শিরক একটি কবীরা গুনাহ

ইসলামে শিরক একটি কবীরা গুনাহ বা এটি এমন এক ধরনের পাপ, যে পাপের ক্ষমা কখনোই করা হবে না। কেউ যদি শিরককারী হিসেবে মৃত্যু বরণ করে, তাহলে ইসলাম ধর্মমতে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। অর্থাৎ এর কোন ক্ষমা নাই। শিরক সম্পর্কে কোরানের একাধিক জায়গায় মুসলমানদেরকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে।

“তারা আল্লাহর পরিবর্তে এমন বস্তুর ইবাদত করে, যা না তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে, না করতে পারে, কোন উপকার। আর তারা বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।”
[সূরা ইউনুছ ১০:১৮]

“অতএব যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে ”
[সূরা কাহাফ,১৮: ১১০]

শিরক শব্দের অর্থ-অংশীদারিত্ব, অংশিবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, সমান করা, শরিক করা, ভাগাভাগি করা। ইংরেজীতে Polytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Associate, partner. বিশ্বাসগতভাবে, আমলগতভাবে আল্লাহর সাথে ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর অংশিদার/সমতুল্য বা সমান বানানোকে/করাকে শিরক বলে। রব ও ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক (অংশিদার) সাব্যস্ত করার নামই শিরক৷

সোজা বাঙলায় শিরক হলো, আল্লাহর ক্ষমতার সাথে আর কাউকে অংশীদার করা বা অংশীদার মনে করা এবং এই ধরনের বিশ্বাস রাখা। অর্থাৎ ইসলামী আক্বীদা অনুযায়ী, জীবনের যে কোন মুহুর্তে, যে কোন অবস্থাতে এক আল্লাহকেই সর্বময় ক্ষমতার অধীকারী হিসেবে মানতে হবে। তাঁর সাথে অন্য কিছু বা কাউকে অংশিদার করা যাবে না, বা এমন কিছু করা যাবে না যাতে আল্লাহর ক্ষমতার সাথে অংশিদারী হয়ে যায়।

ইসলাম গ্রহন করতে হলে প্রথম যে কালিমাটি পাঠ করতে হয় এবং তা মনে প্রানে ধারন করতে হয় সে কালিমা শুধুই আল্লাহর একত্ববাদকে ঘোষনা করে না, সাথে মুহাম্মদের নবুয়তেরও স্বীকৃতি প্রদান করে। যদিও কালিমাতে শুধুই নবুয়তের স্বীকৃতির জন্য মোহাম্মদের নাম ব্যবহৃত হয়, তথাপি একই সাথে আল্লাহ এবং মোহাম্মদ শব্দদ্বয় কী আল্লাহর সাথে মোহাম্মদকে শরীক করা নয়! হ্যাঁ, যেহেতু এটি একটি কালিমা এবং ঈমানের সাথে জড়িত সেহেতু এই প্রশ্নটা অবান্তরই মনে হয়। হোক অবান্তর, তবুও তো প্রশ্ন, তাই না! তবে, এমন কী কোন ইসলামী ইবাদত দেখাতে পারবেন যেটি মোহাম্মদের নাম ছাড়া সম্পন্ন করা যায়?

বাদ দিন কালিমার সাথে শিরকের সম্পর্ক খোঁজার মত অর্বাচীনীয় প্রলাপের কথা। আসুন জেনে নিই ইসলামী নানাবিধ বিশ্বাস ও ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর সাথে সাথে শুধু মোহাম্মদ নয় বরং আরও যেসব বস্তু এবং বিশ্বাস অবধারিতভাবে এসেই যায় সেসবের কথা।

ইসলামে ছবি তোলা হালাল, না কি হারাম, এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। তবে, প্রানীর ছবি আঁকা যে হারাম তা মোটামোটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

ইবনে মুকাতিল (র)…আবূ তালহা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ঘরে কুকুর থাকে আর প্রানীর ছবি থাকে সে ঘরে (রহমতের) ফিরিশতা প্রবেশ করেন না।
[সহীহ বুখারী, পঞ্চম খণ্ড, হাদিস নং ২৯৯৮]

