“বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালের ১৬’ই ডিসেম্বর” পোস্টের জবাবে…

শেখ মুজিব কিংবা মেজর জিয়াউর রহমানের মতই বৈদ্যনাথতলার নতুন সরকার স্বাধীনতার ঘোষণা লিখিত আকারে প্রকাশ করে। এর আগের ঘোষণাগুলো ছিলো অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক, সেই ঘোষনাগুলোর প্রায় দুই সপ্তাহ পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে এই লিখিত ঘোষণা আবার প্রচার করা হয় ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে। ঘোষনাপত্রটি ছিলো এমনঃ

“We, the elected representatives of the people of Bangladesh, as honour bound by the mandate given to us by the people of Bangladesh, whose will is supreme, duly constituted ourselves into a Constituent Assembly, and having held mutual consultations, and in order to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice, declare and constitute Bangladesh to be sovereign People’s Republic, and thereby confirm the declaration of independence already made by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, and do hereby affirm and resolve that till such time as a Constitution is framed, Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman shall be the President of the Republic and that Syed Nazrul Islam shall be the Vice-President of the Republic, and that the President shall be the Supreme Commander of all the Armed Forces of the Republic…”

বাংলাদেশের সংবিধানের সূচনাতেই বলা আছেঃ

We, the people of Bangladesh, having proclaimed our independence on the 26th day of March, 1971 and through [ a historic struggle for national liberation], established the independent, sovereign People’s Republic of Bangladesh

এখানে proclaimed শব্দটার আলাদা গুরুত্ব আছে। ২৬শে মার্চে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা আসে, এবং সেইদিন থেকেই বাঙ্গালী এই স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব অর্জনের সংগ্রামে লিপ্ত হয়। স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব দুটো কন্ডিশনের মত। ধরে নেই আমার দেশে এক সুপার পাওয়ার ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে আর নানা কলকাঠি নাড়াচ্ছে, তার মানেও এমন করা যায় আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন নই। আবার দেশের একটা অংশে শত্রু রাষ্ট্রের কব্জা থাকলে তার কারণে বলা যায় সম্পূর্ণ দেশের উপর আমাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত নেই। ২৬শে মার্চে আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার পর আমাদের অবস্থা ছিল তেমনই, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে ছিল শত্রু আর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তবে বাঙ্গালীর যে আলাদা রাষ্ট্র, সেটার জন্ম সেইদিনই হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিএনপি কিংবা এরশাদ সরকারও অস্বীকার করেনি। সেই সরকারেরও নানা পত্রে বাংলাদেশ সরকারই লেখা হতো, অন্যকিছু নয়।

সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের কন্ডিশন অর্জন করবার আগ পর্যন্ত একটা দেশের জন্ম হতে পারবে না এমন ভাবলে অনেককিছুই অস্বীকার করতে হয়। একটা উদাহরণ নেই, ২১শে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস, কিন্তু কোন সালের ২১শে নভেম্বরকে সশস্ত্র বাহিনীর সূচনালগ্ন ধরা হয়? সেটা ৭১ সালেরই এবং ১৬ই ডিসেম্বরের আগের। এখন যদি কেউ বলে ১৬ই ডীসেম্বর রাষ্ট্রের জন্ম, তবে তো এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের আগেই বাচ্চা পয়দা করে বসে আছে।

২৬ মার্চের আগপর্যন্ত বাঙ্গালী সরাসরি স্বাধীনতার দাবী করেনি, পশ্চিম পাকিস্তানীরা ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই আলাদা হবার প্রশ্ন থাকতো না। সেটা হয়নি দেখেই ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা। শেখ মুজিব কিংবা মেজর জিয়াউর রহমানের মতই বৈদ্যনাথতলার নতুন সরকার স্বাধীনতার ঘোষণা লিখিত আকারে প্রকাশ করে। এর আগের ঘোষণাগুলো ছিলো অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক, সেই ঘোষনাগুলোর প্রায় দুই সপ্তাহ পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে এই লিখিত ঘোষণা আবার প্রচার করা হয় ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে। ঘোষনাপত্রটি ছিলো এমনঃ

“We, the elected representatives of the people of Bangladesh, as honour bound by the mandate given to us by the people of Bangladesh, whose will is supreme, duly constituted ourselves into a Constituent Assembly, and having held mutual consultations, and in order to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice, declare and constitute Bangladesh to be sovereign People’s Republic, and thereby confirm the declaration of independence already made by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, and do hereby affirm and resolve that till such time as a Constitution is framed, Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman shall be the President of the Republic and that Syed Nazrul Islam shall be the Vice-President of the Republic, and that the President shall be the Supreme Commander of all the Armed Forces of the Republic…”

ঘোষণাপত্রটি প্রস্তুত করেন ব্যারিষ্টার আমীরুল ইসলাম এবং এটিই ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের সময় আবার পাঠ করা হয়। এটাকেই ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গন্য করা হয় এবং ১৯৭২ সালে নতুন সংবিধান পাসের সময় এটাকে এবং এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সকল কার্যক্রমকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। শেখ মুজিব যে দেশে পৌছেই প্রধানমন্ত্রী বনে যান, সরকারের প্রধানব্যক্তি হয়ে যান, তা কিন্তু সেই অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের ঘোষণা এবং স্বীকৃতির বদৌলতেই।

১৯৭১ এর এপ্রিলেই তৎকালীন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা অস্থায়ী সাংবিধানিক সভার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র উপস্থাপন করেছিলেন এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রথম কেবিনেট নিয়োগ করেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে তার অনুপস্থিতিতেই ঘোষনা করা হলো বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি।

কেবিনেট ঘোষনা করবার পর শুরু হয় শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান। এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমেদের অধিনায়কত্বের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম মঞ্চে উপস্থিত হবার সাথে সাথে ধীরে ধীরে প্রথমবারের মত উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা এবং জাতীয় পতাকাকে সশস্ত্র সালাম প্রদান করেন এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যদের সম্মানেও সশস্ত্র সালাম প্রদান করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি মঞ্চে এসে তার বক্তব্য প্রদান করেন এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি এবং সহযোগিতা প্রদানের আকুল আবেদন জানান। এরপর কর্নেল ওসমানীর অধীনে ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং আনসারের একটি দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যদের গার্ড অফ অনার প্রদান করেন।
.
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আরও ঘোষনা করেন আজ থেকে বৈদ্যনাথতলার নতুন নাম হবে মুজিবনগর, সেই সাথে মুজিবনগর বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে গন্য হবে।

এখন ভেবে দেখেন, বাঙ্গালী নিজেরা সরকার গঠন করে ফেললো, পতাকাও আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ফেললো। বক্তব্যটাকেই অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে ঘোষণা করলো এবং পরে সেটা রেগুলারাইজও করা হয় ২৬ মার্চকে সুচনাকাল ধরে। এটাকে রাষ্ট্র গঠন বলবেন না?

রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর মানুষের আবেগের মুল্য আলাদা, একটা জাতি নিজেরা কি মনে করছে সেটাই আসল। বাঙ্গালীরা মনে করে ২৬শে মার্চের পর থেকেই তারা আলাদা। আত্মসমর্পণের দলিলেও লেখা ছিলো ভারত এবং বাংলা দেশ ফোর্সেস। তো ওই বাংলা দেশ ফোর্সেসটা কি ১৬ই ডিসেম্বরই গঠিত হয়? এখন কেউ বলতে পারে এর আগেই তো ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে কয়টা কিংবা ঠিক কোন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলে এবং কতটূকু অঞ্চলের উপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে বলা যায়? বাংলাদেশের সর্বশেষ অংশ হিসেবে মিরপুর মুক্ত হয় ৩১ শে জানুয়ারী ১৯৭২। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র ৭৫ এর আগে আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। তাহলে কি আমাদের জন্ম আরও পরে নাকি এখনও হয়নি? কোনো রাষ্ট্রের এখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া বাকী আছে নাকি আমি জানি না… সর্বশেষ রাষ্ট্রটা আমাদের যেদিন স্বীকৃতি দিয়েছে সেই তারিখ ধরবো নাকি?

আমি মনে করি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের জন্ম ২৬শে মার্চই। মন্টেভিডিও কনভেনশন যাই বলুক, আমরা যেমন ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করি না, এবং তাতে ইসরাইলের কিছু আসে যায়না। তেমনই আমরা আমাদের রাষ্ট্রের জন্মটা যদি ২৬শে মার্চই বলি, তাতেও অন্যরা যাই বলুক, রাষ্ট্র বিজ্ঞানে যাই থাকুক, আমাদেরও কিছু যায় আসে না…

ব্যাপারটা খুব বেশি জরুরী না, আবার জরুরীও। এই বার্থডে বলাটা কেমন যেন সস্তা লাগে। এরচেয়ে একটা গৌরবোজ্জ্বল দিনকেওকে আমরা নাহয় গর্ব নিয়ে বিজয় দিবসই বলি। আমি নিজে মনে করি রাষ্ট্রের জন্মদিন পালনের আলাদা কোনো মানে নাই, স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবসই যথেষ্ঠ। আলাদা করে বিতর্ক সৃষ্টি করে লাভ কি? এইদেশে বিতর্কের টপিকের তো অভাব নাই। এইসব দিবসকেও বিতর্কের ব্যাপার না বানাই…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 + = 37