কালুরঘাট বেতারের ৭১ কাহিনী

১) মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি আওয়ামী নেতা হান্নান সাহেবকে ইপিআর থেকে জানানো হয়। তিনি তা বাংলায় ট্রেন্সলেট করে ভাবছিলেন, পোর্টে পাক বাহিনী তৈরী, চিটাগাং বেতার থেকে ঘোষণা পাঠ করলে সেনাবাহিনী সংগে সংগে এসে আক্রমণ করবে।

২) পরদিন ২ কিলোওয়াটের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষনা পাঠ শুরু হয় দুপুর ২-৩০টা থেকে। তখন মেজর রফিক বিদ্রোহ করে তার বাহিনী নিয়ে বাটালী হিলে অবস্থান নিয়েছে বলে পাক সেনাবাহিনী বাটালী হিলে গোলা ছাড়ছে, আগায়নি। ইপিআররা মেজর রফিকের সাথে যোগ দিবে সকল বর্ডার থেকে। তারা ২৬ তারিখ সকালে আসছিল। তখন এসব কিছু না জেনে জিয়া পূর্বদিন রাতে আগ্রাবাদ বেরিকেড থেকে ফিরে এসে কেন্টনমেন্ট ত্যাগ করে সাতকানিয়ার দিকে পালাচ্ছিল। ইপিআরদের বলছিল তার সাথে যেতে। ইপিআর কনফিউজ হয়ে মেজর রফিকে সাথে যোগ দেয়নি। মেজর রফিকের উদ্দেশ্য ছিল চিটাগাং স্বাধীন রেখে স্বাধীনতার সরকার এখানে ঘটিত হবে।

৩) কালুরঘাট বেতারে পাক হামলা হতে পারে মনে করে হান্নান সাহেবরা শুনলো কিছু বাঙালী সেনা সাতকানিয়ার দিকে গেছে। খবর পাঠালো তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে, কালুরঘাট কেন্দ্রটি পাহারা দিতে। তারা ২৬ তারিখে রাতে এসে পাহারা শুরু করে। তখনো মেজর রফিকের সাথে পাক বাহিনীর গোলা বিনিময় হচ্ছে বলে ফিজিক্যালী পাক বাহিনী কালুরঘাটের দিকে আগায়নি।

৪) চিটাগাং কেন্টনমেন্টে কর্ণেল পাত্তাহ ছিল পাঞ্জাবী বড় কর্তা। বাঙালীরা ছিল প্রধান। কিছুদিন আগে কের্ণেল পাত্তাহকে নেতৃত্বে দিতে বাঙালী ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকা সরিয়ে নেয়। পাত্তাহকে নির্দেশ দেয়া হয়, কুমিল্লাে থেকে ব্রিগেডিয়া শফি এসে শক্তি বৃদ্ধি না করা পর্যন্ত পাত্তাহ যেন মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। জিয়ারা ব্যাটালিয়নে ৭০০ বাঙালী সেনা থাকার পরও তিনি পলায়ন করেন। মেজর রফিক তখন ইপিআর িএর মেজর যেতে এক পাক কেপ্টেনকে ২৪ মার্চ হত্যা করে পজিশন নিতে শুরু করেন।

৫) কুমিল্লা থেকে ব্রিগেডিয়ার শফির আসার রোধ করতে ২৬ মার্চ সকালে মেজর রফিকরা, কর্ণেল হারুনরা একটি বাঙালী ব্যাটালিয়ন নিয়ে শুভপুর ব্রিজের কাছে অবস্থান নেয়। সেখানে এমবুশ থেকে ব্রিগেডিয়ার শফির বিরাট বাহিনীর উপর হামলা হয়। ব্যাপক যুদ্ধ হয় ২৫ মার্চ ভোর থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত। পুরো ব্রিগেডটি (এ বিবরণ পাক মেজর সিদ্দিক সালিকের উইটনেস টু সারেন্ডার বইতে আছে) যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে হারিয়ে যায়। ঢাকার মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা হেলিকপ্টারে খুঁজতে যায় বাহিনীটিকে২৬ তারিখে। তিনি খুঁজে পাননি। হেলিকপ্টারটি নীচে নামালে নীচ থেকে হেলিকপ্টারে গুলি করে বাঙালী সেনারা। গুলি হেলিকপ্টারের টেঙ্কারে ভাগ্যক্রমে লাগেনি। তিনি ঢাকা ফিরেন আশা ছেড়ে। এই যে বিশাল আ্ক্রমণটি কারা সংগঠিত করেছিল? যারা করেছিল তাদের মধ্যে জিয়া ছিলেন না। কিন্তু যারা সে্ই সাহসী দেশপ্রেমিক ছিল তাদের চেয়ে জিয়া এখন প্রধান হয় কিভাবে?