হুমায়দী (র)…মুসলিম (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) মাসরুকের সাথে ইয়াসার ইবনে নুমায়রের ঘরে ছিলাম। মাসরুক ইয়াসারের ঘরের আঙ্গিনায় কতগুলো মূর্তি দেখতে পেয়ে বললেনঃ আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে শুনেছি এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে, (কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি বানায়।
[সহীহ বুখারী, নবম খণ্ড, হাদিস নং ৫৫২৬]

সহীহ বুখারীর দুটি হাদীস থেকেই বুঝা যায় ছবি বানানো অর্থাৎ প্রাণীর চিত্রাংকন ইসলাম কোন ভাবেই সমর্থন করে না। বলা হয়েছে এমন কিছু আঁকা যাবে না যাতে প্রানদান করা যায়। ছবি নিয়ে শিরকের সাথে সম্পর্কিত আমার প্রশ্নটা হলো মুসলমান সমাজে দেয়ালচিত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন রকমের আরবী ক্যলিগ্র্যাফি নিয়ে। দেখা যায়, এই সব ক্যালিগ্রাফির বেশিরভাগই আল্লাহ্‌ কিংবা মোহাম্মদের নাম সম্পর্কিত। আরবি লিখাকে মুসলমানরা কোন দৃষ্টিতে সম্মান করে সেটা বিবেচনায় না আনলেও, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, আল্লাহ্‌ ও মোহাম্মদ শব্দদয়ের ক্যালিগ্রাফিগুলোকে তাঁরা অনেকটা আল্লাহ্‌ কিংবা মোহাম্মদের মতই শ্রদ্ধা করে। অনেককে এসব ক্যালিগ্রাফিতে চুমুও খেতে দেখা যায়। এইসব ক্যালিগ্রাফিতে আল্লাহ কিংবা মোহাম্মদের প্রাণ কিংবা শক্তি কি সঞ্চারিত হয়? এতে করে ক্যালিগ্রাফির মত স্রেফ একটি বস্তুর সাথে আল্লাহ্‌কে শরীক করা হয়ে যায় না কি!

এই সেদিন নাসিক নির্বাচনে সেলিনা হায়াত আইভি নিজেকে এক কাঠি সরেস ধার্মিক প্রমানের জন্য আল্লাহ্‌ আর মোহাম্মদের নাম খচিত নৌকা নিয়ে নির্বাচনি প্রচারে নেমেছেন। লোকে উনাকে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, এতে কোন সন্দেহ নাই, যে নৌকাটি তিনি নিয়ে বের হয়েছেন সেই নৌকাটিকে সকল মুসলমান শ্রদ্ধার চোখেই দেখবে, সম্মান করবে। এটিকে কোন মুসলমান আর পদদলিত করার মত দুঃসাহস পাবে না। এর কারণ নৌকায় ব্যবহৃত আল্লাহ্‌ আর মোহাম্মদ শব্দদয়ের ক্যালিগ্রাফি। অথচ এই নৌকাটি হয়ত সামান্য কিছু ব্রোঞ্জ অথবা ঐ জাতীয় কোন পদার্থ দ্বারা তৈরী। আল্লাহ্‌ মোহাম্মদের নামের গুনে এই ব্রোঞ্জের নৌকাটি এখন মুসলমানদের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে গেছে। এর সাথে মুশরিকদের মূর্তি পূজার কোন পার্থক্য আছে কি! তাহলে, আইভি আপার নৌকাও কি শিরকের সামিল নয়!

