রক্তের সম্পর্ক

সন্তান যখন বড় হয় তখন মা বাবা ও সন্তানের মধ্যে একটা ডিসটেন্স তথা দূরত্বের সৃষ্টি হয়, আর তা বয়সের বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়।
এই দূরত্ব সৃষ্টি হয় দু দিক থেকেই, সন্তানের দিক থেকে যেমন হয়,তেমনি হয় মা বাবার দিক থেকেও।
সন্তান ভাবে, ‘আমি তো অনেক বড় হয়ে গেছি,এখন আর মা বাবার কি প্রয়োজন? ‘
আবার মা বাবা ভাবে, ‘আমার সন্তান তো অনেক বড় হয়ে গেছে,
নিজেরটা নিজেই সামলাতে পারে, এবার আর অত ইনটেনসিভ কেয়ারের দরকার নেই, এবার একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক’।
সন্তান কিংবা পিতামাতার ভাবনার ফসল হিসেবে ক্রমশ বাড়ে সম্পর্ক ও হৃদ্যতার দূরত্ব।
আর এ প্রজন্মে বিষয়টা খুব বেশি।
আমার লেখাটাকে মূল্য দেন আর নাইবা দেন,কিংবা আমায় বোকা বা অহেতুক কিছু ভাবেন না কেন,
একটু বাস্তবতার দিকে তাকালেই সব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
আজ তাই শত শত নতুন নতুন বৃদ্ধাশ্রমের সৃষ্টি হচ্ছে,
আজ তাই শত শত সন্তান বিপথগামী হচ্ছে,
অরাজকতা সৃষ্টির নায়ক হচ্ছে,
আত্মাহুতি দিচ্ছে,
পরনির্ভরশীল হচ্ছে।
কে দায়ী এসবের জন্য?
সন্তান কিংবা পিতামাতা কেউ কম নয়।
আজ সমাজ ও বাস্তবতা শুধু বৃদ্ধাশ্রম বিরোধী জয়গান গাইতেছে,
বাবা মা কর্তৃক সন্তানের প্রতি অবহেলা,
বোঝা হিসেবে দেখা,
নিপীড়ন করার বিরোধিতা কেউ করছে না।
আজ মদ্যপ সন্তানকে বাবা পুলিশের হাতে তুলে দিলে,
ধর্ষক বা খুনী সন্তানকে মা বাবা ত্যাজ্য করলে সবাই হাততালি দেয়,
কিন্তু মা বাবারও উচিত জেলে যাওয়া।
কেননা কতটুকু সুশিক্ষা দিছে সন্তানকে,
কতটুকু খোঁজ নিয়েছে সন্তানের ব্যাপারে?
আজকে ঐশীর মত মেয়েকে সবাই গালি দেয়,
কিন্তু ঐশী কেন এ পথে এলো?
তার মা বাবা কোথায় ছিলো যখন মেয়েটা ধীরে ধীরে বিপথগামী হচ্ছিল?
আজ জঙ্গী হওয়া সন্তানগুলোকে মা বাবাও অভিশাপ দিচ্ছে,
কিন্তু সন্তানগুলো কেন জঙ্গীবাদে জড়ালো তার একটু খোঁজ নিয়েছে মা বাবা?
আজ নারী ও শিশুরা নিগৃহীত হয় যথা তথা যুবসমাজ দ্বারা,
পিতা মাতা কি খোঁজ নিয়েছে তাঁর ছেলেটা কি ধর্মীয় কিংবা নৈতিক শিক্ষা পেয়েছে,
কাদের সঙ্গে সে মিশছে?
এক দল আবার এতটা ইনটেনসিভ কেয়ার করে যে সন্তান মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়ে, হয় পাগল হয়, না হয় আত্মঘাতী হয়।
সমাজ শুধু একচেটিয়া ভাবে।
পিতা মাতা হিসেবে কয়টা দিন সন্তানের খোঁজ খবর নেয় অধিকাংশ পিতামাতা?
আবার সন্তান হিসেবেও কতদিন পিতামাতার খোঁজ নেওয়া হয় অধিকাংশ সন্তান কর্তৃক?
অনেক সন্তান ভুলেও যায় তার মা বাবা কি বেঁচে আছে, না মরে গেছে?
মা বাবার কবরটা যেন কোথায় অবস্থিত?
আধুনিকতা যেমন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে জাপটে ধরে মাটিচাপা দিতে চাইতেছে, তত রক্তের সম্পর্কও ছিন্ন হচ্ছে।
আপনি মা বাবা হিসেবে আধুনিক হোন কিংবা সন্তানকেও আধুনিক বানান, তবে সন্তানের ব্যাপারটাও একটু গ্রহণযোগ্য,জনসমাদৃত ইনটেনসিভ কেয়ার করেন।
আবার সন্তানদেরও উচিত আধুনিকতা আর প্রযুক্তির সাথে তাল মিলাতে গিয়েও মা বাবাকে যেন ভুলে না যাওয়া হয়।
আমরা পিতামাতার কষ্ট নিয়ে গড়া কিংবা সন্তানের চাপাকান্না নিয়ে নির্মিত কোন রিয়েলিটি শো,ম্যাটিনি শো দেখতে চাই না।
দেখতে চাই না মা বাবার অবহেলার কারণে সন্তানের নৈতিক অবক্ষয়,
দেখতে চাই না সন্তানের অবহেলার কারণে মা বাবার জীবন অধ্যায়ের করুণ সমাপ্তি।
‘একই রক্তে গড়া দেহগুলো যেন আজ যেন না হয়
প্রশান্তের এপার ওপার,
দেহগুলো যেন হয় হিমালয়ের মত সুদৃঢ়, সুউচ্চ,
ভালোবাসায় ভরা বরফের পাহাড় ‘।
২০/১২/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =