মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়…

মুক্তিযুদ্ধ। শব্দটা শুনলেই অকল্পনীয় এক আবেগের ধাক্কা মস্তিষ্ক প্রকম্পিত করে। রক্তে ঝড় ওঠে। মনে হয় ভিতরে কী যেন একটা হয়ে যাচ্ছে। শব্দটা কোন সাধারণ শব্দ নয়। আবেগ, বীরত্ব, বেদনা আর স্বপ্নের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই একটি মাত্র শব্দে। আমাদের জন্ম,আমাদের পরিচয়- এই একটি শব্দেই। ‘মুক্তিযুদ্ধ’। কত লাখ লাখ মানুষের রক্ত,আর্তনাদ,জীবন,বেদনা আর বীরত্বের গল্প জড়িয়ে আছে এই শব্দের সাথে? সেটা কি পরিমাপ করা সম্ভব জাগতিক কোন নিক্তিতে?

যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্মযুদ্ধ এবং এর ক্ষেত্রটা অনেক ব্যাপক তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা যায়, তৈরি করা যায় অসাধারণ কোন চলচ্চিত্র বা ডকুমেন্টারি। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটা গল্প বলে শেষ করা যাবেনা, প্রতিটা ক্ষেত্র পরিপূর্ণ ভাবে বিশ্লেষণ করা যাবেনা, প্রতিটা কান্না কিংবা প্রতি ফোঁটা রক্তের হিসেব করা যাবেনা। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীরই নানা দিক রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় এদেশ ছিল অন্ধকার সামরিক অপশাসনের ভিতরে। সে সময় স্বাধীনতা বিরোধীরা নতুন করে জাকিয়ে বসেছে,শক্তি সঞ্চয় করেছে, বিকৃত করেছে ইতিহাস। ফলে আমাদের এখানে বেশ কয়েকটি বিভ্রান্ত প্রজন্মের সৃষ্টি হয়েছে। যারা কিনা এখনও শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কিংবা ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ প্রশ্নে সন্দেহ প্রকাশ করে!

আমার সৌভাগ্য যে আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। পারিবারিক আবহাওয়া আমাকে বিভ্রান্ত হতে দেয়নি। আশার কথা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন অনেক লেখালেখি হচ্ছে। পুরানো প্রামাণ্য লেখা গুলোও নতুন করে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমি ঐতিহাসিক নই, ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণও আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি এই প্রজন্মের একজন হিসেবে বিজয়ের ৪৫ বছর পর শুধু এটাই বিশ্লেষণ করতে পারি, যে উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, ত্রিশ লাখের অধিক প্রাণ বিসর্জিত হয়েছিল- সেটা আমরা কতটুকু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি?

২.

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করে। এই ঘোষণাপত্রের এক স্থানে বলা আছে-
“বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম…”

সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, যখন দেশ শত্রুমক্ত হয়নি, যখনও আমাদের কোন সংবিধান রচিত হয়নি, সেই সময়েই, এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। পাকিস্তানের অধীনে থাকা অবস্থায় আমাদের এই তিনটি জিনিসের অভাব ছিল। আমরা সেগুলো অর্জন করতে চেয়েছি। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কিন্তু এগুলো কতটুকু অর্জিত হয়েছে? এই ২০১৬ সালের শেষে এগুলো কতটুকু আমরা অর্জন করেছি?

‘সাম্য’ শব্দটির মানে কী? ইংরেজিতে যাকে বলা যায় Equality. বাংলায় সেটি সাম্য। সোজা বাংলায় ‘সাম্য’ শব্দটি দিয়ে মূলত বলতে চাওয়া হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে, ‘সমান’ বলে বিবেচিত হবে। কোন মানদন্ডেই কোন নাগরিকের সাথে কোন রকম বৈষম্য করা যাবেনা। আমাদের সংবিধানেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সাম্যের হাত ধরেই ‘মানবিক মর্যাদা’র ব্যাপারটি চলে আসে। যখন সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে, তখন সেখানে মানবিক মর্যাদাও জায়গা করে নেবে। আর যখন সাম্যের ভিত্তিতে মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন কোন সমাজ তৈরি হয়,সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই সুবিচার লাভ আশা করা যায়। কিন্তু সব কিছুর মূলে যে সাম্য, সেটা আমাদের সমাজে কতটুকু বিদ্যমান?