মুসলমানদের জন্য পৃথিবীতে সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান হলো ক্বাবা। সারা পৃথিবীর মুসলমানরা নামাজ আদায়ের জন্য ক্বাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। হ্যাঁ এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহরই নির্দেশ। ব্যপারটা কি এমন যে ক্বাবা ঘর তৈরীর উপাদানগুলি কিংবা এই ঘরটি পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছে? এই ঘরটি কি রক্ষণাবেক্ষণ না করলে যুগ যুগ ধরে কোন অলৌকিক ক্ষমতাবলে যেমনি আছে তেমনি থাকবে? এটি কি এমন কোন ঘর যেখানে সত্যিকার অর্থেই আল্লাহ্‌ অবস্থান করেন? আল্লাহ্‌ যদি অবস্থান করতেন তাহলে এর চারপাশে লাব্বাইক লাব্বাইক বলে হাজিরা দেয়ার একটা যৌক্তিকতা থাকত। অথচ, এই ক্বাবা ঘরটি সার্বক্ষনিকভাবে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়, সময়ে সময়ে মেরামত করতে হয়, এমনকি তালাবদ্ধ করেও রাখা হয়। ক্বাবা ঘরের সবটাই তো পার্থিব। এর সাথে অসীম ক্ষমতার দাবীদার আল্লাহ্‌র তুলনা কোথায়? তাহলে, ক্বাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়া, একে তাওয়াফ করাকে যদি কেউ শিরক-এর সাথে তুলনা করে, ভূল হবে কি?

উপরন্তু, ইসলাম পূর্ব যুগে এই ক্বাবা ছিল আরবের বহুশ্বরবাদীদের সম্মিলিত উপাসনালয়। মক্কা বিজয়ের পূর্বে এতে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ৩৬০টি মূর্তি রাখা ছিল। মূর্তি পূজার ইতিহাস আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদী কিংবা খ্রীস্টানদের মধ্যে পাওয়া যায় না। কোরান এবং হাদীস অনুযায়ী ক্বাবা নির্মান করেছিল ইব্রাহীম এবং নবী পরম্পরায় এটি আল্লাহ্‌র ঘর হিসেবে উপাসিত হয়েছে। ক্বাবার সম্পর্কে কোরান থেকে জানা যায়,

নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।
[ সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৯৬ ]

যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে।
[ সূরা হজ্ব, আয়াত-২৬ ]

স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল কা’বাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিলঃ পরওয়ারদেগার! আমাদের থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।
[ সূরা বাক্বারা, আয়াত ১২৭]

উপরোক্ত আয়াত অনুযায়ী ইব্রাহীম ক্বাবার তৈরী করেছিলেন আল্লাহ্‌র নির্দেশে। যদি ধরেও নেয়া হয়, ইব্রাহীম আর ইসমাইল মুসলমান ছিল এবং সত্যি সত্যি তারাই ক্বাবার নির্মান করেছিল, এরপরও মুসলমানদের আর কোন কোন নবী কিংবা রাসুল ক্বাবার হেফাজতে ছিল কিংবা ক্বাবাতে ইবাদত করত, তার কোন দলিল ইসলামী ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তদোপরি, এই ক্বাবা যুগে যুগে পুরাতন হয়েছে, ভেঙে পড়েছে, সংস্কার করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ্‌ নিজে যেখানে শিরক করতে বারণ করেছেন, একে অমার্জনীয় পাপ বলে ঘোষনা দিয়েছেন, সেই আল্লাহ্‌ কিভাবে ক্বাবা ঘরের মত একটা সম্পুর্ন পার্থিব জিনিসের দিকে মুখ করে নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন? যদি শিরক ছাড়া নামাজ আদায়ের নির্দেশ থাকে, তাহলে আরশ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র আসনের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করাটাই সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক নয় কি? শিরককে অমার্জনীয় গুনাহ ঘোষনা দিয়ে পুনরায় ক্বাবাকে আল্লাহ্‌র উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নির্দেশ দেয়া কি শিরক নয়!

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভ বা ফরজের একটি হলো হজ্ব। সামর্থ থাকলে যে কোন মুসলমানের জন্য অন্তত জীবনে একবার হলেও হজ্বকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের উপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ্ব করা ফরয। আর কেউ যদি অস্বীকার করে তাহলে তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।
[ সূরা আলে ইমরান (৩) : ৯৭]

