকে খন্ড নির্ধারণ করে এর ভাগ্য; অপরাপর সবকিছু।

সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো সংস্কৃতির সঙ্গে এই শ্রেণিসংস্কৃতির সম্পর্কসূত্র প্রকাশ করে শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক সংস্কৃতি। স্থানীয় পর্যায়ে প্রথমবারের মত দেখা দেয় শাসিত শ্রেণি; দেখা দেয় শাসিত শ্রেণির, সাধারণ শ্রেণির, সাধারণ সংস্কৃতিকে শাসনের। সাধারণ, শাসিত শ্রেণির জন্য নির্ধারিত হয় তার শাসিত হবার নিয়তি। এভাবে নির্ধারণপূর্বক শাসিত শ্রেণির সাধারণ সংস্কৃতি নিষ্পেষিত হয়। সাধারণরূপে সংস্কৃতির অখন্ডরূপ ¤্রয়িমাণ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সমন্বিত হবার পরিবর্তে সাধারণের ওপর বিশেষ, বিশেষ শ্রেণির সংস্কৃতি হয়ে ওঠে সমন্বিত। এই শ্রেণি হলো- শ্রেণির সংস্কৃতির একটা কর্তৃপক্ষ। শাসিতের সংস্কৃতি তখন হয়ে ওঠে শাসকশ্রেণির হাতের মোয়া। সংস্কৃতির জন্য এটা হয়ে ওঠে এর ট্র্যাজেডি।

এই ট্র্যাজেডির পর দেখা যায় নাটকীয় কিছু মুহূর্ত। সংস্কৃতির জায়গা থেকে সংস্কৃতিকে অপহৃত করার ক্ষেত্রে এটা হয়ে ওঠে এর প্রহসনের পরাকাষ্ঠা। এই সব মুহূর্তে সংস্কৃতির ওপর থেকে তার কিছু কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে কর্তাশ্রেণি। তবে এখানে বিশেষ শ্রেণির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। অধিকন্তু শ্রেণিটা, তার কর্তারা স্থানীয় পর্যায় থেকে লাভ করে তার বিশেষ শ্রেণির বৈশ্বিকতা; বৈশ্বিক চরিত্রের একটা শ্রেণি চরিত্র। সংস্কৃতির চালচিত্র তখন নির্ধারণ করে এই শ্রেণি। তাই অপহৃত করার পূর্বে এই বৈশ্বিক বিশেষ শ্রেণির হস্তক্ষেপ হয়ে ওঠে অনিবার্য। এখানে অপহৃত করা হলো তার উদ্দেশ্য; বিধেয়রূপে, হস্তক্ষেপ হলো এর অপহৃত করার উপায়। সংস্কৃতির রূপান্তরের পাশাপাশি চলে তার এই কাজ। উপনিবেশিক অর্থনীতির মতে উপনেবিশক ধর্ম হচ্ছে তার সাফল্যের বীজমন্ত্র। যা হবার তা-ই ঘটে। স্থানীয় সংস্কৃতি দোমড়ে-মোচড়ে যায়; ভেঙে পড়ে সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক বেদি।

কার্যত তখন সংস্কৃতিকে অপহৃত করার চেষ্ঠায় বিজাতীয়রা তার শ্বাসনালি চেপে ধরে। প্রাণ জেরবার হয়ে ওঠে সংস্কৃতির, এর জ্ঞাতগোষ্ঠির অবিরাম প্রগতির সঙ্গে চলতে থাকে বিজাতীয়করণের ধর্মযুদ্ধ। প্রাথমিক ভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয় সংস্কৃতির কালজয়ী আবেদন; চূড়ান্তভাবে, তার অসাম্প্রদায়িক রূপ, মূল্যবোধ ও তার বিশ্বাস। প্রাধান্য বিস্তার করে সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি; সাম্প্রদায়িকতা, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাছে তা হলো তার বিশ্বাসের ধন; পুঁজি। শ্রেণি স্বার্থ এখানে ধর্মচর্চা নয়; বরং হয়ে ওঠে গোত্রীয় স্বার্থচর্চার একটা পর্যায়। কার্যত এই গোত্রীয় স্বার্থচর্চা তখন পরিচালিত হয় একটা গোষ্ঠীতন্ত্রের ইশতেহার দ্বারা। গোষ্ঠীতন্ত্রের বুদ্ধিবৃত্তির কাঠামো জন্ম দেয় সাম্প্রদায়িক অর্থনীতি; রাজনীতির, এবং ইতিহাসের। সাম্প্রদায়িক বিষয় নিষ্ঠা তখন সাম্প্রদায়িক স্বার্থে হয়ে ওঠে অন্ধ; বধির। তাই স্থানীয় সংস্কৃতির বিষয়চর্চাকে সে পারে তো গ্রাহ্য করে না, অস্বীকার করে; মূখ্যত তখন দলিত-মথিত করা হয়ে ওঠে তার কাজ। এই অপহৃত করা অবস্থার ক্ষেত্রে তখন প্রতিস্থাপন ঘটে বিজাতীয় সংস্কৃতির। তার অপহৃত করার নীতি ও সংস্কৃতি নিশ্চিত করে তার এই প্রতিস্থাপনের সংস্কৃতিকে।

সবাই যেমন জানে, চুরি বিদ্যা এক্ষেত্রেও বড় বিদ্যা; ধরা না পড়লে কোনো ধমাধম নেই। বুঝতে হবে, প্রতিস্থাপনের সংস্কৃতি কিন্তু স্রেফ প্রতিস্থাপনের বিষয় নয়। তার বিষয় তার স্বার্থচর্চার সঙ্গে জড়িত। এই স্বার্থচর্চার যখন এসব কীর্তিকলাপ যুক্ত হয়, তখন আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয় তার স্বার্থচিন্তাকে কেন্দ্রীভূত করা। কোনো কিছু অপহৃত করার ক্ষেত্রে এটা হয়ে ওঠে একই সাথে চোর ও ডাকাত দলের একটা ব্যাপার। বোধগম্য কারণে, চোর শোনে না ধর্মের কাহিনী; জ্ঞাতিগোষ্ঠী তখন ব্যর্থ হয় তার স্বার্থ রক্ষায়। বস্তুত জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি স্থির নেই; এখানে স্থির নেই বিজাতীয় কর্তৃক তার অপহৃত করার প্রক্রিয়াও। সংস্কৃতি তখন অপহৃত হয়; তবে অপহৃত সংস্কৃতি শিকার হয় অধিক নিপীড়নের। নিপীড়ন হল নিপীড়িতের ধর্ম; নিপীড়কের ধর্ম হল নিপীড়ন করা। নিপীড়িত এখানে অধস্তন, সাধারণ শ্রেণি; অপহৃত করার সংস্কৃতি এখানে ঊধ্বর্তন, বিশেষ সংস্কৃতি। তাই নিপীড়কের ধর্ম ও নিপীড়িতের ধর্ম এক নয়; বরং হয়ে ওঠে পরস্পর বিরোধী।

বস্তুত একটা জ্ঞাতিগোষ্ঠী যখন লাভ করে একটা সাংস্কৃতিক অভয়, পরিচয়, প্রকৃতই তখন বিশিষ্ট হয়ে ওঠে তারা বাঙালি, না চেক। এই পরিচয় জ্ঞাতিগোষ্ঠীর জন্য, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর দ্বারা, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর একটা পরিচয়। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তাই জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। এমন কোনো জ্ঞাতিগোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায় না, যার কোনো সংস্কৃতি নেই; এমন কোনো সংস্কৃতিও নেই, যার কোনো জ্ঞাতিগোষ্ঠী নেই। স্বভাবত জ্ঞাতিগোষ্ঠী রক্ষা পায় তার সংস্কৃতির বর্মে। প্রতিটি জ্ঞাতিগোষ্ঠী, প্রতিটি সংস্কৃতি, কোনো না কোনোভাবে এ তার সংস্কতি, তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে প্রকাশ করে। তবে সংস্কৃতি নিজে হলো একটা নিত্য পরিবর্তনশীল বিষয়। অতীত থেকে বাস্তব বর্তমান পর্যন্ত অবিরাম ঘটে চলে এর পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের পারম্পর্য রক্ষার ইতিহাসে মূল হলো এর সংস্কৃতি। ইহাজাগতিক জগতটা চলে ইহজাগতিক নিয়মে। স্থির বিশ্বাসে তাই সংস্কৃতির কোনো বিশ্বাস নেই।

প্রকৃতই বাস্তব চরিত্র নির্ধারণ করে বাস্তবতার চরিত্রকে। একজন বাস্তব বুদ্ধির ব্যবসায়ীর কাছে বস্তুর ভোগ্যমূল্যের চেয়ে এর অর্থমূল্য, এর মুনাফা হলো সবচেয়ে আকর্ষণের বস্তু। কিন্তু সংস্কৃতির অপহৃত হওয়ার ক্ষেত্রে এর বাস্তব পরিণতিটা হলো এমন, যার বিনাশ ছাড়া কোনো মূল্য নেই। এখানে ভোগ্যমূল্য হলো এর বিনাশ; অর্থমূল্য হলো ডাকু সংস্কৃতি প্রতিস্থাপনের। অবশ্য সংস্কৃতির মধ্যে সংস্কৃতিকে প্রতিস্থাপন করা যাদের কাজ, তারাও কোনো না কোনো জ্ঞাতিগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার বহন করে। কিন্তু সাধারণ, শাসিত শ্রেণির খেয়ালের ওপর, বিশেষ শাসকশ্রেণির খেয়ালি বিশ্বাস পাথরচাপা দিতে ভুল করে না। ঘোড়া ও গাধার মিলনে জন্ম নেয় খচ্চর। এই অবস্থায় অপহৃত সংস্কৃতির দশা হয়ে ওঠে ঠিক একইরকম।

তবে কথা হচ্ছে, পরিবর্তনের বাইরে আর কিছুই নেই।

লেখক: এনামুল কবির, প্রভাষক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − = 26