সাম্প্রতিক একটা খবরের দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই। সম্প্রতি নেত্রকোনায় বাউল গানের আসর বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। প্রশাসন কাজটি করেছে ‘হেফাজতে ঈমান’ নামে একটি সংগঠনের দাবীর প্রেক্ষিতে। এই সংগঠনটির মতে বাউলদের এরকম গান বাজনা শরীয়ত সম্মত নয়। এগুলো চলতে দেয়া ইসলাম বিরোধী!
এই খবরটির সাথে স্বাধীনতা, সাম্যের কি কোন সম্পর্ক আছে? সম্পর্ক আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার? কাল যদি কোন একটা ভুঁইফোড় ধর্মীয় সংগঠন এসে দাবী করে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস পালন করা বেশরয়তী,তখন প্রশাসন কী করবে? বহুদিন ধরেই ধর্মীয় সংগঠন গুলো বলে আসছে পহেলা বৈশাখ পালন, শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া- এগুলো ‘হিন্দুয়ানী’, ইসলাম বিরোধী। প্রশাসন বা সরকার কি তবে এগুলো বন্ধ করে দিবে? আপনাদের কাছেই প্রশ্ন রেখে গেলাম, সাম্যের সাথে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে এই ঘটনার কতটুকু সম্পর্ক আছে?

এবার দেখা যাক, দেশের প্রতিটা নাগরিক কি সমান? সবাই কি সাম্যের মধ্যে বসবাস করছে? রামু, নাসিরনগর, সাথিয়া,গোবিন্দগঞ্জ – এই ঘটনা গুলো সাম্যের পরিচায়ক? স্বাধীনতার পরে কমতে থাকা অন্যান্য ধর্মাবলম্বিদের সংখ্যা আমাদের কী বার্তা দেয়? ৭১ এ যেভাবে ‘হিন্দু’ হবার ‘অপরাধে’ অসংখ্য মানুষকে মরতে হয়েছে সেভাবে এখনও কি কেবল ‘হিন্দু’ হবার অপরাধেই অসংখ্য মানুষকে সহায় সম্বল হারিয়ে আক্রমণ নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছেনা? ৭১ এ হিন্দু পরিবারের মেয়েরা সিঁথিতে সিঁদুর পড়তো না,হাতে শাঁখা পড়তো না- যেন তাদের ‘হিন্দু’ পরিচয়টি প্রকাশ না হয়ে যায়। আমি এমন একটি পরিবারকে চিনি যে পরিবারের মেয়েরা সিঁদুর পড়েনা,ঐ একই কারণে! তাহলে এই বিজয়ের অর্থ কী? এই বিজয়ের মূল্য কী?

হ্যাঁ। মূল্য অবশ্য আছে। পৃথিবীর বুকে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি দেশ আছে। সে দেশটিকে কোন অর্থেই এখন আর ‘তলা বিহীন ঝুড়ি’ বলা যাবেনা। অর্থনৈতিক দিক থেকে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিক আর গার্মেন্টস কর্মীদের রক্ত আর ঘামের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের এই অর্থনৈতিক উন্নতি। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আমরা অসংখ্য দিক থেকে এগিয়ে আছি খোদ পাকিস্তানের থেকেই। পাকিস্তান যেখানে একটি Failed State সেখানে আমরা সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল দেশ। অবশ্যই আমাদের অর্জনের অভাব নেই এই ৪৫ বছরে। এটাকে প্রাথমিক অর্জন বলে ধরে নিলেও,প্রশ্ন থেকে যায়,’সত্যিকার’ অর্থেই উন্নতির দিকে আমরা করে ধাবিত হব?

৩.