কিন্তু এই হজ্ব ইসলামের নতুন কোন বিধান নয়। এটি তৎকালীন আরবে প্রচলিত ধর্মগুলোর একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান মাত্র। ক্বাবা এবং হজ্বকে কেন্দ্র করে মক্কার লোকেরা একটি সিজনাল ব্যবসার সুযোগ পেত। হজ্বের মৌসুমে তারা নানাবিধ ব্যবসাগুলোকে গোত্রে গোত্রে ভাগ করে নিত। এই ব্যবসায় যেন কোন ক্ষতি না হয় এ জন্য হজ্বের মাসকে হারাম মাস এবং ক্বাবাকে মসজিদুল হারাম হিসেবে ঘোষনা করেছিল পৌত্তলিকরা। অর্থাৎ, হজ্বের মাসে এবং ক্বাবার আশে পাশে রক্তপাত অর্থাৎ খুনোখুনি ছিল নিষিদ্ধ। এর কারণ যতটা না পবিত্রতার দোহাই, তার চেয়ে বেশি ছিল ব্যবসায়িক যেন সকল গোত্র এবং ধর্মের মানুষেরা ক্বাবাকে নির্বিঘ্নে প্রদক্ষিণ করতে পারে এবং এতে মক্কায় অবস্থানরত গোত্রগুলোর ব্যবসাও ভালভাবে জমে উঠে।

এই হজ্ব ব্যপারটা ইসলামের আবিষ্কার নয়। ইসলামের অন্যান্য ইবাদতগুলোকে ইউনিক (যদিও গোজামিল) এবং অনন্য দাবী করা হলেও হজ্বের ক্ষেত্রে এই দাবী একদম মেনে নেয়া যায় না। এটি সম্পুর্নভাবে পৌতলিক একটা অনুষ্ঠান। মোহাম্মদ নিজেও মক্কা বিজয়ের আগে ওমরা এবং হজ্ব করার জন্য চেষ্টা করেছিল যদিও তখন ক্বাবায় যথারীতি ৩৬০টি মূর্তি ঠিকই বিদ্যমান ছিল। যাই হোক, হজ্ব পৌত্তলিক হোক আর ইসলামের হোক সে বিতর্কে না গেলেও হজ্বের মাধ্যমে যে সমস্ত শিরক পালন করা হয় সে সমস্ত শিরকের মাধ্যমে কেন মুসলমানদের গুনাহ হবে না! হজ্বের মধ্যে শিরক! আঁতকে উঠার মত ব্যপার, তাই না! হ্যাঁ, ক্বাবার চারপাশে জড়ো হয়ে হাজ্বী সাহেবরা লাব্বাইক লাব্বাইক বলে রব তুলেন সেটা কার উদ্দেশ্যে? ক্বাবার? না কি আল্লাহ্‌র? যদি আল্লাহ্‌র কাছে হাজিরা দেয়ার ব্যপার থাকত, তাহলে ক্বাবাতে কেন? হজ্বের সময়ই বা কেন? আল্লাহ্‌ কি ক্বাবাতে অবস্থান করেন? ঈমানের দাবী অনুযায়ী আল্লাহ্‌ তো সর্বত্র বিরাজমান। সর্বত্র বিরাজিত আল্লাহকে ক্বাবার পাশে গিয়ে হাজির হাজির বলার হেতু কী? যে কোন জায়গা থেকেই তো তার কাছে হাজিরা দেয়া যায়! এটা কি মূলত আল্লাহকে হাজির হাজির বলা? না কি ক্বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলা?

হজ্ব অনুষ্ঠানের নানান ব্রত অর্থাৎ নানান নিয়মগুলোও ইসলামের আবিষ্কার নয়, এগুলো পৌত্তলিকদের বিধান। ক্বাবাকে তাওয়াফ করা, সাফা মারওয়া পর্বতের মধ্যখানে সাতবার প্রদক্ষিন থেকে শুরু করে সবগুলোই পৌত্তলিক আচার। সবচেয়ে বড় কথা এই আচারগুলিতে আল্লাহকে নয়, বরং ক্বাবা, পাহাড় পর্বত প্রভৃতি বস্তুকে ভক্তি করা হয়।

