শ্রমিক আন্দোলন দমানোর অমানবিক কৌশল!

আশুলিয়ায় গত কিছুদিন যাবতই মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন করে যাচ্ছিলো। আজ সরকার এবং মালিকপক্ষের দ্বিপক্ষীয় যোগসাজশে আশুলিয়া এলাকায় ৫৫ টি কারখানা শ্রমিকদের সাথে আলোচনা না করেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চলতি আন্দোলন যাতে না চলতে পারে সেজন্য আন্দোলনরত শ্রমিকদের হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে আবার মজুরি বন্ধের হুমকি দেয়া হচ্ছে,বরখাস্ত করা হচ্ছে অনবরত। আজ সর্বশেষ আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিক নেতাদের এবং শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি -গ্রেফতার চালানো হচ্ছে।ইতিমধ্যে বহু শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয়েছে। সে এলাকায় শিল্প পুলিশের মাধ্যমে এক ত্রাসের সঞ্চার করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করা হচ্ছে , বিজিবি মোতায়েন করে পরিস্থিতি আরো জটিল করে ফেলা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।
শ্রমিক আন্দোলন দমাতে এহেন অমানবিক কৌশল কেনো ?- এই প্রশ্নের উত্তর বিজিএমইএ কি দেবেন তারাই ভালো জানেন। কিন্তু বিজিএমইএ’র এমন একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সরকার শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে এবং প্রকারান্তরে মালিকদের স্বার্থই বাস্তবায়ন করছে কারন এমন একটি সিদ্ধান্তে সরকার টু শব্দটি পর্যন্ত করে নি।

মালিকরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই ভেবে যে-
# যদি ৬ মাসও কারখানা বন্ধ থাকে তবে মালিকদের রূটি রুজির কোন সমস্যা হবে না কিন্তু যদি ১ মাস কারখানা বন্ধ থাকে তবে শ্রমিকের পেটে ভাত জুটবে না। আর এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে অমানবিক কায়দায় পেটের আহার কেড়ে নেয়ার মতো করে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ন্যায্য মজুরি চাইতে গেলে এমন দমন নিপীড়ন ঠিক কোন সভ্যতার মানদণ্ড সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে শ্রমিকের লাভের টাকায় কোটি কোটি টাকার মূণাফা করে মালিক সেই শ্রমিকের মজুরি দিতে তাদের চামড়া খসে পড়ে।

# যেভাবে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে তা প্রমান করে কারখানাগুলোতে কতটা ভালনারেবল অবস্থায় তারা জীবন তাদের কর্মজীবন। যে কারখানায় তারা কাজ করেন সে কারখানায় যে তাদের ন্যূনতম অধিকার নাই এই ঘটনা তা পুনরায় প্রমান করলো।যেকোন সিদ্ধান্ত যে শ্রমিকদের অন্ধকারে রেখেও নেয়া যায় তা স্বৈরাচারী মালিকরা আবারো প্রমান করলো। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা-মানবতার বাইরে গিয়ে দাসমালিকের মতো আচরনই যেন মালিকের চেহারায় বিচ্ছুড়িত হচ্ছে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবি কেনো যৌক্তিক?

গত কিছুদিন যাবত শোনা যাচ্ছে সরকার গ্যাসের দাম বাড়াবে। কিন্তু গ্যাস খাতে সরকারের এখনো মুনাফা অর্থাৎ লভ্যাংশ ৩০০০ কোটি টাকার উপড়ে। লাভ থাকার পরেও সরকারের গ্যাসের দাম বাড়াতে হয় কিন্তু শ্রমিকের বাসাভাড়া-বিদ্যুৎ বিল-দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির কারনে মজুরিবৃদ্ধির দাবি করলেই সরকার- মালিকের যত আপত্তি।মজুরি দাবি করলেই দমন পীড়নের শেষ থাকে না। কিছুদিন আগে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লো যার ফলে দ্রব্যমূল্যের বাজারে চাহিদার দরুন মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকের মজুরিবৃদ্ধির দাবি অযৌক্তিক বলা নেহায়েৎই অন্যায়। দ্রব্যমূল্যের অসহ্য অবস্থার পরেও মালিকরা কি করে অবিবেচকের মতো আন্দোলনকে অন্যায্য মনে করেন! বছরে বছরে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পরিস্থিতি তারা কি করে সংস্থান করবে এসি রুমে রাত কাটানো মালিকরা কি তা জানতে চান কোনদিন? নিজেদের ভোগবিলাস- সম্পদের পাহাড় গড়ে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধেই তাদের যত আপত্তি। বাড়িভাড়া না বাড়ানোর সরকারী নির্দেশনা যে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা ঢাকা শহরে বাড়ী ভাড়া আইনের শূন্য ফলাফল দেখে সেখানকার পরিস্থিতি অনুমান করা যায়।

আন্দোলন হলেই শ্রমিকের নাম হয়ে যায় বিশৃঙ্খলাকারী। কেন?
এ যাবতকালে শ্রমিকরা যত শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী তার হিসাব বের করলে আতকে উঠতে হয়। স্প্রেক্ট্রাম,তাজরিন,রানা প্লাজার গল্প সবারই জানা। নিজের পেটে আহারের সংস্থান যখন না হয়, নিজের মৌলিক মানবিক অধিকার যখন থাকে না তখন আর কিইবা করার থাকে একজন শ্রমিকের। অনবরত শ্রমিক ছাঁটাই ,নির্যাতন, হামলা -মামলা যেন সেখানকার নিত্য দিনকার ঘটনা। আর এসবের প্রতিবাদ করতে গেলেই শ্রমিক হয়ে যায় সন্ত্রাসী। আর শত শত শ্রমিককে যারা লাশ বানিয়েছে আগুনে পুড়ে ,ইট পাথরের নিচে তাদের কি এই সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র স্পর্শ করতে পেরেছে?

যে শ্রমিক মালিক-রাষ্ট্রের মুনাফার ভিত্তি সেই তাদের দমানোর জন্য শিল্প পুলিশ- র‍্যাব- বিজিবির যৌথ আয়োজন অহরহই দেখতে পাওয়া যায়। আন্দোলন হলেই জলকামান-টিয়ার শেল আছড়ে পরে শ্রমিকের উপর। কিন্তু বিগত দিনগুলোতে কোন মালিকের উপর শ্রমিক হত্যার দায়ে শিল্প পুলিশ-র‍্যাব- বিজিবির নড়াচড়া দেখা যায় নি। এ এক চরমতর বৈপরীত্য। প্রশ্ন জাগে – শিল্প পুলিশ তুমি কি মালিকের ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 58