৬) কালুরঘাট থেকে ঘোষণা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো। ২৭ তারিখ রেডিও স্টেশনের ম্যানেজার বেলাল আহমেদ মেজর জিয়াকে হাসতে হাসতে বলেন, মেজর, আমরা তো সব মাইনর, আপনি ঘোষণাটি পাঠ করলে বঙালী সৈন্যরা সাহস পেত। তখন পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর বিভিন্ন স্থানে বাঙালী সেনা, পুলিশ ও ইপিআরের সাথে পাক সেনাদের ভয়ানক যুদ্ধ চলছে। কুষ্টিয়ায় পুরো পাক বাহিনী কোম্পানীটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মেজর জিয়া কথাটি লুপে নিয়ে ঘোষণাটি পাঠ করে ‘আই মেজর জিয়াউর রহমান ডিক্লেয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্স অব বাংলাদেশে অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

৭) যেটা বলা হয় যে জিয়া প্রথমে নিজেকে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে ঘোষণাটি পাঠ করেন এটা ঢাহা মিথ্যা কথা। এরকম বলার সাহসও একজন মেজরের ছিল না গ্রেট লিডা হান্নান এর সামনে। এটা একেবারে মিথ্যা। এ টেল অব মিলিয়ন বইতে বিস্তারিত আছে। আমি অন্য ‍সুত্র থেকেও বহুকাল থেকে এর বিস্তারিত জানি যা বলতে গেলে বিরাট লেখা হয়ে যায়।

৮) পাক বাহিনীর শুভপুরে হারিয়ে যাওয়া বাহিনীটির একাংশ ২৯ তারিখ চিটাগাং পৌঁছে হেটে। এরপর পোর্ট থেকে পাক সেনা মার্চ করতে চায় কালুরঘাট বেতার বন্ধ করতে। তারপরও মেজর রফিকের গোলার জন্য আগাতে সাহস পায়নি। তখন জিয়ার সৈন্যরাও পাহারা অটুট রাখে।

৯) শেষে ৩০ তারিখ সকালে ঢাকা থেকে দুইটি জেট গিয়ে বোমা বর্ষণ করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি উড়িয়ে দেয়। অবশ্য বিমান দেখে জিয়ার বাহিনী সরে যায়।

১০) এরপর মেজর রফিকও অবস্থান তুলে নেয়। তারা চলে যায় বান্দরবান। সেখানে স্বাধীন বাংলা সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়। তাদের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশে তা গঠন করে ভারত যাবে। কিন্তু সে খবর পেয়ে পাক সেনারা ট্যাংক ও নানা অস্ত্র নিয়ে পাহোরে হামলা চালায়, মেজর রফিকরা মিজুরামে চলে যায়, সেখান থেকে কোলকাতা ও পরে মুজিব নগরে সে সরকার ঘোষণা হয়। সেটা পরে প্রচার হয়। না হলে সেখানে বিমান আক্রমণের ভয় ছিল। তখন মুজিব নগর যেত ভদ্রা নদীতে ব্রিজ ছিল না বলে জায়গাটি বেছে নেয়া হয়।

১১) জিয়া এসব বিশাল কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল না। সেজন্য কিছু জানতো না। কোন সিদ্ধান্ত আর না পেয়ে চলে যান রামগড়ে। সেখানের পোষ্ট অফিস ভবনে মাস খানেক থেকে কোন সিদ্ধান্ত না পেয়ে ভারতে প্রবেশ করে কোলকাতা গিয়ে স্বাধীন বাংলা সরকারের সাথে দেখা করেন।

– এটাই হলো প্রকৃত ঘটনা। যে জন্য জিয়া বেঁচে থাকতে এখনকার মত উদ্ভব প্রচারণার দাবীগুলো করেননি। তিনি ঘোষণা পাঠ করার সুযোগ পেয়েছিলেন সেটা ঐতিহাসিক সাক্ষি থাকার সুযোগ। একজন মেজর ঘোষণা দেয়ার সাহস করবে কিভাবে? এত বেয়াদবি ও এর পরিণতি সেনা কর্মকর্তা জিয়া জানতো। সেটা ভুলেও করতো না। আমরা তখন শুনেছি চিটাগাং থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুর হয়েছে। কে ঘোষণা দিল সেটা শুনিনি। বলার অপেক্ষাও রাখে না। জিয়ার কথা আমরা ৭৫ এর আগে সত্যিই শুনিনি। তখন শুনতাম আওয়ামী নেতাদের কথা। কর্নেল ওসমানির কথা ও স্থানীয় কমান্ডারদের কথা।

( ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 + = 75