হজ্বের একটা আবশ্যিক কর্তব্য হলো শয়তানের স্তম্ভে শয়তানকে উদ্দেশ্য করে পাথর নিক্ষেপ। এর মাধ্যমে শয়তানের ধ্বংসকে প্রতীকিভাবে উদযাপন করা হয়। শয়তানের স্তম্ভকে যদি কেউ মূর্তি হিসেবে দাবী করে এবং এতে পাথর নিক্ষেপকে পূজার সাথে তুলনা করে তাহলে ভুল হবে কি? মূর্তির পূজায় থাকে ভক্তি আর স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের পুজায় থাকে ধ্বংস কামনা, এছাড়া মূর্তিতে বা প্রতিমায় তো কোন পার্থক্য নাই। যে ইসলাম শিরককে কবীরা অর্থাৎ অমার্জনীয় পাপ বলে আখ্যা দেয়া হয়, সে ইসলামে কিভাবে এমন একটি বিধান বা আচার রাখা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। নাকি ইসলামের বিধান বলে এটিকে শিরক হিসেবে নেয়া যাবে না শুধু বিশ্বাসের কারণে!

শয়তানের স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ যেহেতু ভক্তি নয়, সেহেতু একে মূর্তি পূজার সাথে না হয় তুলনা না দেয়া হলো। হজ্বের আরেকটি অনুষঙ্গ হলো হজ্বরে আসওয়াদ বা কালো পাথরে চুমো দেয়া। মুসলমানরা বিশ্বাস করে এই কাল পাথরে চুমো দিলে তাদের জীবনের সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। দাবী করা হয়, এই পাথরটি আদিতে সাদা রঙের ছিল, লোকের পাপ শোষন করতে করতে এটি কালো হয়ে গেছে। অথচ, এই পাথরটি পৃথিবীর অন্য আট দশটা পাথরের মত একটা পাথর ভিন্ন আর কিছুই নয়। এমনকি এটি নিজে নিজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পর্যন্ত যেতে পারে না। ইব্রাহীম তার সময়ের মূর্তি ভেঙে দাবী করেছিল, মূর্তির কোন ক্ষমতা নাই নিজেকে রক্ষা করার। এই কাল পাথরটিকে পাপ শোষনকারী হিসেবে দাবী করা হচ্ছে, এই পাথরটিকে আঘাত করলে এটি কি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে?

মজার বিষয় হলো, এটি যে সামান্য একটি পাথর ভিন্ন অন্য কিছু নয়, তা একটি হাদীস থেকেও ধারনা পাওয়া যায়।

মুহাম্মদ ইবনে কাসীর রহ……….উমর রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তা চুম্বন করে বললেন, আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র, তুমি কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে কখনো আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।
[ সহীহ বুখারি (ইফা), অধ্যায়ঃ ২২/ হজ্ব (হাজ্জ), হাদিস নাম্বার: ১৫১০ ]

আরও মজার বিষয় হলো, এই হাজরে আসওয়াদকে জান্নাতি পাথর হিসেবে দাবী করা হলেও এটি একবার ভেঙে তিন টুকরা হয়ে গিয়েছিল বলে প্রমান পাওয়া যায়। কয়েকটা ঘটনার বর্ননাই এর বড় প্রমান।

## আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. এর শাসনামলে হাজরে আসওয়াদ ভেঙ্গে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি তাকে রুপা দিয়ে বাঁধালেন। আর তিনিই সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে রুপা দিয়ে বাঁধানোর সৌভাগ্য অর্জনকারী।

## ১৭৯ হিজরীতে খলীফা হারুনুর রশীদ রহ. হাজরে আসওয়াদকে রুপা দ্বারা বাঁধায় করা দেখে তাঁর মনে পাথরটিকে সংরক্ষণ ও মেরামতের খেয়াল এল। ফলে তিনি হীরা দ্বারা তাকে ছিদ্র করে রুপা দ্বারা ঢালায় করে দেন।

## ৪১৩ হিজরীতে এক নাস্তিক লৌহ শলাকা দ্বারা হাজরে আসওয়াদের ওপর হামলে পড়ে। ফলে তা ছিদ্র হয়ে যায়। এরপর বনী শায়বার কিছু লোক তার ভগ্নাংশগুলোকে একত্র করে কস্তুরি দ্বারা ধৌত করে তার টুকরোগুলো পুনরায় জোড়া লাগিয়ে দেয়।