একটা সময় পৃথিবী পরিচালিত হত যুদ্ধ দিয়ে। একটা সময় শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে বিবেচনা করা হত তেল-গ্যাস-খণিজ এগুলোকে। শিল্প বিপ্লবের পর যে দেশ গুলো পরিবর্তিত ধ্যান ধারণাকে গ্রহণ করার বদলে আদিম ধ্যান ধারণা লালন করতে থাকল তারা পিছিয়ে পড়ল। অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া দেশ গুলো পরিণত হল পৃথিবীর নীতি-নির্ধারকে। এই কারণে প্রবল পরাক্রমশালী অটোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেল, অন্যদিকে এক সময়ের অপরিচ্ছন্ন পিছিয়ে থাকা ইউরোপ পরিণত হল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও উন্নতির সূতিকাগা।রে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি বিপ্লব হয়েছে। সেটি হল প্রযুক্তির বিপ্লব, জ্ঞানের বিপ্লব। এখন তেল-গ্যাস-খণিজ নয়, সব থেকে বড় সম্পদ হল জ্ঞান। এখন যারা এই জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে প্রাচীন পুথি নিয়ে পড়ে থাকবে তারা পিছিয়ে পড়বে, অন্যদের দ্বারা শোষিত হবে। আর যারা এই বিপ্লবে শামিল হয়ে নিজেদেরকে এর জন্য প্রস্তুত করবে তারাই নেতৃত্ব দিবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর। এরকম একটা সময়ে আমাদের অবস্থান কোথায়? আমরা কি এই বিপ্লবে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত?

একটু মন দিয়ে ভাবলেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন। উত্তরটি হল, আমরা প্রস্তুত নই। প্রস্তুত তো নইই, প্রস্তুতি যে নেয়া দরকার- এটুকুও আমরা মনে করিনা। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে এসে আমরা একটা বদ্ধ সমাজে বাস করছি। একটা বন্ধ্যা সমাজে বাস করছি। যেখানে কোন কিছু সৃষ্টি হয়না, মৌলিক কোন ধারণা-জ্ঞান-শিল্পের জন্ম হয়না। প্রথাগত ধ্যান ধারণার বাইরে এসে যারাই কিছু ভাবতে চান, বলতে চান- উল্টো তাদেরকে থামিয়ে দেয়া হয় নির্মম নিষ্ঠুরতার সাথে। প্রতিটা পরিবর্তনশীল সমাজেই কিছু প্রাচীনপন্থী মানুষ থাকবে, তারা প্রগতির পথে বাঁধা সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই বাঁধা যখন রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের উপরে আরোপিত হয় তখন সেখানে জ্ঞান বিকাশের কোন রাস্তা থাকেনা। রাষ্ট্র যখন প্রাচীনপন্থীদের কাছে নতি স্বীকার করে প্রগতির বিপক্ষে অবস্থান নেয় তখন সেখানে নতুন কিছু সৃষ্টি হতে পারেনা। রাষ্ট্রের,প্রগতির পথে এই বিরূদ্ধাচরণ শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানির নামান্তর।

বাহাত্তরের সংবিধানটি ছিল স্বাধীনতার পর, শহীদের রক্ত দিয়ে কেনা বাঙ্গালির মুক্তির দলিল। সেই সংবিধানে কাটা ছেড়া করা হয়েছে বহুবার। সংবিধানের মূলনীতি পর্যন্ত পরিবর্তীত হয়েছে। যেখানে আমাদের গড়ে তোলার দরকার ছিল একটি জ্ঞানভিত্তিক সাম্যবাদী রাষ্ট্র, সেখানে আমরা গড়ে তুলেছি ধর্মভিত্তিক বৈষম্যবাদী রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা হাঁটছি উল্টোদিকে! এই উল্টোদিকে হাঁটার ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি আমাদের হচ্ছে, হাজারটা পদ্মাসেতু করেও সেই ক্ষতি পোষাণো যাবেনা। অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়তে সময় লাগবেনা, যদিনা আমরা জ্ঞান ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে না পারি।

চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের সাম্প্রতিককালের সব থেকে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয় যখন দেখি কুখ্যাত রাজাকার সাঈদীর ছেলে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সম্মাননা’ দিয়ে বেড়াচ্ছে! যখন দেখি জামাত ইসলামী দলটি এখনও দাপটের সাথে রাজনীতি করে বেড়ায়।যখন দেখি জঙ্গীবাদী প্রতিক্রিয়াশীল দল গুলো সমাজে ব্যাপক মাত্রায় গ্রহণযোগ্য অবস্থানে আছে। তখন মনে হয় বিজয় অর্জন থেকে আমরা হয়তো এখনও বেশ দূরে। তবে কি আমরা এখন বসে বসে হা-হুতাশ করব? কেন আমরা উল্টো পথে হাঁটছি- সেটা নিয়ে কান্নাকাটি করব?

মুক্তিযুদ্ধ- একটা আবেগের নাম। একটা চেতনার নাম। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই চেতনার মশাল এখন আমাদের হাতে এসে পৌছেছে। কেবল হা-হুতাশ করলেই হবেনা, এই মশালকে আরও শতগুণে উজ্জ্বল করে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমি যেটাকে বলেছি ‘প্রাথমিক বিজয়’ সেটি অর্জিত হলেও আধুনিক বিশ্বে নিজেদের শক্তিশালী ও মর্যাদাবান অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার যে লড়াই সেটা আমাদের লড়তে হবে। এখানে আমাদের শত্রু অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, প্রাচীনত্ব আর প্রতিক্রিয়াশীলতা। এর বিপরীতে জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রগতিশীল ধ্যান ধারণাকে অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আমাদের।

আমাদের কে আওয়াজ তুলতে হবে,বলতে হবে, হিন্দুরা এদেশে মার খাবে- এজন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। প্রগতিশীলরা এদেশে কোপ খেয়ে রাস্তার লুটিয়ে পড়ে থাকবে- এজন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। ভুঁইফোড় কিছু সংগঠনের জন্য এদেশের ঐতিহ্যবাহি বাউল গানের আসর বন্ধ হয়ে যাবে- এজন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। রাজাকারের ছেলে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সম্মানিত'(!) করবে- এজন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দেন নি। বিশ্বের উন্নত দেশ গুলোর কাতারে না গিয়ে প্রাচীনপন্থী হয়ে থাকার জন্য এদেশের মানুষ অস্ত্র তুলে নেয়নি।

দ্বিতীয় পর্যায়ের এই যুদ্ধ কে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। এই যুদ্ধেও প্রাণ দিতে হতে পারে, হচ্ছেও। আমার ভাইএর রক্তে এখনও রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ। তবে যেকোন মূল্যে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা জরুরী। আমরা যদি হেরে যাই তবে আবারও আমরা পিছিয়ে পড়ব কয়েকশ বছর। উন্নত দেশ গুলো যেখানে জ্ঞান সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবে পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর, আমরা তখনও নিজেদের মধ্যে হানাহানি করব,মন্দির ভাঙ্গব,নির্যাতন করব সংখ্যালঘুদের। জ্ঞানভিত্তিক দেশ গুলো যখন পৃথিবীতেই স্বর্গ প্রতিষ্ঠা করবে,আমরা তখনও পরকালীন স্বর্গ নিয়ে ফতোয়া জারি করে বেড়াব।

৪.

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ কোন ফ্যান্টাসি ছিলনা। ছিল জীবন হাতে নিয়ে শত্রুর সাথে লড়াই করার ব্যাপার। একজন মুক্তিযোদ্ধা লড়াই করতে যাবার আগে ধরেই নিতেন হয়তো তিনি আর ফিরবেন না। জীবনকে এত সহজে দেশের জন্য উৎসর্গ করতে পেরেছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীন। তার থেকে অনেক সুন্দর এবং সুবিধাজনক অবস্থানে বাস করছি আমরা। তাদের উত্তরসূরি হয়ে তবে কেন আমরা ভয় পাব? কেন আমরা প্রতিহত করতে পারব না অন্ধকারের অপশক্তি গুলোকে? আমাদের মধ্যে যারাই এই লড়াই এর গুরুত্বটুকু অনুধাবন করেন, তাকেই এগিয়ে আসতে হবে এই যুদ্ধে।

এই সন্ধিক্ষণে এসে আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতাকে আরও উচ্চতর অবস্থানে নিয়ে যাব নাকি জড় পদার্থ হয়ে বসে থেকে, অন্ধকারের অপশক্তি গুলোকে আমাদের উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেব? জ্ঞান বিজ্ঞান আর আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ কে সুখী মানুষের জ্ঞানভিত্তিক উন্নত রাষ্ট্র পরিণত করব, নাকি অভিবাসী শ্রমিক আর গার্মেন্টসকর্মীদের পিষ্ট করে যেকোন মূল্যে টাকা বানিয়ে নির্বোধদের দেশ হিসেবে পরিচিত হব?

সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সময় বেশি নেই।আমরা যদি ব্যর্থ হই,আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তবে ব্যর্থ হবেন।আসুন না, দেশের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের এই যুদ্ধে জয়ের শপথ নেই…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − = 65