পরবর্তী পথ চলার ভুলের কারণে একাত্তরকে অস্বীকার করা যায়না বন্ধুগণ

?_nc_eui2=v1%3AAeEIx9n3BEv9i9VtmaULdwO549GqehGfRdfDj7NCewVS2P3MawdS7eU-B_Yfbngd2K5C5wQzZhUwR085RmmgBMT9Nm_P8EqMD5hBBU0RUQev5Q&oh=312cddb1504fdf6369a7dc0d7d74a69b&oe=58E57627″ width=”500″ />

গতকাল সারাদিন (১৬ই ডিসেম্বের,২০১৬) অনেকের লেখাই পড়লাম। অনেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও কারো কারো লেখায় দেখেছি চরম হতাশা। প্রবাসী একজন লেখিকা তার মধ্যে অগ্রগণ্য। আর তাদের হতাশার কারণটিও অবান্তর নয়। ৪৫ বছরে দেশে মৌলবাদের হুংকার বৃদ্ধি পেয়েছে আশংকাজনকভাবেই। পাহাড়ে জ্বলেছে অশান্তির আগুন। পুড়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রফদায়ের সাজানো ঘর বাড়ি।চাপাতির আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন মুক্তচিন্তক ব্লগার , মন্দিরের পুরোহিত ,ইসলামী চিন্তাবিদ , গির্জার পাদ্রী ,প্রকাশক অনেকেই। টানা ২১ বছর ধরে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় রাস্ট্রীয়ভাবে লালন পালন করা হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার ফ্রাংকেন্টস্টাইনকে। ঘটেছে ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ বা হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা। কাজেই হতাশা জাগাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একটি ব্যাপার এড়িয়ে গিয়েছেন বা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা মোটাদাগেই। হয়তোবা এড়িয়ে গিয়েছেন সচেতন ভাবেই। সেটি হলো তাঁদের এই সকল হতাশার কারণগুলি ঘটেছে স্বাধীনতা উত্তরকালে। তাই বলে একাত্তর তো আর মিথ্যে হয়ে যায়না। যেমন মিথ্যে হয়ে যায়না ৩০ লক্ষ শহীদের মহান আত্মত্যাগ বা ২ লক্ষ বীরাঙ্গনা মায়েদের ক্রন্দন আর দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস।

তাদের বেশীরভাগ এর বক্তব্য হলো একাত্তর তাঁদের কিছুই দেয়নি। কিংবা দেয়নি এদেশের মানুষকে। আসলেই কি তাই? প্রথমতঃ ১৬ ই ডিসেম্বর আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতা। কর্ণাটক হতে আগত সেনদের হাতে পাল সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। সেন ,পাঠান , সুলতান , মুঘল , ইংরেজ আর পাকিস্তানের পায়ের নীচে যে স্বাধীনতা অস্তমিত হয়েছিল প্রাণ দুই হাজার বছর্। ১৬ ই ডিসেম্বর সে পরাধীনতার জিঞ্জির ছিন্ন করে দিয়েছিলো চিরতরে। উদ্ভাসিত হয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য আপন মহিমায়। আমরা পেয়েছিলাম নিজেদের জন্য একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড। বাঙালীর বাংলাদেশ। যে স্বপ্ন দেখেছিলেন কবিগুরু। যা করতে চেয়েও পারেননি শরত বসু , নাজিমুদ্দিন হাশিমরা।

২৬ শে মার্চ রাতে আহমদ ছফা লিখেছিলেন ,

“চমকে ওঠা অন্ধকারে থমকে দাড়ায় রাত ,
আদ্যিকালের ইতিহাস বাড়ায় লোহার হাত”

সেই আদ্যিকালের ইতিহাসের সুলুকসন্ধান আমাদের নিয়ে গিয়েছিল “তীর হারা ঢেউয়ের সাগর পাড়ি” দিয়ে ১৬ ই ডিসেম্বরের দিকে। একাত্তর নিয়ে হাপিত্যেশ করার আগে আমরা অনেকেই কিন্তু ভেবে দেখিনা এই ব্যপারটি। একাত্তর আমাদের অনেক কিছুইতো দিয়েছে। মেজর হয়েছেন মেজর জেনারেল , হাবিলদার হয়েছেন ডিআইজি , হাকিম হয়েছেন বিচারপতি , মুদির দোকানী হয়েছেন শিল্পপতি। স্বাধীনতা না আসলে এসব হতো স্রেফ অলীক কল্পনা।

আজ হাইফাই বারে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে যারা একাত্তরের সমালোচনা করেন , স্বাধীনতা না এলে তাদের বেশীরভাগই সেসব বারের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিও করতে পারতেন কিনা সন্দেহ। স্যাণ্ডহার্স্ট এলিট মিলিটারী একাডেমী হতে পাশ করেও জেনারেল ওসমানী কর্ণেল এর উপরে যেতে পারেননি। ডেপুটি সেক্রেটারীর উপরে মাত্র হাতেগোণা কয়েকজন বাঙালী অফিসার ছিলেন। ধণাঢ্য ২২ পরিবারের মধ্যে মাত্র ১ টি ছিলো বাঙালী। আজ যারা বিএমডব্লু , মার্সিডিজ বা পাজারোতে চড়ে নিজেদের রাজা মহারাজা ভেবে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন , তাদের বেশীরভাগই তখন আমাদের মতো রিকশা বা বাসে বাদুড়ঝোলা জীবন কাটাতেন। আর তাদের কথায় কথায় “অফ শীট ” “ফাকিং কান্ট্রি ” বলে স্মার্টনেস দেখানো ফার্মের মুরগী মার্কা সন্তানেরা বগলে বই আর হাতে ছাতা নিয়ে দৌড়াতেন কোন অবাঙালী মালিকের লাথিগুতোতে কেরানির জীবন কাটাতে। অথচ এই প্রিভিলেইজড শ্রেণীটিকেই দেখা যায় দেশ , বিপ্লব ,স্বাধীনতা প্রসঙ্গে উন্নাসিকতা দেখাতে। অথচ নূর মোহাম্মদ , মতিউর , রুহুল আমিন , জগৎজ্যোতি , ক্যাপ্টেন করিম , রুমী ,বদি আজাদদের মতো বীর সেনানীরা জীবন দিয়েছেন তাদের এই সুন্দরভাবে জীবন ধারণের সূযোগ দেয়ার জন্যই।

বিকৃতি যা এসেছে , সব এসেছে পরবর্তীকালে। যা নিতান্তই দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। কিন্তু একাত্তর ছিলো বন্ধন মুক্তির সময়। হুমায়ূন আজাদের ভাষায় , “!বাঙালী আবার বাঙালী হয়ে উঠেছিলো একাত্তরে” আর তাই পরবর্তী পেছল পথের যাত্রার জন্য ১৬ ই ডিসেম্বরের অপরিহার্যতা অস্বীকার করার কোন মানে হয়না। এতে অপমানিত হন সেই সব বীর শহীদেরা যাদের আত্মত্যাগের কাহিনী স্বর্ণাক্ষরে লেখা রইবে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। কারণ পরে মানুষ অমানুষের প্রশ্ন উঠলেও সেসব আগুন ঝরা দিনগুলোতে আমরা যে আসলেই সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠেছিলাম।

কবি আসাদ চৌধুরীর ভাষায় বলতে গেলে ,

“নদীর জলে আগুন ছিল আগুন ছিল বৃষ্টিতে
আগুন ছিল বীরাঙ্গনার উদাস করা দৃষ্টিতে।
আগুন ছিল গানের সুরে আগুন ছিল কাব্যে,
মরার চোখে আগুন ছিল এ কথা কে ভাববে ?
কুকুর-বেড়াল থাবা হাঁকায় ফোঁসে সাপের ফণা
শিং কৈ মাছ রুখে দাঁড়ায় জ্বলে বালির কণা। আগুন ছিল মুক্তিসেনার স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়-
প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে কাঁপছিল সব অন্যায়।
এখন এসব স্বপ্নকথা দূরের শোনা গল্প,
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম এখন আছি অল্প।”

কাজেই বিজয়ের দিনে লক্ষ শহীদের আত্ম বলিদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে অন্তত বিজয়ের মহান দিনটিকে যেন আমরা আর যেন অকারণে প্রশ্নবিদ্ধ না করি বন্ধুগণ ……

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “পরবর্তী পথ চলার ভুলের কারণে একাত্তরকে অস্বীকার করা যায়না বন্ধুগণ

  1. দীর্ঘ ২১ বছরে ক্ষমতাসীনদের
    দীর্ঘ ২১ বছরে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় যতটা সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করা হয়েছে, পৃষ্টপোষকতা করা হয়েছে, তারচেয়ে কয়েকগুন বেশি করা হয়েছে বিগত ৪/৫ বছরে। আওয়ামীলীলীগের পৃষ্টপোষকতায় এতটা করার পরও আপনাদের বোধদয় এখনো কেন হয় না বুঝিনা! খুব দ্রুত বাংলাদেশ তার অসাম্প্রদায়িকতার চেহারা হারিয়েছে আওয়ামীলীগের আমলে।

  2. আওয়ামিলীগ আসলে ধোয়া তুলসী
    আওয়ামিলীগ আসলে ধোয়া তুলসী পাতা। শুধু সভানেত্রীইই একজন মুসলমান। উনি প্রধানমন্ত্রী হয়েও চাপাতিওয়ালাদের পক্ষে সাফাই গান। এটা কী সাম্প্রদায়িকতা?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2