## আফগানিস্থান থেকে এক ব্যক্তি মক্কায় এসে হাজরে আসওয়াদের একটি টুকরো উপড়ে ফেলে দেয়। এবং ঐ লোকটি কাবার গিলাফের একটি অংশের সাথে কাবার চৌকাঠের এক টুকরো রুপাও চুরি করে নিয়ে যায়।

উপরোক্ত ঘটনাসমুহের বর্ননা সউদী আরবের প্রসিদ্ধ হজ্জ ফাউন্ডেশন ‘মুতাওয়িফী’ কর্তৃক প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক আল আহিল্লাহ’ ম্যাগাজিনের {সংখ্যা- ৬, ১৪২৭হিজরীর শাওয়ালের) একটি প্রবন্ধ সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই কালো পাথরটিকে চুমো দিলে এটি লোকের পাপ শোষন করে নেবে এই ধরণের বিশ্বাস লালন করা কি শিরকের অন্তভূক্ত নয়? অথচ মুসলমানরা দিব্যি এটিকে কি সুন্দরভাবেই না পালন করছে!

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে ইসলামে শিরকের ব্যপারে কঠোরভাবে নিষেধ করার পরও ইসলাম নিজেই শিরকে নিমজ্জিত হয়ে আছে। মূলত; মুহাম্মদের হাত ধরে ইসলাম প্রবর্তিত হয়েছিল যখন যেখানে যেমন, তখন সেখানে তেমন এই নীতিতে। মোহাম্মদ তার জীবনে ইসলামকে তরবারীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার সাথে সাথে কবিতা লিখা, মদ প্রভৃতি হারাম করার পরও আলোচিত বিষয়গুলোকে হারাম করতে পারেনি, কারণ হিসেবে বলা যায়; হয়ত এই বিশ্বাসগুলোকে হারাম করার মত শক্তি তার ছিল না, কারণ তার অনুসারীদের কাছে এই বিশ্বাসগুলো খুব জোড়ালোভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল অথবা এই বিশ্বাসগুলোকে নিষিদ্ধ করার মত সময় তার হাতে ছিল না। এর আগেই তারা ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “শিরক একটি কবীরা গুনাহ

  1. মুসলীমদের নিজের বগলের তলে
    মুসলীমদের নিজের বগলের তলে গন্ধ সেটা দেখার সময় নাই(বিশ্বাস বলে কথা) আর নিজেরাই কবিরাগুনাহ করে নিজেরাই ফতুয়া দেয়! কি আজব ধর্ম।

  2. ধন্যবাদ এই সুন্দর যৌক্তিক
    ধন্যবাদ এই সুন্দর যৌক্তিক যূগোপযোগী পোস্টটির জন্য। আল্লাহ আপনাকে কষ্ট করে এই পোস্টটি লেখার জন্য যথাযথ পুরস্কার দিন , এই কামনা করি।

    তবে আমার মনে হয় না বর্তমানে বাংলাদেশের কোন মুসলমান এই পোস্টটি থেকে কোন শিক্ষা নেবে। এরা সবাই জন্মগতভাবে উত্তরাধিকার সুত্রে মুসলমান। এদের অধিকাংশই বদ্ধমনা। ভাবনা চিন্তা করে বলে মনে হয় না। মোল্লা ও অ/অল্পশিক্ষিতদের কথা বাদ দিন। আমার বুঝে আসেনা উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার ,ইন্জিনিয়ার ,বিচারক ও অন্যান্য পেশাজীবি যারা আছেন , তারাই বা কেমনে কোন চিন্তাভাবনা ছাড়াই এই সকল শিরকী কাজ সমূহ করে চলেছে?

    আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।

    ৭:১৭৯

  3. বুঝাইতে গেলেই শরীর থেকে
    বুঝাইতে গেলেই শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করে দিবে, তবে আমাদের লেখনীর মধ্য দিয়ে আমরা যা করতে পারি তা তারা চাপাতি দিয়ে অতটা এগুতে পারে না আর পারবেও না….পৃথু স্যন্যাল দাদা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − = 35